অস্তিত্ব সঙ্কটে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐতিহ্যবাহী হরিপুর “বড়বাড়ী”

২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ : ৬:০৭ অপরাহ্ণ ৮৯১

আসাদুজ্জামান আসাদ: ব্রাহ্মণবাড়িয়যার নাসিরনগর উপজেলার হরিপুর গ্রামে তিতাস নদীর পূর্বপ্রান্তে হরিপুর জমিদার বাড়ি কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তিতাস নদীর তীরে এই ঐতিহ্যবাহী বাড়িটিকে কেউ বলে রাজবাড়ি , বড়বাড়ি আবার কেউ বলে জমিদার বাড়ি। নাসিরনগর থেকে মাধবপুর যাওয়ার পথে উপজেলার শেষ সীমান্তে হরিপুর গ্রামের রাস্তার পশ্চিম পাশে তিতাস নদীর পাড়ে অবস্থিত এই বাড়িটি। বাড়ির সামনেই রয়েছে চোখে পড়ার মত দুইটি মট বা গম্বুজ। তিনতলার সুবিশাল এই বাড়িটির পূর্ব পাশে নাসিরনগর-মাধবপুর সড়ক। বাকি দিকে তিতাস নদীর ফাঁকা জায়গা। অনেক বড় বারান্দা ডিঙিয়ে মূল বাড়িতে ঢুকতে হয়।

নান্দনিক স্থাপত্য শৈলিতে নির্মিত বাড়িটিতে সরেজমিনে দেখা যায়,বাড়ির বাইরের অবয়বটি অবিকল রয়ে গেছে। আছে কারুকাজ খচিত দেয়াল,স্তম্ভ ও কার্নিশ। সব কয়টি কক্ষের পুরানো সেই দরজা নেই। বর্তমানে বসবাসকারীরা সাধারণ মানের দরজা লাগিয়ে বসবাস করছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৫০ টি পরিবার রয়েছে এখানে। ১০ থেকে ৭০ বছর ধরে তাদের বসবাস।

বাড়িটি দেখার জন্য এখনও দেশের বিভিন্ন  স্থান থেকে লোকজন বনভোজনে আসেন। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে তিতাসে যখন পানি থৈ থৈ করে তখন বাড়িটির সৌন্দর্য আরো বেড়ে যায়। মাঝে মধ্যে কেউ ছবির শুটিং করতে আসলেই বাড়িটিতে সংস্কারের ছোঁয়া লাগে, এছাড়া নয়। দিনকে দিন বাড়িটি সৌন্দর্য হারাতে বসেছে। এক সময়ে ঐতিহ্যবাহি নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা হরিপুর জমিদার বাড়ির নদীর ঘাট থেকেই শুরু হত।

এ বাড়িতে মধুমালতি, ঘেটু পুত্র কমলা এবং নাইওরীসহ অনেক ছবি চিত্রায়িত হয়েছে। এলাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বললে উনারা জানান, এতো পুরাতন বাড়িটি এখনো কোন সংস্কার হয়নি। সরকার যদি বাড়িটিকে একটু সংস্কার করতো এবং যারা এখানে বসবাস করে তাদের অন্য কোন স্থানে স্থানান্তর করা হতো তবে এটি হয়ে উঠত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অন্যতম পর্যটন স্থান।

বর্তমানে বাড়িটির ভিতরের অবস্থা অনেক খারাপ। ময়লা, আবর্জনা, গরুর গোবর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।আর তাই দিন দিন কমে যাচ্ছে পর্যটক।এইভাবে হয়ত একদিন হারিয়ে যাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এই ঐতিহ্যবাহী বাড়িটা।

জানা যায়,প্রায় ১৭৫ বছর পূর্বে জমিদার গৌরী প্রসাদ রায় চৌধুরী ও কৃষ্ণ প্রসাদ রায় চৌধুরী বাড়িটি নিমার্ণ করেন। বৃটিশ আমলে নির্মিত বাড়িটির নিমার্ণ শৈলী বড়ই মনোরম। ১৩৪৩ বাংলার ১২ চৈত্র (দোল পূর্নিমা) তারিখে কৃষ্ণ প্রসাদ রায় চৌধুরীর মূত্যুর পর পর্যায়ক্রমে বাড়িটির উত্তরাধিকার হন হরিপদ রায় চৌধুরী ও শান্তি রায় চৌধুরী। তাদের কাছ থেকে বাড়ির মালিকানা ও জমিদারি আসে উপেন্দ্র রায় চৌধুরী ও হরেন্দ্র রায় চৌধুরী। কালক্রমে ১৯৪৭ সালে দেশ বিভক্ত হওযার পর জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ হলে তারা বাড়িটি ফেলে কলকাতায় চলে যান।

জমিদাররা বাড়িটি ফেলে যাওয়ার সময় পুরোহিতদের রেখে যায়। এখনও জরাজীর্ণ জমিদার বাড়িতে পুরোহিতদের বংশধরেরা বসবাস করছে। বাড়িটির দেয়ালের অধিকাংশ পলেস্তারা খসে পড়ছে,আর সেখানে জমেছে শেওলার আবরণ।

দৃষ্টি নন্দন কারুকাজের খুব অল্পকিছু অংশই বিলীন হতে বাকি আছে। জনশ্রুতি আছে, মেঘনা তথা তিতাসের পূর্বপ্রান্তে এত বড় বাড়ি আর কোথাও নেই। প্রায় ৪৮০ শতাংশ জমির উপর প্রতিষ্ঠিত তিনতলা জমিদার বাড়িটিতে প্রায় ৬০টি কক্ষ,রং মহল,দরবার হল,ধানের গোলা,গোয়ালঘর, রান্নার ঘর,নাচ ঘর, মল পুকুর,খেলার মাঠ,মন্দির ও সীমানা প্রাচীর রয়েছে। বিশাল আয়তনের বাড়িটির পুরো ভবনের কোথাও কোন রডের গাঁথুনি নেই।

লাল ইট সুরকির গাঁথুনি দিয়ে তৈরি ভবনের দুপাশে দুটি সুউচ্চ গম্বুজ সগর্বে মাথা তুলে দাড়িঁয়ে ঘোষনা করছে, জমিদার বংশের ঐতিহ্যের কথা। দু’তলায় উঠার ৬ দিকে ৬টি সিড়িঁ ও তিন তলায় উঠার ২ দিকে ২টি সিঁড়ি রয়েছে। বাড়তি পশ্চিম-উত্তর কোণে ৬টি বেড রুম এবং মল পুকুরের পূর্বপাড়ে ৪টি ও পশ্চিম পাড়ে ৪টি বেড রুম রয়েছে। বাড়ির পশ্চিম দিকে তিতাস নদীর পাড়ে পাকা ঘাটলার উত্তর দিকে কৃষ্ণ প্রসাদ রায় চৌধুরী ও দক্ষিণ দিকে গৌরী প্রসাদ রায় চৌধুরীর সমাধি মঠ রয়েছে ।

ছবি: তেপান্তর

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।