টাকার বিনিময়ে নয়, ত্যাগী নেতাদের খুজে বের করে পদ দিবো

১৭ জানুয়ারি, ২০২০ : ৭:২০ অপরাহ্ণ ২৪৫০

হাসান সারোয়ার। তবে ভিপি হাসান নামেই তিনি বেশি পরিচিত। ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে তার আছে ব্যাপক পরিচিতি। তরুণ বয়সেই তিনি সৈরাচার বিরুধী আন্দোলন করেছেন। তারপর একসময় ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজের ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সফলতার সাথে কাজ করেছেন। জনপ্রীয়তার কারনে হয়েছেন ছাত্র সংসদের ভিপি। তারপর জেলা ছাত্রলীগের নেতৃত্ব দিয়েছেন সফলতার সাথে। খেয়ে না খেয়ে রাজনীতি করেছেন। রাজপথের এই সাহসী সৈনিক আন্দোলন করে একাধিকবার জেল খেটেছেন। বর্তমানে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা যুবলীগের সভাপতি পদ প্রাত্যাশি। একই সাথে তিনি তেপান্তরের উপদেষ্টা হিসেবেও দায়ীত্ব পালন করছেন। জেলা আওয়ামীলীগের রাজনীতির ভালো-মন্দসহ বিভিন্ন দিক নিয়ে তেপান্তরের সাথে খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সীমান্ত খোকন ও ছবি তুলেছেন মাইনুদ্দীন চিশতী

 

তেপান্তর: কেমন আছেন?

হাসান সারোয়ার: আলহামদুল্লিাহ, সবার দোয়ায় ভালো আছি।

 

তেপান্তর: আপনার রাজনীতিতে আসার শুরুর দিকের গল্প যদি বলতেন।

হাসান: রাজনীতিতে আসলে কাকতালীয় ভাবে আসা। তখন আমাদের বয়স ১৫/১৬ ছিল। রাজনীতিটা তেমন বুঝতামনা। বড় ভাইয়েরা যে যেভাবে বলেছে সেভাবেই মিছিল-মিটিংয়ে গিয়েছি। যখন যারা বলেছে ভাই তোরা আমাদের সাথে থাকিস, থেকেছি। তখন দল বলতে কিছু বুঝিনা। কিন্তু ভালো ভাবে শুরুটা হয়েছে সৈরাচার বিরোধী বা এরশাদ বিরোধী আন্দোলন থেকেই। যদিও তখন আমি ছোট, কিন্তু তবু আমি সেই আন্দোলনে অংশগ্রহন করেছিলাম। মিছিল করেছিলাম। তখনই আমার হাতেখড়ি। ৮৮-৯০ এর দিকের কথা। তখন আমরা সেভেন/এইটে পড়ি। তখন আমরা অন্নদা স্কুলের ছাত্র ছিলাম। তাপস ভাই, শাহনাজ ভাইসহ আরো অনেকেই আছেন যাদের হাত দরে রাজনীতিতে আসা। মূলত তাপস ভাইয়ের আদর্শেই আমরা রাজনীতি করেছি। তার পরেই আমরা শাহনাজ ভাইকে পেয়েছি। আরো অনেকেই আমাদের মহল্লায় ছিলেন যারা আমাদেরকে অনুপ্রানিত করতেন। ফেরদৌস,জহিরের সাথে কাজ করেছি। জেলা ছাত্রলীগে সর্বশেষ মাহমুদ-রিপনের কমিটিতে আমি ছিলাম। কলেজ ছাত্রলীগের সাথে জরিত ছিলাম দীর্ঘদিন। কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি হয়েছি আমি ৯৭/৯৮ এর দিকে। অসহযোগ আন্দোলন থেকে শুরু করে রাজপথ-রেলপথ অবরোধসহ দলীয় সব কর্মকান্ডেই ছিলাম। আমার জানামতে কোন আন্দোলন বাদ যায়নি যেটাতে আমি ছিলামনা। ব্যাক্তিগত বিয়ে-শাদি হয়ত অনেকের মিস হয়েছে কিন্তু দলীয় কর্মকান্ড আমার মিস হয়নি। এসবকিছুর মধ্যেই আমার সক্রিয় ভুমিকা ছিল। আল্লাহ বাচিয়ে রাখলে ভবিষ্যতেও এই দ্বারা অব্যাহত থাকবে ইনশাআল্লাহ।

 

তেপান্তর: বর্তমানে রাজনীতিতে আপনার অবস্থান কি?

