Tepantor

ধর্ম অবমাননার অভিযোগে অধর্ম সাধন,রাষ্ট্রযন্ত্রের সায়!

৩ জুলাই, ২০২২ : ২:৩২ অপরাহ্ণ ৩২০
ফাইল ছবি

মোস্তাফিজ চৌধুরী: সম্প্রতি উগ্রবাদী কথিত মুসলিমরা সাধারণ জনগণের সরলতা ও ধর্মান্ধতার সুযোগ নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্ম অনুভূতিতে আঘাত কিংবা ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এনে ঘটনার সত্যতা যাচাই না করে, দেশের শাসন ও বিচার ব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ভিন্নধর্মাবলম্বী, ভিন্ন সম্প্রদায় এবং প্রগতিশীল ব্যক্তির উপর বিভিন্নভাবে হামলা ও আঘাত করা,সামাজিক ও শারীরিক ভাবে লাঞ্চিত করা,অপমান-অপদস্ত করে মানহানি ঘটানো একটা ট্রেন্ডে পরিণত হচ্ছে। যেখানে রাষ্ট্রযন্ত্র ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা ও জানমাল রক্ষার অজুহাতে তাকেই জেল হাজতে পাঠাচ্ছে, তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করছে, অথবা উগ্রবাদী কথিত মুসলিমদের দ্বারা ঢালাওভাবে নাস্তিক, কাফের,মুরতাদ আখ্যায়িত করে তাকে নির্যাতিত ও অপমানিত হতে সাহায্য  করছে,অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনের অতি উৎসাহীরা সরাসরি এসব অপকর্মে যুক্ত হচ্ছে। কিন্তু এসব অপকর্ম ইসলাম ধর্ম তথা কোরান সাপোর্ট করে না,উল্টো এসবের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, যা অধর্মই সাধন হয় ধর্ম রক্ষা নয়।

রামু,নাসিরনগর থেকে শাল্লা সকল স্থানে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের উপর ন্যাক্কারজনকভাবে হামলা চালানো হয়, তাদের বাড়িঘর ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। অথচ পরে প্রমাণিত হয়েছে এগুলোর পেছনে উগ্রবাদী তথাকথিত মুসলিমদেরই হাত রয়েছে। কিন্তু উগ্রবাদীদের দ্বারা এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত বা ভুক্তভোগী হয়েছে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা।

গতবছর দুর্গাপূজার সময় কুমিল্লায় মন্দিরে পবিত্র কুরআন শরীফ রাখাকে কেন্দ্র করে দেশের ২৩ জেলার বিভিন্ন পূজা মণ্ডপে, হিন্দুদের বাসস্থান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ন্যাক্কারজনক হামলা চালানো হয়, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। অথচ তদন্তে সিসিটিভি ফোটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে একজন মুসলিম নামধারী ব্যাক্তি কুমিল্লার সেই পূজা মণ্ডপে কোরান শরীফ রেখে আসে,তবে সকলে তাকে মানসিক বিকারগ্রস্ত বলে অভিহিত করে, কিন্তু এঘটনাকে কেন্দ্র করে সারা দেশে যে ভয়াবহ অরাজকতা সৃষ্টি করা হয়েছিল তার প্রতিকারে রাষ্ট্রযন্ত্র দৃষ্টান্তমূলক কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি বা করেনি। এসব ঘটনা বিশ্লেষণ করলে সহজেই অনুমান করা যায় যে,যারা ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এনে ঘটনার সত্যতা যাচাই না করে দেশের প্রচলিত আইন,শাসন ও বিচার ব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পূজা মণ্ডপগুলোতে,ভিন্নধর্মাবলম্বীদের বসতভিটা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ন্যাক্কারজনক হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করল তারাই ইসলাম এবং অন্য ধর্মের অবমাননা করল, এবং তারাই মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে পশুত্ব বরণ করেছে।

লক্ষ্য করলে দেখা যায়,সাম্প্রতিক সময়ে হিন্দু তথা ভিন্নধর্মাবলম্বী শিক্ষকদের টার্গেট করে উদ্দেশ্য প্রণোদীতভাবে তাদের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এনে ধারাবাহিকভাবে নির্যাতন করা হচ্ছে, অপমান অপদস্ত করে মানহানি ঘটানো হচ্ছে। যে শিক্ষক জাতি গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে থাকে তাদেরকেই আজকে এসবের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

