Tepantor

আত্নহত্যা; সমাজ, রাষ্ট্র, ও পরিবারের দায়

১১ জুন, ২০২২ : ২:১৯ অপরাহ্ণ ১৩১

মোস্তাফিজ চৌধুরী: ল্যাটিন শব্দ সুই সেইডেয়ার থেকে আত্মহত্যা শব্দটির উৎপত্তি, যার অর্থ হচ্ছে নিজেকে হত্যা করা। আত্মহত্যা বা আত্মহনন (Suicide) হচ্ছে কোনো ব্যক্তি কর্তৃক স্বেচ্ছায় নিজের জীবন বিসর্জন দেয়া বা ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের প্রাণনাশের প্রক্রিয়াবিশেষ।

Tepantor

আমাদের সমাজে যেটাকে সামাজিক ব্যাধি বলা হয়ে থাকে, বিশেষজ্ঞরা আবার একে মানসিক ব্যাধি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে থাকেন। চাইলেই কি কেউ আত্নহত্যা করতে পারে, আত্নহননের পথ বেছে নেয়ার ক্ষেত্রে সমাজ,রাষ্ট্র,ও পরিবারের কি কোন দায় নেই?

বর্তমানে আমাদের সমাজে অধিকাংশ আত্নহত্যার ঘটনায় সমাজ,রাষ্ট্র,পরিবার,আত্নীয়স্বজন,ভালবাসার মানুষ কিংবা পারিপার্শ্বিক অবস্থাকে প্রত্যক্ষভাবে দায়ী করা যায়।

 

ঘটনাঃ ১

নারায়ণগঞ্জে এক তরুণীকে ধর্ষণ করা হয়। তারপর স্থানীয়রা সালিশ বসিয়ে তাকে ডেকে এনে সালিশের মধ্যেই ধর্ষকের ধারণকৃত ধর্ষণের ভিডিয়ো সবার সামনে ছেড়ে দেয়া হয়। এক পর্যায়ে তরুণী কাঁদতে কাঁদতে সালিশ থেকে উঠে বাড়ির দিকে চলে যান। বাড়ি ফিরেই গলায় দড়ি দেন তিনি।

ঘটনঃ ২

পাবনার চাটমোহরে গলায় ফাঁস নিয়ে মিনা খাতুন (৮) নামে এক মাদ্রাসাছাত্রী আত্মহত্যা করেছে,মেয়েটা মাদ্রাসায় যেতে চায়নি তারপরও তার মা জোর করে তাকে পাঠাতো। একদিন এরকম বকাবকি করে পাঠানোর পরে মেয়েটা ঘরে ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করে।

ঘটনাঃ ৩

বাবা-মা ও ভাইয়ের প্রতি নানা অভিযোগ ও অভিমান থেকেই আত্মহত্যার পথ খোঁজে নিয়েছে অর্ক প্রিয়া ধর শ্রীজা। ময়মনসিংহ নগরীর বানিজ্যিক এলাকায় স্বদেশী বাজার মোড়ে রাইট পয়েন্ট নামক বহুতল ভবনের ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে এই স্কুল ছাত্রী আত্মহত্যা করে। সে বিদ্যাময়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্রী। সে গবেষক, ছড়াকার ও ময়মনসিংহ কমার্স কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক স্বপন ধরের কন্যা।

ঘটনাঃ ৪

বাংলাদেশ সিকিউরিটি এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের সহকারী পরিচালক মেহেদী হাসান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাজুয়েশন করা এ শিক্ষার্থী আটটি সরকারি চাকুরীর সুযোগ পেয়েছিলেন। তারপরও গত তিনমাস রাতে একটুও ঘুমাতে পারেনি। অপ্রাপ্তি, দুঃশ্চিন্তা, হতাশা জেঁকে বসেছিলো মেহেদীর। সুইসাইড নোটে লিখেছেন, ‘নিদ্রাহীনতা আর পারছি না’। মেহেদী মৃত্যুর জন্য কাউকে দায়ী করেনি কিন্তু আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র দায় কোন ভাবেই এড়াতে পারে না। এসবের জন্য দায়ী এই দেশ, এই সিস্টেম। এক অসুস্থ প্রতিযোগিতার, এক অসুস্থ সময়ের।

উল্লিখিত চারটি ঘটনা আমাদের দেশে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে ও ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া আত্নহত্যা। যেগুলো বিশ্লেষণ করলে স্পষ্টই দেখা যায় এ আত্নহত্যার দায় সম্পূর্ণ সমাজ, রাষ্ট্র ও পরিবারের।

সারাবিশ্বে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একজন সফলভাবে আত্মহত্যা করছেন এবং আমাদের দেশে প্রতি ৫০ মিনিটে একজন সফলভাবে আত্নহত্যা করছেন,দেশব্যাপী আত্মহত্যার পরিস্থিতি দিনকে দিন আরও ভয়ংকর রূপ ধারণ করছে, যা খুবই উদ্বেগজনক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরিপ মতে বাংলাদেশে প্রতি ২.৫ মিনিটে একজন আত্মহত্যার চেষ্টা করে থাকেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনার আলোকে সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) এর জরিপের রিপোর্ট অনুযায়ী সব বয়সীদের মধ্যেই আত্মহত্যা, সড়ক দুর্ঘটনা ও পানিতে ডুবা আঘাতজনিত মৃত্যুর প্রধান তিন কারণ। তবে প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের আলাদাভাবে বিবেচনা করলে দেখা যায়, প্রতিদিন গড়ে ৪০ জন আত্মহত্যা করছেন।

দেশে আত্মহত্যার ঘটনার তথ্য রাখে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি),তাদের তথ্য অনুযায়ী ২০১৬ সালে দেশে আত্মহত্যা করেন ১০ হাজার ৭৪৯ জন। আর ২০১৭ সালে নভেম্বর পর্যন্ত এই সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ২৫৬ জন।