হাসান: বর্তমানে রাজনীতিতে আমার কোন পদবী নেই।

 

তেপান্তর: চারদিকে একটা গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে যে আপনিই আগামী জেলা যুবলীগ সভাপতি হতে যাচ্ছেন।

হাসান: এটা আল্লাহই ভালো জানেন, উনি চাইলে হবো ইনশাআল্লাহ। যদি দলের জন্য কোন শুভ ফল ভয়ে আনতে পাড়ি তাহলে যেন আল্লাহ আমাকে এই দায়ীত্ব অর্পন করেন। কারন, যুবলীগের নামেতো অপবাদের শেষ নেই। যদি ত্যাগী,সাহসী ও পরিচ্ছন্ন নেতাকর্মীদের নিয়ে একটা কমিটি করতে পারতাম তাহলে মনের আশা পূরন হতো।

 

তেপান্তর: আপনি যুবলীগ সভাপতি হওয়ার ব্যাপারে কি আশাবাদী?

হাসান: ইনশাআল্লাহ। কারন দলের বিরুদ্ধে এমন কোন কাজ করিনি যার জন্য হতে পারবোনা। দলের জন্য জেল খেটেছি, যাই করেছি তা দলের জন্য। কোন চাদাবাাজি করিনি, কারো জায়গাও দখল করিনি আর মাদকও সেবন করিনা। আমাদের এমপি মহোদয় ( উবায়দুল মোক্তাদির চৌধুরী) ও দেশরত্ন শেখ হাসিনার আদর্শে আমরা অনুপ্রাণিত হয়ে সবসময় মাদক,চাদাবাজী ও টেন্ডারবাজির বিরুদ্ধে লড়াই করেছি।

 

তেপান্তর: অতীতে আপনারা যখন ছাত্রলীগ করেছেন তার সাথে এখনকার জেলা ছাত্রলীগের কোন ভালো-মন্দের তফাৎ আছে কি?

হাসান: ভালো-মন্দ বলতে এখন যারা ছাত্রলীগ করে আমি বলবো তারা মায়ের গর্ভে থাকে। একটা সময় ছাত্রলীগ মানেই আতঙ্ক। হামলা-মামলা,জেল জুলুম, ঘরে থাকা যেতোনা। একটা আতঙ্ক ছিলো ছাত্রলীগে। এখনতো রাজনীতি বলতে গেলে ওয়ান সাইডেড হয়ে গেছে। কিন্তু আমরা খেয়ে না খেয়ে ছাত্রলীগ করেছি। একটা পুড়ি একটা সিঙ্গারা। কেউ একটা সিঙ্গারা খাওয়ালেই মনে করতাম তিনি আমাদের নেতা। বড় ভাই একটা সিঙ্গারা খাইয়েছে, সারাদিন এটাই কলেজে পুজি ছিল। দেখা গেছে ভালো খাবার আমাদের জুটেনি বললেই চলে। তখন অভাব ছিল আমাদের নিত্য দিনর সঙ্গী। ৫ টাকা ১০ টাকা বা ৫০ টাকা পেলেই আমরা অনেক খুশি হতাম। জীবনে অনেকবার জেলে গিয়েছি। এই ছিল তখনকার ছাত্রলীগ। তবে এটাও ঠিক, তখন আমাদের নেতাদের সহযাগীতা পেয়েই আমরা এখন এই জায়গায় এসেছি।

 

তেপান্তর: বর্তমানে জেলা ছাত্রলীগে কি কোন বিভক্তি বা অসন্তোষ আছে?

হাসান: আসলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ছাত্রলীগে তেমন কোন বিভক্তি আমার চোখে পড়েনা।ব্যাক্তি স্বার্থে অনেকে হয়ত বলতে পারে আমি অমুক ভাইয়ের লোক আমি তমুক ভাইয়ের লোক। আসলে সবাই আমরা জননেত্রী শেখ হাসিনার লোক, রবিউল ভাইয়ের লোক। এর বাইরে আমি কিছু দেখিনা। অনেকের মধ্যে ব্যাক্তি স্বার্থে দ্বন্দ থাকতে পারে এটাই অনেক সময় দলের উপর বর্তায়। আবার সামান্য পদ-পদবী নিয়েও থাকতে পারে, যেমন আমি এই পদে বা ওই পদে যেতে পারিনি। বড় সংগঠন হলে এগুলা থাকতেই পারে। সুস্থ প্রতিযোগীতা আছে, কিন্তু অসুস্থ না। এর বেশি কিছুনা।

 

তেপান্তর: বর্তমানে জেলা আওয়ামীলীগে বিভিন্ন সময় দ্বন্দ দেখা যায়, এই ব্যাপারটা কেন?

