শিশুদের নিয়ে জঙ্গী সংগঠন “আই এস”র ভয়ঙ্কর কর্মসূচী

২১ আগস্ট, ২০২০ : ৩:৩১ অপরাহ্ণ ২০৩

তেপান্তর রিপোর্ট: ইসলামিক স্টেট তাদের সামরিক পরাজয় এবং বিপুল অর্থ নিঃশেষ হওয়া সত্ত্বেও এখন তাদের স্থায়ী এক চিহ্ণ রেখে যাওয়ার লক্ষ্যে শিশুদের নিয়ে নতুন কর্মসুচী শুরু করেছে। তারা যে সব জায়গা নিয়ন্ত্রণ করছে সেখানে স্কুলে শিশুদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় জোরদার প্রচার অভিযান চালু করেছে।

আই এস স্বঘোষিত খেলাফতের অধীনে ইরাক, সিরিয়া, আফগানিস্তান এবং অন্যান্য দেশে হাজার হাজার শিশুকে উগ্রবাদী, পশ্চিমা বিরোধী মতাদর্শ এবং সন্ত্রাসী তৎপরতা সম্পর্কে শিক্ষা দিচ্ছে। আই এস তাদের বার্তা প্রচারের লক্ষ্যে, ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন ভাষায় শিশুদের জন্যই প্রচার অভিযান চালাচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আই এস-এর উগ্রবাদী লক্ষ্যাদর্শ হচ্ছে ওই গ্রুপের পরেও যাতে সেই চিন্তাধারা কাজ করে যায় তা নিশ্চিত করা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের মধ্যে আইএস যে ভাবে তার মতাদর্শ ছড়িয়ে দিচ্ছে তার ফলে ভবিষ্যতে আইএসকে, বর্তমানে তারা যে সব এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরেও সেখানে বহু বছর যাবত এক ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করবে। বর্তমানে আইএস নিয়ন্ত্রিত শহর সিরিয়ার দির এজোর শহরে এক প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষয়িত্রী ওয়াজিহা বলেন, ‘সিরিয়া ও ইরাকে আইএস-এর উপস্থিতি না থাকলেও আগামী প্রজন্ম আরও বেশী উগ্রবাদী হবে।’
আইএস-এর আদর্শ কি? এ সম্পর্কে দক্ষিণ তুরস্কে এক শরণার্থী শিবিরের স্কুলে সিরিয়ান এক শিক্ষক ভয়েস অফ আমেরিকাকে বলেন, ‘আই এস দীর্ঘ মেয়াদী প্রভাব বিস্তারের জন্য শিশুদের ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করছে কারণ এটা হচ্ছে মতাদর্শের বিষয়, শুধুমাত্র শিশুদের কাজে নিয়োগ করা নয়।’

আই এস তার স্বঘোষিত রাজধানী -সিরিয়ার রাকা শহর, ইরাকের মোসুল এবং আফগানিস্তানের নাঙ্গারহার প্রদেশে সেই সঙ্গে সুদূর ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত যেসব ছোট ছোট এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে সেইসব জায়গায় প্রতিদিন অসংখ্য শিশুদের নিয়ে ক্লাস চালিয়ে যাচ্ছে।
জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষকরা এ বছরের গোড়ার দিকে শিশুদের ওপর আইএস-এর নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার সম্পর্কে এক নিবন্ধে বলেন যে, ‘ইসলামিক স্টেট নজীরবিহীনভাবে বর্ধিত সংখ্যায় শিশু কিশোর তরুনদের সংগঠিত করছে।’


আইএস শিশু কিশোরদের চরমপন্থী আদর্শ শেখানোর জন্য নাঙ্গারহার প্রদেশের কোট এলাকায় অন্ততঃ আটটি স্কুল ও মাদ্রাসা পরিচালনা করছে। পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় বাসিন্দা ও কর্মকর্তারা ভয়েস ওঅফ আমেরিকাকে বলেছেন, আইএস নাঙ্গারহারের কোট জেলায় দুটি হাইস্কুল ও মাদ্রাসা পরিচালনা করছে।