এদিকে দেশের তরুণদের সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, করোনাকালে গেল এক বছরে সারা দেশে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে ১৪ হাজার ৪৩৬ জন নারী-পুরুষ। আত্মহত্যার ঘটনার মূল কারণ হিসেবে তারা পারিবারিক জটিলতা, সম্পর্কের অবনতি, পড়াশোনা নিয়ে হতাশা, আর্থিক সংকট ইত্যাদিকে দেখিয়েছে। তারা দাবি করছে, ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে আত্মহত্যা ৪৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর গত বছরের এ–সংক্রান্ত নিহতের সংখ্যার সঙ্গে তারা তুলনা করেছে। সংগঠনটির হিসাবে, এক বছরে আত্মহত্যা করার সংখ্যা ১৪ হাজারের বেশি। আর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, ২০১৯ সালে সারা দেশে আত্মহত্যা করেছে ১০ হাজারের বেশি মানুষ। এই এক বছরের ব্যবধানে আত্মহত্যার পরিমাণ বাড়াটা অশনিসংকেত।

আঁচলের তথ্যমতে নারীর আত্মহত্যা বেশি,সারা দেশে করোনাকালে পুরুষের চেয়ে বেশি নারী আত্মহত্যা করেছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। নারীদের ক্ষেত্রে এ সংখ্যাটা ৫৭ শতাংশ এবং পুরুষের ক্ষেত্রে ৪৩ শতাংশ। মোট আত্মহত্যার ঘটনা ১৪ হাজার ৪৩৬টি। এর মধ্যে নারীর আত্মহত্যার ঘটনা ৮ হাজার ২২৮টি এবং পুরুষের আত্মহত্যার ঘটনা ৬ হাজার ২০৮টি।

আত্মহত্যার ঘটনা পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ২০ থেকে ৩৫ বছর বয়সী রয়েছেন ৪৯ শতাংশ, ৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী ৩৫ শতাংশ, ৩৬ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ১১ শতাংশ। সবচেয়ে কম আত্মহননকারী হচ্ছেন ৪৬ থেকে ৮০ বছর বয়সীরা, ৫ শতাংশ।

 

আঁচলের রিপোর্টে আত্মহত্যার কারণ:

বিভিন্ন ধরনের পারিবারিক সমস্যার কারণে আত্মহত্যা করেছেন ৩৫ শতাংশ নারী-পুরুষ। এর বাইরে ২৪ শতাংশ সম্পর্কে টানাপোড়েনের কারণে এবং অজানা কারণে ৩২ শতাংশ মানুষ আত্মহত্যা করেছেন। আর্থিক ও লেখাপড়ার কারণে আত্মহত্যা করেছেন ৪ ও ১ শতাংশ।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষ হতাশ হলে ঠুনকো কারণে নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারে না। তখন তিনি নিজেকে একা মনে করে এবং আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। আপাতদৃষ্টিতে, অন্যদের কাছে মৃত্যুর কারণ ছোট মনে হলেও ওই কারণ ওই মুহূর্তে ওই ব্যক্তির জন্য অনেক বড় কারণ হয়ে সামনে এসেছিল।

আঁচলের ওয়েবনিয়ারে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আজহারুল ইসলাম বলেন, বিষণ্ণতা থেকেই মূলত মানুষ আত্মহত্যা করে। দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ থেকে মানুষ নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। আত্মহত্যার কারণগুলো যত তুচ্ছই হোক না কেন, আত্মহত্যাপ্রবণ ব্যক্তির কাছে তা অনেক বড় একটি ঘটনা। (উৎসঃ)

 

কেন হচ্ছে এই আত্মহত্যা?

বর্তমানে তরুণরা অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও চাপিয়ে দেয়ার সংস্কৃতির ফলে তাদের মধ্যে একধরনের চাপ অনুভব করে। বর্তমানের অসুস্থ ও অসম প্রতিযোগিতামূলক সময়ের জন্যই তাদের মধ্যে এই মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়। নিজেকে সর্বদা শ্রেষ্ঠ রাখার জেদটাও সেই চাপ থেকেই সৃষ্টি হয়। এই জেদের বসেই তারা জীবনকেও নিঃশেষ করে দেয়,ব্যাক্তির পরিবারিক চাপও এর অন্যতম কারণ।

আত্মহত্যার উল্লেখযোগ্য কারণ স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া-বিবাদ, মা-বাবা ও ছেলেমেয়ের মনোমালিন্য, পরীক্ষায় ব্যর্থতা, দীর্ঘস্থায়ী রোগযন্ত্রণা থেকে নিষ্কৃতি, প্রেমে বিরহ, ব্যবসা-বাণিজ্যে ক্ষতি ও ব্যর্থতা, শত্রুর কাছে ধরা না দেওয়া প্রভৃতি। যখন কারও জ্ঞান-বুদ্ধি, বিবেক ও উপলব্ধি-অনুধাবন শক্তি লোপ পায়, নিজেকে অসহায়-ভরসাহীন মনে হয়, তখনই ধর্ম-কর্ম ভুলে মানুষ আত্মহত্যা করে বসে। জাগতিক দুঃখ-কষ্ট, লাঞ্ছনা ও অপমান থেকে আত্মরক্ষা করার ইচ্ছায় মানুষ আত্মহননের মাধ্যমে চিরন্তন কষ্ট ও লাঞ্ছনার দিকে চলে যায়।

