অভিমান নিয়ে আবারো এক তরুনের আত্নহত্যা; ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দিন দিন বাড়ছে আত্নহত্যার প্রবণতা

১৭ জুন, ২০২০ : ৭:৩২ অপরাহ্ণ ২৪৫২

আসাদুজ্জামান আসাদঃ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর তিতাস নদীবেষ্টিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় সাম্প্রতিক সময়ে আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২০ইং সালের শুরু থেকে গত কয়েক মাসে জেলায় ২০ জনের উপর আত্নহত্যা করেছে, যাদের বেশিরভাগই কিশোর ও তরুণ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধৈর্য, জ্ঞান এবং সামাজিক প্রেরণার অভাবে আমাদের সমাজের কিশোর, তরুন-তরুনীরা আত্মহত্যার প্রবনতায় ঝুঁকছে।

গতকাল ১৬ই জুন(মঙ্গলবার) ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার উজানিসার গ্রামের সুজন খান নামে এক তরুন তার বাবা ও সৎ মায়ের সাথে অভিমান করে আত্নহত্যা করেন।
যে ছেলেটি ২দিন আগে ভারতের এক অভিনেতার আত্নহত্যায় তার ফেইসবুক ওয়ালে লিখেছিলেন “আত্নহত্যা সব কিছুর সমাধান  নয়”।

নিহত সুজনের বন্ধু ও প্রতিবেশী আরমান তেপান্তর কে জানান,নিহত সুজনের মা মারা যাওয়ার পর তার বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে।তার সৎ মায়ের সাথে কোন একটা বিষয় নিয়ে কথা-কাটাকাটি হয় গতকাল সকালে। এ নিয়ে সুজনের বাবা সুজনকে বকা-ঝকা করেন।যার কারনে অভিমান করে সে আত্নহত্যা করে।

ছবি-গতকাল আত্নহত্যা করা সুজন

গত ১৩ই জুন পৌর এলাকার  মুন্সেফপাড়ায় শিপলু নামে এক যুবক আত্নহত্যা করে  ভালবাসার সাথে অভিমান করে।

একই এলাকার মুন্সেফপাড়ায় গত জানুয়ারিতে আনন্দময়ী বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী খাদিজা আত্নহত্যা করে।সে আশুগঞ্জ উপজেলার তালশহর গ্রামের মামুনুর রশিদের মেয়ে ছিল।
আরো জানা যায় মুন্সেফপাড়ার এই একি গলিতে অনিক ও রিয়া নামের আরো দুইজন তরুন-তরুনী আত্নহত্যা করেছে। আর তাদের সবার মৃত্যুর কারন প্রেম জনিত কারনে বলেই ধারণা করছে এলাকাবাসী।এলাকাবাসীর মতে, অভিশপ্ত এই গলিতে একজনকে দেখে আরেজন অনুপ্রেরণা পাচ্ছে আত্নহত্যা করার।ছবি-মুন্সেফপাড়ার আলোচিত সেই গলি।

এছাড়াও গত ৩১ মে এস এস সিতে আশানুরূপ রেজাল্ট করতে না পারায় পৌর এলাকার ফুলবাড়িয়া এলাকায় বিষ পানে আত্নহত্যা করে রেশমি নামে এক তরুনী।

গত ১৭মে  কসবা উপজেলায় পরকিয়া প্রেমের অভিযোগ দেয়ায়  অভিমান করে গাছের সাথে রশিতে ঝুলে আত্নহত্যা করে রুনা নামে এক গৃহবধু।

গত ২৬শে এপ্রিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে পেঁপে গাছ কাটাকে কেন্দ্র করে চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে ঝগড়া করে সুচন্দ্রা দাস (১৫) নামে এক কিশোরী গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে।

গত ৩এপ্রিল আখাউড়ায় এক বখাটে উত্যক্ত  করায়  তানজিনা আক্তার তোফা(১৯)নামে এক মেয়ে গলায় ফাঁসদিয়ে আত্মহত্যা করে।

