ইউরোপ-আমেরিকার ভিসার লোভনীয় বিজ্ঞাপনের আড়ালে প্রতারণার ফাঁদ

২১ জানুয়ারি, ২০২০ : ৬:৪০ অপরাহ্ণ ৭৮৪

“কানাডা ভিসা ২০ লাখ !! আমেরিকা ভিসা ২০ লাখ !! ইউরোপ ভিসা ১৫ লাখ !! ভিসার আগে বা পরে ১ টাকাও নয়, সমস্ত পেমেন্ট পৌঁছানোর পরে।”

এরকম রংচং মাখা বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পা দিয়ে ফারুক মিয়া নামে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার একজন এই ফাঁদে পা দিয়ে তার সর্বশেষ খুয়িয়েছেন।। তার করুন কাহিনী হুবহু তুলে ধরা হলো।

ভুক্তভোগী এমনই লোভনীয় এক বিজ্ঞাপন দেখে ঢাকার অভিজাত এলাকায় একটা অফিসে গিয়েছিলেন, সেখানে তাদের কাছ থেকে বিস্তারিত জানতে চায়। তারা জানায় যে, গ্যারান্টি দিয়ে আপনাকে বিদেশ নিয়ে যাবো, ২ বছর এর জন্যে জব ভিসা, মাসিক ২০০০-২৫০০ ডলার বেতন। ৫ বছর পরে নাগরিকত্ত পেতে আমরাই সাহায্য করবো। এমনকি ভিসার আগে ও পরে কোনও অর্থ প্রদান করতে হবে না। সমস্ত খরচ আপনি বিদেশ পৌঁছানোর পরে আপনি যখন বিদেশ থেকে আপনার পরিবারকে ফোন দিয়ে বলবেন যে আপনি ভালোভাবে পৌঁছে গেছেন, তারপর আপনার পরিবার আমাদের টাকা দিবে। আমাদের আমেরিকা/কানাডাতে নিজস্ব প্রতিনিধি আছে, তারাই সরসরি আমেরিকা/কানাডা থেকে আপনার নামে ভিসা ইস্যু করে পাঠাবে, তাই এখানে এম্বাসি ফেস করার কোনও ঝামেলা নেই।।  এক সঙ্গে এতো অফার পেয়ে বেচারা কনফিউস হয়ে গেলো !! সে নিজেকে প্রশ্ন করতে লাগলো বিদেশ যাওয়া এতো সোজা ?? নিজে নিজে উত্তরও খুজে নিলো, আরে কি আর, এক বার চেষ্টা করে দেখি, আমার তো ২৫ পয়সাও আগে দিতে হবে না। সমস্ত খরচ যেখানে আমেরিকা/কানাডা পৌঁছানর পরে, সেখানে আমার আবার টেনশন কি !! যেই কথা সেই কাজ, বাড়িতে গিয়ে বাবা-মা এর সাথে আলোচনা করলো। যেখানে সমস্ত খরচ পৌঁছানর পরে সেহেতু বাবা-মা আর দ্বিধা না করে রাজী হয়ে গেলো। শুরু হয়ে গেলো সুদে টাকা গুছানো ও অবশিষ্ট জমিজমা বিক্রি করার প্রস্তুতি।। ১৮-২০ দিনের মাথায় টাকা গুছানোর প্রস্তুতি শেষ করে পাসপোর্ট নিয়ে আবার অফিসে গিয়ে নিজের নামটা বুকিং দিয়ে আসা। বুকিং এর সময় অরিজিনাল পাসপোর্টসহ ২ কপি ফটো ও ন্যাশনাল আইডি এর ফটোকপি রাখলো, সঙ্গে মোবাইল নাম্বার।।  ৭ দিন পর তাকে ফোন করে অফিসে ডাকা হলো। যথারীতি অফিসে যাবার পরে দেখলো সেখানে তার মতো আরও ১১ জন অপেক্ষা করছে; কানাডা বা আমেরিকা যেতে চায়।। এর পরে অফিস থেকে তাদের বলা হলো, টোটাল ১২ জন এর একটা গ্রুপ এদের প্রত্যেকের (৯ জন কানাডা, ৩ জন আমেরিকা) ভিসা রেডি, এনাদের ফ্লাইট আগামী ৪ দিন পরে।। ফ্লাইট ভারতের নিউ দিল্লী থেকে সরাসরি। তাই প্রত্যেকের পাসপোর্টে ইন্ডিয়ান ভিসা লাগানো আছে, ২ দিনের মধ্যে ১২ জনের গ্রুপ ঢাকা থেকে নিউ দিল্লীর উদ্দেশ্যে রউনা দিতে হবে, সঙ্গে তাদের প্রতিনিধি থাকবে।। তাদের প্রত্যেকের ভিসা অনলাইন এ ইস্যু হয়ে গেছে। অনলাইন ভিসা কপি ও বিমান টিকিট নিউ দিল্লী থেকেই উনাদের প্রতিনিধি প্রত্যেক ক্যান্ডিডেট এর হাতে দিয়ে দেবে।।  এই ১২ জন এর ভীতর ২/১ জন এর মনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিলো যে, পাসপোর্ট এর স্টাম্প ছাড়া কি আসলেই তারা কানাডা যেতে পারবে তো? আবার নির্ভয়ে ২/১ জন এই প্রশ্ন করেও ফেলে। কিন্তু তারা রিতিমত ধমক খেয়ে যায়।। আরে মিয়া, আপনারা কি বেশি বুঝেন নাকি? আমরা ২৫ বছর ধরে এই লাইনে।, আমাদের অভিজ্ঞতা আছে, আপনাদের আগে আমাদের যে সব ক্যান্ডিডেট বিদেশ গেছে, এই নেন ফোন নাম্বার, এদের সাথে কথা বলেন।।  আপনাদের কি টেনশন ?? আপনার কি ২৫ পয়সা পেমেন্ট করেছেন??? আপনাদের পিছনে আমাদের কত করে ইনভেস্ট করতে হয়েছে জানেন?? একটা কানাডা এর ভিসা রেডি করতে কতো টাকা লাগে জানেন?? এর পরে প্লেন এর টিকিট নেটে সার্চ দিয়ে দেখেন কত খরচ ।। কথাগুলি (ঝারি) শোনার পরে সবাই চুপ হয়ে গেলো ও নির্ধারিত তারিখ সবাই নিউ দিল্লী এর উদ্দেশ্যে রউনা দিলো।।  ঢাকা থেকে ট্রেনে কোলকাতা, এরপর কোলকাতা থেকে নিউ দিল্লী ট্রেনে সবমিলিয়ে ২/৩ দিন পরে তারা নিউ দিল্লী পৌছালো !! নিউ দিল্লী স্টেশন থেকে প্রায় ৩/৪ ঘন্টা প্রাইভেটকারে করে নিয়ে গিয়ে রাতে এই ১২ জনকে কোথায় রাখা হলো কেউ সঠিক বলতে পারলো না।