আবার আত্মহত্যার প্রসংগে রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার দায় অনেক। তরুণ সমাজের ব্যাপক ডিপ্রেশনের পেছনে সোশাল মিডিয়া আর প্রেমের সম্পর্কই যে মূল তা মোটেও সত্য নয়। তরুণ সমাজের আত্মহত্যার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে ভবিষ্যতের দিকে তাকালে তারা নিরেট অন্ধকার দেখতে পাই। গুটিকয়েক বিসিএস,সরকারি বিভিন্ন সেক্টর এবং আরও হাতেগোণা কিছু প্রাইভেট সেক্টর বাদে আর কোন ঠায় তাদের জন্য নেই। সব মিলিয়ে প্রতিবছর লাখখানেক  তরুণ হয়তো স্বপ্নে পৌঁছাতে পারেন। দেশে প্রায় ৩ কোটি তরুণ ভোটার আছে। প্রতি বছর ২ লাখ কর্মসংস্থান কেন ৩ কোটি তরুণের দেশে? বাকি তরুণ ডিপ্রেশনে যাবে না কেন? তারা তো জানে তাদের কপালে কী আছে। কোন মহান লক্ষ্য নিয়ে বেঁচে থাকতে অনুপ্রেরণা তারা পাবে? এটার নেতিবাচক প্রভাব অবশ্যই আছে । সেই প্রভাব প্রেমজীবনে পড়ে, ক্যারিয়ার প্ল্যানিংয়ে পড়ে, অপরাধপ্রবণতায় পড়ে। দিনশেষে দোষটা এসে পড়ে অবশ্য এদের ওপর। কারণ দু’লাখ কর্মসংস্থান আসলে সবটুকু নয়। প্রচুর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা আছে দেশে, তবে স্বচ্ছতার অভাবে তাদের কেউ কর্মসংস্থান এর ব্যাপারে ভাবতে পারছে না।

আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র তরুণদের জীবন এবং হিসাব জটিল করেন অযথা, যেন হয়রানি করে কোটি কোটি টাকা কামাতে পারেন। পাসপোর্ট অফিস থেকে জাতীয় পরিচয়পত্রের অফিসে টাকা খাওয়ার জন্য লোক বসে থাকে, সেখানে নিয়োগ আর অন্যান্য ফেয়ার অপরচুনিটি এই তরুণসমাজ দেশের প্রতিটা শাখায়, জীবনের প্রতিটা ধাপে পেয়ে থাকে তা অতি সহজে ধারণা করা যায়।

বাস্তবতা হচ্ছে এদেশে তরুণরা পুলিশকে বিভীষিকা মনে করে, সড়ককে মনে করে মৃত্যুফাঁদ, বাবার পয়সা ধ্বংসের অপরাধবোধ নিয়ে পড়াশোনা করে, কারণ পাশ করার পর কী ঘটবে জীবনে সে জানে না – এই দেশে কেউ তাকে যযথাযথ সুযোগ দেবে না। আবার পড়াশোনার সুযোগও অনেক সময় তারা পায় না, কারণ রাষ্ট্র তার পড়াশোনার বা কারিগরী শিক্ষার ব্যবস্থা করেনি – সে-ও একই কারণে,স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নেই, রাষ্ট্রের কোন ঠেকা পড়েনি আপনাকে পড়ার পর্যাপ্ত সুযোগ সে দেবে। (সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে সিট কয়টা সব মিলিয়ে?) মানুষ ক্লিনিকাল ডিপ্রেশনে খুব সহজে যেন যেতে পারে সেজন্য থরে থরে উপকরণ সাজানো আছে। কেবল এ মাটিতে জন্ম নিলেই হয়ে গেল। এদেশে বয়স যত বাড়বে ডিপ্রেশন ততো বাড়বে। অথচ আত্মহত্যা কেউ করলে দোষ প্রেমের কিংবা ‘সমাজের চাপে’র। স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে কথা হয় না কখনো।

 

আত্মহত্যার সুনির্দিষ্ট কারণ,তাত্ত্বিক কারণ ও বিপদজনক উপাদানগুলোকে যদি একসাথে বিশ্লেষণ করি,তাহলে দেখবোঃ

জেনেটিক, ব্যাক্তির হঠকারিতা বা ইমপালসিভিটি (বাংলাদেশের আত্মহত্যা প্যাটার্নে এটা বেশ গুরুত্ব বহন করে, অর্থাৎ পূর্বে কোন মানসিক রোগ না থাকলেও ঘটনার আকস্মিকতায় আত্মহননের পথ বেছে নেয়া,ধর্ষিত হওয়ার পর পরই আত্মহত্যা, দাম্পত্য কলহে আত্মহত্যা, পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের সাথে সাথে আত্মহত্যা, প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার সাথে সাথে আত্মহত্যা, প্রিয়জনের মৃত্যু সংবাদে আত্মহত্যা, শেয়ার বাজারে সূচক পতনের দিন আত্মহত্যার অনেক ঘটনাই কেবলমাত্র ইমপালসিভিটির জন্য হয়ে থাকে), মানসিক রোগ যেমন – বিষন্নতা, বাইপোলার ডিসঅর্ডার (ম্যানিক-ডিপ্রেসিভ), সিজোফ্রেনিয়া, পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার (বর্ডারলাইন, এন্টি সোশ্যাল ও হিসট্রিওনিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার), লাভ অবসেশন,এবং মানবিক ও জনকল্যাণমূলক সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তে আমরা দ্রুত ব্যক্তি স্বার্থ কেন্দ্রিক পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় ধাবিত হওয়ায় তীব্র প্রতিযোগিতামূলক (অনেক ক্ষেত্রে অসুস্থ ও অসম প্রতিযোগিতামূলক) পরিবেশে অর্থ উপার্জন ও জীবনের ব্যায় নির্বাহ এবং ভোগের সাথে সংলিষ্ট সকল বিষয়ই আমাদের উপর মানসিক চাপ তৈরির ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে, এরূপ অবস্থায় মানসিক চাপ তৈরির ক্ষেত্র ও পরিমাণ বাড়লেও তা মানিয়ে নেওয়া ও সহ্য করার মত মানসিক দৃঢ়তা অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত থাকায় মানসিক রোগ তৈরি ও আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

