আলো ছড়াচ্ছে আশুগঞ্জের আশ্রয় বিদ্যাপীঠ

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ : ৪:২৫ অপরাহ্ণ ১৩১৩

মিজানুর রহমান: বিবেকের তারণায় মানবতার পক্ষে ফেইসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন এক যুবক। আর সেই স্ট্যাটাসে অনুপ্রাণিত হয়ে এক হয়েছেন কয়েকজন যুবক। সিদ্ধান্ত হলো মানবতার পক্ষে কাজ করার। তারপর ২০১৭ সালের ১৪ এপ্রিল আশুগঞ্জের মেঘনা ব্রিজের নিচে পহেলা বৈশাখের মেলায় ৪৫০ লিটার মিনারেল পানি তৃষ্ণার্ত মানুষকে বিনামূল্যে পান করিয়ে তৃষ্ণা নিবারন করা হলো। সেই থেকেই শুরু আশ্রয় বিদ্যাপীঠের কাজ।

পরবর্তীতে সংগঠনটি বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কাজ করতে থাকে। যেমন, সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের মধ্যে শিক্ষা ব্যাবস্থা,দুর্যোগ মোকাবেলায় স্বেচ্ছাসেবেক হয়ে কাজ করা ও ত্রাণ বিতরণ করা,ঈদে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদেরকে জামা কাপড়সহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী দেওয়া, এতিম ও দরিদ্রদের মাঝে সাহায্য হাত বাড়িয়ে দেয়া। স্বাস্থ্যসেবায় ফ্রি ক্যাম্প আয়োজন করে অসহায় মানুষের সেবা করা, রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণ সংগ্রহ এবং স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচিসহ আরো অনেক সেবা।

প্রথমে ১০৩ জন শিশু শিক্ষার্থী নিয়ে কার্যক্রম শুরু করে আশ্রয় বিদ্যাপীঠ। এই স্কুল নিয়ে প্রথমে অনেক হিমশিম খেতে হয় তাদের । তারপর সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুবিধা বঞ্চিতদের শিশুদের স্কুলের যাবতীয় উপকরণ বই, খাতা, কলম, পেন্সিল, বিনা মূল্যে দিয়ে সপ্তাহে তিন দিন ক্লাস করানো হয়।
এই আশ্রয় বিদ্যাপীঠ স্কুলে প্রতি বৃহস্পতিবার, শুক্রবার ও শনিবার বিকাল ৩:৩০ থেকে ৫ টা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের পড়ানো হয়। সম্মিলিত চেষ্টা আর গুণীজনের পরামর্শে শুরু করেন স্কুলের সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা ব্যবস্থা। এর সাথে শিশুদের বিভিন্ন খেলাধুলা আরো অন্যান্য যাবতীয় সু ব্যবস্থা। শুধু তাই নয়,প্রতিটি জাতীয় দিবসে এই সব শিশুদের সামনে জাতীয় দিবসের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়, তাদের নিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও প্রতিযোগিতা মূলক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়!
পালিত হয় একুশে ফেব্রুয়ারি এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। অমর একুশে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান, নাচ, নাটক, কবিতা আবৃত্তি এবং খেলাধুলার বেশ কিছু আয়োজন।
কুরবানী ঈদে সুবিধাবঞ্চিত পরিবারদের হাতে মাংস তুলে দেওয়া হয়। যা ব্রাক্ষণবাড়িয়াতে প্রথম ও পুরো বাংলাদেশে ঈদের দিন এই কার্যক্রম কোথাও অনুষ্ঠিত হয় না।
এক দিনের জন্য বিলাসিতার আয়োজন করা হয় ঈদের দিন পথ শিশুদের একটি ভালো রেস্টুরেন্টে খাবার খাইয়ে।

এছাড়াও শীতে আয়োজন করা হয় উইন্টার প্রজেক্ট। যাতে দেশের প্রান্তিক জেলাগুলোতে আশ্রয় বিদ্যাপীঠ এর পক্ষ থেকে শীত বস্ত্র বিতরণ করা হয়।
প্রতি বছর প্রায় ২৫০ জন শিশু নিয়ে ইফতারের আয়োজন করা হয়।
তখন আশুগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন গণ্যমান্য ব্যক্তি উপস্থিত থাকেন।

