Tepantor

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নির্বাচনী আচরণবিধি মানছেন না প্রার্থীরা

২৬ ডিসেম্বর, ২০২৩ : ৭:১১ অপরাহ্ণ

মোস্তাফিজ চৌধুরী: দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় যতোই ঘনিয়ে আসছে, প্রার্থীদের প্রচারণাও বাড়ছে জোরেশোরে। এক্ষেত্রে নির্বাচনি প্রচারণার বিধিমালাও মানছেন না বেশিরভাগ প্রার্থী। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ৬টি আসনে মোট প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সংখ্যা ৩৪ জন। প্রত্যেক আসনে প্রায় সকল প্রার্থীর পক্ষে দেয়ালে,বিভিন্ন যানবাহনে লাগানো হচ্ছে পোস্টার,হুমকি দেয়া হচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর কর্মী সমর্থকদের,পাড়ায় পাড়ায় দেয়া হচ্ছে নিয়ম বহির্ভূত ভাবে প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী অফিস,ভোটার আনতে ঘোষণা করা হচ্ছে আর্থিক পুরস্কারের, অভিযোগ আছে কালো টাকা খরচ করা হচ্ছে ভোটের প্রচার প্রচারণায়,প্রচারণায় মোটর শোভাযাত্রা ও যানবাহনের ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকলেও প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকরা তা মানছেন না। ফলে প্রতিদিনই ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে জেলাবাসীকে।

গত কয়েক দিনে সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রচারণার কারণে পথচারীরাও বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। আবার অনেক পথচারী জানান, তারা ভোট দিতে পারবেন কি-না, তা নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। গত নির্বাচনেও তাদের অনেকেই ভোট দিতে পারেননি। তাই তারা প্রশ্ন করেছেন, ‘জনগণকে ভোগান্তিতে ফেলা এই প্রচারণার মানে কি?’ শুধু পথচারীই নয়, নির্বাচনি প্রচারণার ধরণ দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এসএসসি পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। সবার প্রশ্ন, নির্বাচনি প্রচারণার কোনো বিধিমালায় জনদুর্ভোগের কথা সত্যিই আছে কিনা? যদি থেকে থাকে, তাহলে নির্বাচন কমিশন কেনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না?

এসএসসি পরীক্ষার্থী নুসরাত জেলা শহরের পাইকপাড়ার বাসিন্দা। গত কয়েকদিন ধরে ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারছে না। সে জানায়, ‘দিনের বেলায় তো মাইকে প্রচারণা চলেই। রাত ১০টার পরও সাউন্ড বক্স ও মাইকে নির্বাচনি প্রচারণা চালাচ্ছেন প্রার্থীরা। এতে করে পড়াশোনায় মনযোগ দিতে পারছি না। অথচ আর মাত্র এক মাস বাকি পরীক্ষার। পরীক্ষার ফল খারাপ হলে কি বিষয়টা তারা দেখবেন? তারা তো নির্বাচিত হতে পারলেই শেষ।’

গত রবিবার রাত ১০টার দিকে কাউতুলি মোড়ের সামনে কানফাটা আওয়াজে চলছিলো নির্বাচনি প্রচারণার গান। এতে বিরক্ত পথচারীরা। একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন সামসুল হক। তার সঙ্গে চায়ের দোকানে এ প্রসঙ্গে কথা বললে তিনি ঘড়ি দেখে বলেন, ‘এখন বাজে রাত ১০টা। এখনো এতো জোরে স্পিকার বাজানোর কোনো মানেই হয় না। এগুলো দেখার কি কেউ আছে?’

 

শুধু নুসরাত-সামসুল হক নয়, এমন আরো কয়েকজন পরীক্ষার্থী ও পথচারী জানান, প্রচারণার নির্ধারিত সময় আছে। রাত ৮’টার পর প্রচারণা চালানো নিষেধ। কিন্তু কেউ তা মানছেন না। প্রতিদিন রাত ১০টা-১১টা পর্যন্ত প্রচারণা চলছে।

নির্বাচন সংক্রান্ত বিধিমালার ২১ ধারার ১নং উপধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী বা তাহার পক্ষে কোনো রাজনৈতিক দল ও অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান একটি ওয়ার্ডে নির্বাচনি প্রচারণার কাজে একের অধিক মাইক্রোফোন বা শব্দের মাত্রা বর্ধণকারী অন্যকোনো যন্ত্র ব্যবহার করিতে পারিবেন না।’ প্রচারণার সময়ের প্রসঙ্গে ২নং উপধারায় বলা হয়েছে, ‘মাইক্রোফোন বা শব্দের মাত্রা বর্ধণকারি অন্যবিধ যন্ত্রের ব্যবহার দুপুর ২টার পূর্বে এবং রাত ৮টার পরে ব্যবহার করা যাইবে না।’

কিন্তু নির্বাচনি এই বিধিমালা উপেক্ষা করে চলেছেন প্রার্থীরা। গত ২৪ ডিসেম্বর (রবিবার ) রাত ১০টা ১৫ মিনিটে টি এ রোড সংলগ্ন এলাকায় একটি পিকআপ ভ্যানে বড় দুটি সাউন্ড বক্স নিয়ে প্রচারণা চলছিলো। এটি শুধু জেলা শহরে নয়। জেলার সব জায়গাতেই হচ্ছে। দিন থেকে শুরু করে মধ্যরাত পর্যন্ত দলীয় ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর থিম সং বাজছে।