 

বর্তমানের তরুণ সমাজ সবকিছুতেই দ্রুত সফলতা কামনা করে এমনকি অনৈতিকতার মাধ্যমে অর্জিত হলেও। তারা সফলতা অর্জনের জন্য তাদের সমস্ত মেধা ও শ্রম ঢেলে দিলেও মুদ্রার অপর পিঠে থাকা ব্যর্থতা মেনে নেওয়ার মত মানসিক জোর ও প্রস্তুতি অনেক সময়ই তাদের মধ্যে দেখা যায় না। ফলে পরীক্ষা, প্রেম কিংবা চাকুরী না পাওয়ার ব্যর্থতায় অনেকেই আত্মহননের পথ বেছে নেন। পরিবার কর্তৃক প্রত্যাশার মানসিক চাপ; সবার মেধা সমান নয়,সবাই ক্লাশে ফার্স্ট হবে না, সবাই ভাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চান্স পাবে না, সবাই ডাক্তার-প্রকৌশলী হবে না, পাশ করেও সবাই ভাল চাকুরী পাবে না, সবাই জীবনে সবকিছু অর্জন করতে পারবে না,এগুলো কঠিন বাস্তবতা। কিন্তু আমাদের অনেক অভিভাবকই সন্তানদের উপর প্রত্যাশার চাপ বাড়িয়ে দেন অন্যায় ও অযাচিতভাবে। সামান্য ব্যর্থতাতেও তাদের উপর নেমে আসে কঠোর মানসিক নির্যাতন। অনেকেই এই চাপ সহ্য করতে না পেরে আত্মহননের পথ বেছে নেয়। এটা যে শুধু অভিভাবকদের দিক থেকেই আসে তা নয়, সহপাঠী, প্রতিবেশী ও স্বজনদের সাথে অন্যায্য তুলনা করে অনেক সময় আমরা নিজেরাই নিজেদের উপর প্রত্যাশার চাপ বাড়িয়ে দিই, যেমন- স্কুল ছাত্র শাওন ফেনী সেন্ট্রাল হাইস্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছিল ২০১৫ সালে, প্রকাশিত ফলাফলে সে পায় জিপিএ ৪.৮৩, কিন্তু তার পিছনে প্রচুর টাকা খরচ করার পরও কেন জিপিএ ৫ বা এ প্লাস পেল না এনিয়ে বাবা-মায়ের মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে সে আত্নহননের পথ বেছে নেয়।

 

আমাদের সমাজে অগ্রজদের সাথে অনুজদের মানসিক দূরত্ব দিন দিন বেড়েই চলেছে,প্রতিষ্ঠা পেয়েছে অনুজদের উপর চাপিয়ে দেয়ার সংস্কৃতি । অনেক পিতামাতাই তার সন্তান এর চাহিদা এবং মানসিক অবস্থা ভালভাবে বুঝতে পারেন না, অনেক সন্তানও পিতামাতাকে তার সমস্যা বা আকাঙ্খার কথা খুলে বলতে পারছেন না কিংবা বললেও অনেক অভিভাবকই যৌক্তিকতা যাচাই না করে তাদের চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষা পূরণে উদাসীনতা দেখান এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রূঢ়ভাবে তীব্র বিরোধিতা করেন,যার ফলে সন্তানরা পরে আর কোন ব্যাপারে তাদের সাথে সন্তানরা শেয়ার বা আলোচনা করেন না। অনেক সন্তান আবার পিতামাতার স্নেহ-ভালবাসা থেকে নিজেকে বঞ্চিত মনে করেন। অনেক তরুণ-তরুণীই সুইসাইড নোটে পিতামাতার প্রতি আক্ষেপ জানিয়ে আত্মহত্যা করেন।

 

পারিবারিক কলহ বা দাম্পত্য কলহের কারণে অনেক সময় স্বামী বা স্ত্রী আত্মহত্যা করে ফেলেন,আবার অনেক সময় সন্তানরা বাবা-মায়ের নিত্য কলহের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করে ফেলে, আমাদের দেশে এ ধরনের ঘটনাগুলো উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে । সামাজিক বৈষম্য তথা সমাজে নারী-পুরুষের বৈষম্য নারীদের আত্মহত্যাপ্রবণ করে তুলছে। বিবিসি’র এক রিপোর্টে গবেষণা প্রকাশনা “The Lancet” এর বরাত দিয়ে বলা হয়েছে বাংলাদেশের নারীদেরকে বৈষম্যমূলকভাবে নিম্ন সামাজিক মর্যাদা দেওয়া হয় যা তাদের উপর প্রচন্ড মানসিক চাপ তৈরি করে(The study found that Bangladeshi women who are married are far more likely to commit suicide than single women.The suicide rate was highest among married women in their 20s. The report suggests that this is because recently married women faced demands from husbands, including the payment of dowry, strained relations with their husbands’ families and economic hardship while raising children.)

