চরম সঙ্কটে লেবানন প্রবাসীরা

১৯ নভেম্বর, ২০২০ : ১:৫২ পূর্বাহ্ণ ৩০৪

মনির হোসেন রাসেল, লেবানন: ভূমধ্যসাগরীয় দেশ লেবানন। আকারে ছোট হলেও বহুদেশের অভিবাসিদের নিয়ে দেশটিতে বসবাস প্রায় কোঠি মানুষের। লেবানন থেকে প্রায় ৪০ হাজারের বেশি অবৈধ (বৈধ কাগজপত্র বিহীন) বাংলাদেশী অভিবাসী কর্মী দেশে ফেরার জন্য দূতাবাসের সহযোগিতা চেয়েছেন। গত ৪ আগস্ট বৈরুত বন্দর বিস্ফোরণের পর দেশটিতে চরম আকারে খাদ্য সঙ্কট দেখা দিয়েছে। হাজার হাজার প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মী কর্মহীন হয়ে কষ্টে দেশটিতে জীবন যাপন করছেন। বর্তমানে কর্মসংস্থানের জায়গা আরো সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ফলে কর্মীরা দেশে ফিরতে প্রতিদিন দূতাবাসের সামনে ভিড় করছেন।

সম্প্রতি আন্তঃমন্ত্রণালয় (পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান) বৈঠকে কর্মীদের দেশে ফেরত আনার বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে পরবর্তী বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে এমন আশ্বাস দিয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানিয়েছে।

লেবাননের রাজধানী বৈরুতে বাংলাদেশ দূতাবাসের তথ্যমতে, লেবাননে বর্তমানে দেড় লাখের বেশি বাংলাদেশী কর্মী কাজ করছেন। এর মধ্যে বেশিরভাগ নারী কর্মী। এই কর্মীরা দেশটির বিভিন্ন বাসাবাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করেন। এদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক কর্মী অবৈধ হয়ে পড়েছেন। দেশটিতে বর্তমানে ৪০ হাজারের বেশি অবৈধ কর্মী রয়েছেন। এদিকে অনেক বৈধ কর্মীও দেশে ফিরে যাচ্ছেন। কারণ প্রথমত কোম্পনী ডলারে বেতন পরিশোধ করতে পারছে না, দ্বীতীয়ত কোম্পনীতে কাজের পরিমাণ কমে গেছে। আবার, অনেক দেশে আসতে চাচ্ছে না, কারণ অনেক টাকা খরচ করে ধার দেনা করে পরিবারের শান্তির জন্য তারা প্রবাসে পারি জমিয়েছেন। পরিস্থিতি ভাল হলে তারা কাজ পাবেন এই আশায় থেকে যাচ্ছেন।

কিন্তু অবৈধ কর্মীরা দেশে ফেরার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছেন। তাদের হাতে কোন টাকা পয়সা নেই যে কর্মহীন হলে দীর্ঘ দিন চলতে পারবেন। তাঁরা যে বিমানের টিকেট কাটতে পারবেন সেই অর্থও তাঁদের কাছে নেই। ফলে তারা সরকারী খরচে দেশে ফেরার দাবি জানিয়ে আসছেন।

এদিকে লেবাননে প্রবাসী সামাজি সংগঠনগুলো বলছে, কাগজপত্রহীন কর্মীরা আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে দিন পার করছেন। তাদের কোন দায়ীত্ব নিচ্ছে না দূতাবাস। একদিকে চরম খাদ্য সঙ্কট-অন্যদিকে দেশে না ফেরার বিষয়টি অনিশ্চিত হওয়ার কারণে বাংলাদেশী কর্মীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। তাদের দ্রুত দেশে ফেরত না পাঠালে তারা চরম খাদ্য সঙ্কটে পড়বেন।

তাঁরা জানান, লেবানন বিস্ফোরণ ঘটে যাওয়ার কয়েক মাস চলে গেলেও এখন পর্যন্ত এই কর্মীদের কাউকে দেশে ফেরত পাঠাতে কোন উদ্যোগ নেয়নি লেবানন অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস। লেবাননের বিষয়ে সম্প্রতি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ‘ইমরান আহমদ’ এক বিবৃতিতে বলেন, আন্তঃমন্ত্রণালয়ের এক দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আবারও আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠক ডাকা হবে। সেখানেই লেবাননের কর্মীদের কিভাবে ফেরত আনা যায় তার সিদ্ধান্ত হতে পারে। ফ্লাইট না থাকায় কর্মীদের ফেরত আনার বিষয়টি কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে একটা আশার কথা কাতার এয়ারওয়েজ ফ্লাইট পরিচালনা করার একটি সিদ্ধান্তের কথা শোনা যাচ্ছে। আমরা বিষয়টি নিয়ে অনেক চিন্তা ভাবনা করছি, দেখা যাক কি করা যায়। এদিকে লেবাননের ডলার সঙ্গট ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা প্রায় এক বছরের বেশি সময় ধরে চলছে। আজ ঠিক হবে কাল ঠিক হবে বলে অাজও লেবাননের ডলার সঙ্কট নিরসন হচ্ছে নানা। বর্তমানে ১শত মার্কিন ডলারে মূল্যে ৮ লক্ষ লেবানিজ লিরা! যা পূর্বে ছিল ১ লক্ষ ৫০ হাজার লিরা। এক বছর যাবত দেশে টাকা না পাঠাতে পেরে অনেকেই বিপদে আছে দেশে ফিরতে চাইলেও ফিরতে পারছে না কারণ বেশিরভাগ লেবাননের থাকা প্রবাসীদের আকামা নেই। উল্লেখ্য যে, গত বছরের নভেম্বর মাসে সরকার বিরুধী বিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব থাকা “সা’দ হারিরি”। পদত্যাগের পর থেকে শুরু হয় লেবাননে একের পর এক সঙ্কট। সঙ্কট নিরসনেরর জন্য নতুন করে নির্বাচন হয়, মনোনীত হয় নতুন প্রধানমন্ত্রী। নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় “হাসান ডিয়াব” তিনিও ব্যর্থ হলেন লেবানন চলমান সঙ্কট বিমোচনে। বৈরুত বন্দরে বিষ্ফোরণের পর তিনিও পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এর কিছু পরে আবার নতুন করে নিয়োগ দেয়া হয় “মস্তুফা আদিব” তিনিও কিছু করতে পারেনি, শুরুতেই ধাক্কা সামলাতে না পেরে দুই সপ্তাহের মধ্যেই সেচ্ছায় দায়িত্ব থেকে সড়ে যান। নতুন সরকার গঠনে সমঝোতার জন্য কয়েক সপ্তাহের রাজনৈতিক উত্থান-পতনের পর গত ২২ অক্টোবর ফের “সা’দ হারিরি” নির্বাচনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়। উল্লেখ্য যে, ১৯৭৫-১৯৯০ সালের গৃহযুদ্ধের পর লেবানন বর্তমানে এখন সবচেয়ে সংকটময় সময় পার করছে। দেশটিতে ব্যাংকিং, মুদ্রা সঙ্কট, রাষ্ট্রীয় ঋণ এবং দারিদ্র্য বেড়ে যাওয়ার মতো কঠিন চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

  • 152
    Shares