চেয়ারম্যান রাজ্জির কোটি টাকা বাণিজ্যের অভিযোগ,প্রতিবাদ করায় মার খেলেন অধ্যক্ষ

৮ জানুয়ারি, ২০২০ : ২:১১ অপরাহ্ণ ৪৭৩৪

আহত অধ্যক্ষ একেএম রমজান আলী

তেপান্তর রিপোর্ট: কলেজের আয় ব্যয়ের হিসেব চাওয়ায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শাহবাজপুরের তিতাস মডেল কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ একেএম রমজান আলীকে পেটালো কলেজটির সভাপতি ও ১০ নং শাহবাজপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রাজিব অাহমেদ রাজ্জি ও তার সহযোগী কাঠ রোমান নামের এক সন্ত্রাসী। এমন অভিযোগ করেছেন অধ্যক্ষ রমজান নিজেই।

গতকাল ৭ জানুয়ারি কলেজ ছুটির পর একটি কক্ষে রমজানকে ডেকে নিয়ে যান ফাইজুল ইসলাম রোমান ও রোমান মিয়া। ওই কক্ষে অাগে থেকেই উপস্থিত ছিল কলেজ সভাপতি ও শাহবাজপুরর ইউপি চেয়ারম্যান রাজ্জি। রমজান অালী প্রবেশ করতেই রুমটির দরজা বন্ধ করে তাকে চেয়ারের সঙ্গে বেঁধে ফেলেন তিনজন মিলে। তারপর লাঠি দিয়ে বেধড়ক পেটাতে থাকে অার রাজ্জি বলতে থাকে “তুই কলেজ ছাড়বি কবে? তোর জন্য দুইডা টাকাও হজম করতে পারছি না। ” অন্যদিকে তার দুই সহযোগী কাঠ রোমান ও সবজি বিক্রেতা রুমান গামছা দিয় রমজানের গলায় চাপতে থাকে।

পরে অবস্থা বেগতিক দেখেলে তার হতের বাধন খুলে দেন তারা। কলেজ থেকে কোনোরকম পালিয়ে একটি সিনজিতে দুই জনের সহযোগিতায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি বেসরকারি হাসপাতাল চিকিৎসা নেন রমজান। এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত থানায় অভিযোগ দায়েরের প্রস্ততি চলছিল চেয়ারম্যান রাজ্জির বিরুদ্ধে।

চেয়ারম্যান রাজিব আহমেদ রাজ্জি

অভিযোগ ও অনুসন্ধানে জানা গেছে, কলেজের নামে বিভিন্ন ব্যাক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে টাকা তুললেও সেসব নিজের নামে লিখিয়েছেন কলেজের সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান রাজিব আহেমদ রাজ্জি। গত ২০১৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তিতাস মডেল কলেজের নামে আল-আরাফা ইসলামী ব্যাংকের পল্টন শাখায় খোলা ব্যাংক হিসাবে কলেজের নামে এফডিআর এর এক লাখ টাকা ছাড়া গত দুই বছরে মাত্র ৬২ হাজার টাকা লেনদেন করেন। এর অতিরিক্ত আর কোনো ধরণের লেনদেন করেননি কলেজ কর্তৃপক্ষ । এই প্রতিবেদককে কলেজের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার না করার বিষয়টি নিশ্চিত করেন ব্যাংকের এক কর্মকর্তা।

কলেজের শিক্ষকদের একজন নিজের নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গত বিশ মাসে তিতাস মডেল কলেজের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার না করে কলেজের প্রতিষ্ঠাতাদের তিনজন রাজিব আহমেদ রাজ্জি, ফাইজুল ইসলাম (রোমান) ও মো. রোমান মিয়া যোগশাজোশে নিজেদের কাছে টাকা রাখছেন। কলেজ নিয়োগ প্রাপ্ত অন্যান্য শিক্ষকদের বেতন দিলেও যার হাত ধরে তিতাস মডেল কলেজ প্রতিষ্ঠাতা হয়েছে সেই অধ্যক্ষ রামজান আলীকেই গত চার মাস ধরে বেতন দিচ্ছে না বলে তিনি জানান।

