“ভিলেজ পলিটিক্স”র শিকার হয়ে মরতে হয়েছে বিজয়নগরের নাসিরকে

৫ জুন, ২০২০ : ৩:৫৫ অপরাহ্ণ ৮৬২

আসাদুজ্জামান আসাদ: গ্রাম্য রাজনীতি বা “ভিলেজ পলিটিক্স”র শিকার হয়ে মরতে হয়েছে বিজয়নগরের সেজামুড়া গ্রামের নাসির মিয়াকে। তেপান্তরকে এমনটাই জানিয়েছেন এলাকাবাসী। তারা বলেন, গ্রামে ক্ষমতা বিস্তার নিয়ে অভিযুক্ত কাউসার ও মৃত নাসির তাদের দুইজনের দুইটা দল ছিল।দুই দলই গ্রাম পরিচালনার জন্য ক্ষমতার দাপট দেখাতে ব্যস্ত ছিল। তাই কোন ইস্যু পেলেই একে অপরকে ফাসাতে চেষ্টা করতো।

এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৬ মে কাউসার ও তার দলবল নাসিরকে পিটিয়ে আহত করে। আহত নাসির ঢাকা একটি প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ২৯ মে মারা যান। নাসির বিজয়নগরের পাহাড়পুর ইউনিয়ন যুবলীগের যুগ্ন-সাধারন সম্পাদক ছিলেন। আর কাউসার ভুইয়া বিজয়নগর উপজেলা যুবলীগের যুগ্ন-সাধারন সম্পাদক। তবে কাউসার ও নাসির এ দুজনই মাদক ব্যাবসায়ী বলে এলাকায় গুঞ্জন আছে।

এ ঘটনায় গত ২৬ মে নাসিরের বাবা আবু শামা বাদী হয়ে যুবলীগ নেতা কাউসারকে প্রধান আসামি করে বিজয়নগর থানায় একটি মারামারির মামলা দায়ের করেন যা এখন হত্যা মামলায় রুপান্তরিত হয়েছে।

নাসির এর মৃত্যুর পর সরজমিনে সেজামুড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায় শোকের ছায়া। আর প্রধান আসামি কাউসার ভূইয়ার বাড়িতে ঝুলছে তালা। তালা বদ্ধ কাউসার ভূইয়ার মানবশূন্য বাড়ি

কাউসারের প্রতিবেশি ৭নং গ্রাম পুলিশ সাঈদ মিয়া জানান,ঘটনার পর থেকেই কাউসারসহ তার পরিবারের সবাই বাড়ি তালা দিয়ে পলাতক র‍য়েছে।তবে কাউসারের বাড়িতে কোন প্রকার হামলা বা লুটপাট হয়নি বলেও জানান তিনি।

নিহত আবু নাসিরের বাড়ি গিয়ে পাওয়া যায় তার স্ত্রী-সন্তান,মা ও বড় ভাইকে।নাসিরের বড় ভাই নিজাম উদ্দিনের কাছে নাসির হত্যার ব্যপারে জানতে চাইলে তিনি তেপান্তর কে বলেন,অতীতে কাউসার ভূইয়া এবং নাসির ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল।কিন্তু কাউসার নারীলোভী ও অবৈধ কর্মকান্ডের সাথে জরিত থাকায় নাসির তার সাথে বন্ধুত্ত রাখেনি। কাউসার আওয়ামীলীগের নেতা জাহাঙ্গীর মৃধার লোক হিসেবে এলাকার মানুষের সাথে ক্ষমতার অপব্যবহার করত।সেজামুড়া গ্রামের সবাইকে তাদের বাড়ির সামনে দিয়ে বাজারে যেতে হয় বিধায় গ্রামের মানুষকে জিম্মি করে রাখতো।
আমার ভাই পাহারপুর ইউনিয়ন যুবলীগের যুগ্ন-সাধারন সম্পাদক হওয়ার পর থেকেই সে আমার ভাইয়ের ক্ষতি করার চেষ্টা করতে থাকে। সে এলাকার মাদক ব্যবসায়ীদের গডফাদার ছিল, কিন্তু আমার ভাই তার এই অবৈধ ব্যবসার বিরুধীতা করায় তাকে পরিকল্পিত ভাবে হত্যা করে।থানায় মামলা করতে গেলে বিজয়নগর থানার ওসি প্রথমে মামলা নিতে চাইনি রাজনৈতিক চাপ আছে বলে।একদিন পর আমাদের দেয়া ১৭জন আসামির নাম থেকে ৮জনের নাম বাদ দিয়ে ৯জনের নামে মামলা নেয়।আবু নাসির এর বসত বাড়ি

নাসির এর স্ত্রী লিজা আক্তার তেপান্তর কে জানান,আমার দুটি সন্তান রয়েছে, একটি ছেলে ও একটি মেয়ে।আমার স্বামী নাসির একজন ভাল মানুষ ছিলেন।আমি তার হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবী জানাচ্ছি। যারা আমাকে বিদবা এবং আমার সন্তানদের এতিম করেছে তারা যেন ছাড় না পায়।নাসির এর স্ত্রী ও কোলের মেয়ে সন্তান