নড়াইলের এক কলেজ অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে মারধর করা হল এবং স্থানীয় প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে মাইকে ঘোষণা দিয়ে তাকে জুতার মালা পরিয়ে কলেজ থেকে বের করা হল। এই লজ্জাজনক ও ন্যাক্কারজনক ঘটনায় রাষ্ট্রযন্ত্রের উচ্চপদস্থরা উপস্থিত থেকে কোন ধরনের বাধা প্রদান না করার মাধ্যমে অন্যায়ভাবে সায় দিয়েছে। রাষ্ট্র তার একজন নাগরিক সম্মানিত কলেজ শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা করতে পারেনি,তার যথাযথ নিরাপত্তা দিতে পারেনি কিংবা নূন্যতম চেষ্টাও করেনি,উল্টো শিক্ষকের নির্যাতন ও মানহানি ঘটানোয় উগ্রবাদী জনতাকে সায় দিয়েছে। নড়াইলের ঘটনার ধারাবাহিকতায় বরিশালে শিক্ষক সঞ্জয় সরকার ও উমেশ রায়কে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ফাসানোর চেষ্টা হয়েছে। নওগাঁর আমোদিনী পাল,সাভারের হৃদয় মন্ডল,নারায়ণগঞ্জে শ্যামল কান্তি প্রত্যেকেই শিক্ষক ও ভিন্ন ধর্মাবলম্বী এবং তাদের উপর ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটানো হয়েছে যা সারা বিশ্বে আমাদেরকে লজ্জিত ও ছোট করেছে। এজাতীয় প্রত্যেকটা ঘটনার পরপরই দেশজুড়ে প্রতিবাদ হয়েছে, মামলা হয়েছে, কিন্তু দৃষ্টান্তমূলক কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি, হচ্ছে না। উল্টো দায়েরকৃত মামলা গুলোর তদন্ত কার্যই শেষ করতে বছরের পর বছর লেগে যাচ্ছে,আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় অনীহা প্রকাশ পাচ্ছে।

আমরা ভুলে গেছি লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলায় ধর্মীয় অনুভূতির দোহাই দিয়ে সাধারণ মানুষদের উত্তেজিত করে একজনকে প্রকাশ্যে জীবন্ত অবস্থায় আগুনে পুড়িয়ে মারার কথা। অথচ আমরা প্রশ্ন করিনি আমাদের ধর্ম একজনকে এরকম অভিযোগে অন্যায় ভাবে হত্যা করার অধিকার আমাদের দিয়েছে কি,কিংবা রাষ্ট্র আমাদের এই অধিকার দিয়েছে কি,আমরা করিনি,এসব নিয়ে ভাবিনি। এই ঘটনায় রাষ্ট্রযন্ত্র কি ব্যবস্থা নিয়েছে,কিংবা সকল উগ্রবাদী কথিত মুসলমান হত্যাকারীদের তথা ধর্ম রক্ষাকারীদের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নিয়েছে, এবং মৃত ব্যক্তির পরিবারের স্বজন হারানোর দুঃখ এবং তাদের যে ক্ষতি হয়েছে সে ব্যাপারে অভিভাবক হিসেবে রাষ্ট্রযন্ত্র কি করেছে , আমরা কি এসব প্রশ্ন করেছি,করিনি।

ইসলামে শাতিমে রাসুল বা গুস্তাখে রাসুলের শাস্তির কোনো বিধান নেই। আর মুরতাদ মানে রাষ্ট্রদ্রোহী ও ষড়যন্ত্রকারী। সবচেয়ে বড় কথা, এটি কোরআন বিরোধী। প্রিয় নবী (সাঃ) কে ভিন্নধর্মাবলম্বীরা প্রতি নিয়ত অত্যাচার নির্যাতন করার ইতিহাস রয়েছে কিন্তু তিনি কিংবা তার কোন অনুসারী কখনোই তাদের সাথে অন্যায় আচরণ করেনি,উল্টো রাসূল (সাঃ) এবং উনার অনুসারীরা তাদের সাথে আরও বিনয়ের সহিত হেকমতের সহিত ব্যবহার করেছে। আর এখন উগ্রবাদীরা তাদের উল্টোটা করে ধর্মের নামে অধর্ম সাধন করছে। প্রিয়নবী (সাঃ) এবং উনার অনুসারীদের সৌন্দর্যবোধ,রুচি ও দৃষ্টিভঙ্গি কত সুন্দর ছিল,তাদের আচার ব্যবহারে বিরোধীরা বিমোহিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করতো। আর এখন উগ্রবাদী কথিত মুসলিমদের রুচিবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি এবং আচার ব্যবহারে তাদের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি হয়,তাদের আচরণে পশুত্বের ছাপ স্পষ্টিত হয়।

