শিপলুর আত্নহত্যা: নেপথ্যে প্রেম নাকি অন্য কিছু?

১৪ জুন, ২০২০ : ১১:০৮ অপরাহ্ণ ৮৮৪২

আসাদুজ্জামান আসাদ: মাহমুদুল হক শিপলু। ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে একজন সুনামধন্য গিটারিস্ট হিসেবেই পরিচিত তিনি। কিন্তু গত শনিবার হঠাৎ তার আত্নহত্যার ঘটনায় শহরে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তার এই মৃত্যুতে তার ভক্ত, পরিচিত ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। হাস্যোজ্জল, ভদ্র ও প্রতিভাবান এই যুবক কেন ফাসিতে ঝুলে আত্নহত্যা করেছে এই প্রশ্ন এখন সবার মুখে মুখে। অনেকে বলছেন প্রেম ঘটিত ব্যপারে এই আত্নহত্যার ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।

সরজমিনে তার লাশের কাছে গিয়ে দেখা গিয়েছিল ,খাটের উপর রাখা তার গিটার,গিটার এর পাশে রাখা দুইটা ডায়রি এবং ফ্লোরে পড়ে আছে দুইটা মোবাইল।এক পাশে খালি ঔষধের পাতা, ওপাশের সোফায় রাখা ছিল তার জন্য দেয়া সকালের নাস্তা রুটি,ডিম,ডাল। ছবি-গিটার,ডায়েরি, নাস্তা,মোবাইল
তার একটা ডায়েরি খোলা ছিল যাতে লিখা ছিল একটি গান এবং অপর পাতায় একটি শব্দ  Giveway.
ফ্লোরে পড়ে থানা মোবাইল এর লক স্ক্রিনে ভেসে ওঠে একটি বউ সাজা মেয়ের ছবি।খাটের উপর  উঠানো টি-টেবিল এবং তার উপর সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলে থাকা শিপলুর লাশ।ছবি-ডাইরিতে শিপলুর লিখা গান আর শেষ শব্দ Giveway

এ ব্যপারে শিপলুর পরিবারের সাথে কথা বলে জানা যায়,মোবাইলে ভেসে উঠা মেয়েটি শিপলুর স্কুল জিবনের প্রেমিকা সূচি(ছদ্ধনাম)।যার বিয়ে হয়েছে এবং স্বামী সন্তান নিয়ে সূদুর আমেরিকায় বসবাস করছেন।কিন্তু শিপলুর সাথে তার যোগাযোগ ছিল প্রতিনিয়ত। তাদের ধারণা সূচির সাথে কোন বিষয়ে ঝামেলা হওয়াতেই আত্নহত্যা করেছে শিপলু।

এ ব্যাপারে শিপলুর ছোট বোন নওরিন জানান, সকালে ঘুমিয়ে ছিলাম আমি,আম্মার চিৎকারে ঘুম ভাঙ্গে আমার।ভাইয়া ঘরের ভিতর কিছু একটা  করছে তা আম্মু কে ফোনে জানিয়েছে সূচি।তারপর আম্মা ভাইয়ার রুমের জানালা দিয়ে দেখে ভাইয়া ফ্যানের সাথে ঝুলছে। তখন আম্মা চিৎকার দিলে আমি ছুটে যায়,দরজা খোলার চেষ্টা করি।দরজ খুলতে না পেরে প্রতিবেশীদের ডাকাডাকি করি কিন্তু ওই সময়  কেউ আসেনি সাহায্যের জন্য।

সূচির সাথে ভাইয়ার যোগাযোগ ছিল তা আমরা জানতাম।কিন্তু কি কারনে এমনটা করেছে তা বুঝে উঠতে পারছি না।আমার ভাই ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট ছিল।কিন্তু তার ভালবাসার মানুষ সূচির কারনেই পড়ালেখা শেষ হয়ে উঠেনি তার।ইউনিভার্সিটি থেকে ড্রপ আউট হয়ে যায়।গানের সাথে ছিল তার দারুণ সখ্যতা।গান লিখত,গায়ত, গিটার বাজাত।

