গোসলখানায় যুদ্ধ

২৬ জানুয়ারি, ২০২০ : ৫:২৮ অপরাহ্ণ ৫৯২
মার্গারেট অ্যাটউড:

সোমবার
শেষ বিকেলে সে পুরোনো বাসা ছেড়ে নতুন বাসায় উঠল। খুব কম কষ্টেই হয়ে গেল বাসা পাল্টানো; সে সবকিছু দুটো স্যুটকেসে আঁটিয়ে নিয়ে নিজেই নিয়ে গেল তিন ব্লক পরের নতুন জায়গায়। মাত্র দুবার থেমে জিরিয়ে নিতে হয়েছিল তাকে। বয়সের হিসাবে সে বেশ শক্তিশালী। একজন লোক এসে সাহায্য করার প্রস্তাব দিয়েছিল, বেশ সহৃদয় দেখতে লোকটা। কিন্তু আমি অপরিচিত কারও কাছ থেকে সাহায্য নিতে বারণ করেছিলাম তাকে।

আমার মনে হয়, জার্মান মহিলাটি তাকে যেতে দেখে খুশিই হয়েছে। সে তাকে বেশ সন্দেহের চোখে দেখত। আমি নিজে এই জার্মান মহিলাকে বেশ অপছন্দ করি। ঘরের কিছু জিনিস সব সময় সরানো দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম (সে অবশ্য কষ্ট করে হলেও জিনিসগুলো আগের জায়গায় সরিয়ে নিত, এমনিতেও সে তেমন গোছানো নয়), ইদানীং আমার সন্দেহ হচ্ছিল, মহিলা সম্ভবত চিঠিপত্রগুলোও দেখে। খামের ওপর তেলতেলে হাতের ছাপ ছিল, এখনো বেশ ঠান্ডা, পোস্টম্যানের দস্তানা ছাড়া বেরোবার কথা নয়। নতুন বাসায় বাড়িওয়ালির বদলে বাড়িওয়ালা; মনে হয়, সব মিলিয়ে এটাই ভালো।

নতুন বাসায় পৌঁছেই সে এক বুড়ো লোকের কাছ থেকে চাবি নিল, যে নিচতলার সামনের ঘরে থাকে। বাড়িওয়ালা বাইরে ছিল, কিন্তু বলে গেছে তার আসবার কথা। সাদা চুলের বুড়োটি বেশ অমায়িক, হাসিখুশি। সে স্যুটকেসগুলো তিনতলায় তুলল সরু সিঁড়ি দিয়ে, এক এক করে। দিনের বাকি সময় ঘর গোছাতেই লেগে গেল। ঘরটা আগেরটার চেয়ে ছোট, কিন্তু পরিষ্কার অন্তত। সে কাপড়গুলো কাবার্ডে আর ওয়ার্ডরোবে রাখল। কোনো তাক নেই কোথাও, তাই সসপ্যান, কাপ, প্লেট, কফি পট—এসবই ওয়ার্ডরোবের ড্রয়ারেই রাখতে হবে। আমি ঠিক করলাম, টি–পটটা ছোট টেবিলের ওপর রাখা হবে। বেশ ভালো দেখতে ওটা।

সে বাড়িওয়ালার দেওয়া চাদর আর কম্বল দিয়ে বিছানা করল। ঘরটা দক্ষিণমুখী, তাই ঠান্ডাই হবে। ভাগ্যিস একটা বৈদ্যুতিক রুমহিটার আছে। সে সব সময় উষ্ণতা পছন্দ করে, যদিও আমি তাপ–শৈত্য নিয়ে অতটা উদ্বিগ্ন নই। ক্ষতিপূরণ হিসেবে ঘরটা ঠিক গোসলখানার পাশেই, যেটি আসলে দরকার।

