জায়গা সঙ্কটে বিসিক

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ : ১১:৫৯ অপরাহ্ণ ৫০৮
কারখানার দূষিত বর্জ্যে নষ্ট হয়ে গেছে বিসিকের পুকুরের পানি।
কারখানার দূষিত বর্জ্যে নষ্ট হয়ে গেছে বিসিকের পুকুরের পানি।

জহির রায়হান : ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) এ জায়গা সঙ্কটের কারনে নতুন কোন ব্যাবসায়ী আসতে পারছেনা এখানে। ফলে নতুন করে বিসিকের অর্থনৈতিক অগ্রগতিও হচ্ছেনা। এই অবস্থায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সুলতানপুরের কাছে পঞ্চবটি নামক এলাকায় নতুন আরেকটি শিল্পনগরী গড়ার চেষ্টা  করা হলেও বিভিন্ন কারনে সেটা হয়নি।

এছাড়াও নানাবিধ সমস্যায় বেহাল দশা ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিসিকের। শিল্প উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, প্লট সংকট, কেমিক্যাল ফ্যাক্টেরীর বর্জের দুর্গন্ধ এবং বিসিকের ভিতরের কিছু রাস্তা একেবারেই চলাচলের অনুপযোগী। নেই ড্রেন ও পানির সু-ব্যবস্থা। অগ্নিনির্বাপণ নিরাপত্তার জন্য যে পুকুরটি রয়েছে সেটাও নাজুক। এসব সমস্যার কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে শিল্পের প্রসার। সমস্যা সমাধানে কাজ করছেন বলে জানান বিসিক কর্মকর্তারা।

জানা যায়, ১৯৯৮ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নন্দনপুরে ২১.৯৮ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় বিসিক শিল্প নগরী। এখানে প্লটের সংখ্যা ১শ’ ৩৭টি। যদিও বিসিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বর্তমানে চালু আছে ৬৬ ইউনিট (এক ইউনিটে ৩/৪ টি প্লট) এরমধ্যে এ টাইপ, বি টাইপ এবং এস টাইপ এই ৩টি ভাগে বিভক্ত করেছে প্লট গুলোকে। এ টাইপের ৪ হাজার ৫শ’ বর্গফুটের প্লট রয়েছে ৯০টি, বি টাইপের ৩ হাজার বর্গফুটের প্লট রয়েছে ১৫ টি এবং এস টাইপের বিভিন্ন আকারে প্লট রয়েছে আরো ৩২ টি। বর্তমানে ৪ টি ইউনিট বন্ধ রয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিসিক কার্যালয়।

