সু-নাগরিক হওয়ার গুণ শিশুকালে না হলে পরে তা হয়না

২৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ : ১০:০২ অপরাহ্ণ ৭৬৩

মোহাম্মদ কবির হোসেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরের সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার তিনি। সম্প্রতি তেপান্তরের সাথে কথা বলেছেন শিশুর শিক্ষা-দিক্ষা ও দেশপ্রেম নিয়ে। লিখেছেন মো.আবু রায়হান চৌধুরী

কবির হোসেন বলেছেন, একটি পতাকা মানে একখন্ড মানচিত্র, একটি চেতনার নাম, জাতীয়তার প্রতীক। একটি পতাকা একটি দেশের পরিচয় বহন করে এবং জাগ্রত করে দেশপ্রেম। লাল সবুজ পতাকা আমাদের তারুণ্যের অহংকার,জাতীয় ঐক্যের সেতুবন্ধন। একটি দেশের অগ্রযাত্রা নির্ভর করে জাতীয় ঐক্যের উপর। ১৯৭১ সালে জাতীয় ঐক্যেরভীতের উপর দাঁড়িয়ে মাত্র নয় মাসে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে এবং পৃথিবীতে ইতিহাসে রচিত হয় বাংলাদেশের গৌরব গাঁথা। মহান মুক্তিযোদ্ধ আমাদের বাঙালি জাতীর ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ ঘটনা। আমাদের দেশপ্রেম থেকে উৎসারিত একটি আবেগ পূর্ণ বীরত্বগাথা, যা আমাদের মনে দেশপ্রেম জাগিয়ে তুলবে চিরকাল। আর শিশুরা আমাদের ভবিষ্যৎ, আমাদের গর্বিত উত্তরসূরি, আমাদের জাতি ও জাতীয় চেতনার প্রতিনিধি। তাই শিশুদেও সুকৌশলে শৈশব থেকেই দিতে হবে দেশপ্রেমের পাঠ।
এই বিজয়ের মাসে ওদের হাতে তুলে দিতে হবে লাল সবুজের পতাকা। ওদের শোনাতে হবে বিজয়ের কথা। আমাদের গৌরবগাথা ইতিহাস ওরা যার ধারক বাহক ও উত্তরাধিকারী। বাঙ্গালীদের মধ্যে তখন কোন বিভেদ ছিল না, একই লক্ষ্যে সবাই ছিল অনড়। যার ফলস্রুতিতে আমরা পেলাম স্বাধীনদেশ। আমাদের ছিলনা কোন বিশাল সৈন্য বাহিনী, গোলাবারুদ ও যুদ্ধাস্ত্র। কিন্তু তার পরও পাকিস্তানি বাহিনী,রাজাকার,আলবদর সবাই মিলেও দমাতে পারেনি বাঙ্গালীর অদম্য স্পৃহাকে। ভাঙ্গতে পারেনি বাঙ্গালীর ঐক্য। কালের পরিক্রমায় আজ আমাদের মধ্যে সেই ঐক্য খুঁজে পাওয়া দুস্কর। আজ আমরা বহুধারায় বিভক্ত কেউ ডান,কেউ বাম,কেউ স্বাধীনতার পক্ষে আবার কেউ বা বিপক্ষে। নিজের স্বার্থে দেশের স্বার্থকে বিসর্জন দিতে কার্পণ্য করছে না। আমরা আজ বিশ্বে উন্নয়নশীল দেশে পদার্পণ করেছি তবুও কি কাঙ্খিত দেশ গঠন করতে পেরেছি? কোথায় আমাদের ব্যর্থতা? কেন আজ আমরা এত বিভক্ত? মূলত আমরা আমাদের অতীতের ইতিহাস ভুলে গেছি,হারিয়েছি সেই সুদৃঢ় বন্ধন।
নিষ্পাপ ও সুকোমল মনের অধিকারী শিশুর মনে দেশপ্রেমের উন্মেষ ঘটাতে প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসাবে তাদের সামনে জাতীয় ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস, মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনী, জাতীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সাথে ধারাবাহিকভাবে পরিচিত করানো দরকার। খুদে শিশুদের কাছে উপস্থাপিত তথ্য যাতে সহজবোধ্য হয় এবং শিশু সেগুলো যাতে মুখস্ত না করে আনন্দের সঙ্গে হৃদয়ঙ্গম করতে পারেÑ সেদিকে লক্ষ রেখে মজার কাজ, আকর্ষণীয় কৌশল, আনন্দদায়ক শেখার পদ্ধতি দিয়ে পরিকল্পনা সাজাতে হবে। তথাকথিত অ আ ক খ পাঠ নয়; বরং আনন্দ-গানে, খেলতে খেলতে, দেখতে দেখতে, গল্প-ছড়া শুনতে শুনতে দেশ ও জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্যের কথা তাদের শেখাতে হবে। গল্পে গল্পে শিশুদের জানাতে হবে যে ডিসেম্বর আমাদের গৌরবোজ্জ্বল বিজয়ের মাস। তাদের বলতে হবে এ বিজয় অর্জনের কাহিনী, কীভাবে বিজয় রচিত হয়েছিল ৯ মাস যুদ্ধের পর, বিজয়টি পেয়েছি আমরা কত রক্তের বিনিময়ে। তাদের বোঝাতে হবে আমরা শুধু বহিঃশত্রুর সাথে লড়াই করিনি; হানাদার পাকবাহিনীদের দোসর দালাল-রাজাকার, আলবদর, আলশামস, শান্তি কমিটি নামে নানা স্বাধীনতা বিরোধী তথা ঘরের শত্রু বিভীষণদেরও মোকাবিলা করতে হয়েছিল তখন।
দেশপ্রেমের অনুশীলনের হাতেখড়ি হোক পরিবারেই:
বিজয়ের মাসে আমরা শিশুকে বিজয়ের লাল-সবুজের পতাকার মাধ্যমে বিজয়ের ধারণা দিতে পারি। লাল-সবুজের পতাকার গাঢ় উজ্জ্বল রঙে রঙিন হয়ে যাক শিশুর মন; দেশের সবুজ প্রকৃতি আর সূর্যের রঙে রাঙা রক্তে ত্যাগে ও দেশপ্রেমের আবেগে সমুজ্জ্বল হোক শিশুর কোমল হৃদয়। তাই লাল-সবুজের পতাকা হাতে তুলে দিন আপনার সন্তান আমাদের নতুন প্রজন্মের হাতে। ওদের দেশকে ভালোবাসার সূচনা হোক আপনার হাতে, পরিবার থেকেই।
দেশপ্রেমের পাঠ দেয়া হোক বিদ্যালয়ে।
পরিবারের পর দেশপ্রেমের অনুশীলন শুরু হোক বিদ্যালয়ে। জাতীয় শিক্ষাক্রমে বলা হয়েছে একেবারে প্রথম শ্রেণি থেকে শিশুকে ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানা ও এর চেতনায় দেশপ্রেম ও জাতীয়বোধে উদ্দীপ্ত হওয়া’ এবং ‘বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে জানা ও এগুলোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও ভালোবাসা’ জাগিয়ে তোলার জন্য শিখন কার্যক্রম চালানোর জন্য বিদ্যালয় ভূমিকা রাখবে। এজন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ নামে বই তালিকাভুক্ত করা হয়। কিন্তু এটা করতে হবে সম্মিলিতভাবে এবং সুকৌশলে। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে কোন বই নেই; আছে নির্দেশনা। দুঃখের বিষয় এই বার্তা শিশুকে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা ও কৌশলগত দিকটি বাবা-মার কাছে পৌঁছায় না। এমনকি শিক্ষকদেরও দেওয়া হয় না প্রশিক্ষণ, কীভাবে শেখাতে হবে। তবে মুষ্টিমেয় কিছু শিক্ষক চেষ্টা করেন, তাদের জন্য ধন্যবাদ।
শৈশব থেকে ধাপে ধাপে শিশুর দেশপ্রেম, ইতিহাস- ঐতিহ্যের জ্ঞান দিতে হলে সেটি জানতে হবে সবার আগে মা-বাবা ও শিক্ষকদের। শিশুর মনস্তত্ব অনুযায়ী কীভাবে জানাতে হবে, তাও বুঝিয়ে দিতে হবে। শিশুর সুনাগরিক হয়ে ওঠার গুনাবলি অর্জন করতে তাকে হাতে-কলমে অনুশীলনের, ঐতিহাসিক স্থান পর্যাবেক্ষণের, অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিতে হবে। শিশুকে বাস্তবনির্ভর, নিকট পরিবেশ থেকে উপাদান সংগ্রহের মাধ্যমে ধাপে ধাপে তাদের দেশপ্রেম, ইতিহাস-ঐতিহ্য কথা জানাতে হবে। এই শৈশবে প্রোথিত দেশপ্রেম তারা পৌঁছে দিবে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে। কিছু পরিকল্পিত কাজ ও সম্ভাব্য উপকরণের তালিকা নিচে দেয়া হল:
পর্যাবেক্ষণ: মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী স্থান, স্থাপনাসমূহ, জাদুঘর, শহীদ মিনার, স্মৃতিসৌধ ইত্যাদি পর্যাবেক্ষণে শিশুদের নিয়ে যাওয়া ও সেখানকার ঘটনা/ইতিহাস শিশুদের বলতে পারেন।
গল্প বলা:
