আমাদের বাঙ্গালিয়ানা বা ছোটলোকপনা

২৭ জুলাই, ২০২০ : ১:৫৫ অপরাহ্ণ ২১৫

সীমান্ত খোকন: আমি যখন বছর খানেক আগে সৌদিতে ছিলাম, তখন সৌদি নাগরিকদের কাছ থেকে আরবিতে প্রায়ই একটা কথা শুনতাম। তা হলো “বাঙ্গালি মাফি কুইস”। এই “বাঙ্গালি মাফি কুইস” শব্দের বাংলা অর্থ হলো, “বাঙ্গালি ভালোনা”। এটা বেশি শুনা যায় যখন কোন বাঙ্গালি চাকরির জন্য কোন প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির কাছে যায় তখন। সত্যি বলতে আমাকেও কয়েকবার এই কথা শুনতে হয়েছে। এই কথা শুনার পর আমি মনে মনে অনুসন্ধান করতে লাগলাম কেন তারা বাঙ্গালিকে অপছন্দ করে? দেখা গেলো বাঙ্গালির নিজেদের ছোট বা নিকৃষ্ট মন-মানসিকতা ও খারাপ কিছু কাজ বা স্বভাবের কারনেই সৌদিয়ানদের কাছে বাঙ্গালি আজ এত খারাপ জাতি হিসেবে পরিচিত।সৌদিতে কোন ইন্ডিয়ান বা পাকিস্তানি যদি হয় কোন হাসপাতালোর ম্যানেজার তো বাঙ্গালি হয় সেই হাসপাতালের ক্লিনার। বাঙ্গালিরা সেখানে এতটাই মর্যাদাহীন। তো এই বিষয়ে “বাঙ্গালি মাফি কুইস” শিরোনামে আমি একটি পত্রিকায় কলাম লিখেছিলাম তখনই।

সম্প্রতি বাঙ্গালিদের তৈরি করা করোনার ভুয়া সার্টিফিকেট নিয়ে ইতালীতে আজ কি হচ্ছে তা আমরা সবাই দেখছি। আজ বাঙ্গালির কু-কর্ম নিয়ে ইতালীর জাতীয় পত্রিকায় লিড নিউজ হয়। ইতালীতে সবাই বাঙ্গালিদের থুথু দিচ্ছে। বাঙ্গালিদের চরম নিকৃষ্ট জাতি হিসেবে অবহিত করে ইতালীর বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংঘঠন গুলো ইতালীতে বাঙ্গালিদের নিষিদ্ধের দাবী তুলেছে। রাস্তায় মিছিল করছে। বাঙ্গালিদের ইতালী থেকে বের করে দেওয়া দাবী তোলা হয়েছে। শুধু তাই নয়, ইতালীতে বাঙ্গালিরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে বললেও ভুল হবেনা। কারন, রাস্তা-ঘাট,কর্মস্থল বা যেখানেই বাঙ্গালিদের দেখা যায় সেখানেই ইতালীয়ানরা বাঙ্গালির দিকে তেড়ে যাচ্ছে। ওইদিন আমার এক ইতালী প্রবাসী বন্ধু আক্ষেপ করে ফোনে আমাকে বললো, “ইতালীতে বাঙ্গালিরা এখন খুব খারাপ সময় পার করছে। বাঙ্গালিদের দেখলেই মারতে আসছে, গালাগাল করছে। ওইদিন তোর ভাবি (বন্ধুর স্ত্রী) কোথাও যাওয়ার জন্য ট্রামে উঠছিল, তখন এক ইতালীয়ান তোর ভাবিকে গালাগাল শুরু করলো। তখন সে মুখ লুকিয়ে কোনরকমে অন্য রাস্তা ধরে।”
আরেকবার বাঙ্গালি জানার পর মাঝ পথেই ট্রাম থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে এক ব্যক্তিকে।

উপরের ঘটনা দুটির দিকে মনোনিবেশ করলে সহজেই অনুমান করা যায় জাতি হিসেবে বিশ্ব দরবারে আজ আমরা কতটা নিচু। বিশেষ করে ইতালীর ঘটনা দেখার পর ও নিজ দেশে করোনার ভুয়া সার্টিফিকেটের ব্যবসা দেখার পর নিশ্চয় বিতর্কের কোন অবকাশ নেই। এই ঘটনা পুড়ো বিশ্ববাসীকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, জাতি হিসেবে আমরা কেমন। এই বিষয় গুলো গর্ব করার মতো নয়, বরং লজ্জার। তাই, “আমি বাঙ্গালি” বলে আজ আর গর্ব করতে পারিনা। তবে এটাও ঠিক, অভাব, অত্যাচার আর শোষণের মধ্যে যেই জাতির জন্ম সেই জাতির মানসিকতা উন্নত হবে কি করে? আমাদের এই মানসিকতা যে বাইরের দেশের কাউকে খুব বেশি ক্ষতি করছে এমন নয়। বরং আমরা নিজেরাই নিজেদের ক্ষতি বেশি করছি। এই মানসিকতার কারনে আমাদের পরিবার,সমাজ এমনকি দেশের ক্ষতি সবচেয়ে বেশি করছি। আমাদের বাঙ্গালি সমাজের সম্পর্কগুলোও হয় ভীষণ স্বার্থ পরায়ন। স্বার্থ ছাড়া কোন সম্পর্ক টিকেনা আমাদের মধ্যে। যতদিন স্বার্থ আছে ততদিন সু-সম্পর্ক আছে। কাজ শেষ হয়ে গেলেই সেই সম্পর্কের কোন গুরুত্ব থাকেনা। স্বার্থের জন্য সম্পর্ক ঘড়ে আবার ভাঙ্গেও। এই ভাবে চলছে প্রায় সব ক্ষেত্রেই। পরিবার, বন্ধু-বান্ধব,প্রেমিক-প্রেমিকা বা যাই বলেন না কেন। এমন মানসিকতা নিয়ে অন্তত ভালো কিছু করা যায়না, সুনাম অর্জন করাতো দূরের কথা। তাই পুড়ো বিশ্বেই বাঙ্গালি এক খারাপ জাতি হিসেবেই পরিচিত।

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

  • 109
    Shares