সবসময়ই দেখা যায় পবিত্র কুরআন ও আমাদের প্রিয় নবী (সাঃ) কে সবচেয়ে বেশি অপমান করেছে উগ্রবাদী কথিত মুসলিমরা। ভিন্নধর্মীরা এমন কোনো সমালোচনা করে না যার সূত্র ইসলামে নেই। যেসব কথা গর্বের সঙ্গে বলা হয়েছে, সেগুলিই অন্যরা বললে আমরা অবমাননা হিসেবে গণ্য করি। একটি ধর্মের প্রচার-প্রসার হয় অনুসারীদের বিনয়,নম্রতা ও আচার-আচরণে (খাজা বাবার ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে হাজার হাজার মানুষের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার ইতিহাস রয়েছে), কিন্তু গত একশ বছর ধরে উগ্রবাদী কথিত মুসলিমদের আচরণে উগ্রতাই আলোচনার বিষয়বস্তু হয়েছে।

ইসলাম ধর্ম কি মনুষ্যত্বের কথা বলেনি,মানবিকতার কথা বলেনি,শান্তি, শৃংখলা ও সহাবস্থানের কথা বলেনি,কিভাবে অন্যকে সম্মান করতে হয় সেকথা বলেনি,কিংবা বিনয়ী হতে বলেনি? যদি বলে থাকে তাহলে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ধর্ম রক্ষার নামে যা করা হচ্ছে সেগুলো অবশ্যই অধর্ম সাধন নয় কি?

ইসলাম ধর্মের পবিত্র কুরআন শরীফে কোথাও ধর্ম অবমাননার অভিযোগে এরকম ন্যাক্কারজনকভাবে হামলা, নির্যাতন ও নিপীড়নের কথা উল্লেখ নাই। উল্টো সূরা আন-আমের ১০৮ নং আয়াতে বলা হয়েছে, ”আল্লাহকে ছেড়ে তারা যাদের (দেব-দেবীর) আরাধনা করে, তোমরা তাদেরকে মন্দ বলো না। তাহলে তারা ধৃষ্টতা দেখাতে গিয়ে অজ্ঞতাবশত আল্লাহকে গাল-মন্দ করবে। এমনিভাবে আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে তাদের কাজ-কর্মকে সুশোভিত করে দিয়েছি। অতপর স্বীয় পালনকর্তার কাছে তাদের প্রত্যাবর্তন করতে হবে। তখন তিনি তাদের বলে দেবেন যা কিছু তারা করত।’ কুরআনে আরও উল্লেখ আছে,”যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যন্যদের ডাকে তোমরা তাদের গালি দিও না, তাহলে তারাও শত্রুতাবশত না বুঝে আল্লাহকে গালি দিবে”। অথচ আমরা বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে দেখি কথিত ইসলামি বক্তারা ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ও তাদের দেব-দেবীদের নিয়ে অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য প্রতিনিয়ত দিয়ে যাচ্ছে, কেউ এর প্রতিবাদ বা বিরোধিতা করছে না। এগুলো যে স্পষ্ট কুরআন বিরোধী সেটা আমারা এসব উগ্রবাদী বক্তাদের ধরিয়ে দিচ্ছি না,তাদেরকে লক্ষ টাকায় হেলিকপ্টার দিয়ে ভাড়া করে এনে এসব কুরআন বিরোধী বক্তব্য শুনতে হচ্ছে, অধর্ম চর্চা দেখতে হচ্ছে।