শিশুদের সহজবোধ্য করে, শিশুর উপযোগী করে মুক্তিযুদ্ধের কথা, মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনকাহিনী ও এর চেতনায় দেশপ্রেমের কথা ও জাতীয়তাবোধে উদ্দীপ্ত হওয়ার মতো ঘটনা গল্পাকারে বলুন আপনার শিশুকে।
গানে সক্রিয় অংশগ্রহণ: জাতীয় সংগীত, দেশের গান, স্বাধীনতার গান, জাগরণের গান শিশুদের শুনিয়ে এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে দেশপ্রেম ও মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক বোধ ও জাতীয় চেতনা জাগাতে পারেন।
চিত্র প্রদর্শন/ চিত্রাঙ্কন:
শিশুদের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চিত্র অঙ্কন করতে উৎসাহিত করতে পারেন এবং অন্যের আঁকা চিত্র প্রদর্শন, পরিচিত হওয়া, অন্যের প্রশংসা করা ও স্বীকৃতি দেওয়ার মতো ভদ্র আচরণ শেখাতে পারেন।
টিভি দেখা:
দেশপ্রেম কিংবা মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অনুষ্ঠান দেখিয়ে শিশুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। রেডিও, টিভি, পত্রিকায় উপস্থাপিত তথ্য ও নির্দেশনা মা-বাবা ও বড়দের সঙ্গে আলোচনা বা শ্রেণিতে বর্ণনা ও মহড়ার মাধ্যমে শিশুকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন।
এছাড়া জাতীয় দিবসের উপর নির্মিত চলচ্চিত্র (বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, মাতৃভাষা দিবস) দেখিয়ে কথা বলা ও আলোচনার মাধ্যমে শিশুকে দেশপ্রেম শেখাতে পারেন। বুদ্ধিজীবীদের পোস্টার, বীরশ্রেষ্ঠদের পোস্টার, শহীদ মিনার, স্মৃতিসৌধের বড় সাইজের ছবি, ফিপচার্ট, জাতীয় পতাকা, জাতীয় বিষয় সমূহ,স্বদেশ ও বিশ্বের মানচিত্র দেখিয়ে শিশুর সাথে আলোচনা করুন। খাতা, কলম, রং পেনসিল, কাঁচি, লাল-সবুজ কাগজ, কাঠি দিয়ে শহীদ মিনার, স্মৃতিসৌধ ইত্যাদি আঁকা শেখাতে পারেন। দেশাত্মবোধক ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্পের বই পড়তে দেওয়া ও গল্পের ভিডিও এবং গানের বই/সিডি ইত্যাদি শিশুকে উপহার দিতে পারেন।
শিশুর দেশপ্রেমের সূচনা হোক আপনার হাতে তথা পরিবার থেকেই; তারপর বিদ্যালয়ে। ধাপে ধাপে সে হয়ে উঠুক দেশপ্রেমিক সুযোগ্য নাগরিক। জাতীয়তাবোধের ভিত্তিবোধ মজবুত হলে ধাপে ধাপে তার মধ্যে আর্ন্তজাতিক বোধ ও তৈরি হোক, মানবতার কল্যাণে। তাতেই আমাদের মা-বাবা হিসাবে, শিক্ষক হিসাবে সাফল্য।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ সেই বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পেরেছেন । তাই তিনি জাতির উন্নত ভবিষ্যৎ বিনির্মানে জাতীয় ঐক্যের উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে তিনি সফলও হয়েছেন। তার উদাহরণ- পদ্মাসেতু নির্মাণ,সন্ত্রাস দমন ও জঙ্গিবাদ নির্মূল। জাতীয় ঐক্য গঠনের জন্য সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। আমরা আজ এত ভাগে বিভক্ত হয়েছি যে জাতীয় ঐক্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা। আমরা যদি আমাদের শিশুদের মাঝে জাতীয় ঐক্যের বীজবপন করতে পারি তাহলে আমরা অচিরেই একটি সুখী সম্বৃদ্ধ বাংলাদেশ তাদের কাছ থেকে উপহার পেতে পারি। আজকের শিশুই আগামীর দেশকে নেতৃত্ব দিবে। আমরা যেটি পারিনি আশা করি তারা আমাদের তা করে দেখাবে। আর তাদের সেভাবে গড়ে তোলার দায়িত্ব আমাদেরকেই নিতে হবে। কেননা-