নোটবুকটা টেবিলের ওপর থাকবে, টি–পটের পাশে।

আগামীকাল তাকে বাইরে যেতে হবে কিছু সদাইয়ের জন্য। কিন্তু এখন সে বিছানায় যাবে।

মঙ্গলবার

আজ সকালে সে বিছানায় শুয়ে আবার ঘুমোবার চেষ্টা করছিল। আমি ঘড়ির দিকে চেয়ে ছিলাম এবং তার সঙ্গে একমত হচ্ছিলাম যে তোশকটা বেশ পাতলা আর শক্ত, আগেরটার তুলনায়। প্রায় নয়টা বেজে গেয়েছিল, আর আমি তাকে বলছিলাম উঠে অ্যালার্ম শেষ হওয়ার আগেই ঘড়িটা বন্ধ করতে।

কেউ একজন পা টিপে টিপে সামনের সিঁড়িতে এল এবং বাথরুমে ঢুকে দরজা আটকাল। আবিষ্কার করলাম, দেয়ালগুলো প্রশস্ত নয়, শব্দ আসে। সে পাশ ফিরে আবার ঘুমাতে যেতেই বাথরুমের ব্যক্তিটি ভীষণভাবে কাশতে লাগল। এরপর গলা খাকারি, থুতু ফেলা আর ফ্লাশের আওয়াজ পাওয়া গেল। আমি নিশ্চিত এটা কে, নিচতলার বুড়ো লোকটা হবে। বেচারার নিশ্চয়ই ঠান্ডা লেগেছে। সে পাক্কা আধঘণ্টা গোসলখানায়ই কাটাল—অনেক সময়; এর মধ্যেই সে অপ্রীতিকর শব্দ করল অনেকবার। আমি দেখলাম, গোসলখানার পাশের ঘরের কিছু অসুবিধাও আছে; আর শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারলাম, বাড়িওয়ালা কেন এত সস্তায় ঘরটা ভাড়া দিতে রাজি হয়েছে।

অবশেষে তাকে উঠে গিয়ে জানালা বন্ধ করতে (আমার সব সময় মনে হয়, টাটকা বাতাস স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী, যদিও সে অত পছন্দ করে না) আর রুমহিটার চালাতে রাজি করাতে পারলাম। সে আবার বিছানায় ফিরতে চাইছিল, কিন্তু আমি তাকে বললাম কাপড় পরতে। তাকে বাজারে যেতে হবে, খাওয়ার কিছু নেই ঘরে। সে গোসলখানায় গেল, তক্ষুনি নয়, অন্য পায়ের আওয়াজও পেলাম। আমার মনে হলো, গোসলখানাটা আরেকটু পরিচ্ছন্ন হতে পারত। সে অবশ্য আজ সকালেই বেসিনটা ধুয়েছে। অনেক গরম পানি ছিল।

সে ঘরে ফিরে ওভারকোট ও জুতা পরল। আমি তাকে বললাম একটা স্কার্ফও নিতে, কারণ জানালায় বরফ দেখতে পাচ্ছিলাম। সে পার্স নিল, আর ঘর থেকে বেরিয়ে দরজা আটকাল। সে যাবার সময় গোসলখানার দরজা বন্ধ ছিল, চৌকাঠের দিক দিয়ে আলো দেখা যাচ্ছিল। সে যখন নিচের ধাপে পৌঁছাল, বুড়োটা দরজার কাছের টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চিঠিগুলো গোছাচ্ছিল। তার গায়ে ছিল বাথরোব আর তার নিচে নেমে যাওয়া স্ট্রাইপড পাজামা, তার নিচে শীর্ণ গোড়ালি আর মেরুন চামড়ার বেডরুমের চপ্পল। লোকটা সুন্দর করে হেসে শুভ সকাল বলল। আমি তাকে বললাম মাথা ঝুঁকিয়ে হাসি ফেরত দিতে।

সে সামনের দরজা বন্ধ করে পকেট থেকে দস্তানা বের করে পরে নিল। খুব সাবধানে সিঁড়ির ধাপগুলো বেয়ে নামল, যেহেতু ওগুলো বরফে পিছল। আমি প্রায়ই লক্ষ করেছি যে তার জন্য সিঁড়ি বেয়ে ওঠাটা নামার চেয়ে কম বিপজ্জনক।

