Tepantor

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গ্রেফতার অভিযানে পুলিশের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ

৩ নভেম্বর, ২০২২ : ১০:২২ পূর্বাহ্ণ ৩২৭

তেপান্তর রিপোর্ট: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাটাই গ্রামে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি বিবাধকে কেন্দ্র করে পুলিশ যেই স্টাইলে গ্রামের নারীদের গ্রেফতার করেছে ও যেই আইনে মামলা দিয়ে চালান করেছে তা “মানবাধিকার লঙ্ঘন” বলে অভিযোগ তুলছেন গ্রেফতারকৃতদের আপনজনেরা। তারা এর বিচার চেয়ে গত ২৪ অক্টোবর”বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন”এ অভিযোগ করেছেন। সেই অভিযোগে সদর থানার দুই উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাসহ ৩ জন পুলিশ অফিসারকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এর আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কোন গ্রাম্য সংঘর্ষে এমন ঘটনা নজিরবিহীন।

টানা ২ দিনে কয়েক দফায় চলা ওই গ্রাম্য সংঘর্ষের সময় গত ২৩’শে অক্টোবর সোমবার রাত আনুমানিক সাড়ে আটটার সময় নাটাই গ্রামের সিরাজ মিয়ার স্ত্রী বিলকিস (৫০),সিএনজি চালক মারফত আলীর স্ত্রী স্বপ্না আক্তার (৩০), বিশিষ্ট সমাজ সেবক কাজী মোবারক হোসেন এর স্ত্রী ফারজানা বেগম (৫০), তার ছেলে স্কুল শিক্ষক কাজী আশরাফুল ইসলাম এর স্ত্রী আইরিন খানম প্রিয়া (২৫),এবং ইউনিয়নের সাবেক মেম্বার কাজী ফারুক এর স্ত্রী ইউনিয়নের সাবেক মহিলা মেম্বার মর্জিনা বেগম (৫৬) কে তাদের নিজ নিজ বাড়ি থেকে সদর মডেল থানার ওসি এমরানুল হক এবং ইন্সপেক্টর তদন্ত সোহরাব হোসেনের নেতৃত্বে উপপরিদর্শক ইব্রাহিম আকন্দ সংগীয় ফোর্স নিয়ে বিনা ওয়ারেন্ট ও অভিযোগে আটক করে পরেরদিন ২৪’শে অক্টোবর মঙ্গলবার বিস্ফোরক আইনে মামলা দায়ের করেন। ওইদিন সন্ধ্যা প্রায় সাতটায় কোর্টের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠায়। তাদেরকে আটক করে জেল হাজতে পাঠানোকে জেলা পুলিশের মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে মনে করছেন সমাজের বিশিষ্ট জনেরাও।

সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ২১’শে অক্টোবর জেলা সদরের নাটাই উত্তর ইউনিয়ন এর বটতলী বাজারে ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান নাটাই গ্রামের চান্দের বাড়ির বাসিন্দা সোহেল মিয়া’র ছোট ভাই শাকিল মিয়ার সাথে একই গ্রামের নাসির বাড়ির মৃত নাইম মিয়ার স্ত্রী মাহমুদা বেগমের ভাই এর স্ত্রীকে নিয়ে বাকবিতণ্ডা হয় এবং হাতাহাতি হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রায় তিন দিন এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করে, এবং উভয় পক্ষই সদর মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করে। কিন্তু পুলিশ কারও অভিযোগই আমলে নেয়নি।

এবং নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিরপেক্ষ কিছু ব্যক্তি প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, এলাকায় পুলিশের টহল ছাড়া সংঘর্ষ ঠেকাতে এর বেশি কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আন্তরিকতার অভাব এবং গ্রামের কিছু উগ্র যুবকের কারণে নাটাই গ্রামের চান্দের বাড়ি এবং নাসির বাড়ির মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। সংঘর্ষে উভয়পক্ষের এবং পুলিশের কয়েকজন আহত ও আঘাতপ্রাপ্ত হন।

সোমবার বিকেলে থমথমে অবস্থার মধ্যে প্রথম সংঘর্ষ ঘটে, এবং এদিন সন্ধ্যা আনুমানিক সাড়ে আটটায় গ্রামের পাচজন নির্দোষ মহিলাকে আটক করে পুলিশ। পুলিশের দায়ের করা এজাহারে উল্লেখ আছে প্রত্যেক আসামীকে সংঘর্ষের ঘটনাস্থল চান মার্কেটের সামনে থেকে আটক করা হয়, কিন্তু আটকৃত ফারজানা বেগম, আইরিন খানম প্রিয়া, এবং মর্জিনা বেগমকে তাদের স্ব স্ব বাড়ি থেকে আটক করা হয়েছে। তারা প্রত্যেকেই চান্দের বাড়ির বাসিন্দা। বিলকিস ও স্বপ্না আক্তারকেও তাদের স্ব স্ব বাড়ি থেকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে  বিলকিস বেগমের সন্তান এসএসসি পরীক্ষার্থী শায়লামণি এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা।