 

অপরিকল্পিত নারীর ক্ষমতায়নঃ

নারীর ক্ষমতায়নে সরকার এবং বেসরকারি এনজিও ও উদ্যোক্তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নারীরা আজ ঘরের বাইরে নানা ক্ষেত্রে সরব উপস্থিত।শিল্প কলকারখানা থেকে শুরু করে শিক্ষা-দীক্ষা এমনকি সামরিক বাহিনীতেও নারীদের জয় জয়কার।কিন্তু নারী ক্ষমতায়নের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ ঘরের বাইরে নারীর নিরাপত্তার বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।ফলে কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার পথে ইভটিজিং বা শ্লীলতাহানির বা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে অনেককেই আত্মাহুতি দিতে হচ্ছে আজ।

 

উৎপীড়ন:

উৎপীড়ন বলতে ভয় প্রদর্শন, হুমকি দেওয়া, বলপ্রয়োগ করা, বিব্রত করা, খারাপ উদ্দ্যেশে প্রভাব বিস্তার করা, খারাপ আচরণ করা, কারো আবেগ-অনুভূতিকে আহত করা,ব্যাক্তির শারীরিক অবস্থা, ধর্ম, বর্ণ নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করা যাতে আক্রান্ত ব্যক্তি মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের র‌্যাগিং থেকে শুরু করে ইন্টারনেটের মাধ্যমে সোশ্যাল মিডিয়ায় কারো ব্যক্তিগত বিষয় ফাঁস করে দেওয়া এসবই উৎপীড়নের  অধীনে পড়ে। বিভিন্ন গবেষণা ও স্টাডিতে দেখা গেছে উৎপীড়নের সাথে আত্মহত্যার সম্পর্ক রয়েছে। আর এর দ্বারা আক্রান্ত হয় মূলত শিশু ও টিনএজার মেয়েরা যাদের সামাজিক আক্রমণ প্রতিরোধের দক্ষতা কম বা থাকে না।

 

রাত জাগার বদ অভ্যাসঃ

যে সকল মানসিক রোগে মানুষ আত্মহত্যা করে থাকে তাদের বেশীর ভাগেরই অন্যতম উপসর্গ রাতে ঠিকমত ঘুম না হওয়া। গবেষকরা প্রমাণ পেয়েছেন যেসব কিশোর কিশোরীরা রাতে ৫ ঘন্টার কম ঘুমায় তাদের বিষন্নতায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ৭১% বেশী এবং আত্মহত্যার চিন্তা ৪৮% বেশী এমন কিশোর কিশোরীদের তুলনায় যারা রাতে ৮ ঘন্টা ঘুমায়।রাত ১০টার পরে ঘুমালে আত্মহত্যার সম্ভাবনা প্রায় ২০% বেড়ে যায় এমনকি ৮ ঘন্টা ঘুমালেও।

 

মাদকাসক্তিঃ

মদ্যপায়ীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বেশী। হিরোইন সেবীদের আত্মহত্যার হার সাধারণ মানুষের তুলনায় প্রায় ১৪ গুণ বেশী।ইয়াবা সেবনেও আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়ে।

 

জুয়া খেলা:

জুয়াড়ীদের ১২%-২৪% আত্মহত্যা করে থাকে,এমনকি এদের ঘরের বউদের আত্মহত্যার হার সাধারণ মানুষের তুলনায় প্রায় ৩ গুণ বেশী।

 

শৈশবকালীন যৌন নিপীড়ন:

শৈশবকালীন যৌন নিপীড়নের শিকার তরুণ তরুণীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার সাধারণ আত্মহত্যার হারের তুলনায় ১১-১৩ গুণ বেশী। শৈশবকালীন যৌন নিপীড়নের শিকার শিশুরা তারুণ্যে পৌঁছার পর তাদের ৩২% আত্মহত্যার চেষ্টা করে থাকে।

 

দীর্ঘমেয়াদী পীড়াদায়ক বা কষ্টদায়ক রোগঃ

দীর্ঘমেয়াদী ব্যাথা,ক্যান্সার,কিডনী নষ্ট হওয়া, অনিদ্রা(ইনসোমনিয়া), হাঁপানি ইত্যাদি দীর্ঘমেয়াদী, কষ্টদায়ক ও ব্যয়বহুল রোগের রোগীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশ দেখা যায়।কোন ব্যক্তির ক্যান্সার ডায়াগনোসিস হলে তার আত্মহত্যার সম্ভবনা প্রায় ২ গুণ বেড়ে যায়, এইডস রোগীদের আত্মহত্যার হার সাধারণ মানুষের তুলনায় ৩০গুণ বেশী।

 

বিষন্নতা:

আত্মহত্যার খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ বিষণ্নতা।বিষণ্নতা এমন একটি ভয়াবহ মানসিক রোগ যে বেঁচে থাকার সকল আগ্রহকে ম্লান করে দেয়, এ রোগে বিপুল সংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হলেও সচেতনতার অভাবে তা নির্ণিত হচ্ছে না এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হচ্ছে না। অনেকের ধারণা  মন খারাপ থাকলেই বুঝি বিষণ্নতা বোঝা যায়, কিন্তু সর্বক্ষেত্রে এ কথাটি অপ্রযোজ্য। অনেক বিষণ্নতায় ভোগা রোগীই হাসিমুখে অামাদের মাঝে বাস করে যাকে ‘স্মাইলিং ডিপ্রেশন’ বলে। তাছাড়া ছোট বাচ্চারাও বিষণ্নতায় ভূগতে পারেন।

অলীক কথা শোনা বা দেখা, ভ্রান্ত দৃঢ় বিশ্বাস, অসংলগ্ন কথাবার্তা, চিন্তার জগতে বিশৃঙ্খলা, ঘুম না হওয়া, কম কথা বলা, সন্দেহ করা, নিজের যত্ন নেওয়ায় উদাসীনতা, মন খারাপ থাকা ইত্যাদি।

 