সরেজমিনে ঘুরে শিল্প উদ্যোক্তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এখানে ১শ’ ভাগ রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ধরনের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এরমধ্যে সিলিকেট ফ্যাক্টোরীগুলোর দূষিত বর্জ শিল্প উদ্যোক্তাসহ বিসিকে কর্মরত মানুষের জীবনমান দুর্বিষহ করে তুলছে। ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান (ইটিপি) ছাড়াই এসব দূষিত বর্জ ড্রেনে ছেড়ে দেওয়ায় সামান্য বৃষ্টি হলেই ড্রেন সংশ্লিষ্ট রাস্তা ঘাটগুলো বেহালদশায় পরিণত হয়, এবং খালগুলো বর্জে ভরে যায়। সেইসাথে দূষিত বর্জের দুর্গন্ধে আশেপাশের এলাকার বাতাস ভারি হয়ে উঠে। ফলে শিক্ষার্থীসহ এলাকার সাধারণ লোকজন বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়। নন্দনপুর গ্রামের কামাল মিয়া জানান, দূষিত এই পানির জন্য বাড়িতে কোন মেহমান আসলে আমাদের লজ্জিত হতে হয়। এছাড়া সিলিকেট কারখানার দূষিত পানি এই খাল দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় ছোট ছোট বাচ্চারা নানান রোগে আক্রান্ত হয়। একই গ্রামের সোহাগ নামের এক শিক্ষার্থী জানান, সামান্য বৃষ্টি হলেই জমাট বেঁধে থাকা দূষিত এসব বর্জের পানি ফুলেফেঁপে রাস্তায় উঠে। তখন দূষিত এসব পানির উপর দিয়েই হেঁটে স্কুলে যেতে হয়। পরবর্তীতে স্কুল শেষে বাড়ি ফিরে দেখি পা চুলকানোসহ পায়ে ছোটছোট গোটার সৃষ্টি হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিসিকের আরমান কেমিক্যাল (সিলিকেট) কোম্পানির ম্যানেজার মাইনুল ইসলাম জানান, ২০ বছর ধরে এভাবেই চলছে কোম্পানির কার্যক্রম। সুডা, বালি ও পানির মিশ্রণে তৈরি করা হয় সিলিকেট। এখানে ক্ষতিকর কোন উপাদান নেই। আমরা দূষিত পানি ফ্যাক্টোরীতে আটকে রেখে ভাল পানিটুকু ড্রেনে ছাড়ি।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিসিকের সহকারী মহাব্যবস্থাপক আব্দুল ওয়াদুদ মিয়া জানান, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) এর চ্যায়ারম্যান জায়গা সঙ্কট দূর করতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৩০০ একরের জায়গা খুজছেন নতুন শিল্পনগরী গড়ার জন্য, কিন্তু পাচ্ছেন না। এই জায়গাটি পেলেই নতুন ব্যাবসায়ীদের আমরা স্থান দিতে পারবো।  দূষিত এসব বর্জের পানি নিষ্কাশনের জন্য বিসিক মালিক সমিতির উদ্যোগে গত ৬ মাস পূর্বে ৩ লক্ষ টাকা ব্যয়ে মহাসড়কের সাথে পানি নিষ্কাশনের প্রধান খালটি খনন করা হয়। এছাড়া দূষিত এসব বর্জ পরিশোধনের জন্য বিসিকে ৫টি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি) রয়েছে। এরপরেও দুর্গন্ধযুক্ত এসব পানি আসে কোথা থেকে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, সব ফ্যাক্টোরীতে তো আর ইটিপি নেই। বিসিকের ড্রেন এবং রাস্তাগুলো সংস্কার করলেই আর কোন সমস্যা থাকবেনা। এছাড়া ফায়ার সার্ভিসের জন্য থাকা বিসিকের পুকুরটি ময়লা আবর্জনায় নষ্ট হয়ে গেছে। সেটিকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পুকুরের চারপাশে সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলেই বিসিকের চেহারা পাল্টে যাবে।

আরমান কেমিক্যাল (সিলিকেট) কোম্পানিতে কাজ করছেন শ্রমিকরা। ছবি: তেপান্তর

এ বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক আলহাজ্ব মো: শাহ আলম মুঠোফোনে জানান, বিসিকে প্লট সংকটের কারণে নতুন নতুন অনেক শিল্প উদ্যোক্তা প্লট না পেয়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। এসব সমস্যা সমাধানের জন্য কসবা এবং সুলতানপুর এলাকায় আরো দুটি নতুন বিসিক শিল্প নগরী গড়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

তিনি আরো জানান, বিসিকের দূষিত পানির এই বিষয়টি নিয়ে আমরা একাধিকবার বসেছি। তারা (শিল্প উদ্যোক্তা) দূষিত এসব পানি নিজস্ব ফ্যাক্টোরীতে জমা রেখে ইটিপির মাধ্যমে পরিশোধিত করে ড্রেনে ছাড়বে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এছাড়া আগামী ২ অক্টোবর উৎপাদনশীলতা দিবস পালিত হবে। ওই সময় বিসিকের কেমিক্যাল বর্জের দূষিত পানি এবং প্লট সংকটের বিষয়টি নিয়ে আমরা আলোচনা করবো। এছাড়াও বিসিকের নানাবিধ সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে সকল কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।