তারপর শুরু হয় আশুগঞ্জ উপজেলার দরিদ্র ও এতিম শিশুদের সাহায্য করা করা। প্রজেক্ট স্বাবলম্বী এর মাধ্যমে প্রতি বছর আশ্রয় বিদ্যাপীঠ এর প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে ৫ টি পরিবারকে স্বাবলম্বী করা হয়। যেখানে পুরো সহযোগিতা করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশ। প্রতিটি পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয় ছোট ব্যবসার উপকরন যেমন, সেলাই মেশিন,মুড়ি বিক্রির জিনিস পত্র, ডিম ও ডিম বিক্রির জিনিসপত্র।

এবং বিভিন্ন দুর্যোগে আশুগঞ্জ আশ্রয় বিদ্যাপীঠ স্বেচ্ছাসেবক হয়ে কাজ শুরু করেন। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে বিভিন্ন ধরনের ত্রাণ বিতরণ করেন।

গতবছর কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার আদমপুর গ্রামে বন্যার্তদের মাঝে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করার জন্য চাল-ডাল, নারিকেল, কিসমিস, সেমাই, মেহেদি ইত্যাদি বিতরণ করা হয়।

অতিবৃষ্টিতে রাঙ্গামাটি পাহাড় ধসে পড়ে যাওয়ার পর আশুগঞ্জ আশ্রয় বিদ্যাপীঠ সংগঠনের তরুণরা চলে যায় রাঙ্গামাটির পাহাড়ি অধীবাসিদের কাছে এবং বিভিন্ন ত্রাণ বিতরণ করা হয় সেখানে।

রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রান নিয়ে ছুটে যায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। সেখানে কমপক্ষে ৫০০ রোহিঙ্গদের কে চাল, ডাল, প্লিট, সাবান, গ্লাস , দুই প্যাকেট এলার্জি বিস্কিুট, তিন প্যাকেট গুড়া দুধ, চিড়া, গুড়, কিছু খাবার স্যালাইন, মোমবাতি এবং দিয়াশলাই ইত্যাদি দেওয়া হয়।

বিনামূল্যে চিকিৎসা ক্যাম্প। গত বছর প্রায় ৩০০ মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসা এবং বিনামূল্যে ব্লাড গ্রুপিং করা হয়। বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে ব্লাড গ্রুপিং করেন এবং স্বেচ্ছায় রক্তদানের উৎসাহিত করে তোলেন ।
গত তিন বছরে আশুগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৩-৪ হাজার মানুষকে তারা রক্ত দিয়েছেন।
কোন মুমূর্ষু রোগীদের রক্তের প্রয়োজন হলে আশুগঞ্জ উপজেলার ভিতরে কোন রকম খবর পেলে অনায়াসে স্বেচ্ছায় রক্ত দিতে চলে আসেন আশ্রয় বিদ্যাপীঠ সংগঠনের তরুণরা।
আশুগঞ্জ উপজেলা সহ তাদের সদস্য প্রায় ৩ হাজার এর বেশি সদস্য রয়েছেন । এর মধ্যে ৩১ জন সদস্য সার্বিক তত্ত্বাবধানে রয়েছেন।

বিশেষ করে সাতজন ব্যক্তি পুরো টিম পরিচালনা করেন মোঃ আশিক, সাদ্দাম, নাজমুল, ফাহিম, আকরাম, মোহাম্মদ এরশাদ ও মোহাম্মদ ফারুক তাদের মাধ্যমে বিভিন্ন গ্রুপের রক্ত সংগ্রহ থাকেন ।

আশ্রয় বিদ্যাপীঠ সংগঠনের অন্যতম সদস্য এরশাদ সাহেব তেপান্তর কে জানান, মানবতার শ্রেষ্ঠ দান হাসিমুখে রক্তদান। রক্তদান একটি মহৎ কাজ। এতে জাগ্রত করে মানবিক অনুভূতি। রক্তদান করা মানে মানবতার কল্যাণে পাশে থাকা। আমাদের এক ব্যাগ রক্ত হাসি ফোটাতে পারে একটি মুমূর্ষু রোগী ও তার পরিবারের। যেকোনো দানের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ দান স্বেচ্ছায় রক্তদান । আমাদের চোখের সামনে রক্তের অভাবে মারা যেতে দেখেছি অনেক মুমূর্ষু রোগী। নিজের কানে শুনেছি কত পরিবারের আর্তনাদ। এজন্য রক্তের অভাবে একটি প্রাণ যাতে না হারায়-সেজন্য স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করছি আমাদের আশুগঞ্জ আশ্রয় বিদ্যাপীঠ। এছাড়াও আরো অনেক মানবিক বিষয় নিয়েও আমরা কাজ করি।

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।