Tepantor

বিরাসার: বারো মাস যেখানে বর্ষাকাল

১৪ মে, ২০২৪ : ১২:৫৭ অপরাহ্ণ

কাজী আশরাফুল ইসলাম: ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরের অন্যতম প্রবেশদ্বার বলে বিবেচিত সদর – লালপুর – তালশহর রোডের বিরাসার অংশের খানাখন্দ ও জলাবদ্ধতা যেন চিরস্থায়ী রুপ ধারণ করেছে।গ্রীষ্মের দাবদাহ কিংবা শীতের রুক্ষ আবহাওয়া, সারা বছরই সড়কের এই একশো মিটার অংশ এক থেকে দেড় হাত পানির নিচে থাকে।এ সড়ক দিয়ে জেলা সদরে যাতায়াত করে সদর উপজেলা ও আশুগঞ্জ উপজেলার অর্ধশতাধিক গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ। জনগুরুত্বপূর্ণ এ সড়কের বেহাল দশায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন বিভিন্ন যানবাহনের হাজার হাজার যাত্রী ও পথচারী। এছাড়াও প্রতিদিনই জলাবদ্ধতায় খানাখন্দে পড়ে ছোট আকারের যানবাহনগুলো দুর্ঘটনার শিকার হয়ে আহতের ঘটনাও ঘটছে।

সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, জেলা শহরের উপকন্ঠে বিরাসার বাস স্ট্যান্ড থেকে সড়ক ও জনপথ বিভাগের এ সড়কটি বটতলী বাজার হয়ে একটি অংশ আশুগঞ্জ উপজেলার লালপুর পর্যন্ত বিস্তৃত এবং আরেকটি অংশ তালশহর হয়ে আশুগঞ্জ গোলচত্বর পর্যন্ত বিস্তৃত। সড়কটির দৈর্ঘ্য দুই অংশ মিলিয়ে প্রায় ৩০ কিলোমিটার। অল্প কিছুদিন আগে বিরাসার বাসস্ট্যান্ড থেকে লালপুর পর্যন্ত সড়কটির সংস্কার করা হয় এবং বিরাসারের খানাখন্দভরা অংশটুকু বাদ দিলে সড়কটিকে মসৃণ ও স্বস্তিদায়ক বলা যায়।কিন্তু বিরাসার গ্রামের খানাখন্দভরা মাত্র একশো মিটার অংশ পুরো সড়কের গলার কাঁটা হয়ে দাড়িয়েছে।মাত্র একশো মিটারের বেহাল দশার কারনে পুরো সড়কটিই এখন জনদুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ পথের যাত্রীরা জলাবদ্ধতা এড়াতে প্রায়ই বিকল্প সড়ক হিসেবে পিরবাড়ি- নাটাই রোড ব্যবহার করছেন।প্রতিদিনই এই সড়ক পথে ট্রাক, পিকআপ ভ্যান ছাড়াও অর্ধ সহস্র সিএনজি ও অটোরিকশায় হাজার হাজার মানুষ দুটি উপজেলা সদর ছাড়াও বিভিন্ন গন্তব্যে চলাচল করছে। জলাবদ্ধ অংশটির পানি নিষ্কাশনের সুষ্ঠু ব্যবস্থা না করা সহ সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ না করার কারণে পুরো বছরজুড়ে জনদুর্ভোগ লেগেই থাকে। ফলে কখনো কখনো খানখন্দ ভরাট করতে পরিত্যক্ত ইট-খোয়া ফেলে সাময়িকভাবে যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা করা হলেও দুর্ভোগ পিছু ছাড়ে না। বৃষ্টিপাত ছাড়াই সবসময় পানি লেগে থাকার পাশাপাশি সামান্য বৃষ্টি হলেই পানি বৃদ্ধি পেয়ে ছোট খাটো খালের আকার ধারণ করে। যার ফলে ছোট যানবাহনগুলো চলাচলে যেমন বিঘ্ন সৃষ্টি করে, তেমনি অনেক সময় বড়ো ট্রাক বিকল হয়ে পড়লে ঘন্টাব্যাপী যানযটের সৃষ্টি হয় এবং এ সময় দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করে।
সাম্প্রতিক সময়ে এ সড়কটির সবচেয়ে বড় দুর্ভোগের কারণ আকস্মিক বৃষ্টিপাত। এ স্থানটিতে বৃষ্টির পানি এবং ড্রেনের পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় দীর্ঘ সময় ধরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়ে আছে। এতে প্রতিনিয়তই সিএনজি অটোরিকশা, ইজিবাইক, মিনিট্রাক, পিকআপ, রিকশা, মোটরসাইকেলসহ ছোট যানবাহনগুলো কখনও যাত্রীসহ উল্টে পড়ছে কখনো বা বিকল হয়ে পড়ছে। ফলে প্রতিদিনই অনেকে এসব দুর্ঘটনাকবলিত হয়ে আহত হচ্ছে। এছাড়া জলাবদ্ধতার ফলে সেখানে দুর্ঘটনাকবলিত হয়ে যানজটও সৃষ্টি হচ্ছে। এ সড়কে চলাচলকারী , সিএনজি অটোচালক শামীম মিয়া তেপান্তরকে জানান, ‘ এ সড়কটির পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় বর্ষায় প্রতিদিনের বৃষ্টিতে জনদুর্ভোগ বাড়িয়ে দিয়েছে হাজার হাজার মানুষের।  গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতে স্থানটি অনেকটা পুকুরের আকার ধারণ করেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও আসছে না এই দুর্ভোগ নিরসনে সাহায্যের হাত বাড়াতে। ফলে এ সড়কে চলাচলকারী যানবাহনের চালক ও যাত্রীরা বলতে গেলে এক প্রকার অসহায়। পাশাপাশি জলাবদ্ধতার কারণে এ সড়ক দিয়ে শত শত পথচারী অবর্ণনীয় কষ্টের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। ‘