সে রাস্তা ধরে হেঁটে গেল, কয়েক ব্লক, যেখানে আমার জানামতে একটা দোকান আছে। আগের বাসার আশপাশের বাড়িগুলো আরও বড় ছিল। আমি এই রাস্তায় আগেও এসেছি (অবশ্যই, এই জায়গাটা তো আর আগের বাসা থেকে খুব দূরে নয়) কিন্তু এখন আমি এই রাস্তাকে নিজের বলতে পারি, যেহেতু নতুন এলাকায় নিজস্ব যাতায়াতের চেনা পথ রয়েছে আমার। গাছগুলোও আমার, ফুটপাত আমার। বরফ গলে যাবার পর গাছগুলোতে যখন আবার পাতা ধরবে, ভেজা মাটি আর বসন্তে নর্দমার দিকে বয়ে চলা পানিও আমার হবে।

সে গাড়িচলা বড় রাস্তায় উঠে গেল, এক ব্লক হেঁটে আবার ফিরে আরও দুই ব্লক হাঁটল দোকানে পৌঁছানো পর্যন্ত। আগের বাসার কাছাকাছি আরেকটা দোকান ছিল। এই দোকানটাতে আমি আগে আসিনি।

সে কাচের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে দ্বিধা করল, ঝুড়ি নেবে নাকি ঠেলাগাড়িটা—বুঝতে পারছিল না। সে ভাবছিল ঠেলা নেওয়া সহজ, ঝুড়ি নিলে ভারী হয়ে যাবে; কিন্তু আমি বললাম, অত জিনিসপত্র কেনা হবে না, ঠেলা নিলে দেরি হবে, তাই শেষে সে ঝুড়িই নিল।

আমাকে সব সময় খেয়াল রাখতে হয় সে কত খরচ করছে। সে অবশ্যই মাশরুম আর স্টেক কিনতে চাইবে, আর জলপাই, কেক ও পর্করোস্ট। কিন্তু আমি জোর দিয়ে বললাম সস্তা কিন্তু পুষ্টিকর খাবার নিতে। যত যা–ই হোক, এখন মাসের মাঝামাঝি আর সরকারি চেক আসতে বেশ দেরি আছে। বাসা ভাড়া দেওয়ার পর বেশি টাকা বাকিও নেই। সে পাউরুটি আর মাখন নিল (মার্জারিন নিতে মানা করেছি); অল্প দুধ, কিছু প্যাকেটের স্যুপ, শীতের দিনে বেশ ভালো ওগুলো, কিছু চা আর ডিম আর বেশ কয়েকটি বেকড বিন। সে আইসক্রিম চেয়েছিল, কিন্তু তার বদলে আমি ফ্রোজেন মটর নিতে বলেছি।

জিনিসগুলো সহজেই বয়ে আনল সে—দুধ, ডিম ও ফ্রোজেন মটরগুলো ফ্রিজে রাখল, যেটি নিচতলার হলওয়েতে রাখা। ফ্রিজটাতে অদ্ভুত গন্ধ। বাড়িওয়ালাকে নিশ্চয়ই পরিষ্কার করতে বলা হয়েছে। সে এরপর ওপরে গিয়ে বাথরুম থেকে পানি নিয়ে নিজের জন্য এক কাপ কফি বানাল আর একটু পাউরুটি–মাখন খেল। যখন সে খাচ্ছিল, কেউ একজন গোসলখানায় ঢুকল—এবার বুড়ো লোকটি নয়, একজন মহিলা। সে নিশ্চয়ই নিজের সঙ্গে কথা বলে, আমি স্পষ্ট দুটি স্বর শুনলাম, একটা ঝগড়াটে ধরনের উঁচু গলা, আরেকটা নিচু ফিসফিস, খুবই আজব। দেয়াল অপ্রশস্ত, কিন্তু সে কী বলছে, তা বুঝতে পারলাম না।

পায়ের শব্দ চলে যাওয়ার পর সে গোসলখানায় ঢুকে কফির কাপ আর চামচ ধুলো বেসিনে। তারপর বিছানায় শুয়ে দিল একটা ছোট্ট ঘুম। আমার মনে হলো, অতখানি হাঁটার পর এটুকু তার প্রাপ্য। যখন সে জাগল, তখন রাতের খাওয়ার সময় হয়ে গিয়েছিল। সে বিনের একটা কৌটা খুলল, চেকটা আসার পর তাকে একটা নতুন ক্যান–ওপেনার কিনতে হবে। এটা শেষ হবার পর খানিকক্ষণ বাইবেল পড়ব (ঘরের আলো যতটা ভেবেছিলাম তার চেয়ে ভালো)। এরপর সে ঘুমাতে যাবে।