তার মা বিলকিস বেগম এবং স্বপ্না আক্তারের আটকের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে শায়লামণি বলেন, আমার মা মাগরিবের নামাজ পড়ে বাসায় শুয়ে ছিল। তখন হঠাৎ স্বপ্নার ৬ বছরের ছেলের কান্নাকাটির আওয়াজ শুনে আমার মা তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখে পুলিশ স্বপ্নাকে আটক করেছে। তাকে উদ্দেশ্য করে বাজে গালিগালাজ  করছে,এক পর্যায়ে তার হাতে লাঠি দিয়ে আঘাতও করে। তখন পুলিশের একজন নারী সদস্য আমার মা’কেও গালিগালাজ করে এবং তাকেও আটক করে। তারা আমার বড় ভাই এর স্ত্রী চার মাসের সন্তানের মা’কেও আটক করতে চাইলে উপস্থিত অনেকের অনুরোধে আর আটক করেনি। তারা আমার মা বিলকিস বেগম এবং স্বপ্না আক্তারকে তার ৬ বছরের ছেলেকে সহ আটক করে থানায় নিয়ে যায়। সে রাতেই আনুমানিক একটার সময় স্বপ্না আক্তারের ৬ বছরের ছেলেকে ছেড়ে দেয়। শায়লা মণি আরও বলেন, আমার মা দীর্ঘদিন যাবত  ডায়বেটিস এবং উচ্চরক্তচাপে ভুগছে। আমার বোন জামাই অনেক চেষ্টা করছে আমার মা’কে ছাড়িয়ে আনার। তাছাড়া আমার পরিবারের কেউই এই ঝগড়ার সাথে জড়িত নয়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, স্বপ্না বেগম,ফারজানা বেগম, আইরিন খানম প্রিয়া, এবং মর্জিনা বেগম সকলেই বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। থানায় নেয়ার পর ঘটনার আকস্মিকতায় বার বার জ্ঞান হারান স্বপ্না। তাকে দুদিন জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। সে শারীরিক ভাবে অনেক দুর্বল এবং নিম্ন রক্তচাপে ভুগছে। মর্জিনা বেগম উচ্চরক্তচাপ, ফারজানা বেগম ও আইরিন প্রিয়া অনেকদিন যাবত নিম্ন রক্তচাপে ভুগছে। তাছাড়া গত প্রায় একমাস আগে সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসাধীন ছিল প্রিয়া। জানা যায়, আইরিন খানম প্রিয়ার আড়াই বছরের কন্যা সন্তান এবং পাচ বছরের পুত্রসন্তান রয়েছে। তারা তাদের মায়ের জন্য থেমে থেমে কান্নাকাটি করছে। ফারজানা বেগমের সন্তান এবং প্রিয়ার স্বামী কাজী আশরাফুল ইসলাম বলেন, আমার মা এবং স্ত্রী সহজ সরল,তারা কখনোই ঝগড়া বিবাদ পছন্দ করে না, এটা পুরো গ্রামের মানুষ জানে,তারপরও তাদেরকে আটক করা হয়েছে। জেলা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী অনেক নেতা এবং জেলার প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধিরা তাদের আটকের ব্যাপারে জানতে চাইলে এসপি মহোদয় তাদের বলেন দু’পক্ষের মধ্যে আপস হলে তাদের ছেরে দেয়া হবে। কিন্তু তাদের কোন অন্যায় ছিলনা,পুলিশ তাদের ব্যর্থতা তথা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থ হয়ে কাপুরুষের মতো বিনা অপরাধে নারীদের আটক করেছে, এটা মানবাধিকার ও সংবিধানের এর লঙ্ঘন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জজকোর্ট এর আইনজীবী শওকত আলী বলেন, পুলিশ যেটা করেছে সেটা মানবাধিকারের লঙ্ঘন, এটা নজিরবিহীন।

এব্যাপারে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান বলেন, সংঘর্ষের তদন্ত হচ্ছে, মানবাধিকার, আইন লঙ্ঘন সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই তদন্ত হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নাটাই গ্রামের একজন বলেন পুলিশ যেটা করেছে খুবই ন্যাক্কারজনক, এখন আমাদের গ্রামে কোন মেয়ে বিয়ে দিতে গেলেও বলবে তোমাদের বউদের জেল খাটতে হয়। যা গ্রামের মর্যাদা হানি করেছে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি শিরোনামে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার এর বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে অনুচ্ছেদ ১১ এ৷ প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে।

Tepantor

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।