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা জজ আদালতের আইনজীবী শওকত আলী বলেন, এই রোড দিয়ে আমি প্রতিদিন কোর্টে আসা যাওয়া করি। বিরাসার মোড়ে ভাঙা এবং জলাবদ্ধতার কারণে দীর্ঘদিন যাবত যাতায়াতে অনেক কষ্ট করতে হচ্ছে। কাপড় নোংরা পর্যন্ত হয়ে যায়। জলাবদ্ধতা নিরসনে এবং রাস্তা সংস্কারের কোন উদ্যোগ কেউ নিচ্ছে না।

লালপুর বিরাসার রোডে সিএনজিতে যাত্রী পরিবহন করা দুলাল মিয়া বলেন, বিরাসারের জলাবদ্ধতা ও ভাঙার ব্যাপারে কি বলব,এই ভোগান্তির কোন শেষ নাই। পানির কারণ অনেক সময় ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়। যাত্রীদের ভোগান্তির শিকার হতে হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিরাসার গ্রামের একজন সচেতন ব্যক্তি বলেন, বিরাসারের এই জায়গায় রাস্তার পাশে পানি নিষ্কাশনের জন্য খাল ছিল। খাল ভরাট করে স্থাপনা তৈরী হয়েছে। যার ফলে সারা বছর জলাবদ্ধতা লেগে থাকে, জলাবদ্ধতার কারণে রাস্তা ভেঙে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে এবং রাস্তা সংস্কারে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়া দরকার।

নদী ও প্রকৃতি সুরক্ষা সামাজিক আন্দোলন তরী বাংলাদেশ এর আহ্বায়ক শামীম আহমেদ বলেন, চারলেন সড়কের কারণে আশেপাশের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিলেও বিরাসার মোড়ে মূলত সরকারি খাল ভরাট করে প্রভাবশালীদের টিনশেড মার্কেট নির্মাণকেই বেশি দায়ী করছি আমরা। কারণ এখানে বিশাল একটি সরকারি খাল রয়েছে যা পশ্চিম দিকে বিরাসার গ্রামের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত বড় খালের সাথে যুক্ত ছিলো। এখন প্রায় পুরোটাই অবৈধভাবে দখল হয়ে গেছে! আর পূর্ব দিকে খৈয়াসার সড়কের পাশ দিয়ে প্রবাহিত খালটি পৌরসভা কর্তৃক ড্রেনে পরিনত হয়ে তিতাস নদীর সাথে যুক্ত হয়েছে।
বিরাসার মোড়ে খালের উপর টিনশেড মার্কেটটি উচ্ছেদ করে খালটি উদ্ধার ও সংষ্কারের দাবি করছে নদী ও প্রকৃতি সুরক্ষা সামাজিক আন্দোলন তরী বাংলাদেশ।

সড়কের জলাবদ্ধ অংশের পানি নিষ্কাশনের জন্য ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে কেন কোন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না জানার জন্য নাটাই উত্তর ইউনিয়নের তিন নং ওয়ার্ড (বিরাসার) – এর ইউপি সদস্য সাদ্দাম হোসেনের নাম্বারে একাধিকবার কল দিয়ে সাড়া পাওয়া যায় নি।

সড়কের জলাবদ্ধতা দূরীকরণে এবং সাধারণ মানুষের দুর্দশা লাঘবে অচিরে কোন সংস্কার প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে কি-না জানার জন্য জেলা সড়ক ও জনপদ বিভাগের প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলী মীর নিজাম উদ্দীন আহমেদের নাম্বারে কল দিলে একটি মিটিং এ ব্যস্ত আছেন বলে ফোন রেখে দেন।

Tepantor

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।