স্থানীয় সূত্র ভয়েস অফ আমেরিকাকে জানায়, সেখানে র‍্যাডিক্যাল ইসলামের ধারা অনুযায়ী নিজস্ব পাঠক্রম রয়েছে। মেয়দের স্কুলে যাওয়ার অনুমতি আছে তবে ছেলেদের থেকে অন্য সময়ে। আইএস পরিচালিত স্কুলের বেশীরভাগ শিক্ষকই আফগান শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং আইএস-এর বেতনভূক্ত। আফগান শিক্ষা কর্মকর্তারা ভয়েস অফ আমেরিকাকে জানিয়েছেন, তারা আইএস-এর স্কুল সম্পর্কে অবগত, কিন্তু আইএস স্কুলে পড়নোর জন্য আফগান সরকারের কাছ থেকে যে বেতন পাচ্ছেন সে বিষয়ে তারা কোন মন্তব্য করবেন না।
আফগানিস্তানের আচিন জেলায় আইএসের ৫টি শিক্ষালয় রয়েছে। সেখানে শিশুদেরকে ক্লাসে যাওয়ার জন্য জোর করা হয়। স্থানীয় অধিবাসিরা বললেন, যেসব বাবা মা তাদের সন্তানদেরকে ওইসব স্কুলে পাঠাতে অস্বীকৃতি জানান, তাদের ওপর জরিমানা ধার্য করা হয়।

আইএস এর শিক্ষা কার্যক্রম:
আইএস নিয়ন্ত্রিত সকল স্থানেই তাদের নিজস্ব শিক্ষা কার্যক্রম অনুসরণ করা হয়। ইরাকের মসুলের নিয়ন্ত্রন আইএসের কাছে, দুই বছরেরও বেশী সময় ধরে। শহরের নিয়ন্ত্রন নেয়ার পরদিন থেকেই সেখানকার শিক্ষা পদ্ধতি ধ্ধংস করে দিয়েছে তারা। তার পরিবর্তে সেখানে তারা চালু করেছে র‍্যাডিক্যাল মতাদর্শ।

মসুলে কুর্দিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রধান ইসমাত রাজাব বললেন, “শিক্ষালয়ে তারা বাচ্চাদেরকে অস্ত্র চালাতে শেখায়। যেসব শিক্ষক আইএসের শিক্ষা পদ্ধতির বিরুদ্ধে কথা বলে তাদেরকে বন্দী করা হয় বা মেরে ফেলা হয়”।
আইএসের শিক্ষা কার্যক্রম দ্বারা তরুন তরুনীদেরকে শেখানো হয়, কিভাবে আত্মঘাতি বোমা হামলা করতে হয়।
“অতীতে মসুলের বেশিরভাগ আত্মঘাতি বোমা হামলাকারী ছিল বিদেশী। আর এখন বেশিরভাগই মসুলের টিনেজার”; বললেন ইসমাত রাজাব।
তিনি ভয় পাচ্ছেন, আইএস মসুল ছেড়ে যাওয়ার পর ঐসব তরুন তরুনীদের কিভাবে পুনর্বাসন করা যাবে, তা নিয়ে।
“আমার ধারণা আসল বিপদ এখনো আমরা দেখিনি। মসুল থেকে আইএস চলে যাওয়ার পর তা আরো প্রকটভাবে বোঝা যাবে। তখন আমরা এমন একটি শহরে থাকবো যেখানকার শিশু কিশোরদের মস্তিস্ক ধুয়ে দিয়েছে আইএস”।

আরো কঠোর জঙ্গীবাদী প্রশিক্ষন দিতে কিছু বাচ্চাকে আইএস ইরাক থেকে সিরিয়ায় পাঠিয়েছে। ইরাকের সংখ্যালঘূ ধর্মীয় সম্প্রদায় ইয়াজিদিদের বহু বাচ্চা, সিরিয়ায় নিয়ে গেছে তারা।

প্রশিক্ষিত আত্মঘাতি বোমা হামলাকারী:
সিরিয়ার আইএস নিয়ন্ত্রিত রাক্কায় ইয়াজিদি শিশুদেরকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণে বাধ্য হরা হয়েছে। তাদেরকে অস্ত্র চালানো শেখানো হয়েছে।
১২ বছর বয়সী এক ইয়াজিদি বলক গত বছর ভয়েস অব আমেরিকাকে জানায়, “দৈনিক ভোর ৪টায় আমাদেরকে নামাজ পড়ার জন্য উঠতে হতো, তারপর সকাল ৮টা পর্যন্তু ছিল ঘুমানোর অনুমতি। ৮টা থেকে ৯টা নাস্তা, দুপুর ১২টা পর্যন্ত কোরান শিক্ষা। তারপর দুপুরের খাবার। লাঞ্চের পর বিকাল ৫টা পর্যন্ত একটানা চলতো অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষন। সে সময় কালো পোষাক পরানো হতো, যার মধ্যে ছিল বোমা হামলার নানা কৌশল”।
বালকটি তুরস্ক সীমান্তের কাছের একটি স্থান থেকে পালাতে সক্ষম হয় এবং কুর্দিশ বাহিনী তাকে উদ্ধার করে। জার্মানীর একটি শরনার্থী ক্যাম্পে রাখা হয়েছে তাকে।
Raqqa Is Being Slaughtered Silently নামে আইএসের কার্যক্রম পর্যবেক্ষনকারী একটি সংগঠনের কর্মীরা বলেন, রাক্কায় মেয়েদের শিক্ষা দিতে ২০১৫ সালে আইএস অন্তত ১২টি স্কুল খুলেছে। সেখানে র‍্যাডিকাল ইসলামের শিক্ষা দেয়া হয়।