পুনশ্চ: আগামীকাল তাকে গোসল করতে হবে।

বুধবার

এটা নিয়মিত হয়ে গেছে। ঠিক নয়টার সময় বুড়োর গোসলখানায় ঢোকার শব্দে আমার ঘুমটা ভেঙে যায়। তার কাশিটা ভয়ানক। শব্দে মনে হয় যেন বমি করছে। সে হয়তো মাথাটা সরিয়ে দেয়াল থেকে যথাসম্ভব দূরে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু ঘরের যে আকার–আকৃতি, তাতে একটাই মাত্র অবস্থান সম্ভব। এটা আসলেই খুব বিরক্তিকর। নিজের কাশির শব্দ শোনা এক কথা আর অন্য কারওটায় ভিন্ন কথা। এভাবে কাশতে থাকলে তো তার ভেতরের সবকিছু বেরিয়ে আসবে। লোকটার জন্য খারাপই লাগছে।

আজ আবার সে আধঘণ্টা গোসলখানায় কাটিয়েছে।

পরে সে কাপড় পরে নিচে গেল ফ্রিজ থেকে দুধ আনতে, বুড়ো তখন চিঠিগুলোকে টেবিলে সাজিয়ে রাখছে। আজ কয়েকবার সেই দুই স্বরে কথা বলা মহিলার আওয়াজ পেলাম গোসলখানায়। নিশ্চয়ই কোনো সসপ্যান খালি করছিল। আমি উঁচু গলা আর কর্কশ ফিসফিসানি শুনতে পেলাম। নিজের সঙ্গে কথা বলার অভ্যাসটা খারাপ। দুপুরে খাওয়ার পর কাপ আর থালা ধুতে গিয়ে সে আলুর খোসা পেয়েছে।

সেদিন বিকেলের পর আমি তাকে বললাম গোসল করতে। সে নিশ্চয়ই গোসলখানার ঠান্ডার ভয়ে করছিল না এত দিন, কিন্তু আমি তাকে সব সময় বলি পরিচ্ছন্নতা আর স্বাস্থ্য পরিপূরক।

সে গোসলখানার দরজা বন্ধ করল আর আমি তাকে বাথটাবের পাশে হাঁটু গেড়ে বসালাম, যাতে ভালোমতন দেখতে পারি। চুল আর কিছু ময়লা পেলাম।

আগের বাসায় মাত্র একজনের সঙ্গে একই গোসলখানা ব্যবহার করতে হতো। একটা কর্মজীবী মেয়ে, যে নিজের অন্তর্বাস ধুয়ে তোয়ালে রাখার জায়গায় ঝুলিয়ে রাখত। কারও সঙ্গে একই গোসলখানা ব্যবহার করাটা কেমন যেন। আমার মনে হয়, অপরিচিত লোকেদের ব্যবহার করা বেসিনে দাঁত মাজতে হলে সেটাও বাজে ব্যাপার। আমি তাকে বলেছি, আবার সে নিজস্ব গোসলখানা পাবে, কিন্তু মনে হয় আমার কথা বিশ্বাস করেনি। আমার তাকে একটা অ্যান্টিসেপটিকের বোতল এনে দেওয়া উচিত, এখনেরটা প্রায় খালি হয়ে গেছে।

পানি গরম ছিল আর সে আরামে গোসল করতে পারল, যদিও যতটা স্বাচ্ছন্দ্য হবার কথা ছিল, ততটা হয়নি। বাইরে কয়েকবার উদ্বিগ্নভাবে হাঁটার আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। বাড়িওয়ালা আরেকটা গোসলখানা বানালে উপকার হতো, নিচতলায় মনে হয় জায়গা আছে।

অবশ্য আমি তাকে দিয়ে বাথটাব পরিষ্কার করিয়েছি। বাড়িওয়ালা এই কাজের জন্য মাজুনি আর ক্লিনজার দিয়েছিল। সে অন্তর্বাস ধুয়ে রুম হিটারের ওপর শুকাতে দিল।

