Tepantor

মাদক ব্যবসায়ী ও অনলাইন জুয়ার এজেন্টদের আধিপত্য পশ্চিমাঞ্চলে

৫ মার্চ, ২০২৪ : ১০:৫৯ পূর্বাহ্ণ

তেপান্তর রিপোর্ট: ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার পশ্চিমাঞ্চল তথা আশুগঞ্জের চারতলা, আড়াইসিধা, লালপুর, শরীফপুর ও নবীনগরের বড়াইল ও বাইশ মৌজা ইউনিয়নের গ্রামগুলোতে মাদক ব্যবসা ও অনলাইন জুয়ার কয়েন বিক্রেতার সংখ্যা বেড়েছে। এর মধ্যে অনলাইন জুয়ার ব্যবসা করে কোটিপতি বনে গেছে অনেক তরুণ ও যুবক। অনলাইন জুয়ার বদৌলতে রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হয়েছে তারা। অনেক জুয়ারির রয়েছে পাকা দালান বাড়ি ও দামি গাড়ি। তাদের এসব কর্মকান্ড এলাকায় ওপেন সিক্রেট। গ্রামের বেশিরভাগ মানুষের এসব বিষয় জানা, কিন্তু তবু এসব এলাকার অনলাইন জুয়ার কয়েন বিক্রেতাদের কখনো আইনের মুখোমুখি হতে হয়নি। এসব জুয়ার করেন বিক্রেতারা হল এজেন্ট বা সুপার এজেন্ট। সাধারণ পর্যায়ে যেসব জুয়াড়িরা অনলাইনে জুয়া খেলে তারা মূলত এসব এজেন্টদের কাছ থেকে কয়েন কিনে নিয়ে তা দিয়ে অনলাইনে জুয়া খেলে। এই অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে দেশের টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। খোদ শরীফপুর গ্রামেই অনলাইন জুয়ার ব্যবসা করে বাড়ি গাড়ি করেছে এমন ব্যক্তি আছে।

অনলাইন জুয়া পরিচালনা হচ্ছে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে। ফেসবুক-ইউটিউবে এমনকি জাতীয় টেলিভিশনেও লাইভ খেলা প্রচারের বিরতিতে প্রচার করা হচ্ছে এসব সাইটের তথ্য। মোবাইলে ফেসবুক চালু করলেই স্কিনে ভেসে উঠছে একাধিক অনলাইন জুয়ার পেজ। ফেসবুক আইডি, পেজ, গ্রুপ, ওয়েবসাইট ও মোবাইলভিত্তিক এনক্রিপ্টেড অ্যাপ দিয়ে চলছে এই জুয়ার সাইটগুলো। এতদিন বিদেশি আয়োজনে এসব জুয়ার সাইট চললেও এখন দেশিয় অনেক প্রতিষ্ঠান এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। গ্রামগঞ্জের সাধারণ মানুষও বিশেষ করে তরুণ-তরুণীরা এসব জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়ছে। খোয়াচ্ছে বিপুল পরিমাণ টাকা। অনেকে ধার-দেনায় জর্জরিত হয়ে পড়ছেন। খেটে খওয়া মানুষ দিনের উপার্জনের পুরোটাই দিয়ে দিচ্ছেন এসব অনলাইন জুয়ায়। জেলায় অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে উড়ছে কোটি কোটি টাকা। এই টাকার বড় একটি অংশ পাচার হয়ে যাচ্ছে  বিদেশে। জুয়াড়ি চক্রের সদস্যরা মাঝে মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়লেও বেশির ভাগই থাকছে অধরা
। আর ব্রাহ্মণবাড়িয়া পশ্চিম অঞ্চলের জুয়া ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কখনো কোন অভিযান হয়নি।

এই এলাকার প্রতিটি গ্রাম-পাড়া-মহল্লায় ছেয়ে গেছে এই অনলাইন জুয়া। এতে , মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দেশের বাইরে টাকা পাচার হচ্ছে। সরকার পড়ছে তারল্য সংকটে। আর এসব অনলাইন মোবাইল জুয়ার টাকা লেনদেন হয় বিভিন্ন ধরনের মোবাইল ব্যাংকিং তথা বিকাশ, নগদ, রকেট-এ, এমনকি ব্যাংকের মাধ্যমেও টাকা ক্যাশ করার তথ্য রয়েছে। বিষয়টি দ্রত নজরে না আনলে দেশে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশংকা রয়েছে।

