Tepantor

আশুগঞ্জে ড্রায়ার মিলে বিপর্যস্ত জনজীবন,দেখার দায়িত্ব কার?

২৫ জুন, ২০২৪ : ৩:৩৩ অপরাহ্ণ

কাজী আশরাফুল ইসলাম: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বন্দরনগরী আশুগঞ্জে যত্রতত্র স্থাপিত ড্রায়ার মিলের কালো ধোঁয়া, ছাই ও রাইস ব্রানে (চালের উপরের স্বচ্ছ পাতলা আবরণ) মারাত্মকভাবে নষ্ট হচ্ছে এলাকার পরিবেশ।

সরকারি নীতিমালা অনুসারে অটো রাইস মিল করতে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, ট্রেড লাইসেন্স, শিল্প সনদ, ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স, ফুড লাইসেন্স এবং চকিদারি খাজনা রশিদ প্রদান করে অটোরাইস মিল স্থাপন করার কথা এবং আবাসিক এলাকা, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জনগুরুত্বপূর্ণ এলাকা ব্যতিরেকে অটো রাইস মিল স্থাপন করার নির্দেশনা রয়েছে।

কিন্তু শিল্পাঞ্চল ও জনবহুল আশুগঞ্জ উপজেলায় বেশিরভাগ রাইস মিল গড়ে উঠেছে আবাসিক এলাকা ও জনবহুল স্থানগুলোতে। শুধু তাই নয় আশুগঞ্জ ফিরোজ মিয়া সরকারি কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশেপাশেও কিছু কিছু প্রভাবশালী ব্যাবসায়ীরা গড়ে তুলেছেন অটো রাইস মিল। এতে ধোঁয়া, ছাই ও শব্দদূষণে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে জনজীবন। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

আশুগঞ্জের এসব রাইস মিলের কারো কারো পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র থাকলেও নেই খাদ্য অধিদপ্তরের নিবন্ধন।
এই সমস্যাটি নিয়ে বছরের পর বছর এলাকাবাসী অভিযোগ করলেও সরকারের পক্ষ থেকে এটি সমাধানে কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তবে সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে অনেকবার।

একটি অটো রাইস মিল কারখানায় প্রিলি ক্লিনার, প্যাডি ক্লিনার, বয়লার, ড্রায়ার পেডি হাস্কার, পেডি সেপারেটর, রোটারি শিফটার, লেন্থ গ্রেডার, কালার সার্টার, ডিস্টোনার, থিকনেস গ্রেডার, হোয়াইটনার, সিল্কি পলিশার যন্ত্রপাতি গুলো যথাযথভাবে থাকতে হয়। কিন্তু অধিকাংশ অটো রাইস মিলে এ সকল যন্ত্রপাতি নাই, কারো কারো থাকলেও খরচ বেড়ে যাওয়ার ভয়ে সেগুলোর সঠিক ব্যবহার করছে না তারা। যার ফলে এসকল রাইস মিলের উৎপাদিত চাউলের মান যেমন ঠিক থাকছে না, অন্যদিকে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে খুব সহজেই।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, সিলেট ও হবিগঞ্জ জেলার হাওরাঞ্চলের উৎপাদিত ধান বেচাকেনা হয় আশুগঞ্জের মেঘনা নদীর তীরে বিওসি ঘাটে অবস্থিত ধানের হাটে। এই হাট থেকে ধান সংগ্রহ করে প্রক্রিয়াজাত করে চালে রুপান্তর করতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গড়ে উঠে চাতালকল। এখানে উৎপাদিত প্রায় লক্ষাধিক মন চাল প্রতিদিন ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। এতে এলাকায় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ঘটতে থাকায় গত ৪-৫ বছরে আশুগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে ছোট বড়ো ৪৫ টি ড্রায়ার মিল।
এদের মধ্যে শুধু সোনারামপুর এলাকায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে গড়ে উঠেছে খান অটো-১ ও ২, আওলাদ এগ্রোফুড, শাহজালাল অটো, একতা অটো, কামরুল অটো, উন্দা মিয়া অটোসহ আরও অনেক কারখানা।
আশুগঞ্জ সদর ইউনিয়নের যাত্রাপুর গ্রামের বাসিন্দা জয় আহমেদ তেপান্তরকে জানান,’ আশুগঞ্জের অন্যতম প্রবেশদ্বার বলে বিবেচিত আলমনগর এলাকায় মেসার্স হাইটেক এগ্রো ফুড ইন্ড্রাস্টিজ,ভাই ভাই অটো রাইস মিল, ফারহান অটো রাইস মিল, সরকার অটো রাইস মিলসহ অধিকাংশ ড্রায়ার মিল আশুগঞ্জের ব্যস্ততম চলাচলের রাস্তা ঘেঁষে স্থাপিত। এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন আশুগঞ্জ সদরে প্রবেশ করে আড়াইসিধা,তালশহর পূর্ব ও তালশহর পশ্চিমসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের প্রায় অর্ধ লক্ষ মানুষ। তাদের ধানের ট্রাক যখন আসে ঘন্টার পর ঘন্টা ওই রাস্তায় জ্যাম পড়ে থাকে। এতে জরুরি মুহূর্তে একটি রিক্সা নিয়েও পারাপার হওয়ার জায়গা থাকে না। যখন তাদের ধোঁয়া ছাড়া শুরু করে আশেপাশে পাঁচ মিনিট দাঁড়ানো সম্ভব হয় না। তাছাড়া রাইস মিলগুলোর কাছেই রয়েছে ফিরোজ মিয়া সরকারি কলেজ। কলেজগামী শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ভোগান্তি ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি, দুটোই চরম আকার ধারণ করেছে।’