কলেজের ওই শিক্ষক জানান, সম্প্রতি কলেজের প্রধান উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ এ.কে.এম রমজান আলীর সঙ্গে কলেজের হিসাব চাওয়া নিয়ে বাদানুবাদ শুরু হলে শাহবাজপুরের ইউপি চেয়ারম্যান রাজিব আহমেদ রাজ্জি তাকে বাবা মা নিয়ে গালি গালাজ করেন।

সরেজমিনে অনুসন্ধান করে জানা যায়, রাজিব আহমেদ রাজ্জি যে জায়গায় তিতাস মডেল কলেজ করেন সেই জায়গার প্রকৃত মালিক শাহবাজপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও পাকিস্তান গণপরিষদের পার্লামেন্টেরিয়ান ও এই ইউনিয়নের পাঁচবারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান মরহুম নান্না মিয়া সাহেব ও তার পারিবার।

এই বিষয়ে নান্না মিয়ার বড় ছেলে ইকরামুল অামিন বাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, কলেজের জায়গাটা অামাদের কিন্তু কলেজ করার অাগে এরা কেউ অামাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। অামরা নিজেদের জায়গায় ইউনিয়ন পরিষদ দিয়ে রেখেছি। এখানে একটা কারিগরি কলেজ এর কথা হচ্ছিল অামরা ডিপ্লোমা কোর্সের জন্য একটা কলেজের সব কথা চূড়ান্ত করেছি, এর মধ্যেই এরা জায়গাটার দখল নেয়। অামরাতো এই জায়গাটা উদ্ধার করতে গেলে গ্রামের মানুষের কাছে এরা বলে বেড়াবে অামি কলেজ হতে দিতে চাই না। নিজের সম্মানের কথা ভেবে কিছু বলতে পারছি না। অামার কথা হলো অামরা যদি কোটি টাকা মূল্যের পরিষদের জায়গা দিতে পারি, তাহলে গ্রামের শিক্ষা প্রসারে এটাও শাহবাজপুরের মানুষকে দিতে পারবো। অামরা চাই এখানে একটা ডিপ্লোমা কলেজ হোক।

সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়ে হাসপাতালে ভর্তি অবস্থায় গুরুতর অাহত কলেজটির অধ্যক্ষ এ.কে.এম রামজান আরীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি হাউ মাউ করে কেঁদে ফেলেন। রমাজান বলেন, অামি সরকারি অডিট অাসবে সে কারণে সঠিক হিসাব চাইলে তারা অামাকে অাক্রমণ করে। অামরা যেখানে কলেজটি করেছি সেটি নিয়ে বিরোধ আছে। এসব অনিয়মের কারণে কলেজের নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাবে বললেই তারা অামার উপর ক্ষেপে যায়। ”

উল্লেখ্য, দেওড়ার ভূমি অফিসের রেকর্ড রুমের তথ্যমতে মো. ইদ্রিস মিয়ার কাছ থেকে ৬১ শতাংশ ও মো: ছিদ্দিক মিয়ার কাছ থেকে ৪১ শতাংশসহ মোট ১০২ শতাংশ জায়গা ক্রয় করে ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮ সালে ক্রয় করে তিতাস মডেল কলেজ যার প্রকৃতমূল্য ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা। যা দলিলে উল্লেখ আছে ১৪ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। যার সিএস, এসএ, আরএস- ২৪৪০, ২৪৪৪,২৪৪৫ নং দাগের।

কলেজের হিসাবে বিষয়ে জানতে চাইলে রমজান বলেন, প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে সুমন ২৫ লাখ, অামি রমজান আলী ১৫ লাখ, রাজিব আহমেদ রাজ্জি (টাকা দেয়নি), ফাইজুল ইসলাম রোমান (টাকা দেয়নি) মো. রোমান মিয়া (টাকা দেয়নি) এলাকার ধনাঢ্য ব্যাক্তিদের কাছ থেকে অনুদানের আরও প্রায় ৮০ লাখ টাকাসহ পায় এক কোটি ২০ লাখ টাকার একটি টাকাও ব্যাংক হিসাবে রাখা হয়নি।’

