Tepantor

মাদকসেবীদের ট্রেন যাত্রায় ঝুকি বেড়েছে যাত্রীদের

২২ নভেম্বর, ২০২২ : ৪:৪৯ অপরাহ্ণ ১১৩

ওপেন সিক্রেট মাদক – পর্ব ৬

তেপান্তর রিপোর্ট: প্রত্যেকদিন গড়ে প্রায় হাজার খানেক মাদকসেবি মাদক সেবনের উদ্দেশ্যে ট্রেনে করে সীমান্ত এলাকায় যায়।মাদকসেবিদের বিনা টিকিটে ট্রেন যাতায়াতের কারণে হয়রানি ও ভোগান্তিতে পড়ছে টিকেট ধারী সাধারণ যাত্রীরা,অনেক যাত্রী ভোগেন নিরাপত্তাহীনতায়। এর মধ্যে ঢাকা, নরসিংদী, ভৈরব,আশুগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশন থেকে আখাউড়া, কসবা,আজমপুর ও শশীদল রেলওয়ে স্টেশন নেমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আখাউড়া, বিজয়নগর, ও কসবা উপজেলার সীমান্তবর্তী বিভিন্ন মাদক স্পট এবং কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার সীমান্তবর্তী শশীদল আসাবাড়ী যাতায়াত করে। মাদক সেবনের পর বিনা টিকিটে আবার ট্রেনেই তারা ফেরত আসে। বিনা টিকিটে ট্রেন যোগে যাতায়াতকারী মাদক সেবীদের সিংহভাগই ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশন থেকে যাতায়াত করে থাকে। তবে বৃহস্পতিবার ও সরকারি ছুটির দিন ঢাকা, নরসিংদী,কিশোরগঞ্জ জেলার মাদকসেবির সংখ্যা বেড়ে যায়। মাদকসেবিদের সিংহভাগই বিনা টিকিটে যাতায়াত করলেও নেয়া হয়না দৃষ্টান্তমূলক আইনগত কোন ব্যবস্থা,যার কারণে বিনা টিকিটে ট্রেন যাত্রা আইনত দণ্ডনীয় হলেও তোয়াক্কা করছেনা মাদকসেবিরা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশনে সরেজমিনে অনুসন্ধান করে দেখা যায়, বিভিন্ন আন্তঃনগর, কমিউটার,ও মেইল ট্রেনে প্রত্যেকদিন গড়ে প্রায় এক হাজার মাদকসেবি মাদক সেবনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। স্টেশন থেকে ওঠেই তারা প্রত্যেক বগির দরজাগুলো দখলে নিয়ে বাহিরের দিকে পা ঝুলিয়ে বসে পড়ে, যা তাদের জন্যই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। মাদকসেবিরা ছোটবড় বিভিন্ন গ্রুপে ট্রেনে যাত্রা করে, যাদের সিংহভাগই অশালীন ও কুরুচিপূর্ণ শব্দে উচ্চস্বরে আলাপ আলোচনায় মত্ত থাকে। তারা সাধারণ কিংবা দূরের টিকিটধারী যাত্রীদের উপর কর্তৃত্ব খাটানোর চেষ্টা করে। কেউ তাদের অবাধ্য হলে অথবা প্রতিবাদ করলে সে ব্যাক্তিকে বাজে ভাষায় গালিগালাজ করে এমনকি শারীরিক ভাবে লাঞ্চিতও করে থাকে। তারা অনবরত প্রকাশ্যে চলতি ট্রেনে ধূমপান করতে থাকে, উচ্চস্বরে হাসিঠাট্টায় মেতে থাকে। এসব কারণে সাধারণ যাত্রীদের পড়তে হতে হচ্ছে বিব্রতকর অবস্থায়, পোহাতে হচ্ছে ভোগান্তি। বেশি অস্বস্তিতে থাকে নারী যাত্রী এবং শিশুদের অভিভাবকরা।

