জীবন নিয়ে ছিনিমিনি: সদর হাসপাতালের এম্বুলেন্স মাস্তানদের থামাবে কে?

২১ আগস্ট, ২০২০ : ৫:১৪ অপরাহ্ণ ২৬৫৫

কাজী আশরাফুল ইসলাম: ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালের সীমানার ভিতরের এম্বুলেন্স চালকদের সিন্ডিকেট দিন দিন যেন আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে। রোগী ছিনিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে কাউকে পরোয়া করছেনা তারা। হাসপাতালের কোন রোগীকে যদি ঢাকায় নিতে হয় তাহলে হাসপাতালের ভিতরের সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই নিতে হবে। এবার নিতে গিয়ে যত বেশি ভারা রাখুক বা খারাপ সার্ভিসই হোকনা কেন। রোগীর স্বজনরা চাইলেও নিজের ইচ্ছেমতো বাইরের পরিচিত কোন এম্বুলেন্স আনতে পারবেনা। যদি কোন রোগীর স্বজন বাইরের এম্বুলেন্সে দিয়ে রোগী নিতে চায় তাহলে সেখানে মারপিটের ঘটনা ঘটে। তখন ড্রাইভারদের সিন্ডকেটের সবাই মিলে রোগীর স্বজনকে মারধোর করে। এরকম মারধোরের ঘটনা নতুন নয়। গত কয়েক বছর থেকে ধারাবাহিক ভাবে হাসপাতাল কম্পাউন্ডের ভিতর এমন নৈরাজ্য চললেও এর বিরুদ্ধে শক্ত কোন পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি কর্তৃপক্ষকে।

গতকাল (২০ আগষ্ট) আশুগঞ্জ উপজেলার তালশহর গ্রামে নারকেল গাছ থেকে পড়ে নাঈম মিয়া (১২) নামে এক শিশু সদর হাসপাতালে ভর্তির পর যখন অবস্থা খারাপ দেখে রোগীকে ঢাকায় পাঠানোর পরামর্শ দিলো ডাক্তাররা, তখনই ঘটলো বিপত্তি। তখন নাঈমের স্বজনরা সময় বাচানোর জন্য শহরের কুমারশীল মোড় থেকে পরিচিত এক এম্বুলেন্স ড্রাইভারকে আনেন সদর হাসপাতালে। তখনই হাসপাতালের ভিতরের সিন্ডিকেট রোগী নিতে বাধা প্রধান করে। হয়ত সিন্ডিকেটের এম্বুলেন্স দিয়ে নিতে হবে, নয়ত রোগী নিতেই পারবেনা। তারা বলে, বেসরকারি এম্বুলেন্স মালিক সমিতির নির্দেশনা ছাড়া কোন এম্বুলেন্স সদর হাসপাতালে প্রবেশ করতে পারবে না এবং বেসরকারি এম্বুলেন্স মালিক সমিতির সিরিয়াল মোতাবেক যে এম্বুলেন্স রয়েছে সেটিতে করেই রোগী সদর থেকে বের হবে। এনিয়ে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে রোগীর স্বজনদের পিটিয়েছে এম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের ড্রাইভাররা। এসব করতে করতে ১ ঘন্টা সময় অপচয় হয়ে যায়। তারপর বাধ্য হয়ে রোগীর স্বজনরা সিন্ডিকেটের এম্বুলেন্স দিয়েই রোগীকে ঢাকায় নেওয়া হয়। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেড়ি হয়ে গেছে। আহত রোগী ঢাকার হাসপাতালের গেইটের কাছে যাওয়া মাত্রই মারা যায়।

রোগী নাঈমের খালাতো ভাই গোলাপ রহমানের অভিযোগ, এম্বুলেন্স দালালদের সাথে ধস্তাধস্তি এবং বাক বিতন্ডায় সেখানেই আধ ঘন্টার মত সময় নষ্ট হয় এবং রোগীর অবস্থা ক্রমশ খারাপ হতে থাকে। এক পর্যায়ে বাধ্য হয়েই সব মিলিয়ে প্রায় এক ঘন্টা পর সদর হাসপাতালের ভেতরে থাকা এম্বুলেন্স মালিক সমিতির সিরিয়াল প্রাপ্ত এম্বুল্যান্সে করে রোগীকে ঢাকা পাঠানোর ব্যাবস্থা করা হয়। কিন্তু ঢাকা মেডিকেল কলেজ গেটের সামনে গিয়েই হটাৎ করে রোগীর শ্বাস প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়।পরে ঢাকা মেডিকেলের কর্তব্যরত চিকিৎসক রোগীকে মৃত ঘোষণা করেন।

রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, যদি এম্বুলেন্স দালালদের সাথে বাকবিতন্ডায় এক ঘন্টা সময় নষ্ট না হতো তাহলে হয়তোবা রোগীকে সময়মতো ঢাকা মেডিকেলে পৌছানো যেত এবং রোগীর জীবন বাচানো সম্ভব হতো। তারা বলেন, সরকারি হাসপাতালকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই দালাল চক্র প্রতিদিনই অসহায় এবং নিরীহ রোগীদেরকে বিভিন্নভাবে হেনস্তা করছে। তারা চান, আর যাতে কেউ এই দালাল চক্রের দ্বারা হেনস্তার স্বীকার না হয়।