আজকের শিশু ভালবাসবে আগামীর বাংলাদেশকে এই প্রত্যয় নিয়ে আমরা বাঞ্ছারামপুর উপজেলায় একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণ করি। আমরা বিদ্যালয়কে শিশুবান্ধব পরিবেশে ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি এবং সিদ্ধান্ত নিই আমাদের বিদ্যালয়কে তারুণ্যে ও দেশপ্রেমের প্রতীক লাল সবুজে রঙ্গিত করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করার এবং সবাইকে এক পতাকা তলে সামিল করার। পাশাপাশি প্রতিটি বিদ্যালয়ে ফুলের বাগান এবং সৃজনশীল কাজ দ্বারা সজ্জিত শ্রেণি কক্ষ ও প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণিকে করা হয় আকর্ষনীয়। এতে শিক্ষার্থীদের মাঝে এক ধরনের উৎফুল্লতা তৈরি হল এবং যে শিশুটি বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়নি সেও বিদ্যালয়ে আসা শুরু করল। লক্ষ্য করা যায় পরবর্তী বছর গুলোতে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার হ্রাস পায়।
অভিভাবক,শিক্ষক, শিক্ষার্থী সকলের মাঝে লাল সবুজের চেতনা ঐক্যের সেতুবন্ধন তৈরি করল। সুন্দর বিদ্যালয় পরিবেশ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন শিক্ষক ও অংশিজনের আন্তরিকতা। ০১-০১-২০১৯ থেকে ২০২০ সালে মুজিব বর্ষে উপহার হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর উপজেলায় লাল সবুজের চেতনার বীজবপন কর্মসূচি আরম্ব করা হয়েছে।
ইতোমধ্যে অনেক বিদ্যালয়কে সাজানো হয়েছে। আজ বাঞ্ছারামপুরের অনেক বিদ্যালয়ই এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে বিভোর। প্রতিটি বিদ্যালয় পরিণত হচ্ছে একখন্ড বাংলাদেশে। শিশুদের মননে বুনছে ঐক্যের বীজ।
স্বদেশপ্রেম মানুষকে স্বার্থপরতা,সম্প্রদায় ও গোষ্ঠীগত সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে তুলে সুখী সমৃদ্ধ দেশ গঠনে সক্ষম করে তোলে। এজন্য দেশ গঠনে স্বদেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে ঐক্যবদ্ধ জাতীয় নবজাগরণ সৃষ্টি করতে হবে। আর সে জাগরণ সৃষ্টি করতে হবে পরিবার এবং বিদ্যালয় থেকে। একটি পরিবারে বিভিন্ন মতাদর্শের লোক থাকতে পারে। তার প্রভাব শিশুর মাঝেও দেখা দিতে পারে। তাই বিদ্যালয়কেই অগ্রনী ভূমিকা পালন করতে হবে। কারন একটি বিদ্যালয় স্বপ্ন বুনে ভবিষ্যতের কান্ডারী বিনির্মানে। জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করে ব্যক্তি,দেশ ও জাতিকে। ব্যক্তির জীবন গঠনে অন্যতম কার্যকর ভূমিকা রাখে একটি বিদ্যালয়,পথ দেখায় সৌহার্দ্য,সম্প্রীতি ও দেশপ্রেমের। বিদ্যালয় পরিবেশ,পাঠ্য বিষয় ও শিখন শেখানো কার্যক্রমের উপর নির্ভর করে প্রজম্মের ভবিষ্যৎ বেড়ে ওঠা। শিশুর জন্য সুন্দর করে সাজাতে হবে বিদ্যালয় পরিবেশ। কারণ পরিবেশ মানুষের চরিত্র ও জীবন গঠনের উপর বিশাল প্রভাব বিস্তার করে। একটি বিদ্যালয়ের পরিবেশ অনেকগুলো উপাদানের উপর নির্ভর করে যেমন শিক্ষক-শিক্ষিকার আচার-আচরণ,মানবিক মূল্যবোধ,দেশাত্ববোধ, শিখন-শেখানো কার্যক্রম ইত্যাদি। এক এক অঞ্চলের মানুষের আচার-আচরণ, কৃষ্টি-কালচার একেক রকম। আমরা যদি সারা দেশের সকল বিদ্যালয়ের পরিবেশ এক করতে পারি, অভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারি তাহলে আমরা অবশ্যই একটি বিভেদহীন জাতি উপহার দিতে পারব।

বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন “আমাদেরকে সোনার দেশের,
সোনার মানুষ হতে হবে।”।
সোনার মানুষ আমরা হতে পারিনি,তবে সোনার মানুষ আমরা গড়ে তুলতে পারি। তার জন্য দরকার সম্মিলিত প্রয়াস। আজকে সোনার মানুষ গড়ার জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলোতে সম্মিলিত প্রয়াস দেখা যাচ্ছে। আজ বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ভাসিত। সবাই আজ স্বদেশপ্রেমের ফেরিওয়ালা।
কবি হেলাল হাফিজ লিখেছেন “কথা ছিলো একটি পতাকা পেলে আমি আর লিখবো না
বেদনার অঙ্কুরিত কষ্টের কবিতা।”
কবির কষ্ট দূর হয়েছে,পেয়েছেন একটি পতাকা। কিন্তু আমরা আজ সেই পতাকাতলে নেই। যা বার বার আমাদের ঠেলে দিচ্ছে অনগ্রসরতার দিকে। তা থেকে ফিরে এখনই বীজ বুনতে হবে স্বদেশপ্রেমের। আর সে কাজটি সূচিত করেছে আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়সমূহ। এ সুমহান কাজের অগ্রনায়ক বাঞ্ছারামপুর উপজেলার শিক্ষকগণ। তারাই লাল সবুজের ফেরিওয়ালা। ছাত্রজীবনে যে দেশপ্রেম মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয় তা মনে আজন্ম লালিত হয়। বিশ^ সভায় মাথা তুলে দাঁড়ানোর জন্য আজ দরকার দেশগঠনের কাজে সকলকে উদ্বুদ্ধ ও সমবেত করার। এজন্য প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা। লাল সবুজের প্রাথমিক বিদ্যালয়ই হতে পারে সেই কাঙ্খিত প্রয়াস। শিশুদের মধ্যে ভালো মানসিকতা, মূল্যবোধ ও দেশাত্ববোধের বিকাশ ঘটানো সম্ভব যথাযথ শিক্ষার মাধ্যমে। একটি শিশু বিদ্যালয়ে প্রায় আট ঘন্টা অবস্থান করে। তাই তার বিকাশে বিদ্যালয় পরিবেশ যথেষ্ঠ প্রভাব ফেলে। যে পরিবেশে দেশপ্রেমের ছোঁয়া থাকেনা সেখানে দেশপ্রেমিক জন্মাতে পারে না। বিদ্যালয়ের প্রতিটি পদক্ষেপ হতে হবে শিশু কেন্দ্রিক এবং সুনাগরিক হয়ে ওঠার লক্ষ্যে। প্রাথমিক বিদ্যালয় হল বীজবপনের ক্ষেত্র। একটি শিশু কাদামাটির মত। মাটি কাদা থাকা অবস্থায় যেমন তাকে বিভিন্ন রূপ দেয়া যায় কিন্তু পরবর্তীতে তা আর সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। তেমনি সুনাগরিক হওয়ার গুণাবলী যদি শিশুকালে বিকশিত না হয় তাহলে পরে আর তা সহজে হয় না। তাই প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ই হোক দেশপ্রেমিক তৈরির সূতিকাগার। কারণ উন্নত দেশ পেতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন দেশপ্রেমের চেতনায় উদ্বুদ্ধ একটি জাতি। বর্তমান প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধেরচেতনায় ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে পারলে অচিরেই আমরা পাব এক উন্নত ও সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ। আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও দেশপ্রেমের বীজবপন শুরু হোক বাংলাদেশের প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরিশেষে কবির ভাষায় বলতে চাই-
“সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে,
সার্থক জনম মাগো তোমাই ভালোবেশে।”

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

  • 36
    Shares