গত ফেব্রুয়ারিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর পৌর এলাকার এক গৃহবধূ মর্জিনা বেগম (২৫) পারিবারিক কলহের জেরে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করে।
স্থানীয় সূত্র জানায়,ঘটনার দিন সকালে স্বামী সাদেক মিয়ার সাথে তাঁর সাংসারিক বিষয়ে ঝগড়া হয়। এরপর সাদেক মিয়া কাজে চলে গেলে মর্জিনা বেগম ঘরের দরজা লাগিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে।

গত ১৫ই ফেব্রুয়ারী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় মায়ের কাছে গরম ভাত চেয়ে না পাওয়ায় নিজ ঘরের আড়ার সঙ্গে ফাঁসিতে ঝুলে বাবু মিয়া (২৫) নামে এক যুবক আত্মহত্যা করে।
পরিবার ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সকালে ঘুম থেকে উঠে বাবু তার মায়ের কাছে খাবার খেতে চায়। তার মা বলেন, গরম ভাত রান্না হয়নি, পাতিলে ঠাণ্ডা ভাত আছে।এ সময় তিনি মায়ের সঙ্গে অভিমান করে নিজ ঘরে চলে যায়। তার মা দুপুরে ভাত রান্না করে গরম ভাত নিয়ে ছেলের ঘরে গিয়ে দেখেন ঘরের আড়ার সঙ্গে গলায় ফাঁস লাগানো অবস্থায় বাবুর নিথর দেহ ঝুলে আছে।ছবি-যুগান্তরে প্রকাশিত সেই নিউজ

গত ৫জানুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলায় পৃথক স্থানে পারিবারিক কলহের জেরে বিষপানে রৌশন আরা বেগম (৩৫) ও ছালেহা বেগম (৪৫) নামে দুই গৃহবধূ আত্মহত্যা করে।

এছাড়াও এমন অসংখ্য আত্নহত্যার ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত কিন্তু সামাজিক ও পারিবারিক আত্নসম্মান এর ভয়ে অনেকেই  প্রকাশ করছে না গনমাধ্যমে।

আত্মহত্যার এমন প্রবণতা বিষয়ে ধর্মীয় শিক্ষক মাওলানা নিজামুল হক বলেন, মানুষ এখন যান্ত্রিক জীবন-যাপন করছে। কোনো ধরনের বিশ্রাম নেই। ফলে ছোট ছোট ব্যাপারেই আমাদের মন বিষিয়ে উঠে। আর এসব কারণেই এই প্রবণতা বাড়ছে।
আত্মহত্যাকে মহাপাপ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই কথাটা আমাদের ছেলে-মেয়েদের ভালোভাবে বোঝাতে হবে।

তিতাস মডেল কলেজের অধ্যক্ষ রমজান আলী তেপান্তর কে  বলেন, সধারণত পরিবার এবং সমাজ থেকে প্রেরণা, স্নেহ, ভালোবাসার অভাব থেকেও আজকাল তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আমাদের সচেতন হতে হবে। পরিবার থেকে সন্তানদের বেশি বেশি সময় দিতে হবে। তাহলেই এ প্রবণতা কমে আসবে।

অ্যাডঃ তাসলিমা সুলতানা খানম নিশাত বলেন, একজন মানুষ নানা কারণে আত্মহত্যা করতে পারেন এর মধ্যে ব্যক্তিত্ব্যে সমস্যা, গুরুতর মানসিক রোগ বা স্বল্পতার মানসিক, মাদকাসক্তি, এনজাইটি, ডিপ্রেশন অথবা প্ররোচনা ইত্যাদি।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কম বয়সী ছেলে-মেয়েদের মধ্যে এই আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা যায়। কেউ মা-বাবার ওপর অভিমান করে, কেউবা পরীক্ষায় খারাপ রেজাল্ট করাতে আবার কারো কারো কারণ থাকে অজানা। তবে বেশির ভাগ আত্মহত্যা করেন ডিপ্রেশন বা বিষণ্নতার জন্য।
মানুষ এখন অনলাইন এর সহজলভ্যতার কারনে আত্নকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে।যার কারনে ডিপ্রেশনে থাকাকালীন কারো সাথে নিজের অনুভূতি শেয়ার করতে পারে না,তাই বাড়ছে আত্নহত্যার প্রবণতা। পরিবার থেকে সন্তানদের বেশি বেশি সময় দিতে হবে। তাহলেই এই প্রবণতা কমে আসবে।

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।