ঢাকা-সিলেট রোডের আন্তঃনগর জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস এর যাত্রী রাশেদুল হক বলেন, আমি ব্যবসায়ের কাজে সপ্তাহে তিন চারদিন ট্রেন যোগে ঢাকা সিলেট আসা যাওয়া করি। প্রত্যেকবার সিলেট যাওয়ার পথে ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্টেশন থেকে টিকেট ছাড়া অনেক যাত্রী ওঠে যাদের মধ্যে প্রায় সবাই তরুণ ও মধ্যবয়সী। তারা ট্রেনে ওঠেই বগিগুলোর দরজা সব খোলে বসে পড়ে। এক বগি থেকে আরেক বগি যাওয়ার রাস্তাটা ব্লক করে দেয়,টয়লেট এর সামনে দাড়িয়ে আড্ডা দিতে থাকে। তাদের কারণে মহিলা ও বাচ্চারা টয়লেট ব্যবহারের প্রয়োজন হলেও যেতে চাই না। তারা অনেক সময়ই অন্য যাত্রীদের সাথে বাজে ব্যবহার করে, খারাপ ভাষায় গালিগালাজ করে, সবসময় আক্রমণাত্মক আচরণ করে। কেউ কেউ আবার উচ্চস্বরে বিভিন্ন মাদক নিয়ে কথা বলে। ধীরে বা আস্তে কথা বলতে বললে উদ্যত আচরণ করে, মারতে তেড়ে আসে। বিভিন্ন রকম হুমকি ধমকি দেয়,বলে ট্রেন থেকে নামিয়ে আটকিয়ে রাখবে, কিংবা জানালা দিয়ে চলতি ট্রেন থেকে ফেলে দিবে। ট্রেনের টিটি বা এটেন্ডেন্সের কাছে অভিযোগ দিয়েও প্রতিকার মেলে না,এমনকি তারা ওদের টিকিট আছে কিনা সেটাও চেক করে না। তবে স্বস্তির ব্যাপার হচ্ছে আজমপুর রেলওয়ে স্টেশনে গাড়ি স্টপেজ দিলে তাদের অধিকাংশই নেমে পড়ে।

ঢাকা-নোয়াখালী’র ট্রেন আন্তঃনগর উপকূল এক্সপ্রেস এর যাত্রী আবরারুল হক শাহীন বলেন, আমার বাড়ি লাকসামে,আমি প্রত্যেক বৃহস্পতিবার ঢাকা থেকে উপকূল ট্রেন যোগে পরিবারের কাছে লাকসাম যাই এবং শনিবার সকালে একই ট্রেনে ঢাকায় ফিরে আসি। সবসময়ই দেখি ব্রাহ্মণবাড়িয়া আসলেই অনেক পোলাপাইন ট্রেনে ওঠে, যাদের কাছে টিকিট থাকেনা বলেই জানি। এরা ট্রেনে ওঠেই নিজেদের পাওয়ার দেখাতে থাকে, কেউ কিছু বললেই খুবই বাজে ভাষায় গালিগালাজ করে, আক্রমণাত্মক আচরণ করে। কয়েকমাস আগে কুমিল্লার দুটো ছেলেক সামান্য বিষয় নিয়ে ব্যাপক মারধর করে, তাদের নাকে মুখে রক্ত চলে আসে, তারা পুরো রাস্তা কান্না করতে করতে গেছে। আমার সামনেই এমন ঘটনা ঘটেছে কিন্তু কিছুই করতে পারিনি। কিন্তু কষ্ট লাগে ট্রেনের এটেনডেন্স এবং একজন পুলিশ সদস্য এসে ঘটনা জেনেও তারা কিছু করেনি। আমরা যারা ট্রেনে যাতায়াত করি রেল কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের একটাই আশা আমরা যেন নিরাপদে শান্তিপূর্ণভাবে ট্রেনে যাতায়াত করতে পারি তারা সেটা নিশ্চিত করবেন।

জেলা শহরের কান্দিপাড়া’র একজন মাদকসেবী তার নিজস্ব ভাষায় বলেন, “আমি সবসময় ট্রেনেই আসা যাওয়া করি, এতে গাড়ি ভাড়া বেচে যায়। এই টাকা দিয়ে অর্ধেকটা মাল খাওন যায়,আবার সময়ও অনেক কম লাগে। সারাদিন কবে কোনসম কোন ট্রেন আইয়ে সব আমার মুহস্ত,ট্রেনের রাজা আমরা বাউনবাইরার পুলাপাইন। আমরা সবাই মধু হাইতে যাই,ট্রেনে আমরার উপর আওয়াজ দেওয়ুইন্না কেউ নাই। ”