রোগীর স্বজনদের অভিযোগ পেয়ে সরেজমিনে সদর হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়,হাসপাতালের প্রবেশপথের ডানপাশে বেসরকারি এম্বুলেন্স মালিক সমিতির নামে একটা ব্যানার টানানো আছে,যার সামনেই কয়েকটি চেয়ার রাখা।এখানেই নাকি এম্বুলেন্স মালিক সমিতির নেতারা বসে থাকেন এবং সদর থেকে বের হওয়া প্রতিটি এম্বুলেন্স থেকে নির্দিষ্ট পরিমানে চাদা আদায়ের মাধ্যেম সিরিয়াল ঠিক করে দেন। অভিযোগ রয়েছে মালিক সমিতিতে আছেন সরকারি দলের নাম ব্যাবহারকারী কতিপয় কথিত নেতা। তাদেরকে সহায়তা করেন সদর হাসপাতালেরই কিছু অসৎ কর্মচারী।

হাসপাতালের কর্মচারী এবং এম্বুলেন্স দালালদের নেতা পরিচয় দেয়া টাঙ্গাইলের রফিক মিয়া নামে একজনের নাম তাৎক্ষণিকভাবে অনেকের মুখেই শোনা যায়। সদর হাসপাতাল সংলগ্ন অনেকেই বলেন কথিত সরকার দলীয় এক নেতা প্রভাবেই এই বেসরকারি এম্বুলেন্স মালিক সমিতির কার্যক্রম সদর হাসপাতালে দাপটের সাথে চলমান আছে। কিন্তু কথিত রাজনৈতিক এই নেতা প্রভাবশালী হওয়ায় এবং জেলা ছাত্রলীগ ও যুবলীগের অনেক হাই প্রোফাইল নেতার সাথে তার উঠাবসা হওয়ায় তার বিরুদ্ধে সরাসরি কেউ মুখ খুলতে রাজি হননি।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত রফিক মিয়ার কাছে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের ব্যপারে জানতে চাইলে তিনি তেপান্তরকে বলেন,”আমি সদর হাসপাতালের ভেতরে না,বরং আমি সদর হাসপাতাল সংলগ্ন নার্সিং ইনস্টিটিউটে চাকরি করি। বেসরকারি এম্বুলেন্স চালকদের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নাই।” সদর হাসপাতালে বেসরকারি এম্বুলেন্স মালিক সমিতির এম্বুলেন্স ব্যাতীত অন্য কোন এম্বুলেন্স প্রবেশ করতে পারে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “এটা রোগীর স্বজনদের ব্যাপার। তারা নিজেদের সময় এবং আর্থিক ব্যাপার বিবেচনা করে যে কোন এম্বুলেন্স দিয়ে রোগীকে আনা নেয়া করতে পারে,এতে বাধা দেয়ার কোন কারন নেই।”
এবিষয়ে মালিক সমিতির নেতাদের সাথে কথা বলার অনুরোধ জানান তিনি।

২০১৭ সালে সদর হাসপাতালের এম্বুলেন্স ড্রাইভারদের কু-কীর্তি নিয়ে সাপ্তাহিক তিতাসের লিড নিউজ।

এর আগে ২০১৫ সালে সদর হাসপাতালের এম্বুলেন্স চক্রের গড়িমসিতে নাটাই গ্রামের আজাদ মিয়ার ছেলে নিলয়ের করুণ মৃত্যু হয়। মৃতের সাথে থাকা স্বজনরা উত্তেজিত হয়ে সদর হাসপাতালের দুটি সরকারি এম্বুলেন্স ও হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভাঙচুর এবং হাসপাতালের স্টাফদেরকে মারধর করে।এ ঘটনা শেষ পর্যন্ত আদালতে গড়ায়।

সদর হাসপাতালকে ঘিরে দীর্ঘদিন যাবৎ গড়ে উঠা এম্বুলেন্স দালাল চক্রের দৌরাত্ম সম্পর্কে জানেন কিনা কিংবা সদর হাসপাতালকে দালালমুক্ত করতে কোন অভিযান পরিচালিত হয় কিনা জানতে চাইলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডাক্তার শওকত হোসেন তেপান্তরকে বলেন,”বেসরকারি এম্বুল্যান্স মালিক কিংবা ড্রাইভার কারও সাথেই সদর হাসপাতালের কোন কার্যক্রম নেই। সদর হাসপাতালে সরকারি এম্বুলেন্সের কিছুটা সংকট রয়েছে। এই সংকট কাজে লাগিয়ে এক শ্রেনীর অসাধু ব্যাক্তিরা সাধারণ জনগণকে জিম্মি করার চেস্টা করে।ভুক্তভোগীদের অভিযোগের ভিত্তিতে ইতিমধ্যে কয়েকবার তাদেরকে হাসপাতাল গেটে ঢুকতে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে জরুরি প্রয়োজনে এম্বুলেন্স লাগতে পারে ভেবে একটি বা দুটি বেসরকারি এম্বুলেন্স ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয়েছিল এবং এই সুযোগটিই অসাধু চক্রটি কাজে লাগিয়েছে। সদর হাসপাতালের কোন কর্মচারী যদি এ ধরনের চক্রের সাথে জড়িত থাকে তাহলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যাবস্থা নেয়া হবে।সাধারণ মানুষের বেশে বসে থাকে বলে অনেক সময় দালালদেরকে চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়া বিভিন্ন সময় অভিযান পরিচয়কালীন সময়ে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক তদবিরের কারনে তাদের অভিযান কার্যক্রম কিছুটা ব্যাহত হয় বলেও তিনি দাবি করেন।কেউ দৌরাত্ম্যের স্বীকার হলে তাকে সিভিল সার্জন অফিস বরাবর লিখিত অভিযোগ দেয়ার অনুরোধ জানান তিনি।

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।