পার্কিং লট নেই ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের বেশিরভাগ শপিংমলে, ভুগান্তি চরমে

২০ নভেম্বর, ২০২০ : ৩:১৮ অপরাহ্ণ ৩৯৭

কাজী আশরাফুল ইসলাম: একের পর এক শপিং মল গড়ে উঠায় খুব দ্রুতই বদলে যাচ্ছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের চেহারা।একসময় শহরে হাতেগোনা কয়েকটি মার্কেট থাকলেও এখন মার্কেটের সংখ্যা ডজন ছাড়িয়েছে।কিন্তু শহরের ভেতরে গড়ে উঠা এইসব শপিং মলের বেশিরভাগই গড়ে উঠেছে অপরিকল্পিতভাবে।পৌর শহরে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠা এই মার্কেটগুলোই শহরের যানজট নিরসনের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা বলে মনে করছেন শহরবাসী।

শহরের ব্যাস্ততম সড়কগুলোর পাশে অবস্থিত এইসব বিপনি-বিতানের প্রায় কোনটিতেই নেই পার্কিং-এর ব্যাবস্থা। যার কারনে এইসব মার্কেটে কেনাকাটাসহ বিভিন্ন কাজে আসা মানুষজনের সাথে থাকা ব্যাক্তিগত গাড়িগুলোকে কোথায় রাখবেন তা নিয়ে প্রায়ই পড়ছেন বিপাকে।অনেকটা বাধ্য হয়েই সড়কের উপর গাড়ি রেখে মার্কেটে প্রবেশ করেন ক্রেতারা।

শহরের ব্যাস্ততম সড়কগুলোর উপর পার্কিং করে রাখা গাড়িগুলো একদিকে পথচারীদের চলাচল বিঘ্নিত করছে এবং অন্য দিকে প্রতিনিয়তই যানজটের সৃষ্টি করছে।অথচ মার্কেট গুলো পৌরসভা কর্তৃক অনুমতি পাবার পূর্ব শর্ত হলো গাড়ি রাখার পর্যাপ্ত স্থান রাখা।কিন্তু এই নিয়ম শুধু কাগজপত্র পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। প্রায় প্রতিদিনই যানজটের কারনে নাকাল শহরবাসীর ভোগান্তি যেন দেখার কেউ নাই।

সরেজমিনে শহরের মধ্যস্থলে অবস্থিত মার্কেট গুলোতে গিয়ে দেখা যায়,প্রায় সবগুলো মার্কেটের অবস্থা প্রায় একই।মার্কেটের মালিকরা আন্ডারগ্রাউন্ডের পার্কিং প্লেসগুলো ভাড়া দিয়ে রেখেছেন বিভিন্ন শোরুমের কাছে এবং মার্কেটের সামনে থাকা খালি জায়গাগুলো ভাড়া দিয়ে রেখেছেন ছোট হকারদের কাছে।

শহরের কুমারশীল মোড়ের আমিন কমপ্লেক্স নামক বহুতল বাণিজ্যিক ভবনটিতে রয়েছে সরকারি ব্যাংক, বীমা, হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, আবাসিক হোটেলসহ অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। অথচ সুউচ্চ এই ভবনের গাড়ি পার্কিং হিসেবে রয়েছে নামকাওয়াস্তে পার্কিং এর জায়গা।আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকা পার্কিং লটের উল্লেখযোগ্য অংশ ভাড়া দিয়ে রেখেছেন একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কাছে।

একই কাজ করেছেন কোর্ট রোডস্থ ফরিদউদ্দীন আনোয়ার (এফ.এ) টাওয়ারের মালিক।তিনি আন্ডারগ্রাউন্ড ভাড়া দিয়েছেন সম্প্রতি ভেঙে ফেলা পৌর সুপার মার্কেটের দোকানীদের কাছে। এক্ষেত্রে দোকান মালিকরা দেখাচ্ছেন মানবতার ছুতো।নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যাবসায়ী বলছেন,পাশ্ববর্তী পৌর সুপার মার্কেট ভেঙে ফেলায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাবসায়ীদের সাময়িক আশ্রয় মিলেছে এফ.এ টাওয়ারের আন্ডারগ্রাউন্ডে।মার্কেটে আসা ক্রেতাদের গাড়ি পার্কিং এর জায়গা কোথায় জানতে চাইলে তারা বলেন, এই শহরে ড্রেনের উপর জায়গা খালি থাকে না,আর পার্কিং এর জায়গা খালি রাখাতো বিলাসিতা।