কথিত এসব ইসলামি বক্তারা প্রতিনিয়ত যে পরিমাণ ধর্ম অবমাননা করে সেগুলো নিয়ে উগ্র ধর্মান্ধরা কিছুতো বলেই না উল্টো বাহবা প্রদান করে তাদেরকে পুরস্কৃত করে, দেশের প্রচলিত শাসন ও বিচার ব্যবস্থাকে যেভাবে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায় তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রযন্ত্র কোন ব্যবস্থাই গ্রহণ করছে না। মওদুদিবাদী জামায়তি বক্তা মিজানুর রহমান আজহারি কিংবা মামুনুল হকসহ অন্য বক্তারা যখন প্রিয় নবী (সাঃ) এবং উনার পরিবার নিয়ে উদ্দেশ্যমূলক ভাবে কুরুচিপূর্ণ ও দৃষ্টিকটু মন্তব্য করে তখন কথিত উগ্রবাদী মুসলিমদের কাছে এটা আর ধর্ম অবমাননা হয় না। এদেশে কথিত ইসলামি বক্তারা এবং মোল্লা ও কাটমোল্লারা যে হারে ধর্ম অবমাননা করে ধর্মের নামে অধর্ম সাধন করে যাচ্ছে তা অন্য ধর্মের কোন ব্যক্তি কল্পনায়ও করবে না। অথচ এই মোল্লারা মাদ্রাসায় শত শত শিশু ধর্ষণ বা বলৎকার হচ্ছে তা নিয়ে কিছুই বলছে না,ধর্মীয় শিক্ষা প্রদানের নামে এই ধর্ষণের ফলে তাদের ধর্ম অবমাননা হচ্ছে বলে স্বীকার করছে না।

কুরআন শরীফে সূরা নেসার ৫৯ নং আয়াতে যেখানে বলা হয়েছে দুনিয়াবি ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের আনুগত্য করা আবশ্যক, সেখানে উগ্রবাদী ধর্মান্ধরা রাষ্ট্রের শাসন ও বিচার ব্যবস্থাকে তোয়াক্কাই করছে না। বিভিন্ন কিতাব এবং বেনামি হাদিসের রেফারেন্স দিয়ে উগ্রবাদী কথিত মুসলিমরা ধর্ম অবমাননার অভিযোগে এরকম গুরুতর অধর্ম সাধন করে যাচ্ছে, কিন্তু কুরআনে স্পষ্টত এসবের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আল্লাহ বলেন,”তোমরা কিতাবিদের দল বিশেষের আনুগত্য করো না,তারা তোমাকে কাফির বানিয়ে ছাড়বে(সুরা ইমরান-১০০),কিতাবিদের সঙ্গ ধারণ থেকে নিজেকে বিরত রাখার জন্য প্রয়োজন হলে নিজের বাসগৃহে সালাতের স্থান নির্ধারণ করে সেখানে সালাত কায়েম কর(সূরা ইউনূস-৮৭),আর যারা কুরআন বাদেও অন্যকিছুকে দ্বীনের দলিল হিসাবে মনে করে তারা আল্লাহর সাক্ষাৎ এর আশা পোষণকারী নহে(সূরা ইউনূস-১৫),আবার যারা নিজ হাতে কিতাব রচনা করে আল্লাহর নামে চালিয়ে দেয় এবং অল্প মূল্যে বাজারে বিক্রয় করে তাদের জন্য কঠিন দুর্ভোগ(সূরা আল’বাকারা-৭৯),আবার আল্লাহর আয়াত বিকৃতকারীর জন্য জাহান্নাম (সুরা ফুসসিলাত-৪০ সূরা আল’বাকারা-৭৫)।একটি বিষয়ে বিভিন্নভাবে এই কুরআনে বর্ণনা করা হয়েছে,যাতে করে মানুষ এই কুরআন সহজেই বুঝতে পারে(সূরা আন’আম-৫)।দ্বীনের সকল বিষয় মিমাংসাকারী এই কুরআন(সূরা তারিক-১৩),আর যারা কুরআন মোতাবেক না চলে অধিকাংশ লোকের কথা মত চলে তারা আল্লাহর পথ হইতে বিচ্যুত হবে(সূরা আন’আম-১১)।আর তাই নবী (সাঃ) কুরআনের বাইরে কোন কিছু অনুসরণ করে নাই(সূরা আন’আম-৫)। তিনি এই কুরআন ব্যতিত কাউকে দ্বীনের বিষয়ে সতর্ক করেন নাই(সূরা আম্বিয়া-৪৫)তিনি ওহী ব্যতিত কোন কথা বলেন নাই(সূরা তূর-৩)।