হাসান: আসলে এটা বলতে গেলে সময়ের ব্যাপার। যেহেতু আমার ও আপনাদের উভয়েরই সময় কম তাই সংক্ষিপ্ত সময়ে বলতে হবে। আসলে একটু আগে ছাত্রলীগ নিয়ে যেটা বললাম যে বড় সংগঠন হলে এরকম একটু-আধটু থাকবেই। তবে আমি মনে করি জেলা আওয়ামীলীগে এটা একটা অসুস্থ প্রতিযোগীতা। পদ দিতে পারলেই শেখ হাসিনা ভালো রবিউল ভাই ভালো। কিন্তু পদ না দিতে পারলেই কেউ ভালোনা। যারা আজকে জেলা আওয়ামীলীগের এই নেতা সেই নেতা বলে দাবী করে তারা গত নির্বাচনে অনেকের চেহারা আমরা দেখিনি। কোন মিছিল-মিটিংয়ে তাদের বক্তৃতা দিতে দেখিনি, কারো কাছে ভোট চাইতে দেখিনি। তারা নৌকার বিরুদ্ধে সবসময় কাজ করেছে যেন রবিউল ভাই ফেইল করেন। কিন্তু আল্লাহ সহায়, উনি রবিউল ভাই কৃতকার্য হয়েছেন। আমাদের মুখ উজ্জল হয়েছে। আর যারা পদের জন্য চিল্লায় তারাই দলের বিরুধীতা করেন। আর যারা রবিউল ভাইয়ের সাথে থেকেই বিরুধীতা করতে চায় তাদের ব্যাপারেও আমরা সজাগ আছি। কারন আমরা চাই রবিউল ভাইয়ের হাত আরো শক্তিশালী হোক তিনি আরো ভালো জা্য়গায় অবস্থান করুন। ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসীর আক্ষেপ যে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সাবেকএকান্ত সচীব হয়েও মন্ত্রীসভায় স্থান পাননা বা কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগের ভালো একটা জায়গায় যেতে পারছেন না। এমন কিছু একটা হলে বোধহয় ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসী মনে শান্তি পেতো। আমিতো ক্ষুদ্র মানুষ ওভাবে বলতে পাড়িনা, তবে আমার মনে হয় জেলাবাসীর মনে প্রশ্ন, উনি এমন একজন মানুষ হয়েও মন্ত্রীসভায় স্থান পাচ্ছেননা কেন?

 

তেপান্তর: জেলা আওয়ামীলীগে বিদ্রোহের যে ব্যাপারটা এটা সমাধানের পথ কি?

হাসান: জেলা আওয়ামীলীগে বিদ্রোহ এটা আমরা দেখিনা বা এটা রাজপথে দেখার মতো কিছু না। জেলা পরিষদের যেই ঘটনাটার কথা বলতে পারেন সেটা তার ব্যাক্তি স্বার্থ হাসিলের জন্যই করেছে। এটার দায়ীত্ব আওয়ামীলীগ, যুবলীগ বা ছাত্রলীগ কেউই নিবেনা। এটা যারা করেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। এতে আমাদের কোন আপত্তি নেই। আর এটা যেহেতু বৃহৎ সংগঠন তাই আজ নাহয় কাল এটার সমাধান হয়ে যাবে। আর মূলত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের জন্যই রবিউল ভাইয়ের দরকার। সন্ত্রাস,চাদাবাজী, ছিনতাই ও মাদকের বিরুদ্ধে রবিউল ভাইয়ের সোচ্চার ভূমিকা আছে। বিশেষ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ এখন শান্তিপ্রিয়। যেখানে আগে প্রতিদিন একটা খুন হতো আর ছিনতায়ের ঘটনাতো নিত্যদিনের ব্যপার ছিল। ব্রাহ্মণবাড়িয়া যেহেতু সীমান্ত এলাকা তাই এটা মাদকের একটা বিশাল স্পট ছিল কিন্তু আল্লাহ’র অশেষ মেহেরবানী, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রবিউল ভাইকে এমপি বানানোর পর এখন এখানে মাদক নেই বললেই চলে। যারা এখনো মাদক ব্যাবসা করে তারা হয়তো চুরি-চামারি করে ছোট পরিসরে করে। আশা করি এটাও থাকবেনা।