কোন কোন প্রেম ‘লাভ অবসেশন’ নামক জীবননাশী মানসিক রোগে পরিণত হয়। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি ভালোবাসার মানুষের সামান্যতম অবহেলাও সহ্য করতে পারে না এবং এত বেশি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা ও সন্দেহ করে যে প্রায়শই এ ধরনের সম্পর্ক একসময় ভেঙ্গে যায়। কিন্তু সে মানসিক রোগাক্রান্ত হয়ে যাওয়ায় ভালোবাসার মানুষটিকে ফিরে পেতে কিংবা তার বিরহে বিধ্বংসী কাজকর্ম শুরু করে যার একটি হলো আত্মহত্যা।

বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি তথা ঝোঁকের মাথায় বা হঠকারিতায় কাজ করা,নিজেকে অপাংক্তেও মনে করে পাগলামি করা,কারো সাথে তীব্রভাবে সম্পর্কে জড়িয়ে যাওয়া এবং তাকেই আবার নিগৃহ করা,নিজের ব্যক্তিত্ব ধরে রাখতে অসমর্থ হওয়া,মন মেজাজ চড়ে থাকা,অস্থিরতায় ভোগা,বুকের ভিতরটা শুন্য মনে হওয়া, সন্দেহবাতিকতা,নিজের শরীরে আঘাত করা,অবিবেচকের মত ও ঝোঁকের মাথায় অর্থ বিনিয়োগ সংক্রান্ত জটিলতায় জড়িয়ে যাওয়া,নারী-মদ-নেশায় জড়িয়ে যাওয়া,নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হওয়া এবং সর্বোপরি আত্মহত্যার চিন্তা বা চেষ্টা করা।

হিসট্রিওনিক পার্সোনালিটি তথা প্রেম, যৌনতা ও বিয়ে সংক্রান্ত জটিলতায় প্রায়ই ভূগতে থাকা, অপরিপক্কতা, আবেগের চরম বহিঃপ্রকাশ, আত্মনিয়ন্ত্রণের অক্ষমতা, ইমপালসিভিটি বা হঠকারিতা ইত্যাদি কারণে অনেক সময় আত্মহত্যার চেষ্টা করা হয়ে থাকে এবং কেউ কেউ সফলভাবে আত্মহত্যা করেও ফেলে।

এন্টিসোশ্যাল পার্সোনালিটি মূলত অপরাধপ্রবণতা,  জীবনের মূল্য বুঝতে প্রায়শই অক্ষমতার পরিচয় দেয়া, যেমন অন্যের জীবনের জন্য হুমকি ঠিক তেমনি নিজ জীবনকেও এরা তুচ্ছজ্ঞান করে। ফলে এ ধরনের ব্যক্তিত্বের ব্যক্তিরা আত্মহত্যার মত ঘটনা ঘটিয়ে ফেলতে দ্বিধা করে না।

বীভৎস্য অভিজ্ঞতা পরবর্তী মানসিক রোগ (PTSD)- ভয়ংকর কোন ঘটনা দেখার পর কেউ কেউ এ সমস্যায় ভূগে থাকেন। অতিরিক্ত অস্থিরতা ,আতংক, ভয়ে চমকে চমকে উঠা এবং বীভৎস্য ঘটনাটি বার বার চোখের সামনে ভাসতে থাকা বা বার বার সেটা স্বপ্নে দেখা এ সমস্যার প্রধান উপসর্গ।POST TRAUMATIC STRESS DISORDER (PTSD) বা বীভৎস্য অভিজ্ঞতা পরবর্তী মানসিক চাপে মানুষ এতটাই অস্থিরতায় ভূগতে পারে যে সে আত্মহত্যাও করে ফেলতে পারে। করোনা রোগির শ্বাসকষ্ট যখন বেশি হয় তখন তার কষ্ট চোখের সামনে দেখা একটা ভয়ংকর অভিজ্ঞতা অথবা একটা মর্মান্তিক যানবাহন দুর্ঘটনা। একের পর এক মৃত্যু দেখাও একটা ভয়ংকর অভিজ্ঞতা।

 

দারিদ্রতাঃ

নিঃসন্দেহে দারিদ্রতা আত্মহননের পথে অনেককেই ঠেলে দিচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার “World Suicide Report-2014” এ দেখা যাচ্ছে আত্মহত্যাকারীদের প্রায় ৭৫% নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে বসবাসকারী। এ বাস্তবতা আমাদের মত নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।অর্থাভাবে কিংবা দারিদ্রতা বিমোচনে ঋণ নিয়ে তা শোধ করতে না পেরে আত্মহত্যা করার ঘটনা নেহায়েত কম নয়। ভারতে ১৯৯৭ সাল পরবর্তী সময়ে ২ লাখেরও বেশী কৃষক আত্মহত্যা করেছেন ‍ঋণ শোধ করতে না পেরে।

বর্তমানে পরিবারের স্বেচ্ছাচারিতা,রাষ্ট্রযন্ত্রের দুর্নীতি ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় দুর্বলতা, এবং সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে নীতিহীনতা ও অমানবিকতা ব্যক্তিকে আত্নহননের পথ বেছে নিতে প্রতিনিয়ত বাধ্য করছে।

 

আত্মহত্যা প্রতিরোধে ব্যক্তির ও পরিবারের করণীয়ঃ

১) পরিবারের সদস্যদের সাথে যতটা সম্ভব সময় কাটাতে চেষ্টা করুন এবং তাদেরকে দৃশ্যমান স্নেহ, ভালবাসা ও শ্রদ্ধায় জড়িয়ে রাখতে চেষ্টা করুন।The International Association for Suicide Prevention (IASP) এর মতে মানুষের একাকীত্ব তাকে আত্মহননের পথে ঠেলে দিতে পারে।আবার দৃঢ় পারিবারিক বন্ধন তাকে আত্মহননে নিরুৎসাহিত করে। কৈশোর ও তারুণ্যে আত্মহত্যাকারীরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাবা-মা’র আচরণ থেকে প্রাপ্ত কষ্টের কথা তাদের আত্মহননের নোটে উল্লেখ করে গেছেন।