গত শুক্রবার রাত ৮টা ৪৫ মিনিটের দিকে টি এ রোড এলাকায় ১৫টির অধিক মোটরসাইকেল ও চারটি মাইক্রোবাস নিয়ে প্রচারণায় দেখা গেছে এক স্বতন্ত্র প্রার্থীকে। তার সঙ্গে ছিলেন শহরের প্রভাবশালী এক সাবেক ছাত্রলীগ নেতা যিনি নিজেও গত ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন। তার কর্মি সমর্থকেরা শহরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি প্রায় দশ মিনিট আটকে প্রচারণা চালান। পাশেই সদর মডেল থানা এবং পুলিশের একটি নিয়মিত টহল টিম থাকলেও তারা ছিল প্রায় নির্বিকার। স্থানীয় এক দোকানদারের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানালেন, ‘প্রচারণায় মোটরসাইকেল তো নিষেধ।’ শোডাউনের সময় প্রার্থীর সাথে থাকা পুলিশ কর্মকর্তার কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোন মন্তব্য করেননি।

আচরণবিধির ৭-এর ‘খ’ ধারায় রয়েছে, ‘কোনো প্রার্থী পথসভা ও ঘরোয়া সভা করতে চাইলে প্রস্তাবিত সময়ের ২৪ ঘণ্টা আগে তাহার স্থান এবং সময় সম্পর্কে স্থানীয় পুলিশ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে হবে। যাতে ওই স্থানে চলাচল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য পুলিশ কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারেন। কিন্তু বাস্তবে চলছে তার উল্টো। প্রতিদিনই প্রার্থীরা গণসংযোগকালে একাধিক পথসভা করছেন। রাস্তা বন্ধ করে এসব পথসভা করায় আশপাশের এলাকায় দেখা দিচ্ছে দীর্ঘ যানজটের। কিন্তু এসব দেখতে নির্বাচন কমিশনের কোনো কর্মকর্তাকে মাঠে দেখা যাচ্ছে না।

সরকারি দলের প্রার্থীদের নির্বাচনি আচরণ বিধি ভঙ্গের প্রসঙ্গে প্রশ্ন তুলেছেন স্বতন্ত্র ও অন্য দলের প্রার্থীরা। তাদের অনেকে বলেন, ‘ইসির কাছে আমরা লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। তারপরও কমিশন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। আমাদের বিপক্ষের প্রার্থীরা প্রতিদিনই আচরণবিধি লঙ্ঘন করছেন। আমাদের কর্মীদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে।’

 

আচরণবিধির ৮ ধারায় উল্লেখ আছে, প্রার্থীদের পোস্টার সাদাকালো হতে হবে এবং এর আয়তন ৬০/৪০ সেন্টিমিটারের অধিক হতে পারবে না। কিন্তু অনেক প্রার্থীই এ বিধি মানছেন না। নির্ধারিত আয়তনের পাশাপাশি অনেকে বড় আকারের ব্যানার ফেস্টুনও টানিয়েছেন। একই ধারার ৫নং উপধারায় বলা আছে, নির্বাচনী প্রচারণায় কোনো প্রার্থী নিজ ছবি ও প্রতীক ছাড়া অন্য কারো নাম, ছবি বা প্রতীক ব্যবহার করতে পারবেন না। তবে প্রার্থী কোনো রাজনৈতিক দলের মনোনীত হলে সেক্ষেত্রে তার দলের বর্তমান প্রধানের ছবি পোস্টারে বা লিফলেটে ছাপাতে পারবেন। এ বিধানও মানা হচ্ছে না। দুই সিটির মেয়র প্রার্থীরা দলীয় মনোনীত। কিন্তু কাউন্সিলরা মনোনীত নন। কিন্তু রাজধানীর বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখা গেছে, অনেক কাউন্সিলর প্রার্থী তাদের পোস্টারে নিজ নিজ দলের মনোনীত বলে পোস্টারে তা লিখেছেন।

আচরণবিধির ১৬ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো সড়ক কিংবা জনগণের চলাচল ও সাধারণ ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত স্থানে নির্বাচনি ক্যাম্প বা অফিস স্থাপন করা যাবে না। কিন্তু বাস্তবচিত্র পুরো উল্টো। এসব নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে বেশিরভাগ কাউন্সিলর প্রার্থী ফুটপাত, এমনকি অনেক জায়গায় রাস্তা দখল করে নির্বাচনি ক্যাম্প স্থাপন করেছেন।

আচরণবিধির ২০ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো প্রার্থী বা তাহার পক্ষে কোনো রাজনৈতিক দল, অন্য কোনো ব্যক্তি, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান মসজিদ, মন্দির, গির্জা বা অন্য কোনো ধর্মীয় উপাসনালয়ে কোনো প্রকার নির্বাচনি প্রচারণা চালাতে পারবেন না। এ বিধিও মানছেন না প্রার্থীরা। শুক্রবার জুমার নামাজের শেষে প্রায় প্রত্যেক প্রার্থীই মসজিদের ভেতর প্রচারণা চালান। ভোটারদের সঙ্গে কোলাকুলিসহ তাদের কাছে ভোট চান।

নির্বাচনে আচরণবিধি অমান্য করলে প্রার্থী বা তার সমর্থকের সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড বা পঞ্চাশ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয়দণ্ডের বিধান রয়েছে। সেই সঙ্গে প্রার্থিতা বাতিলসহ নিবন্ধিত দলকে পঞ্চাশ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানার করারও বিধান করে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে জেল-জরিমানা করার ক্ষমতা থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তার প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলেন,সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছি। সার্বক্ষণিক ম্যাজিস্ট্রেট মাঠে কাজ করে যাচ্ছে।

Tepantor

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।