রমরমা বাণিজ্য: ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে চড়া দামে ঔষধ বিক্রি

১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ : ২:২১ অপরাহ্ণ ৭১৮৫

আসাদুজ্জামান আসাদ: ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জীবন রক্ষাকারী ঔষধের মূল্য আগের থেকে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আগে ঔষধের গায়ে লিখা মূল্যের থেকে ১০ থেকে ১২% ছাড় পাওয়া যেতো। কিন্তু এখন ঔষধের প্যাকেটের গায়ে লিখা মূল্যেই গ্রাহকদের ঔষধ কিনতে হচ্ছে। শুধু তাই নয়, এই সিস্টেমে ঔষধ বিক্রি করতে বাধ্য করা হচ্ছে ফার্মেসী গুলোকেও। যদি তারা এর থেকে সামান্য কম মূল্যেও ঔষধ বিক্রি করেন তাহলে দোকানদারদের শাস্তি দেওয়া হবে বলে তাদের নীতিমালায় বলা হয়েছে। একই সাথে “কম মুল্যে ঔষধ বিক্রি করলে শাস্তি পেতে হবে” এই মর্মে লিফলেট লাগানো আছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের অনেক ঔষধের দোকানে। বাংলাদেশ কেমিস্টস এন্ড ড্রাগিষ্টস সমিতির ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শাখা এই সিস্টেম চালু করেছে। ফলে ঔষধ ব্যাবসায়ীরা লাভবান হলেও লোকশান গুনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষের। শুধু লোকশান নয়, ভুক্তভোগীরা বলছেন ঔষধ ব্যাবসায়ী ও তাদের সমিতি মিলে জিম্মি করেছে অসহায় রোগীদের।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে “বাংলাদেশ কেমিস্টস এন্ড ড্রাগিষ্টস সমিতি”র কেন্দ্রীয় কমিটির নির্দেশে ঔষধের গায়ে লিখা MRP দামে ঔষধ বিক্রয় শুরু করা হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায়। এতে করে আগের থেকে প্রায় ৫থেকে ৬গুন বেশি লাভবান হচ্ছেন খুচরা ঔষধ ব্যবসায়ীরা । অপরদিকে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন সাধারণ জনগন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে ডাক্তার দেখাতে আসা কসবার নারগিস আক্তার বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ডাক্তার দেখিয়ে এখান থেকেই ঔষধ নিয়ে যায়।কারন আমাদের ওখান থেকে কিছুটা কম দামে ও ভাল ঔষধ এখানে পাওয়া যায়। কিন্তু এখন তো আমাদের ওখানে এবং এখানে একই দাম।

মধ্যপাড়ার তাসলিমা আক্তার বলেন,ভালো ঔষধের আশায় এবং কিছুটা কম দামের জন্যই এদিকে আসি ওষুধ নিতে। আগে ১২% পর্যন্ত ছাড় পেতাম কিন্তু এখন আর  তা পাচ্ছি না। কিন্তু একজন রোগীর জন্য ঔষধ না কিনেও কোন উপায় থাকেনা। তাই বাধ্য হয়েই মানুষ বেশি দাম দিয়ে ঔষধ কিনছে। আমি মনে করি সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে এটা করা হয়েছে। এতে সাধারণ  মানুষ খুবই অসন্তুষ্ট।

সুলতানপুর গ্রামের বৃদ্ধ মীরকাশেম মিয়া বলেন,ওষুধের দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন আর পুরো মাসের ওষুধ নিতে পারি নাই। আগে যেই ঔষধগুলো নিতাম ১২৫০ টাকায় এখন ওইগুলোই ১৫০০টাকায় নিতে হচ্ছে। তাই এবার ঔষধ কমিয়ে নিয়েছি।