তাহলে এসব উগ্রবাদী কথিত ইসলামি বক্তাদের কথায় ঝাপিয়ে পড়ে কুরআনের তথা ধর্মের অবমাননা কি করা হচ্ছে না, অধর্ম সাধন করা হচ্ছে না। কুরআনে বলা হয়েছে তোমরা মানুষকে প্রভুর পথে আহবান কর হিকমতের সদউপদেশ দ্বারা এবং তাদের সহিত তর্ক কর উত্তম পন্থায় (সূরা নহল-১২৫)। আমার আল্লাহর অনুমতি ব্যতিত কেউ ঈমান অর্জন করতে পারবে না(সূরা ইউনুস-১০০)। আমার ইচ্ছা ছাড়া কেউই ঈমান অর্জন করতে পারবে না (সূরা আনাম-১১১)। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে হেদায়েত করেন,আর যাকে ইচ্ছা তাকে পথভ্রষ্ট করেন(সূরা রা’দ-২৭),এবং যাকে ইচ্ছা তাকে পবিত্র করে থাকেন(সূরা নূর-২১),এবং যাকে ইচ্ছা তাকে ক্ষমা করেন,এবং যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেন(সূরা আনকাবুত-২১)। যেখানে আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কেউ শেরেক থেকে বাঁচতে পারবে না(সূরা আনাম-১০৭) সেখানে এই উগ্রবাদীরা এসব মানছে না। কুরআনে মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব বলা হলেও এসব উগ্রবাদী কথিত মুসলিমরা সাধারণ মানুষদেরকে নূন্যতম মর্যাদা দিচ্ছে না, তাদেরকে নির্যাতন ও নিপীড়ন করে যাচ্ছে।

রাষ্ট্রকে অনুধাবন করতে হবে যে,একটা দেশ কতোটা সভ্য সেটা কখনোই অর্থনীতি বা বিদেশি রিজার্ভের ওপর নির্ভর করে না, করে তার নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের ওপর। আর এই মূল্যবোধে দিনকে দিন আমরা তলানিতে নামছি। যার ফলে নেমে আসছে অন্ধত্ব। আর এই অন্ধত্ব সমাজকে অসুস্থ করে, অসুস্থ সমাজ মিথ্যা বানোয়াট অনুভূতির উন্মাদনায় উন্মত্ত হতে ভালোবাসে, সেই উন্মত্ততা উন্নত সভ্য বা স্থিতিশীল সমাজব্যবস্থাকে ধ্বংস করে অানন্দিত হয়।

প্রগতিশীল সুস্থ ও মুক্ত মন হয় মানবিক ও সার্বজনীন। আর মানবিকতা ও সার্বজনীনতা হল সমাজের মূল মন্ত্র,সেই মন্ত্রেই গড়ে উঠে সুস্থ,সভ্য এক প্রগতিশীল মানবিক সমাজ। আর এই সামাজিক ব্যবস্থাকে টেকসই করার জন্য আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে প্রধান শর্ত।

অস্বীকার করার সুযোগ নাই বর্তমান সরকার যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক ও বাহক দাবি করে তারা যে কারণেই হোক উগ্রবাদী হেফাজতসহ সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়াশীল সবার সাথে একটা সমঝোতা করে এবং ছাড় দিয়ে চলার চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু সরকার বা রাষ্ট্রযন্ত্রের মনে রাখতে হবে তারা দেশের জনগণের সেবক,অভিভাবক এবং সর্বক্ষণ যাবতীয় নিরাপত্তা রক্ষাকারী। রাষ্ট্রযন্ত্র সংখ্যাগরিষ্ঠদের অন্যায্য ও অন্যায় দাবির প্রতি দুর্বলতা দেখায় কিন্তু ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠায় কার্যকরী ভূমিকা পালন করছে না। তাদের বুঝতে হবে অবকাঠামোগত উন্নয়ন কোন কাজেই আসবে না যদি জনগণের মগজ,মনন ও মনস্তত্বের সুষ্ঠু উন্নতি সাধন না হয়। নাগরিক যদি প্রগতিশীল সুনাগরিক হিসেবে গড়ে না উঠে তাহলে রাষ্ট্রের ভিত ধ্বংস হয়ে ধূলিসাৎ হতে সময় লাগবে না।

রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে শিশুদের সামাজিক সুশিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে, শিল্প, সংস্কৃতি চর্চার বিস্তার ঘটাতে হবে। জনগণকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, এবং গবেষণা নিয়ে কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে, এসবের সুব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কেননা প্রত্যেকটা উন্নত সভ্য দেশেই সংস্কৃতি, শিল্প চর্চাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়,কারণ এসব মানুষের মননকে বিকশিত করে সৃষ্টিশীল হতে সাহায্য করে।

