Tepantor

নবীনগরে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান সেজে ভাতা উত্তোলন কাউন্সেলরের

৯ নভেম্বর, ২০২২ : ৬:১৩ অপরাহ্ণ ১৯৮

মো. সফর মিয়া: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার বড়িকান্দি ইউনিয়নের ধরাভাঙ্গা গ্রামের শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা ল্যান্স নায়েক মোঃ ওয়াহিদুজ্জামান মুক্তিযোদ্ধা গেজেট নং৩৭৯৮ এর সন্তান সেজে আসল পরিচয় গোপন রেখে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার ভাতা উত্তোলন করছেন এক পৌর কাউন্সিলর। ওই কাউন্সিলর হচ্ছেন, নবীনগর পৌরসভার আলমনগর গ্রামের মোঃ কুদ্দুস মিয়ার স্ত্রী ১,২,৩ নং ওয়ার্ডের মহিলা কাউন্সিলর নিলুফা ইয়াসমিন। তিনি ২০১৮ সালের অক্টোবর মাস থেকে প্রতিমাসে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার ভাতা ৩০ হাজার এবং ওই শহীদ মুক্তিযোদ্ধার চাকুরীর পেনশন প্রতিমাসে ১২ হাজার টাকা উত্তোলন করে আসছেন।

তার এসএসসি’র সার্টিফিকেটে পদত্ত প্রকৃত পিতার নাম গোপন করে স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে বড়িকান্দি ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ওই শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান পরিচয়ের জন্য ইউপি চেয়ারম্যানের সনদ ও প্রত্যায়ন সংগ্রহ করে অনৈতিকভাবে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বনে যান। তিনি প্রতারনার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের বিপুল পরিমান অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।

এ ছাড়াও মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের জন্য সরকারের ঘোষিত ঋণও তিনি উত্তোলন করেন। কাউন্সিলরের এই প্রতারনার বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় এক সমাজসেবিকা ও নারী উদ্ধোক্তা ছাবিনা ইয়াসমিন পুতুল সোমবার(০৭/১১)উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বরাবরে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়,উপজেলার সলিমগঞ্জ ইউনিয়নের বাড্ডা গ্রামের আব্দুস সামাদ মিয়ার মেয়ে সুরাইয়া খাতুন এর সাথে উপজেলার বড়িকান্দি ইউনিয়নে অনুসন্ধানকালে তার পারিবারিক সুত্র থেকে ‘তিনি যে ওয়াহিদুজ্জামানের সন্তান সেটা প্রমান করার জন্য জানানো হয়।স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ওই কাউন্সিলরের বয়স দেড় বছর। যদি এটা সত্য হয়ে থাকে তাহলে তার বয়স দাড়ায় বায়ান্ন বছরের উপরে। আবার কাউন্সিলর নিলুফা ইয়াসমিন তার ফেসবুক প্রোফাইলে লিখেন,‘তিনি তার মায়ের পেটে থাকাকালীনই তার (কথিত বাবা ওয়াহিদুজ্জামান) বাবা এই দেশের মানুষের জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন’।স্বাধীনতার যুদ্ধ হয়েছে আজ ৫১ বছর ৭ মাস। প্রশ্ন জাগে ১৯৭১ এর ৩মার্চ তার জন্ম হয় কিভাবে?

অনুসন্ধানে তার চারটি জন্ম তারিখ উঠে আসে। এন আই ডি কার্ড অনুযায়ী‘ ৪৪ বছর’,সংশোধনী বয়স অনুযায়ী ‘৫১বছর ৭ মাস’, কাবিন নামা অনুয়ায়ী ‘৪৯ বছর’ এবং পারিবারিক বক্তব্য অনুযায়ী ‘বয়স সাড়ে ৫২ বছরের উপরে’, আর নিলুফার স্ট্যাটাস বলছে,‘ যুদ্ধের সময় সে তার মায়ের পেটে’।