এসময় নাসিরের কবরস্থানে গিয়ে দেখা যায় প্রায় শতাধিক লোক তার কবরের সামনে দোয়া পড়ছে।দোয়া শেষে নাসিরের বাবা আবু শামা তেপান্তর কে বলেন,আমার ছেলে সৌদি আরবে ব্যবসায়ী ছিল,এবং এলাকায় পাথরের ব্যবসা ছিল তার।কাউসার এলাকার নামকরা থানার দালাল ও অবৈধ ব্যবসায়ী ছিল।তার জন্য বহুবার বিচার শালিস হয়েছে। তারা জরিমানাও দিয়েছে অনেকবার।কিছুদিন আগে পুলিশফাঁড়িতেও তার চাচা ক্ষমা চেয়ে এসেছে।কাউসার এলাকায় ক্ষমতা দেখিয়ে মানুষের কাছ থেকে অবৈধভাবে টাকা নিতো। তার ৪০ এর বেশি মেয়েদের সাথে সম্পর্ক ছিল।তাই নারী কেলেংকারিতে যুবলীগ থেকে বহিঃস্কার হলে গ্রামের মানুষের তার উপর আর আস্থা থাকে না।আমার ছেলে গ্রামের মানুষ নিয়ে এলাকার উন্নয়ন এর কাজ করতে গেলে সে হিংসার বশবর্তী হয়ে আমার ছেলেকে হত্যা করে। থানায় প্রথমে মামলা না নিতে চাইলেও পরে ৯জনের বিরুদ্ধে মারামারির মামলা নেয়।যা এখন আদালত হতে হত্যা মামলায় রুপান্তরিত হয়ে এসেছে।নাসির এর কবরস্থানে

সেখানে উপস্থিত মহিলা মেম্বার রেনু বেগম,মিন্টু মিয়াসহ গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দারা ও প্রত্যাক্ষ্যদর্শীরা জানান, আক্রমণের দিন নাসির মোটর সাইকেল নিয়ে আউলিয়া বাজার গেলে তার পিছু নেয় বিজয়নগর পূর্বাচল কলেজের প্রিন্সিপাল সোহাগ।সোহাগ কাউসারের বন্ধু ও অবৈধ কাজের ভাগিদার বলেও জানান তারা। আউলিয়া বাজার থেকে ফেরার পথে সোহাগ আগে থেকেই উৎপেতে থাকা কাউসার ও তার চাচাত ভাই আসাদ সহ সবাইকে জানিয়ে দেয় নাসির আসছে। নজরপুর মোড়ে স্পিড ব্রেকার থাকায় মোটর সাইকেলের গতি কমিয়ে দিতে হয় সেখানে।সেই জায়গায়ই উৎপেতে ছিল তারা।নাসির এখানে এসে তার মোটরসাইকেলের গতি কমালে পিছন থেকে আক্রমণ করে তারা।প্রথমে মাথায় বারি দিয়ে গাড়ি থেকে ফেলে দেয়, তারপর ১০-১২জন একসাথে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে আহত করে সেখান থেকে পালিয়ে যায়।
গ্রামবাসী আরো জানান যে,এলাকায় প্রভাব বজায় রাখতেই তারা নাসির এর উপর হত্যার উদ্দেশ্যে এই আক্রমণ করে।কারন কাউসার সেজামুড়া এলাকার মাদকের গডফাদার হিসেবে পরিচিত কিন্তু নাসির এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করছিল।যদিও আগে নাসির এবং কাউসার ঘনিষ্ট বন্ধু ছিল।

বিজয়নগর উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক রাসেল খান ও পাহারপুর ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি সেলিম ভূইয়া,সেক্রেটারি মোনায়েম খান সম্মিলিতভাবে তেপান্তরকে জানান,কাউসার এবং নাসির খুব ঘনিষ্ট বন্ধু ছিল।কিন্তু কোন এক কারণে গত বছর দুইয়েক আগে তাদের সম্পর্ক নষ্ট হয়। কাউসারকে নারী কেলেংকারি নিয়ে কিছুদিন আগে দল থেকে বহিঃস্কার করা হয়েছে।তাদের দুইজনের বিরুদ্ধেই আমরা মাদক ব্যবসার সাথে জরিত থাকার কথা শুনেছি কিন্তু দেখেনি কখনো।তবে নাসির ভাল ছেলে ছিল নিঃসন্দেহে। গ্রামে ক্ষমতা বিস্তার নিয়ে তাদের দুইজনের দুইটা দল ছিল।দুই দলই গ্রাম পরিচালনার জন্য ক্ষমতার দাপট দেখাতে ব্যস্ত ছিল।কোন রাজনৈতিক ইস্যু নয়,গ্রামের অন্তঃদ্বন্দ্ব নিয়ে নাসির কে হত্যা করা হয়েছে বলে আমারা মনে করি। হত্যাকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবীও জানিয়েছেন তারা।

এ ব্যাপারে বিজয়নগর থানার ওসি আতিকুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি তেপান্তর কে বলেন,থানায় মামলা নিতে চাইনি বা রাজনৈতিক চাপ আছে ব্যাপারটি মিথ্যা।আমরা মারামারি মামলা নিয়েছে এবং মারারিতে জরিত আছে সন্দেহে দুইজনকে গ্রেফতার করে চালান করেছি।গ্রেফতারকৃত দুইজন হলেন,হাফিজ চৌধুরী(৩৫),পিতা মৃত আব্দুর রশিদ চৌধুরী ও মকবুল(৩৪)- পিতা-মতি চৌধুরী।দুইজন ই সেজামুড়া গ্রামের।তবে এজহারভুক্ত কোন আসামি এখনো গ্রেফতার হয় নাই,তারা সবাই পলাতক রয়েছে।তাদের গ্রেফতারে প্রচেষ্টা চলছে, খুব শীগ্রই আসামীদের গ্রেফতার করব।আর মামলাটি বর্তমানে আদালতে আছে, হত্যা মামলায় রুপান্তরিত হয়ে এখনো থানায় আসে নাই।

  • 434
    Shares