গত দুর্গাপূজায় দেশের যে ২৩ জেলায় হিন্দুদের উপর হামলা, অসংখ্য বাড়িঘর, মন্দির, হিন্দু মালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, দোকানপাট ভাঙচুর লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। অথচ প্রায় এক বছরেও রাষ্ট্রযন্ত্র দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী কোন প্রতিকার করতে পারেনি। রাষ্ট্রে যদি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা না যায় তবে উগ্রবাদী ধর্মান্ধরা এধরণের অপকর্ম তথা অধর্ম প্রতিনিয়ত সাধন করে যাবে,এবং এতে রাষ্ট্রযন্ত্রের সায় আছে বলেই উগ্রবাদীদের কাছে  প্রতিয়মান হবে। এবং ভুক্তভোগীরা রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর আস্থা হারাবে,এমনকি নিজ মাতৃভূমি ত্যাগ করতেও বাধ্য হবে। এসব প্রতিকার করতে হলে দেশে অবশ্যই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে, সংবিধান একজন নাগরিককে যে অধিকার দিয়েছে সেটা সমুন্নত রাখতে হবে,অন্যথায় উগ্রবাদ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না। আর সরকারের স্বদিচ্ছা তথা রাষ্ট্রযন্ত্রের স্বদিচ্ছা ছাড়া আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না, এবং স্বদিচ্ছার অভাব কিংবা অনীহাকে অধর্ম সাধনে রাষ্ট্রযন্ত্রের সায় হিসেবেই বিবেচনা করা যায়। সকলের মধ্যে পেশাদারিত্ব, সৃজনশীলতা, সততার চর্চার অভাব,মন বড় করার তথা উদারতা দেখতে অনীহা ইত্যাদিও উগ্রবাদের লালন পালনে ও বিস্তারে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট অধিকাংশই চরম মাত্রায় প্রতিক্রিয়াশীল। প্রগতিশীলতার চর্চা তথা সাসংস্কৃতিক বিপ্লব সাধন করতে না পারলে উগ্রবাদী কথিত মুসলিমরা ধর্ম রক্ষার নামে অধর্ম চালিয়েই যাবে।

ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এনে সম্প্রতি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কিছু পদ্যাংশ এবং বাণী ভুলভাবে ব্যবহার করে অধর্ম সাধনের চেষ্টা চলছে। যে নজরুলকে মওদুদিবাদী এবং ওহাবিবাদীরা বৃটিশ ও পাকিস্তান আমলে কাফের আখ্যায়িত করেছিল,এখন অসৎ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য তাদেরই কাছে তিনি পরম পূজনীয় হয়ে গেছেন। তারই লেখার উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ করছি-

নজরুল তার রবি প্রবন্ধে লিখেছেন “অবতার-পয়গম্বর কেউ বলেননি, আমি হিন্দুর জন্য এসেছি, আমি মুসলমানের জন্যে এসেছি, আমি ক্রিশ্চানের জন্য এসেছি। তাঁরা বলেছেন, আমরা মানুষের জন্য এসেছি – আলোর মতো, সকলের জন্য। কিন্তু কৃষ্ণের ভক্তেরা বললে, কৃষ্ণ হিন্দুর, মুহম্মদের ভক্তেরা বললে, মুহম্মদ মুসলমানদের, খ্রিস্টের শিষ্যেরা বললে, খ্রিস্ট ক্রিশ্চানদের”। যেখানে কবি বুঝাতে চেয়েছেন মহামানবরা সকলের তরে আবির্ভূত হয়েছেন,তথা সকলের মঙ্গল ও কল্যাণ সাধনেই তাদের আগমন।

আমি বিদ্রোহ করেছি-বিদ্রোহের গান গেয়েছি অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অত্যাচারের বিরুদ্ধে-যা মিথ্যা, কলুষিত, পুরাতন-পচা সেই মিথ্যা সনাতনের বিরুদ্ধে, ধর্মের নামে ভণ্ডামি ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে।

-নজরুল ইসলাম।

 

“বিশ্ব পাপস্থান

অর্ধেক এর ভগবান, আর অর্ধেক শয়তান্‌!

ধর্মান্ধরা শোনো,

অন্যের পাপ গনিবার আগে নিজেদের পাপ গোনো!”

‘পাপ’, কাজী নজরুল ইসলাম।

 

সকলের শুভবুদ্ধির উদয় হোক,

সকলের মঙ্গল হোক,

বাঙলা ও বাঙালির জয় হোক।

 

Tepantor

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।