এ ব্যপারে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কে দাস মোড়ের খুচরা বিক্রেতা নিউ ফার্মেসির মালিক রজত সাহা জানান, MRP তে ঔষধ বিক্রয় করে আমরা আনন্দিত, কারন আগে ঔষধ প্রতি ২-৩%লাভ হত,কাষ্টমার ধরে রাখতে ১০থেকে১২% ছাড় দিতে হত। এখন আর ছাড় দিতে হচ্ছে না, তাই প্রায় ১৫% অব্দি লাভ থাকছে।তবে এর একটি বড় সমস্যাও আছে। তা হলো, এখন শহর এবং  গ্রামে একই দামে ঔষধ পাওয়ায় মনে হচ্ছে কাষ্টমার এর সংখ্যা কমে যাচ্ছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া নিউ মার্কেটের পাইকারি ও খুচরা বিক্রয় প্রতিষ্ঠান আশরাফ মেডিকেল হলের মালিক নাজির আহমেদকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি তেপান্তরকে বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া কেমিস্টস এন্ড ড্রাগিষ্টস সমিতির নির্দেশে আমরা  ঔষধের গায়ের দামে বিক্রয় করছি। এখন আগের তুলনায় আমাদের লাভ বেশি হচ্ছে তা সত্যি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালের কম্পাউন্ডে অবস্থিত হোসনে আরা মেডিকেল হলের বিক্রেতা আল আমিন বলেন,আগে আমাদের কোম্পানির দেয়া রেইট থেকে ১০-১২% কমে বিক্রয় করতে হত ঔষধ। এখন আর ছাড় দিতে হচ্ছে না, তাই মালিকের লাভ হচ্ছে বেশি। সদরে আসা রোগীরা বেশিরভাগই গরীব। ওদের ছাড় দিয়ে বিক্রি করার ইচ্ছা থাকলেও উপায় নেই। কারন ঔষধ সমিতির আদেশ।

ডাঃ ফরিদুল হুদা রোডের সব চাইতে বড় ফার্মেসি মেসার্স আল-শিফার প্রোপাইটর এইচ এম মুরাদ কে তেপান্তর থেকে এই ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে ওনি কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বললেন, আমার কিছু বলার নেই। আপনি ঔষধ সমিতির ওদের সাথে কথা বলেন। আমাদের দেয়ালে তাদের দেয়া নির্দেশনা দেয়া আছে ওইটা দেখেন। আর কাষ্টমাররা এই সিদ্ধান্তে প্রথমে নাখোশ থাকলেও এখন রোগীদেরও সয়ে গেছে। গায়ের মূল্যে ঔষধ কিনতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন রোগীরা।

এবিষয়ে জানতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কেমিস্টস এবং ড্রাগিস্টিস সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোঃ আবু কাউসার এর সাথে ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি তেপান্তর কে বলেন, আমরা আদেশ দেয়ার কেউ না। আমরা অনুরুধ করতে পারি। আমরা ওনাদের অনুরুধ করেছি। এইটা আমাদের বাংলাদেশ কেমিস্টস এন্ড ড্রাগিষ্টস সমিতির সভাপতি আলহাজ্ব সাদিকুর রহমানের ঘোষনা যে, সারা বাংলাদেশে জানুয়ারি থেকে MRPবাস্তবায়ন করা। কোন জেলা যদি এখনও MRP বাস্তবায়নে না এসে থাকে এইটা ওই জেলাতে লেগিংস আছে। আমাদের পার্শবর্তী কুমিল্লা জেলায় ও ঢাকায় MRP বাস্তবায়ন হয়েছে। নকল এবং ভেজাল রুধ করার জন্যই আমরা MRP বাস্তবায়নের উপর জোর দিয়েছি। আমরা সবাই তো ভাল না। সকল ঔষধ ব্যবসায়ীরা যে ১০০% ফেরেস্তা সেটা কিন্তু বলব না আমি।তাদের ফাইন্ড আউট করার দায়িত্ব যেমন আমাদেরও আছে, সরকারেরও আছে। সরকার ধরে ওদের শাস্তি দিক এইটা আমিও চাই। নকল এবং ভেজাল ঔষধের বিরুদ্ধে অভিজানেরই অংশ সরকার নির্ধারিত মূল্যে ঔষধ বিক্রয় কার্যক্রম। যা সারা দেশে বাস্তবায়নের ঘোষনা দিয়েছে আমাদের কেন্দ্রিয় সভাপতি। আমরা তার ই নির্দেশে চেষ্টা করছি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বাস্তবায়ন করতে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালের একজন ডাক্তার বলেন,ফার্মেসি ব্যবসায়ীরা রোগিদের ঔষধ ১০-১২% ডিস্কাউন্ট দিয়ে এতদিন ব্যবসা করে আসছিলেন।নকল ওষুধ রোধের নামে কেমিস্টস সমিতির এই উদ্যোগ ঔষধ ব্যবসায়ীদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত লাভবান করে কি ফলাফল পায় সেইটা ই দেখার বিষয়।

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।