বৃহস্পতিবার

আজ সকালে বৃষ্টি হয়েছিল। জানালা দিয়ে দেখলাম, বৃষ্টিতে বরফ ধুয়ে গেছে অনেকটা। এইটুকু গরম থাকলে তাকে মাখনটা ফ্রিজে রাখতে হবে।

বুড়ো লোকটা অসহ্য হয়ে যাচ্ছে। তার গোসলখানার ক্রিয়াকলাপ খুব উগ্র হয়ে উঠছে বুঝতে পারছি। লোকটা চাইছে না সে এই বাড়িতে থাকুক, তাকে তুলে দিতে চেষ্টা করছে। এবার সে বীভৎস শব্দে কুলি করছে। লোকটাকে নিরুৎসাহিত করা দরকার, বোঝানো দরকার যে আমি বেশি দিন এটা সহ্য করব না। তার ঘুম দরকার, শান্তি দরকার। এই কাজগুলো সে নিজের ঘরেই করতে পারে—শ্রবণসীমার বাইরে।

আমি তাকে দিয়ে চিরকুট পাঠালাম বাড়িওয়ালা বরাবর, যেন ফ্রিজের গন্ধের ব্যাপারে। কিন্তু রাতের খাবারের সময় চিরকুট উধাও হলেও ফ্রিজ পরিষ্কার করানো হয়নি। কিছু মানুষ বেশ ঝামেলার হয়। দুই স্বরের মহিলাও খুব তৎপর। আজ সে গোসল করেছে। আমি ভাবতে লাগলাম সে হয়তো দুজন মানুষ, বাথটাবে অনেক পানির ঝাপটা টের পাওয়া গেল, কিন্তু আমি মাত্র এক জোড়া পায়ের যাতায়াত শুনেছি। ফিসফিসানির আওয়াজ খুব ঝাঁজালো শোনাল।

খাবারদাবার শেষের পথে। তাকে শিগগিরই আবার দোকানে যেতে হবে, কিন্তু আমি চাই বৃষ্টি ছাড়া দিনে যাক সে। বুটজুতোগুলো তত ভারী নয়। আর আমিও একমত যে ভেজা পা খুব অস্বস্তিকর আর অস্বাস্থ্যকরও।

শুক্রবার

আজ বুড়োর সঙ্গে তার দেখা হলো সিঁড়িতে। নয়টার কার্যক্রমের পর, অন্য দিনের চেয়েও নোংরা কাজ শেষে বেশ একটা হাসি দিল বুড়ো। যেন জানেই না আমি পাশের ঘরে থাকি (যদিও তার পায়ের আওয়াজ শোনার কথা)। তার নিষ্পাপ হাসির আড়ালে একটা শত্রুতাভাব ছিল। আমি তাকে বলেছি হাসি ফেরত না দিতে; সে ভ্রু কুঁচকে মুখ শক্ত করে ছিল।

আজকে পানি যাওয়ার ড্রেনে ম্যাকারনির টুকরা পেলাম। নিশ্চয়ই দুই স্বরের মহিলার কাজ। সে মনে হয় বিদেশি; যা হোক, সে পরিচ্ছন্ন ব্যক্তি নয়।

শনিবার

আজ আবার দোকানে গেল সে। সূর্য উঠেছিল, তাই ভেবেছিলাম তার স্কার্ফ না নিলেও চলবে। সে যখন হাঁটছিল, আমি বুড়ো লোকটার কথা ভাবছিলাম। কিছু একটা করা দরকার। বাড়িওয়ালাকে এ ব্যাপারে বিশ্বাস করা যায় না। ফ্রিজটা এখনো পরিষ্কার হয়নি। মাখনটা ওখানে রাখলে গন্ধ হয়ে যাবে। মনে হয়, সরাসরি কথা বলে কোনো কাজ হবে না। সে অপমানিত হতে পারে, ভান ধরতে পারে যে বুঝতেই পারছে না কিছু; কিংবা বলতে পারে যে সে গোসলখানায় কী করছে, তা জিজ্ঞেস করার অধিকার কারও নেই। আমি সময়ের কথা ভাবলাম, সে খুব সময়নিষ্ঠ। বাড়ির সবাই ধরেই নিয়েছে, নয়টা থেকে নয়টা তিরিশের সময়টা এই লোকের। নয়টার আগে কেউ গোসলখানায় ঢুকছে না। আমার তাকে নিশ্চিতভাবে জানানো দরকার যে আমি জানি, এভাবে সে চালিয়ে যেতে পারবে না।