(একটা নিরিবিলি এপার্টমেন্ট, আশেপাশে ফাঁকা সর্বশান্ত পরিবেশ)।  সারারাত রাতে কোনও ফাঁকা রুমে আটকিয়ে রাখলো (খাবার পানি ছাড়াই সারারাত)।। পরেরদিন সকালে একজন একজন করে অন্য ফাঁকা রুমে নিয়ে গেলো এবং মাথায় পিস্টল ঠেকিয়ে বাড়িতে ফোনে বলতে বাধ্য করলো যে “মা/বাবা আমি আজ রাতে কানাডার ফ্লাইটে রওয়ানা হবো, আমার জন্যে দোয়া করবে।”  প্রত্যেকে আলাদাভাবে তাদের পরিবার এর সাথে একই কথা বলানো হলো এবং পরে ২ দিন তাদের একসাথে সেই বদ্ধ ঘরে আটকিয়ে রাখলো (দিনে ১ বার খাবার সহ)। ২ দিন পরে একই স্টাইল এ মাথায় পিস্টল ঠেকিয়ে বাড়িতে ফোনে বলতে বাধ্য করলো যে “মা/বাবা আমি ভালো ভাবে কানাডা পৌঁছে গেছি, কোথাও কোনও সমস্যা হয়নি, এমন কি আগামিকাল থেকে আমি কাজে জয়েন্ট করবো, তোমরা এনাদের প্রাপ্য টাকা দিয়ে দাও “!!   নিরিহ বাবা মা দ্বিধা না করে সবাই সবার চুক্তি মোতাবেক টাকা দিয়ে দিলো !!! টাকা হাতে পাবার গ্রিন সিগন্যাল পাবার পরে, প্রত্যেককে একই স্টাইল এ নিউ দিল্লী স্টেশন এ পৌঁছে দেয় কোনও এক রাতের বেলায়, সঙ্গে কোলকাতা ফেরার ট্রেন টিকিটসহ।   এই সকল প্রতারকের ফাঁদে যাতে সাধারন জনগন না পড়েন সেজন্য নিউজটি শেয়ার করার জন্য সকলের অনুরুধ রইল।

তথ্য সংগ্রহ: আসাদুজ্জামান আসাদ

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।