২) পরিবারের শিশু-কিশোর ও তরুণ সদস্যরা কোন সমস্যা বা কষ্টে ভুগছে কি না তা বিরক্তি উৎপাদন না করে জানতে চেষ্টা করুন এবং কোন সমস্যা পাওয়া গেলে তা ঠান্ডা মাথায় ও যৌক্তিকতা বিচারে সমাধানের চেষ্টা করুন।কারোর মাঝে উপরোক্ত মানসিক রোগেসমূহের কোন উপসর্গ পাওয়া গেলে বা মাদকাসক্তির সমস্যা দেখা দিলে তা নিরাময়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।ভুলেও নিজ থেকে মারধোর,বকাঝকা বা নসিহত করতে যাবেন না।কারণ অনেক ক্ষেত্রেই তাদের বিচারিক ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং তখন কারো দেওয়া ভাল উপদেশকেও অসহ্য লাগে।

৩) অপরিণত বয়সে প্রেমের কুফল ও তার সম্ভাব্য ঝুঁকি ও ক্ষতির বিষয়ে এবং ক্ষেত্র বিশেষে সামাজিক অগ্রহণযোগ্যতার বিষয়ে পরিবারের কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণীদের সচেতন করতে বাস্তবসম্মত আলোচনা করুন।

৪) আপনার শিশুটি কোন ধরনের যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে কি না সেদিকে বিশেষভাবে নজর দিন।

৫) শিশু-কিশোর ও তরুণ সদস্যদের উপর প্রত্যাশার চাপ বাড়াবেন না-হোক সেটা শিক্ষা বা কর্মক্ষেত্রে।রেজাল্ট খারাপ করলে বা পাশ করার পরও চাকুরি না পেলে তাদেরকে তিরষ্কার না করে ধৈর্য্য ধারণ করার পরামর্শ দিন এবং উৎসাহ প্রদান করুন।

৬) পারিবারিক কলহ যথাসম্ভব এড়িয়ে চলুন।কোন অবস্থাতেই পরিবারের শিশু-কিশোর ও তরুণ সদস্যদের সামনে পারিবারিক কলহে জড়াবেন না।

৭) স্বামী-স্ত্রীরা পরস্পরের প্রতি ভালবাসার বন্ধনে আবদ্ধ থাকুন।কোন অবস্থাতেই একজন আরেকজনের মনোঃকষ্টের কারণ হবেন না।

৮) পরিবারের বৃদ্ধ সদস্যদের প্রতি যথাযথ সম্মান দিন।তাদের কষ্ট লাঘবে সচেষ্ট থাকুন।তাদের কেউ দীর্ঘমেয়াদী ও কষ্টদায়ক কোন অসুখে ভুগলে তাদের কষ্টের সহমর্মী হোন।

৯) ঘরে আত্মহত্যায় ব্যবহৃত উপকরণ যেমন কীটনাশক, আগ্নেয়াস্ত্র, ঘুমের ঔষধ ইত্যাদি খুব নিরাপদ জায়গায় আবদ্ধ রাখুন।

১০) বিশ্ব বরেণ্য ব্যক্তিদের জীবনী নিয়ে পরিবারের সদস্যদের সাথে মাঝে মাঝেই আলোচনা করুন যেন তারা জানতে পারে জীবনে বড় কিছু হতে হলে কত দুঃখ-কষ্ট, অভাব-অনটন, ব্যর্থতা, কঠোর পরিশ্রম, অধ্যাবসায় ও ধৈর্য্যের মাধ্যমে তা অর্জন করতে হয়।

১১) অসম তুলনা করা থেকে বিরত থাকুন,অসুস্থ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণে চাপ প্রয়োগ না করা, সর্বোপরি ব্যক্তির যৌক্তিক ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষার প্রতি যথাযথ গুরুত্ব দেয়া।

 

আত্মহত্যা প্রতিরোধে সমাজের ভূমিকাঃ

১) বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে আত্মহত্যাবিরোধী এবং মানসিক রোগ ও মাদকাসক্তির ব্যাপারে সচেতনতা তৈরিতে জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে।

২) শিশু-কিশোর ও তরুণদের খেলাধূলা ও সৃজনশীল কাজে বেশী করে সম্পৃক্ত করতে বিভিন্ন সংগঠনগুলোকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।

৩) যারা নানা কারণে আত্মহত্যার ঝুঁকিতে রয়েছেন তাদেরকে সাপোর্ট দেওয়ার জন্য বিশেষায়িত সামাজিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবী।

৪) “আত্মহত্যা মহাপাপ এবং আত্মহত্যাকারী বা আত্মহত্যা প্রচেষ্টাকারী মহাপাপী” সমাজের এই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে বরং আত্মহত্যাকে রোগ হিসাবে বিবেচনা করে তা নিরাময়ে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।বিশেষত আলেম সমাজের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলছি অাত্মহত্যায় যেন নাউযুবিল্লাহ পাঠ করতে না হয় সেজন্য আত্মহত্যা প্রতিরোধে “যে একজন মানুষের জীবন বাঁচালো সে যেন সমগ্র মানবজাতির জীবন বাঁচালো” এ জ্ঞানে দীক্ষিত হওয়ার অনুরোধ করছি।

৫) “প্রতিটি আত্মহত্যার জন্য সমাজ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দায়ী”-এ দায়িত্ববোধ থেকে সমাজের প্রতিটি অংশকেই আত্মহত্যা প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে হবে।

আত্মহত্যা প্রতিরোধে সমাজের দর্পণ সংবাদ মাধ্যমের যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে। সংবাদ মাধ্যম সংশ্লিষ্ট সকলের উচিত-

