পকেট ভারি ও তৈলবাজী করছে ফেইসবুক ভিত্তিক সংগঠনগুলো

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ : ৭:২৫ অপরাহ্ণ ১৯০৬

আসাদুজ্জামান আসাদ: ফেইসবুক ভিত্তিক সামাজিক সংগঠনের সংখ্যা আমাদের ব্রাহ্মনবাড়িয়ায় একেবারেই  কম নয়। বিভিন্ন নামে ও কর্মকান্ড নিয়ে রয়েছে প্রায় শতাধিক এক্টিভ গ্রুপ। একটি ঘটনার নিরিখে বাস্তব আমার অভিজ্ঞতার খণ্ডচিত্র তুলে ধরার চেষ্ট করছি।

আমার চোখে বিষয়টি অসঙ্গতি মনে হলেও সমাজের একটা বৃহৎ অংশের কাছে সেই সংগঠন স্বীকৃত এবং প্রতিষ্ঠিত। তাই সেই সংগঠন এবং এডমিনদের নাম আমি প্রকাশ করলাম না।

নিজেদের গ্রুপ চ্যাটে দুই-তিনজন গ্রুপ এডমিন সমান গতিতে তাগদা দিচ্ছেন গ্রুপের অন্যান্য সদস্যদের। আগামীকাল সকাল ১০টায় টাউন হলে সবার থাকতে হবে। সবাই অবশ্যয় আসবেন। সাথে করে ১০জন করে নিয়ে আসবেন। গ্রুপের সদস্যরা কিছু বুঝুক আর না বুঝুক ‘লাইক’ দিয়ে এডমিনদের নির্দেশনাকে সমর্থন দিচ্ছেন।

পরেরদিন সকাল সাড়ে নয়টায় ৪/৫জন উৎসাহী যুবক টাউন হলের আশপাশে উপস্থিত হলেন। এর কিছুক্ষণ পর আরও ২/৩জন যুবক আসলেন। মূল নির্দেশনাকারী সেই এডমিনদের একজন ফোন ধরছেন না, আর আরেকজন বলেই যাচ্ছেন, ‘এইতো আসছি, আর কিছুক্ষণ। সকাল ১১টায় সবাই একত্রিত হলেন। কয়েকজন বৃদ্ধ এবং শিশু  হাজির  হল সেখানে। অনুষ্ঠানস্থলে তাদের সামনের দিকে বসিয়ে পিছনের সিট গুলো ভরাট হল সদস্যদের সাথে আসা বন্ধুবান্ধব দিয়ে। কিছুক্ষন পর এসপি,ডিসি ও মেয়র সবাই এলেন। এত লোক দেখে সবাই খুশি। যার যার বক্তব্য দিলেন হাতে গুনা কিছু অসহায় মানুষের হাতে তুলে দিলেন কাপড়। প্রোগ্রাম শেষ।সবাই হাসিমুখে চলে গেলেন।

এবার মূল ঘটনায় আসি। পথশিশুদের এবং অসহায় বৃদ্ধাদের কাপড় দেয়া হবে স্লোগানে টাকা তোলা হয় ওই গ্রুপের সদস্য সবার কাছ থেকে। যার বেশির ভাগই প্রবাসী।   উত্তোলনের টাকা থেকে সামান্য খরচ করে প্রোগ্রাম করে ছবি তোলে তা ফেইসবুকে সফল  প্রোগ্রাম দেখিয়ে প্রতারণা করে অধিকাংশ  টাকা এডমিনদের পকেটে ঢুকানো হয়েছে।

এসব ঘটনা এখনকার সময়ে হরমেশাই ঘটছে। দূর-দূরান্তে অবস্থান করে আঞ্চলিক একটি নাম সংগঠনের নামের আগে জুড়িয়ে কেল্লা-ফতেহ। ব্যস, অল্প সময়ে আঞ্চলিকতার টানে একটা এলাকার সবাই যুক্ত এই ফেইসবুক গ্রুপে। প্রথমদিকে এডমিনরা আকুতি-মিনতি করে সবাইকে যুক্ত হওয়ার আবেদন করে। একটা সময় গ্রুপটি প্রতিষ্ঠিত হলে সেই এডমিনদের ভাব-সাব পরিবর্তন হয়ে যায়। এমন করেই চলছে আমাদের আজকের দিনের অনেক ডিজিটাল সামাজিক সংগঠন। অবশ্য প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য এরা মাঝে মধ্যে ফেইসবুক নির্ভর ‘শীত-বস্ত্র বিতরণ’ ‘শিক্ষা-সামগ্রী বিতরণ’ ‘ঝাড়– দিয়ে রাস্তা পরিষ্কার’ ‘বন্যা কবলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো নির্ভর ব্যানার – ফেস্টুন টাঙানো’ ‘যানজট নিরসনে সবার সহযোগীতা চাই’ এমন সব দৃষ্টিগোচর কর্মকান্ডে একদিন করে সময় ব্যয় করে। ওইদিন কর্মসূচি শেষে প্রশাসনের দুই-একজন কর্মকর্তাকে ফুলের তোড়া দিয়ে অভ্যর্থনা জানানো হয়। যেন কাজটি সেই প্রশাসনিক কর্মকর্তা করেছেন। আর ছবি তো উঠাতেই হবে। এমন তেলবাজি আগে শুধু জানতাম রাজনীতির মধ্যে আছে কিন্তু এখন সামাজিক সংগঠনের মাঝে এই তেলবাজিটা আমাকে আহত করেছে।