এই অনলাইন জুয়া খেলে অনেকেই সর্বস্ব হারিয়ে, ব্যবসা-বাণিজ্য ধ্বংস হয়ে কেউ পথে পথে ঘুরছে আর কেউ পালিয়ে বেড়াচ্ছে পাওনাদারদের ভয়ে। অনলাইন জুয়া অনেকটা মাদকের নেশার মতো। আর এসব নেশায় আসক্ত হচ্ছে স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে তরুণ-তরুণীরা। এ ছাড়া বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও রয়েছে। অনলাইন জুয়ায় অংশগ্রহণকারীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরে বিভিন্ন ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।

জানা যায়, মোবাইলফোনের বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে জমজমাট অনলাইন জুয়া। একসময় যারা সাধারণ জুয়া খেলতেন এমন ব্যক্তিরাও এই অনলাইন জুয়ার দিকে ঝুঁকছেন। নাইন উইকেটস ডট কম, স্কাইফেয়ার,ওয়ান এক্স বেট,রাবি ফরচুন ক্যাসিনো, 888 ক্যাসিনো, কিং ব্যালি,ম্যাজিকরেড ক্যাসিনো, রয়েল ভেগাস ক্যাসিনো, ইউরোপা ক্যাসিনো, রাজাবাজি, 25 ইন 1 ক্যাসিনো, বিগ ফিশ গেম,জিএসএন গ্র‍্যান্ড ক্যাসিনো, হোজে গেমস স্লটস,লাকি উইন ক্যাসিনো, জিংগা ক্যাসিনো গেমস,ক্যাসিনো ফ্রেঞ্জি,জিত উইন,22 বেট,বেটওয়ে,ক্যাসিনো ডেইস,জ্যাকপট সিটি,এবং বেট365সহ বিভিন্ন ধরনের অ্যাপ জুয়া খেলার জন্য জুয়াড়িদের কাছে বেশি জনপ্রিয়। তবে বর্তমানে জিত উইন ও ওয়ান এক্স ভেট বেশ জনপ্রিয়। এগুলোতে ক্রিকেট, সকার,সাবা সকার,টেনিস,ই-স্পোর্টস,স্নুকার/পুল,ফাইনান্স,লটো,বেসবল,ফুটবল, গলফ,হকি ইত্যাদি খেলায় বাংলাদেশি টাকায় বাজি ধরা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এক্ষেত্রে জুয়াড়ি প্রথমে তার নিজস্ব একটি ইমেইল আইডি দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করে থাকে। এরপর দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে অনলাইনের মাধ্যমে জুয়ায় অংশ নিতে পারে। আর এদের পেছনে কাজ করে জুয়ার এজেন্টরা।

একাধিক জুয়াড়ির দেয়া তথ্য মতে, গোটা দেশজুড়ে রয়েছে অনলাইন জুয়ার নেটওয়ার্ক। দেশের মফস্বল পর্যায়ে এখন জুয়াড়িদের কাছে জনপ্রিয় এই অনলাইন অ্যাপ। যেখানে শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে রয়েছেন নানা বয়সীরা। বিপিএল, আইপিএল, ক্রিকেটসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ম্যাচকে কেন্দ্র করে চলে এই জুয়ার আসর।

সুপার এডমিন সর্বপ্রথম টাকা দিয়ে এই অ্যাপ ক্রয় করে পর্যায়ক্রমে একটি বড় নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। তাদের মধ্যে কেউ সুপার, কেউ মাস্টার এজেন্ট। এ ছাড়া রয়েছে লোকাল এজেন্ট। এক্ষেত্রে নবাগতরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি আইডি লাগবে মর্মে পোস্ট লিখে থাকেন। পরবর্তীতে জুয়ার মূল নিয়ন্ত্রণ যার হাতে থাকে অর্থাৎ এডমিন একজন এজেন্ট নির্ধারণ করে দিলে তার মাধ্যমে আইডি খুলে শুরু হয় জুয়ার আসর। শর্ত থাকে নির্দিষ্ট এজেন্টের বাইরে তিনি খেলতে পারবেন না। তাহলে আইডি রিজেক্ট হয়ে যাবে। এসব জুয়ার ক্ষেত্রে কয়েন বা রেটিং হিসেবে প্রয়োজন হয় পিবিইউ (পার বেটিং ইউনিট)। যার প্রতিটি ইউনিটের মূল্য এক থেকে দুই’শো টাকা। নিবন্ধন শেষে টাকা দিতে হয় লোকাল এজেন্টকে। সেখান থেকে টাকাটা চলে যায় তাদের মাস্টার এজেন্টের কাছে।