১) আত্মহত্যা সংক্রান্ত খবর প্রচারের ক্ষেত্রে কোন অবস্থাতেই কীভাবে আত্মহত্যা করল, কয়টা ঘুমের ঔষধ খেয়েছে, আত্মহত্যার ছবি ইত্যাদি বিষয় অর্থাৎ যে তথ্যগুলো আত্মহত্যার ঝুঁকিতে থাকা আরেকজনকে আত্মহত্যার পথে ঠেলে দিতে পারে তা প্রচার করা থেকে বিরত থাকুন।

২) আত্মহত্যাকারী বা প্রচেষ্টকারীর ব্যক্তি জীবনের গোপনীয়তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হউন। তাদের ব্যক্তি জীবনের নানা গোপনীয় বিষয় প্রকাশ করে বা তাদের সমালোচনা করে বা তাদের প্রতি ঘৃণা উদ্রেককারী মন্তব্য করে তার বা তাদের পরিবারের সদস্যদের হেয় করার মত অমানবিক কাজ থেকে বিরত থাকুন। বরং তাদের প্রতি মানবিক ও সহানুভূতিশীল হয়ে এ পথে আর কেউ যেন পা না বাড়ায় সে বিষয়ে জনমত গড়ে তুলতে বিশেষ ভূমিকা রাখুন।

৩) আত্মহত্যা সংক্রান্ত খবর প্রচারের সময় এটা যে প্রতিরোধযোগ্য ও চিকিৎসাযোগ্য একটি সমস্যা তা খবরের সাথে সংযুক্ত করুন এবং কোথায় গেলে এর চিকিৎসা পাওয়া যাবে সে তথ্যটিও দিন। এতে হয়ত আত্মহত্যার ঝুঁকিতে থাকা একজন বেঁচে থাকার অাশার অালো দেখতে পাবেন।

আত্মহত্যা প্রতিরোধে রাষ্ট্রের করণীয়ঃ

বলাই বাহুল্য আত্মহত্যা প্রতিরোধে রাষ্ট্রের ভূমিকা অপরিসীম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আত্মহত্যা প্রতিরোধে প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রকে কর্মপদ্ধতি নির্ধারণের অনুরোধ করলেও মাত্র ২৮টি দেশ এ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন করেছে যা অত্যন্ত হতাশাজনক।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২০ সালের মধ্যে সদস্য দেশগুলোকে আত্মহত্যার হার ১০% কমিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেছেন। এ উদ্দেশ্যে প্রতিবছর ১০ই সেপ্টেম্বর পালিত হয় “বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস”।

১) অতি দ্রুত আত্মহত্যা প্রতিরোধে স্ট্র্যাটেজিক কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করে তা বাস্তবায়ন করুন।

২) ‘আত্মহত্যার প্রচেষ্টাকে অপরাধ বিবেচনা করে শাস্তির বিধান’ সংক্রান্ত অমানবিক আইনটি বাতিল করুন।

৩) সম্প্রচার নীতিমালায় ‘আত্মহত্যা’র বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হোক যাতে কেউ আত্মহত্যা বিষয়ক সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে যথেষ্ঠ সাবধানতা অবলম্বন করে এবং আত্মহত্যাকারী বা প্রচেষ্টাকারীর ব্যক্তিগত ও গোপনীয় বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ থেকে বিরত থাকে।

৪) জীবনের সকল ক্ষেত্রে বিশেষত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উৎপীড়ন বা Bullying বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।

৫) মানসিক রোগ সম্পর্কে ব্যাপক গণসচেতনতা তৈরিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করুন এবং এ বিষয়টিকে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করুন।

৬) সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণে, নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধে এবং ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স রোধে রাষ্ট্রকে আরও বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে হবে।

৭) আত্মহত্যা প্রতিরোধে সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে “সুইসাইড প্রিভেনশন এন্ড রেসপন্স সেল” গঠনের মাধ্যমে ২৪ ঘন্টা হটলাইন চালু রেখে অসহায় এ মানুষগুলোকে সহায়তা করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন। এ বিষয়ে স্থানীয় থানা ও স্বনামধন্য এনজিওগুলোর সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।

৮) বেকারদের জন্য দ্রুত যথাযথ কর্মসংস্থান এর ব্যবস্থা করুণ, নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরীতে সহজলভ্যে সকল ধরনের সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করুন। দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করে গড়ে তুলুন। সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে অবাধে কার্যক্রম পরিচালনার ব্যবস্থা করে দেয়া,এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া সংগঠন এর কার্যক্রম পরিচালনায় প্রণোদনা প্রদানসহ সকল ধরনের সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করা।

৯) আত্নহননের প্রত্যেকটা ঘটনার যথাযথ তদন্তের ব্যবস্থা করুন, এবং তদন্তের রিপোর্টসমূহকে বিচার বিশ্লেষণ করে আত্নহত্যা প্রতিরোধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।

১০) সর্বোপরি রাষ্ট্রে আইনের শাসন নিশ্চিত করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করুন।

১১) দূর্নীতি রোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং ব্যক্তির মনস্তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ সাধনে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

আত্মহত্যার মত একটি অগ্রহণযোগ্য ও প্রতিরোধযোগ্য ঘটনায় কাউকে যেন মৃত্যুবরণ করতে না হয় এবং সমাজ, রাষ্ট্র ও পরিবার যেন এরকম হৃদয় বিদারক ঘটনার মাধ্যমে তার একটি নক্ষত্রেরও পতন প্রত্যক্ষ করতে না হয় সে বিষয়ে সকলের সচেতনতা, সক্রিয় অংশগ্রহণ,এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের যথাযথ কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের প্রত্যাশা করছি।

 

Tepantor

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।