স্থানীয় একটি সুত্র জানায়, মোঃ ওয়াহিদুজ্জামান স্বাধীনতা যুদ্ধের কয়েকমাস আগে নিলুফা ইয়াসমিনের মা সুরাইয়া খাতুনকে বিয়ে করেন। এ ব্যাপারে কাউন্সিলর নিলুফা ইয়াসমিনকে তার বাবা “রহিম না ওয়াহিদুজ্জামান” প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন,আমিতো সার্টিফিকেটে আবদুর রহিম দেই নাই,তিনি তার সার্টিফিকেটে পিতার নাম ওয়াহিদুজ্জামানই দাবী করেন। তিনি কোথায় কোন সার্টিফিকেট জমা দেন নাই।

এ ব্যাপারে বড়িকান্দি ইউনিয়নের বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন,ওয়াহিদুজ্জামান এর কোন সন্তান আছে কিনা আমি জানিনা। তিনি যে বাড়িতে বিয়ে করেছে সেই বাড়িতে স্বাধীনতা পূর্ব সময়ে লজিং ছিলাম। দিন তারিখ বলতে পারব না যুদ্ধের কিছু সময়ে পূর্বে সে বিয়ে করে। তারপর যুদ্ধ শুরু হলে তিনি চলে যান। আমরাও যুদ্ধে চলে যাই। উনার আর কোন খোজঁ খবর আমরা জানিনা। শিক্ষাগত যোগ্যতার সার্টিফিকেটতো যুক্তিতর্ক দিয়ে খন্ড করা যাবে না। সেখানে যার নাম সেই প্রকৃত বাবা। এ ভাতা পাবার আবেদনে আমার স্বাক্ষর নিতে আসছিল আমি কিন্ত স্বাক্ষর দেই নাই। পরে কে বা কারা করেছে আমি জানিনা। মেয়েটা উনার কি না এই রকম একটা সন্দেহে দ্ইুচারজন আমার কাছে বলছে, ‘মেয়েটা উনার না এই রকম’ আমি এটা নিয়ে মাথা ঘামাই নাই। এ বিষয়ে নিলুফার বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিলকারি আলমনগর গ্রামের সমাজসেবিকা নারী উদ্ধোক্তা সাবিনা ইয়াসমিন পুতুল বলেন, সম্পর্কে উনি আমার ভাবী হন,আমরা একই গোষ্টীর। সম্ভবত ১৯৯২ সালে উনার বিয়ে হয় সেই থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত উনি যে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান তা কখনো আমরা শুনিনি। ২০১৯ সালে তিনি যখন কাউন্সিলর নির্বাচন করেন তখন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানের পরিচয় দেন। এর আগে তিনি ২০১৪ সালেও কাউন্সিলর নির্বাচন করেছিলেন সেই সময়েও তিনি যে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান তা কোথাও বলেননি। তার শিক্ষাগত যোগ্যতার সার্টিফিকেটই প্রমান করে সে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান নয়। রাষ্ট্রের সাথে এই চরম প্রতারণার বিষয়টি আমাকে পীড়া দেয় বিধায় আমি সচেতন নাগরিক হিসাবে এ অভিযোগ দাখিল করি। তদন্তের সাপেক্ষে রাষ্ট্রীয় অর্থ আদায়সহ প্রতারক কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবী জানান তিনি।

এ ব্যাপারে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা আজাহারুল ইসলাম লালু বলেন, উনি একবার মুক্তিযোদ্ধা সন্তানের সার্টিফিকেটের জন্য মুক্তিযোদ্ধা সংসদ অফিসে এসেছিলেন। এমদাদুল হক তখন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার। তিনি উনার আবেদন ফরোয়ার্ডিং করে আমার কাছে পাঠালেন মুক্তিযোদ্ধা সন্তানের সার্টিফিকেট প্রদানের জন্য। আমি উনার এন আই ডি কার্ড দেখলাম তার জন্ম ১৯৭৮ সালে। উনার বাবা যদি ১৯৭১ মৃত্যুবরণ করে থাকেন তাহলে তার জন্ম ১৯৭৮ সালে হয় কিভাবে? এ প্রশ্নের স্থলে তিনি সে সময় সার্টিফিকেট দেননি। এর পর কি হয়েছে তিনি তা জানেন না ।

এ ব্যাপারে নবীনগর মুক্তিযোদ্ধ সংসদের দায়িত্বপাপ্ত কমান্ডার ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার একরামুল ছিদ্দিক অভিযোগ প্রাপ্তির বিষয়টি স্বীকার করে বলেন,সুষ্ঠ তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

Tepantor

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।