তিনি বলেন, কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন ব্রিকফিল্ড থেকে ৫২ হাজার ইট আমরা অনুদান হিসেবে পেয়েছি, কিন্তু ইটের সংখ্যা ৭০ হাজার উল্লেখ করে চেয়ারম্যান নিজের নামে ভাউচার তৈরি করেন। এছাড়া জামাল কাকা টিন কেনার জন্য অনুদান দেয় ৬ লাখ ৫০ হাজার, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ১৫ লাখ, মামুন ভাই ৬ লাখ, অাল অামিন ৩ লাখ, এনাম হাজী ৪ লাখ, শিবলী ভাই, ৫০ হাজার, বুলেট বাবুল ১ লাখ, পরিষদ থেকে ৬ লাখ টাকা, জাবেদ মিয়া ১ লাখ, জুম্মন ভাই ৮৬ হাজার টাকাসহ অনুদান অাসে প্রায় ৮০ লাখ টাকা।

তিতাস মডেল কলেজ

ছাত্রছাত্রীদের চেয়ার টেবিল, সিলিং ফ্যান, কলেজের সিলিং, ইলেকট্রিক সামগ্রিসহ যাবতয়ি জিনিসই অনুদান থেকে করা হয়েছে। নির্মান খরচ, সিমেন্টের টাকা ছাড়া কলেজ করতে অামাদের পকেট থেকে চার পয়সাও খরচ করতে হয়নি। নির্মানের সবই অামরা অনুদান হিসেবে পেয়েছি। কলেজ করতে দুই অংশীদারদের কাছ থেকে পাওয়া ৪০ লাখ বিভিন্ন মানুষের
বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে পাওয়া আরও প্রায় ৮০ লাখসহ যে অনুদানের টাকা উঠেছে ব্যাংক হিসাবে এর একটি টাকাও তার রাখেনি।’

তিনি আরও বলেন, হিসেব মতো কলেজ অনেকটা অনুদানেই তৈরি হয়েছে। আর বাকি টাকা তিতাস মডেল কলেজের ব্যাংক হিসাবে থাকার কথা কিন্তু চেয়ারম্যান তার দুই সহযোগী কাঠ রোমান ও সবজি রোমানকে নিয়ে নিজেদের কাছে রাখছেন। উপরন্তু সবচেয়ে বেশি অর্থ লগ্নি করার জন্য দাতা সদস্য হিসেবে সুমন ভাইয়ের নামও তারা রাখেননি। এমনকি একটি পয়সা না দিয়েই তিনি অার তার দুই সহযোগী কলেজের মালিক।

শাহবাজপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি নিজের নাম প্রকাশ করার না করার শর্তে বলেন, এর অাগেও শ্রেষ্ঠ চেয়ারম্যান পদক পাওয়া নিয়ে রাজ্জি জালিয়াতি করেন। একটি ২৫০ টাকা মূল্যের পদক তার সহযোগী জুসেকেক দিয়ে কিনিয়ে গ্রামে প্রচার করতে থাকেন জেলার শ্রেষ্ঠ চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। এই পুরো বিষয়টি মিথ্যা ও বানোয়াট। কারণ শ্রেষ্ঠ চেয়ারম্যান নির্বাচন করে জেলা প্রশাসন।

চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়, তিতাস মডেল কলেজ নিবন্ধনের মধ্য দিয়ে অবৈধভাবে জোরপূর্বক জায়গা দখল ও কোটি টাকা বাণিজ্যে করছে অভিযোগ অাছে রাজ্জির বিরুদ্ধ।। সম্প্রতি একটি ঘটনায় রমজানকে পাগল হিসেব প্রমাণ করার মাস্টরপ্ল্যানও সাজিয়েছে বলে জানান তিনি।
এসব অভিযোগ অস্বীকার করে শাহবাজপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রাজিব আহমেদ রাজ্জি বলেন, কলেজের সমস্ত হিসাব-নিকাশ থাকার কথা অধ্যক্ষের কাছে। তাহলে সেখানে আমি কি করে দূর্নিতী করবো? বরং অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে দুইটি অভিযোগ পাওয়ায় তাকে ডেকে মিটিংয়ে বসেছিলাম। তাকে আমরা মারধোর করিনি। আমি আমার ব্যাক্তিগত ব্যাংক হিসাবে কলেজের কোন লেনদেন কিরিনি।
রাজ্জি বলেন, কারো অভিযোগে কিছু আসে যায়না, সব অভিযোগই মিথ্যা।

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।