আজ বিকেলে ঠিক করলাম, দুই স্বরের মহিলার ব্যাপারে জানতে হবে।

রাতে খাওয়ার পর আবার বুড়োর কথা ভাবলাম। তাকে জেগে বসে থাকতে বললাম যেন চার্চের ঘণ্টাটা শুনতে পাই। অ্যালার্মটা সেইমতো ঠিক করলাম।

রোববার

অ্যালার্ম শেষ হয়েছে নয়টা বাজার কুড়ি মিনিট আগে। তাকে বিছানা ছাড়ার জন্য মিনিট দশেক সময় দিলাম। ড্রেসিং গাউন আর স্লিপার পরে জিনিসপত্র নিল—সাবান, টুথব্রাশ, নোটবুক, অ্যান্টিসেপটিক, তোয়ালে, ঘরের চাবি আর তালা। নয়টা বাজার দশ মিনিট আগে সে গোসলখানায় ঢুকে দরজায় তালা দিল। সে বাথটাব পরিষ্কার করল ও তাতে পানি ভরল। আমি ভাবলাম, পানির আওয়াজে বাড়ির বাকি সব আওয়াজ চাপা পড়ে যাওয়া কত আনন্দের। সত্যিকারের বিলাস হলো বাইরের লোককে নিজের তৈরি শব্দ শুনিয়ে নিজে তাদের করা কোনো আওয়াজ না শোনা। ভাবলাম, গোসলখানাটা আমার নিজস্ব, যখন ইচ্ছা বেরোতে আর ঢুকতে পারি, এখানে আমি নিরাপদ।

সে নোটবুক আর ঘড়ি মেঝেতে রেখে বাথটাবে শুলো। আমি তাকে বললাম নিশ্চিন্তে থাকতে।

ঠিক নয়টায় খুঁড়িয়ে আসবার শব্দ শুনলাম, সে হাসল। পায়ের আওয়াজটা বাইরে থামল, দ্বিধাযুক্ত পায়চারি শেষে ফিরে এল। ঘড়িতে নয়টা বাজতেই তাকে বললাম পানির শব্দ করতে। বিশ মিনিট পেরোতেই পায়ের আওয়াজ অধৈর্য হয়ে উঠল। দরজায় একবার টোকার আওয়াজ হতেই তাকে বললাম কিছুই না বলতে। সে হাসি থামাবার জন্য হাত দিয়ে মুখ ঢাকল।

টোকা ক্রমে ধাক্কায় পরিণত হলো। দুটো মুঠিতে কিল দিচ্ছিল সে, ‘আমাকে ঢুকতে দাও’, চিৎকার করে অনুনয় করছিল।

নয়টা তিরিশে ধাক্কা থামল। বুড়ো একটা দম বন্ধ করা শব্দ করল—রাগ আর হতাশামিশ্রিত। খুঁড়িয়ে চলা আওয়াজ নেমে গেল। দ্রুত, প্রায় দৌড়ের মতন দু–তিন ধাপ যাবার পর ধপাস করে পড়ার শব্দের সঙ্গে তীব্র আর্তনাদ মিলিয়ে গেল। অন্যান্য দরজা খোলার শব্দ পেলাম।

সে বাথটাব থেকে ওঠার উপক্রম করছিল, কিন্তু আমি বললাম যেখানে আছে সেখানেই থাকতে। সে শুয়ে শুয়ে নিজের গোলাপি আঙুল পানিতে ভাসতে দেখল আর আমি শুনতে থাকলাম। জানি যে গোসলখানার দরজা ঠিকমতো আটকানো আছে।

কিছুক্ষণের জন্য জিতলাম আমি।

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।