সংগ্রহিত ছবি-গিটারের সাথে শিপলু

মাঝে মাঝে ডিপ্রেশনে ভুগত,পড়ালেখা শেষ করতে না পারার জন্য।আব্বু আম্মুর আদরের ছিল সে তাই বাড়ির বাইরে  কোথাও গিয়ে কাজ করা ও হয়ে উঠত না তার।আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়া লোকাল ব্যান্ড গুলার সাথে গানের প্রোগ্রাম করত। সূচির বিয়ে হয়ে যাওয়ার কিছুদিন পর থেকে সে লোকাল ব্যান্ড গুলার সাথে প্রোগ্রাম করা ছেড়ে দেয়।তারপর একাধিক জায়গায় চাকরি করেছে।

গত ৬-৭ মাস যাবত ভাইয়ার  আচরনে পরিবর্তন আসে। পরে জানতে পারি  সূচির সাথে আবার প্রতিনিয়ত যোগাযোগ হচ্ছে তার।সূচি গত ঈদে তাকে টাকা পাঠাই ঈদ উপহার হিসেবে।কিছুদিন আগে মোবাইল ও পাঠিয়েছে।মাঝে একবার তাকে আমেরিকা পাঠাতেও বলেছিল।কিন্তু এই বিষয় গুলা আমাদের ভাল লাগত না।সূচি বিবাহিত হয়েও ভাইয়ার সাথে তার সখ্যতা দেখে ভাইয়াকে কিছুদিন আগে বিয়ের কথাও বলি আমরা ।কিন্তু তখন ভাইয়া আমাদের কথা হেসে উড়িয়ে দিলেও, আমার কাছে এখন মনে হচ্ছে এই ধরনের কিছু থেকেই সূচি এবং ভাইয়ার মাঝে কোন ঝামেলা হয়েছে।যার জন্য আত্নহত্যা করেছে ভাইয়া।

কারন আমি ভাইয়ার কাছ থেকে শুনেছিলাম তারা কোরআন শরীফে ছুঁয়ে বিয়ে ও করেছে।সূচি ভাইয়ার ফেইসবুকের পাসওয়ার্ডও জানে।ভাইয়ার আইডি থেকে আমাকে একবার ফোন দিয়েছিল।আর পারিবারিক ভাবে কোন ঝামেলা ছিল না ভাইয়ার।সবসময় হাসিখুশি থাকত,আম্মাকে সাথে নিয়া গান গায়ত।কিছুদিন আগে আব্বা ভাইয়াকে হোন্ডা কিনে দিতে চেয়েছিল কিন্তু ভাইয়া নিতে রাজি হয় নাই,অফিস থেকে পাবে তাই।

এই ব্যাপার শিপলুর প্রমিকা সূচির সাথে যোগাযোগ করলে সূচি তেপান্তর কে জানান,আমি আর শিপলু ২০০১ সাল থেকে পরিচিত,আমরা একি পাড়ায় থাকতাম। শিপলু অন্নদা স্কুলে পড়ত আর আমি মডেল স্কুলে।আমরা ক্লাসমেট ছিলাম তাই একি স্যার এর কাছে প্রাইভেট পড়তাম,সেখান থেকেই আমাদের মাঝে একটা সম্পর্ক তৈরি হয়।

স্কুল শেষে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরকারি কলেজেও আমরা একসাথে ছিলাম।আমাদের সম্পর্কের ৪-৫ বছর এর মাথায় আমাদের ব্রেক-আপ হয়ে যায়।ব্রেকআপ এর পরও শিপলু বারবার চেষ্টা করত সম্পর্কটা ঠিক করতে। ২০১২ সালে আমার পারিবারিক ভাবে বিয়ে হয়ে যায়।বিয়ের অনেকদিন পর সে জানতে পারে আমার বিয়ে হয়ে গেছে।তখন সে অভিনন্দন জানায় এবং বন্ধু হিসেবে কথা বলার রিকুয়েষ্ট করে। কিন্তু কথা বলার মাঝে সে পুরাতন কথা মনে করে সবসময় আবেগি হয়ে যেত  তাই আমি তাকে ফেইসবুকে ব্লক দিয়ে রাখি।তবু মাঝে মাঝে সে অন্য আইডি থেকে মেসেজ পাঠাত আমাকে।