তারা জনান, সকল বয়সী টিনেজাররা ওদের লক্ষ্য হলেও, ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী বাচ্চাদের ওপর আইএস জোর দিচ্ছে সবচেয়ে বেশী। “ওইসব বাচ্চারা আইএস কি, তা না বুঝলেও তাদের নিয়ে আইএস এর ‘শিশু সেনাবাহিনী’ গঠন করা হয়েছে”।
আইএস স্কুলে বাচ্চাদেরকে না পাঠাতে চাইলে তাদের বাবা মায়ের কাছ থেকে জরিমানা স্বরূপ ৫০ থেকে ৫০০ ডলার আদায় করা হয়। যারা ওই অর্থ পরিশোধ করতে ব্যার্থ হয় তাদের বাচ্চাদেরকে জোর করে আইএস ক্যাম্পে নিয়ে সেনা প্রশিক্ষন দেয়া হয়।

সামাজিক মাধ্যম বিহিনী:
সামাজিক মাধ্যমে শিশু কিশোরদেরকে তাদের জঙ্গি আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট করার নানা ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে আইএস।
শিশুদেরকে আরবী ভাষা ও ইসলামী শিক্ষা শেখানোর জন্য আইএস একটি মোবাইল এ্যপ্লিকেশন খুলেছে যাতে ভিডিও গেমের মধ্যে দিয়ে ইসলামী গান বাজিয়ে শিশুদেরকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছে।
‘লাইব্রেরী অব জিল’ নামে আইএসের একটি ডিজিটাল টিম ওই মোবাইল এ্যাপ্লিকেশন ছেড়েছে, যা এ্যান্ডরয়েড ডিভাইসে থাকে।
সব মোবাইল ব্যাবহারকারী সেখানে ঢুকতে পারেন, যদি ওই ডিভাইসের মালিক লিংক পাঠায়। আইএস সমর্থনকারীরা সকল ধরনের সামাজিক মাধ্যমে ওই লিংক পাঠিয়েছে। বড় বড় সামাজিক মাধ্যম যেমন ফেসবুক এবং টুইটার ওইসব লিংক পরিস্কার রাখতে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন যতো সতর্কতাই নেয়া হোক, আইএসের অনলাইন কার্যক্রম বেড়েই চলছে।
আইএসসি প্রকল্পের সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞ দিশাদ ওথম্যান এ প্রসঙ্গে বলেন, “তাদের খুব দক্ষ আইটি বিশেষজ্ঞের টিম রয়েছে যারা এই অনলাইন কর্মকান্ড পরিচালনা করে”।
আইএসের র‍্যাডিক্যাল মতাদর্শ প্রচার করাই তাদের মুখ্য কাজ। চলতি সপ্তাহে আইএস সোশাল মিডিয়া টিম, বেশ কিছু ভাষায় কিছু ছবি আপলোড করেছে, যাতে শিশুরা আইএসের প্ল্যাকার্ড ধরে রয়েছে। ওই প্ল্যাকার্ডে লেখা “আমেরিকানদের মৃত্যুতে অভিনন্দন”। মূলত: অরল্যান্ডোর ভয়াবহ হত্যাকান্ডের ইঙ্গিত রয়েছে এখানে।

খুব অল্প বয়সী বাচ্চাদেরকে এসব মর্তাদর্শ শিক্ষা দেয়ার মধ্যে দিয়ে আইএস তাদের র‍্যাডিক্যাল মতাদর্শ ভবিষ্যতের জন্য স্থায়ী করতে চায়।

source :VOA

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

  • 27
    Shares