এছাড়াও পুরাতন সিনেমা হল রোডে অবস্থিত বিবাড়িয়া টাওয়ার,সড়ক বাজারের আল মদিনা টপ সেন্টার,মসজিদ রোডস্থ তিতাস টাওয়ার,মালেক ম্যানশন,পৌর হকার্স মার্কেটের গা ঘেঁষে গড়ে উঠা ছোট খাটো বিপনি-বিতানগুলোর কোনটিতেই নেই গাড়ি রাখার পর্যাপ্ত জায়গা।পৌরসভার নাকের ডগায় অবস্থিত পৌর আধুনিক সুপার মার্কেটের সামনে পর্যাপ্ত পার্কিং এর জায়গা থাকলেও এর পুরোটাই রয়েছে হকারদের দখলে।ছোট ছোট দোকান দেয়া এইসব হকারদের কাছ থেকে দৈনিক ভাড়া বলে চাদা নিচ্ছেন সরকার দলীয় অনুসারী কতিপয় নেতারা।মার্কেটে কোন কাজে গিয়ে ছোট খাটো দোকানগুলোর জন্য গাড়ি রাখতে গিয়ে বিপাকে পড়েন সাধারণ মানুষ। গাড়ি রাখা নিয়ে কথা-কাটাকাটির জেরে বিভিন্ন সময় এইসব হকারদের কাছে লাঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।এছাড়াও শহরের নামীদামি রেস্তোরাঁগুলোর প্রায় কোনটিতেই নেই গাড়ি রাখার ব্যাবস্থা।

শহরের জেল রোডস্থ ক্যাফে হাসান,কুমারশীল মোড়ের রাধুনি হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট,ফরিদুল হুদা রোডের খাওয়া দাওয়া হোটেল, কোর্ট রোডের কুটুমঘর রেস্তোরাঁ, মওলা ভবনের ক্যাফে আব্দুল্লাহ,থানা রোডস্থ খানা বাসমতী সহ সাম্প্রতিক সময়ে কাউতলীতে উদ্বোধন হওয়া গ্রীন চিলি রেস্টুরেন্টের সামনে গিয়ে কোনটির সামনেই পর্যাপ্ত গাড়ি রাখার স্থান চোখে পড়েনি।বরঞ্চ এইসব রেস্টুরেন্টে খেতে আসা মানুষজন তাদের গাড়ি পার্ক করে রাখছেন অনেকটা ফুটপাত কিংবা সড়কের উপর। এতে করে প্রায়ই সড়কে লেগে যাচ্ছে দীর্ঘ যানজট। অথচ পৌর কর্তৃপক্ষ শহরের যানজট নিরসনে একের পর পরিকল্পনা হাতে নিলেও এইসব মার্কেট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কোন ব্যাবস্থা নেয়ার বিপরীতে রহস্যজনক কারনে নীরব ভূমিকা পালন করছে।

পৌর মার্কেটের সামনে রাস্তার উপর বাইক দাড় করিয়ে রাখা তুহিন মিয়াকে রাস্তায় বাইক রাখার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন,’ মার্কেটের সামনে বাইক রাখার জায়গা চটপটি, ফুচকা ও পিঠা ব্যাবসায়ীদের দখলে। বাইক রাখবো কোথায়?’।

আরেক বাইক চালক হাবিব আহমেদ বলেন, ‘মার্কেটের সামনে জায়গা থাকলে সেখানে মোটরসাইকেল রাখলে অনেকটা স্বস্তিবোধ করি।কিন্তু যত্রতত্র গাড়ি রেখে গেলে চুরি হবার ভয় থাকে বেশি।’

আরেক পথচারী ইব্রাহিম মিয়া বলেন,’বাইক কী আর শখ করে রাস্তায় রাখি?তাছাড়া রাস্তার পাশে যত্রতত্র মোটরসাইকেল দাড় করিয়ে রাখলে প্রশাসনের লোকজন বাইক ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে চলে যায়!অথচ প্রশাসনের লোকজন ভাবে না সাধারণ মানুষ গাড়ি গুলো রাখবে কোথায়।তিনি বলেন, আইনের প্রয়োগ করে এইসব মার্কেটের বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা না নেয়া পৌরকর্তৃপক্ষের দায়িত্বে অবহেলার স্পষ্ট উদাহরণ।

সাধারণ মানুষের ভোগান্তি থেকে উত্তরণের কোন পথ আছে কিনা জানতে চাইলে সদর উপজেলা নাগরিক ফোরামের সহ-সভাপতি শাকিল আহমেদ বলেন,’এই সমস্যাটি একদিনে তৈরি হয়নি।মার্কেট মালিকদের অর্থের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত লোভ,শহরে জনসংখ্যা ও যানবাহনের বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত জায়গার অভাব,সাধারণ মানুষের অসচেতনতা এবং পৌর কর্তৃপক্ষের নজরদারি ও সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবই যানজটের মূল কারন।সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও রাজনৈতিক ব্যাক্তিদের সহযোগিতা নিয়ে সাধারণ নাগরিকদের পক্ষ থেকে খুব শীঘ্রই জেলা প্রশাসক এবং পৌর কর্তৃপক্ষের নিকট যানজট নিরসনের জন্য অতিদ্রুত পরিকল্পনা গ্রহণ করার জন্য একটি স্মারকলিপি দেয়া হবে।

এবিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার মেয়র মিসেস নায়ার কবিরের বক্তব্য জানার জন্য তার মোবাইলে ফোন করা হলে তা রিসিভ হয়নি।

শহরবাসীর এখন একটাই দাবি,প্রতিটি বিপনী বিতানে যাতে গাড়ি রাখার পর্যাপ্ত জায়গা রাখা হয় এবং সড়কের পাশে অপরিকল্পিতভাবে জায়গা দখল করে রাখা হকারদেরকে যেন অন্যত্র পূনর্বাসনের মাধ্যমে পার্কিং লটগুলো দখলমুক্ত করা হয়।

 

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

  • 598
    Shares