পরবর্তী ধাপে সুপার এজেন্টের মাধ্যমে নানা হাত ঘুরে চূড়ান্তভাবে টাকা চলে যায় বিদেশে অবস্থান করা মাস্টারমাইন্ড বা সুপার এডমিনের কাছে। অনলাইন অ্যাপ ব্যবহারকারীদের অধিকাংশের বয়স ৩০-এর মধ্যে। অনেকটা মাল্টি পারপাস বা এমএলএম ব্যবসার মতো চক্রের মূলহোতারাই মূলত নিজেদের মধ্যে এজেন্ট তৈরি করে। এ সকল এজেন্টরা আবার সাব এজেন্ট চক্র তৈরি করে। রয়েছে নিজস্ব শেয়ারহোল্ডার। মোবাইলের অ্যাপে থাকা পয়েন্ট বা রেটিংকে তারা কখনো ডলার, পাউন্ড, বিকাশ, ক্ষেত্র বিশেষে নগদ টাকা থেকে শুরু করে যেকোনো কারেন্সিতে ট্রানজেকশন করে থাকে।

বিশ্বে বিভিন্ন ধরনের মানি ট্রান্সফার ও কনভার্টার অ্যাপ আছে। এগুলো চোরাকারবারি, জুয়াড়ি, মাদক কারবারি ও কালোটাকার মালিকেরা ব্যবহার করেন। এসব অ্যাপে অ্যাকাউন্ট খুলে এক দেশ থেকে আরেক দেশে অর্থ নেওয়া যায়। পারফেক্ট মানি তেমনই একটি অ্যাপ। এটাতে অ্যাকাউন্ট খুলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে টাকা পাঠানো যায়। বাংলাদেশে অসংখ্য ব্যবহারকারী আছে,আছে ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেও।

লেনদেন করা হচ্ছে বাংলাদেশি মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসে-এমএফএস। সবচেয়ে অবাক করা বিষয়, রাশিয়া থেকে পরিচালিত জুয়ার সাইট বেটউইনার ও ওয়ানএক্সবেটসহ একাধিক সাইটে বাংলাদেশিদের লেনদেনের জন্য মোবাইল ব্যাংকিং বিকাশ, নগদ, রকেট ও উপায় যুক্ত। এছাড়া রয়েছে ব্যাংকের মাধ্যমেও পেমেন্ট করার সুযোগ। ব্যাংক এশিয়া, ব্র্যাক ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড ও ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে লেনদেন করা যায় এসব সাইটে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাখাওয়াত হোসেন প্রতিবেদককে বলেন, জুয়া ও মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত আছে। তাছাড়াও সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা তাৎক্ষণিক অভিযান পরিচালনা করছি।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ এর সংবিধানে জুয়া খেলা নিরোধ করা হয়।
সংবিধানের ১৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘গণিকাবৃত্তি ও জুয়াখেলা নিরোধের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে’।

কিন্তু যুগোপযোগী আইন না থাকায় অনলাইন জুয়ায় জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারছেনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

জেলায় পূর্বে কর্মরত এবং বর্তমানে কর্মরত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেক সদস্য এবং রাজনৈতিক কয়েকজন নেতৃবৃন্দের ছত্রছায়ায় ও উদাসীনতায় অনলাইন জুয়ার এজেন্টরা অবাধে জুয়া খেলা চালিয়ে যাচ্ছেন।

জমজমাট মাদক ব্যবসা:

উল্লেখিত এলাকাগুলোতে মাদক ব্যবসার পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। লালপুর ইউনিয়নের লালপুর গ্রাম ও নোয়াগাঁও গ্রামে সবচেয়ে বেশি মাদক ব্যবসা হয়। এই গ্রাম দুটিতে মাদক ব্যবসায়ীর সংখ্যাও বেশি। দিনের পর দিন তারা বুক ফুলিয়ে মাদক ব্যবসা করলেও তাদেরকেও গ্রেফতার করছে না পুলিশ। একই অবস্থা আশুগঞ্জের সীমান্ত ঘেষা এলাকা নবীনগরের বড়াইল ও বাইশ মৌজা এলাকায়ও। তার থেকেও মাদক ব্যবসা বেশি ভয়াবহ আশুগঞ্জের চারতলা গ্রামে। এসব মাদক ব্যবসায়ীরা তরুণদের মধ্যে মাদক বিক্রি করে তরুণ সমাজকে সবচেয়ে বেশি ধ্বংস করছে।

সচেতন মহল মনে করছেন, যদিও মাদক ব্যবসায়ী ও অনলাইন জুয়ার এজেন্টদের এলাকাবাসী চিনে, তবু গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে মাদক ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করে তাদেরকে আইনের আওতায় নেওয়া এখন সময়ের দাবি ।

 

Tepantor

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।