বিনা টিকিটে ট্রেন যাতায়াত অপরাধ কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন ইতা কোন ব্যাপার না, আমরার চেহারা দেখলেই টিকেট আর চাইতো না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আন্তঃনগর উপকূল এক্সপ্রেস ট্রেনের একজন এটেনডেন্স বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে যারা ওঠে তাদের সবাই বাজে ব্যবহার করে না,তবে বেশির ভাগই আক্রমণাত্মক ও উশৃংখল। তাদের কাছে টিকেট আছে কিনা জানতে চাইলে উল্টো তারা বাজে আচরণ করে, এমনকি চলতি ট্রেন থেকে গাড়ে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়ার হুমকিও দেয়। তবে তাদের অধিকাংশই মাদকসেবি বলে ধারণা করা যায়। আমরা ছোট চাকরি করি তাই অযথা তাদের সাথে ঝামেলায় জড়ায় না।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার রফিকুল ইসলাম এর সাথে যোগাযোগে করা হলে তিনি বলেন, বিনা টিকিটে যাতায়াত করছে কিনা সেটা দেখার দায়িত্ব ট্রেনের টিটিদের,আমরা সবসময় মাইকিং করে বিনা টিকিটে যাতায়াত করার ক্ষেত্রে যাত্রীদের সতর্ক করে যাচ্ছি। তবে স্টেশন থেকে বিনা টিকিটে ট্রেনে ওঠা থেকে প্রতিরোধ করার মতো আমাদের লোকজন নেই।

সাধারণ যাত্রীদের কাছ থেকে কোন অভিযোগ দেয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এরকম কোন অভিযোগ পাইনি,কিন্তু মাঝেমধ্যে আমার অফিসে এসে বসে থাকে আজমপুর যায় অনেকে আরকি মাদকসেবি,জয়ন্তিকায় যায় আমার অফিসে এসে টেবিল চেয়ারে বসে পড়ে, কিছু বললে অশ্লীল ভাষায় বকাবকি করে খারাপ ব্যবহার করে। রেলওয়ে পুলিশ জানে এবং তাদেরকে বলাও হয়েছে, কিন্তু তারা ক্যাম্পে থাকে প্রতিরোধমূলক কোন ব্যবস্থা নেয় না। বিশেষ করে জয়ন্তিকা ট্রেনের সময় যে একটা অত্যাচার করে বলে বুঝানো যাবে না। প্রত্যেকদিন প্রায় হাজারের ওপর মাদকসেবি যায়।

আখাউড়া রেলওয়ে থানার ওসির সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তার মোবাইল বন্ধ ছিলো।

ঢাকা ডিভিশনাল রেলওয়ে ম্যানেজারকে ফোন করলে তিনি ফোনটি কেটে দেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আখাউড়া রেলওয়ে স্টেশনের একজন কর্মকর্তা বলেন, আমাদের এখানে এবং অন্য সব স্টেশনে যদি ঢাকা কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের মতো টিকেট ছাড়া প্লাটফর্মে ঢুকতে না দেওয়া হতো তাহলে বিনা টিকিটের যাত্রী অনেকটাই কমে যেত। তাছাড়া কোন যাত্রীকে তো আপনি মাদকসেবি বলে ট্রেন যাতায়াতে আইনত বাধা দিতে পারেন না।

উল্লেখ্য ট্রেন ছাড়াও প্রত্যেকদিন প্রায় ১৫০০ থেকে ২০০০ মাদকসেবি সড়কপথে মোটরসাইকেল, সিএনজিসহ বিভিন্ন যানবাহনে ভারত সীমান্তবর্তী আখাউড়া, কসবা,ও বিজয়নগর উপজেলার মাদক স্পট গুলোতে ফেন্সিডিল,স্কফ,ইয়াবাসহ হরেকরকম মাদক সেবনের জন্য যাতায়াত করে থাকে। দুঃখজনক হল প্রত্যেক বছর শত শত নতুন মাদকসেবি যুক্ত হচ্ছে ট্রেন ও সড়ক পথের এই মাদক যাত্রায়। যাদের মধ্যে রয়েছে অনেক নারী। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা রয়েছেন বরাবরের মতোই উদাসীন।

Tepantor

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।