উপরের কার্যকলাপের চিত্র বাস্তবতায় ভিন্ন। আগেকার সময়ে সামাজিক সংগঠন করতে আমাদের বাবা-চাচা, মামাদের কি অক্লান্ত পরীশ্রমই না করতে হতো। তাঁদের কাছ থেকে শুনেছি, দিন রাত পরিশ্রম করে, নিজেদের পকেটের খুচরা টাকা একত্রিত করে সমাজের বিভিন্ন কাজে ব্যয় করতেন। এলাকার সম্মানিত মানুষ জানতেন ওমুক-তমুক সমাজের জন্য কাজ করছে। তাঁদেরকে সবাই চিনতো-জানতো, ভালোবাসতো। আর আজকের সময় ফেইসবুকে নিজেদের ইচ্ছেমতো প্রকাশ করতে পারলেও বাস্তবে এদের অনেককেই সমাজের মুরুব্বিরা চিনে না, জানেও না। এরা হঠাৎ বৃষ্টির মতো আসে, আবার চলেও যায়। আগেকার সংগঠনের সমাজকর্মী আর এখনকার সমাজকর্মীদের মধ্যে পার্থক্য হলো, আগে যুবকরা কাজ করতেন সমাজের পরিবর্তনের জন্য, অসঙ্গতি দল করার জন্য আর এখন যুবকরা কাজ করে নিজেদেরকে প্রকাশ করার জন্য।  বর্তমানে সমাজকর্মী (ফেইসবুক)-দের ব্যাপারে অবশ্য অনেকের দ্বিমত আছে। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে যদিও এদেরকে কেউ চিনে না, জানে না। তবে একটা নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠী এদেরকে ঠিকই চিনে, জানে। দেশের বাইরে বসবাসরত একজন কমিউনিটি নেতাকে বলতে শোনেছি, ‘এখনকার সময়ে স্বার্থ ছাড়া কেউ কিছু করে না। এরকম দুই-একজন সমাজকর্মী না থাকলে আমাদের বিভিন্ন কাজ করার যুবক খোঁজে পাওয়া যাবেনা। এরা কাজ করে আমাদের পাঠানো টাকার একটা অংশের লোভে আর আমরা আমাদের সংগঠনের কাজটাও এদের দিয়ে সারিয়ে নিতে পারছি।’ কথাটা গায়ে লেগেছে। কারণ, আমিও যুবক। আমিও সমাজের জন্য কাজ করতে চাই। কিন্তু এমন অপমান মেনে নিতে পারিনি। অবশ্য বয়সে উনি আমার বাবার বয়সী তাই প্রতিবাদ করারও প্রয়োজন বোধ করিনি। একজন প্রশাসনের কর্মকর্তাকে বলতে শোনেছি, ‘তাঁদের অনেক কর্মকাণ্ড সমাজের পরিবর্তনে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে’।  আমার জানামতে, ৪-৫ বছর আগে একটি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে একজন ক্যান্সার রোগী মানুষের জন্য টাকা উত্তোলন করে চিকিৎসার জন্য তাঁর পরিবারকে দেয়া হয়। সেই উত্তোলিত টাকার একটা বিশেষ অংশ সেই প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির কাছে এখনো গচ্ছিত আছে। কিন্তু তিনি সেই টাকার কোন হিসেব কিংবা অস্তিত্ব কাউকে জানাচ্ছেন না। এভাবে হয়তো অনেকেই এরকম বিভিন্ন সমাজকর্ম করে অব্যবহৃত টাকা নিজের মনে করে গচ্ছিত রেখে দেন। কিন্তু এর হিসেব কাউকে দিচ্ছেন না। এরকম সমাজকর্মীদের সংখ্যা এখন দিনদিন বাড়ছে।  বলা বাহুল্য, সমাজের কাজ করতে গিয়ে অনেক যুবকের মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। তাঁদের জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিবাহিত হয় মানুষের উপকারে ব্যয় করে। এই মহান কর্মে যে বা যারাই কাজ করে তাদের সম্মান জানানো আমাদের কর্তব্য। কিন্তু প্রকৃত সমাজকর্মের আড়ালে নিজেদের আখের গোঁচাতে যে বা যারা ব্যস্ত তাদের প্রতি ঘৃণা জানানোর ভাষা আমার মস্তিষ্ক সংগ্রহশালায় নাই।

লেখক: সংবাদকর্মী

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।