তেপান্তর: অভিযোগ ও অসন্তোষ নিয়ে একই অবস্থা জেলা যুবলীগেও, এর কারন কি?

হাসান: দীর্ঘ ১৭ বছর দরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা যুবলীগের সম্মেলন হয়না। ২০০২ বা ৩ এর পর থেকেই সম্মেলন হয়না। এখানে একটা জট লেগে আছে। যারা মোবাইল,কম্পিউটার বা স্বর্ণের চেইন দিতে পারে তাদেরই পদ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ত্যাগি নেতাদের জন্য কোন পদ নেই। টাকা দিয়ে কমিটি কিনে নেয়। কমিটিতে অনেক অসন্তোষ আছে। বর্তমান যুবলীগ ভারপ্রাপ্তের ভারে নতজানু। আজকে শাহনুর ভাই তো কালকে স্বপন ভাই,এরপর আরেকজন। এভাবেই যুবলীগ চলছে। অনেকেই পদ প্রত্যাশি, তারা হা-হুতাশের মধ্যে আছে। বর্তমান কমিটিতে যারা আছেন তাদের ব্যাপারে অনেক নেতিবাচক কথা শুনা যায়। যেমন, কসবার কমিটি, আশুগঞ্জের কমিটি ও বিভিন্ন ইউনিয়নের কমিটি টাকা খেয়ে তারা পদ-পদবী দিয়েছে। এসব খবর বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়ও এসেছে। তাই আমরা চাই অচিরেই জেলা যুবলীগের সম্মেলন হোক। এটা হওয়া দরকার। কারন ১৭ বছর দরে যুবলীগের কমিটি থাকতে পারেনা। এজন্যই নেতাকর্মীদের মনে অসন্তোষ। এসব থেকে মানুষ পরিত্রাণ চায়। বিশেষ করে আমি এর থেকে পরিত্রাণ চাই।

 

তেপান্তর: আপনি সভাপতি হওয়ার যে গুঞ্জন শুনা যাচ্ছে তা যদি বাস্তব হয় তাহলে জেলা যুবলীগ আপনার দ্বারা কি রকম উপকৃত হতে পারে?

হাসান: ভাই, আমি ছাত্র রাজনীতি করেছি কিন্তু কোনদিন টাকা দিয়ে কমিটি দেইনি। ছাত্রলীগের অনেক থানা ও ইউনিয়ন কমিটি আমার হাত দিয়ে গেছে, ছাত্র সংসদে ভর্তি থেকে ধরে। কিন্তু হলফ করে বলতে পারি টাকা দিয়ে কখনো কমিটি দেইনি। ত্যাগী নেতাদের খুজে খুজে বের করে পদ দিবো। তার টাকা বা লাঠি থাকুক বা না থাকুক। আমি ত্যাগী নেতাদের উঠিয়ে আনবো। যারা টাকা,মোবাইল বা চেইনের বিনিময়ে পদ দেয় এই কাজ যেন আল্লাহ আমাকে দিয়ে না করান। এটা আমার অঙ্গিকার।

 

তেপান্তর: রাজনীতিতে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বা আশা কি?

হাসান: আজীবন আওয়ামীলীগ-যুবলীগ করার ইচ্ছা। এর বেশি কি করবো জানিনা। আল্লাহ যদি ভালো কিছু কপালে লিখে রাখেন তাহলে তাই হবে। ইচ্ছা আছে আজীবন মানুষের সেবা করা। আওয়ামীলীগ বা যুবলীগের ব্যানারে পদ থাকুক বা না থাকুক যদি ভালো কিছু করতে পারি তাহলে মানুষ আমাকে মনে রাখবে। এটাই আশা।

 

তেপান্তর: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

হাসান: আপনাদেরকেও ধন্যবাদ।

 

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

  • 1.7K
    Shares