আমেরিকায় আসার পর থেকে যোগাযোগ আরো কমিয়ে দিয়েছিলাম।কিন্তু গতবছর তার এক বন্ধুর কাছ থেকে জানতে পারি শিপলু ডিপ্রেশনে আছে।এর মাঝে অন্যান্য মেয়েদের সাথে ও সম্পর্ক করেছিল সে কিন্তু আমাকে ভুলতে পারে নাই।তাই নেশায় এডিক্টেড হয়ে গিয়েছে আরো অনেক কিছু।তাই তার প্রতি একটা টান অনুভব করি আমি। আর ভাবি আমার কথায় যদি ওর জিবনটা ভাল হয়ে যায়, এই ভাবনা থেকেই গত ৬মাস আগে ডিসেম্বর ২০১৯ থেকে ওর সাথে কথা বলা শুরু করি।

কিন্তু কথা বলতে বলতে সে আমার প্রতি আবার ও আসক্ত হয়ে পড়ছে দেখে আমি তার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিতে চাইলে সে সুইসাইড করার হুমকি দিত এবং কয়েকবার চেষ্টা ও করেছে। তাই আমি অনেকটা ভয়ে কথা বলতাম।শিপলুর বাবার সাথেও আমার কথা হয়েছে ওনি বলেছেন শিপলু এমন করলেও আমি যেন তার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।

এরপর বিভিন্ন সময় ওকে যোগাযোগ না করতে বললেও গত শুক্রবার  লাষ্ট আমি তার সাথে আর যোগাযোগ করব না এমন সিদ্ধান্ত জানায়।তখন সে প্রথম মেসেজ পাঠাই “সময় বিদায় নেয়ার,আমি আমার  সুস্থ জ্ঞানে আত্নহত্যা করছি” এবং লাষ্ট মেসেজে “পারিবারিক চাপ সহ্য পারতেছিনা ” জানিয়ে আমাকে মেসেজ পাঠাই।সকালে আমি ওর আম্মাকে ফোনে ব্যপারটি অবগত করি।আমি যদি জানতাম সত্যি সত্যি শিপলু আত্মহত্যা করবে তবে এমনটা বলতাম না।ব্যাপারটা আমাকে ভিষণ ভাবে পীড়া দিচ্ছে।ছবি-শিপলুর আইডি থেকে পাঠানো মেসেজ

তিনি আরো বলেন,আমাদের কোন বিয়ে হয় নাই,এগুলা সে এমনি বলে ফাজলামি করত।বন্ধু হিসেবে তাকে ঈদ গিফট এবং মোবাইল গিফট করেছিলাম। আমি তাকে আমেরিকা আনব এমন কথাও বলি নাই,সে চাইত আমার এখানে আসতে। তবে সে টেলেন্টেড ছেলে হওয়ায়  তাকে কানাডা যেতে বলেছিলাম। আর্থিকভাবে পারিবারিক কোন সাপোর্ট সে পেত না,তাই ডিপ্রেশনে থাকত।

শিপলুর প্রতিবেশীরা জানান,খুবই ভদ্র এবং শান্ত স্বভাব এর ছিল শিপলু।পাড়ার কারো সাথেই তেমন চলাফেরা ছিল না তার। একা একাই বাড়ির ছাদে গিটার বাজাতে দেখা যেত তাকে।তবে কখনো কোন ধরনের মাদক কিংবা অপরাধের সঙ্গে জরিত ছিল না বলেই জানান তারা।প্রতিবেশী ইমরান জানান শিপলুদের এই  গলিতে এখন পর্যন্ত ৫-৬টা সেইম আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে।প্রায় সবগুলা আত্মহত্যায় প্রেম জনিত কারনে ঘটেছে বলে পরে জানতে পারি আমরা। এইগুলা একজন আরেকজন কে দেখে উৎসাহিত হচ্ছে কিনা পরিবারের নজর রাখা উচিৎ।ছবি-মুন্সেফপাড়া শিপলুদের বাড়ির গলি

শিপলুর বন্ধু  সাগর জানান,শিপলু খুবই ভাল গিটারিস্ট ছিল।খুব অল্প সময়ে অনেক খ্যাতি অর্জন করেছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার লোকাল ব্যান্ড গুলাতে।শিপলু আর আমি এক সাথে অগণিত প্রোগ্রাম করেছি, কিন্তু কোন এক অজানা কারণে গত ৪-৫ বছর যাবত সে আর লোকাল ব্যান্ড গুলার সাথে কাজ করছিল না।তবে সে খুব সাহসী আর রাগী স্বভাব এর ছিল ।কিন্তু আত্নহত্যা করার মত ছেলে ছিলনা শিপলু বলেও জানান তিনি।

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

  • 3.3K
    Shares