সরকারি দলের নেতাদের সাথে সাব-রেজিস্ট্রারের আঁতাত: ঘুষ-দুর্নীতির আখড়া নাসিরনগর

১৮ আগস্ট, ২০২০ : ১০:৪৮ পূর্বাহ্ণ ৯২৮

আসাদুজ্জামান আসাদঃ ঘুষ-দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস। দিনের পর দিন অসাধু সাব-রেজিস্ট্রারের যোগসাজশে চলছে দলিল রেজিস্ট্রির কাজ। এখানে ঘুষ ছাড়া কোনো দলিল রেজিস্ট্রি করা যায় না এবং টাকার বিনিময়ে গ্রাহকদের ভূয়া দলিল দেয়া সহ বিভিন্ন প্রকার হয়রানি করা হয়। তাছাড়া সরকারি দলের নেতাদের সাথে আঁতাত করে ভয়-ভীতিও দেখানো হয় বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

এক ভুক্তভোগী মো. সাহাব উদ্দিন আহমেদ প্রায় একবছরেও দলিলের নকল পাননি। সাধারণত ২/৩ দিনের মধ্যেই সহিমোহরী নকল পাওয়ার কথা। উপরন্তু তার নামে রেজিস্ট্রি হওয়া জমি বেহাতের উপক্রম হয়েছে। নকল আটকে রেখে আরেকটি দলিল তৈরি করে তাতে স্বাক্ষর নেয়ার চেষ্টা চলছে। আর এসব কিছুই করছেন সাব-রেজিস্ট্রার স্বয়ং।
একেএম মোমেন আলী নামে একজনের পক্ষে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের সাব-রেজিস্ট্রার মো. মিজাহারুল ইসলামের এ চেষ্টায় আদালতে চিরন্তন নিষেধাজ্ঞার আবেদন করা হয়েছে। এতে সাব-রেজিস্ট্রার এবং মোমেন আলীকে বিবাদী করা হয়। দলিলের নকল সরবরাহ না করায় লিগ্যাল নোটিশও পাঠানো হয়েছে সাব-রেজিস্ট্রারকে।

নাসিরনগর সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে ৬ই আগস্ট করা নিষেধাজ্ঞার মামলা এবং ৮ই আগস্ট দেয়া লিগ্যাল নোটিশ সূত্রে জানা যায়, নাসিরনগরের গুনিয়াউক গ্রামের একেএম মাহফুজ আলী তার মালিকানাধীন গুনিয়াউক মৌজার বিএস ৯৮৪ দাগের ১ একর ৯০ শতক ভূমি থেকে তার ছোট ছেলে একেএম মঈন আলীকে ২০ শতক সাফ-কবলা (২২৬৭ নম্বর) দলিল করে দেন ১৯৯৫
সালের ২রা জুলাই।

মঈন আলী তার মালিকানাধীন ওই ২০ শতক জায়গা থেকে ২০১৯ সালের ২৮শে অক্টোবর ৬১৯৩ নং এওয়াজ বিনিময় দলিল মূলে মো. সাহাব উদ্দিন আহমেদকে সাড়ে ৩ শতক ভূমির মালিকানা দখলার্পণ করেন। এরপর সাহাব উদ্দিন সেখানে মার্কেট নির্মাণের কাজ শুরু করেন। সাহাব উদ্দিন অভিযোগ করেন, তিনি সহিমোহরী নকল সংগ্রহের জন্যে সাব-রেজিস্ট্রার বরাবর আবেদন করেন। কিন্তু নকল সরবরাহ না করে সাব-রেজিস্ট্রার মো. মিজাহারুল ইসলাম তাকে অফিসে ডেকে নিয়ে নানা ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন।

সাহাব উদ্দিনের মালিকানাধীন ওই সাড়ে ৩ শতক ভূমি ‘ওয়াক্‌ফ আল আওলাদ’ দলিল করে দেয়ার জন্যে চাপ সৃষ্টি করেন এবং সাব-রেজিস্ট্রারের সৃষ্ট ওই দলিলের একটি কপি তাকে সরবরাহ করেন। এতে তিনি হতভম্ব হয়ে যান। এছাড়া তাকে টেলিফোনেও ভয়ভীতি দেখানো হয়। সাহাব উদ্দিন জানান, একেএম মাহফুজ আলীর প্রথম স্ত্রীর সন্তান একেএম মোমেন আলীর সঙ্গে যোগসাজশে সাব-রেজিস্ট্রার তার ভূমি কেড়ে নেয়ার এই পাঁয়তারা করছেন।

সাব-রেজিস্ট্রার মো. মিজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে আছে আরো অনেক অভিযোগ। গত বছরের ২৬শে নভেম্বর নাসিরনগর সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে হওয়া একটি জাল দলিল নিয়েও আদালতে মামলা হয়েছে। এ বছরের ২৩শে জানুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এই মামলাটি করেন সেখানকার কুণ্ডা ইউনিয়নের মুছলন্দপুর গ্রামের সারবানু বিবি। তার অভিযোগ মামলার আসামিরা জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে মালিক সেজে তার ৫ শতক ভূমির দলিল সম্পাদন করে নিয়েছেন।

করোনাভাইরাস বিস্তার প্রতিরোধে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সহযোগিতা না করার কারণেও উপজেলা প্রশাসন সতর্ক করেন সাব-রেজিস্ট্রার মো. মিজাহারুল ইসলামকে।

আরেক ভুক্তভোগী বীর মুক্তিযোদ্ধা কুতুবউদ্দিন জানান, আমি নাসিরনগর উপজেলার ৫১৪নং খতিয়ানে সাব কেবলা দলিলে জমি কিনে ছিলাম। ১৯৯৩ সালে ১৩৩৩ ও ১৩৩৮ নং দলিল মূলে এই জমির মালিক হয়েছিলাম। এই জমি নিয়া মামলা হলে ১৯৯৮ সালে আদালতের মাধ্যমে আমার পক্ষে রায় হয়। ২০১৮ সালে ওই জমির কিছু অংশ বিক্রি করি যার দলিল নাসিরনগর রেজিষ্ট্রি অফিসে হয়েছিল।এবং বর্তমান রেজিস্ট্রার ও অফিস সহকারিই তা করেছিল। কিন্তু এখন আমার বিরুধি পক্ষের লোকেদের কাছ থেকে টাকা খেয়ে আমার জমি রেজিস্ট্রার না করে ফেরত দিয়েছে।
মহামান্য হাইকোর্টের রায় অমান্য করেছে। তাই আমি জেলা রেজিস্ট্রার বরাবর তাদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেছি।তিনি আরো বলেন সরকারি দলের নেতাদের সাথে আঁতাত করে সাব-রেজিস্ট্রারের নাসিরনগরে গড়ে তুলেছেন তার ঘুষ-দুর্নীতির আখড়া।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে সাব- রেজিস্ট্রারের মোবাইলে ফোনে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।