মেসার্স সরকার অটো রাইস মিলের সামনের সড়কে কথা হয় ফিরোজ মিয়া সরকারি কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ফারজানা নাজনীনের সাথে। তিনি বলেন,’কলেজে আসা যাওয়ার পথে সরকার অটো রাইস মিলের সামনে এলেই কলেজ ড্রেস কারখানার ধূলায় নোংরা হয়ে যায়। এই পথের পথচারীদের নিত্যদিনের সঙ্গী তাদের মিলের ধূলোর ভোগান্তি।’

এ বিষয়ে জানতে সরকার অটো রাইস মিলের ম্যানেজার রুবেল মিয়ার মুঠো ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

আড়াইসিধা ইউনিয়নের বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, আশুগঞ্জ একটি জনবহুল শিল্পাঞ্চল এলাকা, এই আবাসিক এলাকায় অটো রাইস মিল থাকাটা অবশ্যই পরিবেশবিরোধী ও সাধারন মানুষের স্বাস্থ্য বিরোধী। যেহেতু কর্তৃপক্ষ আবাসিক এলাকার এই রাইস মিল গুলোর তদারকি ঠিকমতো করতে পারছে না, তাই এটা অতি দ্রুত বন্ধ হওয়া উচিত। এটা যদি নিউজ হয় আমরা কোর্টে রিট করব। অনেক মিল মালিকদের পরিবেশ অধিদপ্তরে ছাড়পত্রের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও তারা রাইস মিলগুলো পরিচালনা করছে।পরিবেশ অধিদপ্তরের এ বিষয়ে আরো তদারকি করা উচিত বলে আমি মনে করি।

ড্রায়ার মিলগুলোর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ ও  এসব পরিবেশগত ঝুঁকিসমূহ থেকে উত্তরণের উপায় কী জানতে চাইলে জেলা চাতালকল মালিক সমিতির সদ্য সাবেক সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ভূইয়া স্বপন বলেন,” ড্রায়ার মিলের আশেপাশে একটু আধটু ধূলো, ছাই থাকবেই।বাচতে হলে চালেরও তো প্রয়োজন। আর এই এলাকায় ড্রায়ার মিলগুলো আগে স্থাপন হয়েছে, মানুষ পরে বাড়িঘর করেছে। আর আমি নিজে ভারত, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ঘুরে এসেছি। তাদের দেশেও একই পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে।তবে,আশুগঞ্জের মিল মালিকরা দিন দিন সচেতন হচ্ছে। অবস্থার শতভাগ উন্নতি না হোক,আশা করি নব্বই ভাগ উন্নতি হবে।”

আশুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শ্যামল চন্দ্র বসাক বলেন,” গত মে মাসের ১১ তারিখ আমার অফিসে মাননীয় সংসদ সদস্যের উপস্থিতিতে চাতালকল মালিকদের সাথে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে এবং তাদেরকে তিন মাসের সময়সীমা বেধে দেয়া হয়েছে। বেধে দেয়া সময়ের মধ্যে কারখানার পরিবেশ উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নিলে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ”

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক খালেদ হাসান বলেন,’ কিছুদিন আগে আশুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অফিসকক্ষে ড্রায়ার মিল সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা হয়েছে এবং উপজেলা প্রশাসন মিলগুলিকে নব্বই দিনের সময় বেধে দিয়েছে। এসময়ের মধ্যে যদি মিলগুলি দূষণ কমাতে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করে তাহলে তাদের নবায়ন আটকে দেয়া হবে। আর কারও বিরুদ্ধে অন্য সুনির্দিষ্ট কোন অভিযোগ থাকলে তদন্ত করে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে।’

ভুক্তভোগীরা বলছেন, অতীতে কয়েক বছর ধরে এটা নিয়ে বহু জায়গায় অভিযোগ দেওয়া হয়েছে, মানববন্ধন হয়েছে ও প্রতিবাদ সভা হয়েছে। যখনই এসব হয় তখনই প্রশাসনের পক্ষ থেকে সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়। কিন্তু কিছুদিন যাওয়ার পর এসবের ব্যাপারে আর কোন খোঁজ খবর থাকে না। আমরা মনে করি এসব ড্রায়ার মিল মালিকদের কে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা ছাড় দিয়ে যাচ্ছেন। যার ফলে বছরের পর বছর ধরে এসব চললেও এর কোন সমাধান হচ্ছে না।

Tepantor

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।