অবৈধ কমিটিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের ৮ বছর

২০ নভেম্বর, ২০২০ : ৩:৪৯ অপরাহ্ণ ২৮৮

সৈয়দ ঋয়াদ: দফায় দফায় নোটিশ পাঠানোর পরও গত আট বছরে নির্বাচন হয়নি ব্রাহ্মণবাড়িয়া পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের। শ্রম অধিদপ্তরের বিভাগীয় শ্রম দপ্তর শ্রীমঙ্গল থেকে নির্বাচনের সময় বেধে দিয়ে চিঠি পাঠালেও সরকারের নিয়ম নীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখাচ্ছে ইউনিয়নটি জোর পূর্বক দখলে রাখা শ্রমিক নেতাদের একটি অংশ। আট বছরের অচলাবস্থা কাটাতে শ্রমিকরা নির্বাচনের দাবি করলেও সেটি অদৃশ্য কারণে হচ্ছে না বলে দাবি শ্রমিকদের।

নির্বাচন করে বৈধ কমিটির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে ইউনিয়নের আহ্বায়ক, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে অনুলিপি দিয়ে বিভাগীয় শ্রম দপ্তরের রেজিষ্ট্রার অব ট্রেড ইউনিয়ন  শ্রীমঙ্গল এর উপ পরিচালক নাহিদুল ইসলাম এর ইস্যু করা গত ২৪ সেপ্টেম্বরের একটি চিঠি আসে এই প্রতিবেদকের কাছে।

বিভাগীয় শ্রম দপ্তরের পাঠানো এই নোটিশে বলা হয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের আহ্বায়ক কমিটি কর্তৃক এ দপ্তরে একটি মনোনিত( সিলেকটেড) কমিটির তালিকা দাখিল করা হয়েছে। কার্যকর কমিটির নির্বাচন সম্পর্কে ইউনিয়ন বিদ্যমান গঠনতন্ত্র ২৪ নং ধারায় সদস্যদের গোপন ব্যালটে প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচন সম্পন্ন করার বিধান থাকায় দাখিলকৃত মনোনিত কমিটি গঠণতন্ত্রের সাখে সঙ্গতিপূর্ণ না হওয়ায় উহা গ্রহণ বা অনুমোদন করা গেল না।

এছাড়া শ্রম  অধিদপ্তরের চিঠিতে আরো বলা হয়, বাংলাদেশে শ্রমবিধিমালা ২০১৫ এর ১৬৯(১) আমলে এনে ইউনিয়নের গঠনতন্ত্র অনুসরণপূর্বক পত্র প্রাপ্তি থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে গোপন ব্যালটে নির্বাচন সম্পন্ন করার জন্য আপনাদের নির্দেশ দেওয়া হলো। নির্বাচনের সকল বিষয় দপ্তরকে অবিহিত করতে হবে এবং এই আদেশ লঙ্গণ করলে ইউনিয়নের রেজিষ্ট্রেশন বাতিলের আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শ্রম অধিদপ্তরের দেওয়া চিঠির বিষয়ে জেলা পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নে অবৈধভাবে কমিটিতে থাকা সভাপতি সেলিম মিয়াকে ফোন করে অনির্বাচিত কমিটি গঠনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোনো নির্বাচন হয়নি। সাধারণ সভায় কমিটি হয়েছে। এর বেশি আমি কিছু  জানি না। কমিটির বিষয়ে জানতে চাইলে আহ্বায়ক হানিফ মিয়া ও যুগ্ম আহবায়ক নিয়ামত খানের কাছে ফোন করেন। আমি তাদের নাম্বার দিচ্ছি।

জেলা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতির কথায় জেলা পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের আহ্বায়ক হানিফ মিয়াকে ফোন করলে তিনি বলেন, ‘২০১৬ সালের ১৫ ডিসেম্বর তারিখ কমিটির মেয়াদ শেষ হলে ১২ সদস্যের একটি আহবায়ক কমিটি গঠন করে যেখানে আমাকে আহবায়ক করা হয়। পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যে নির্বাচন করে নতুন কমিটির হাতে ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলে। পরে আমরা দুই পক্ষের সমন্বয়ে সাধারণ সভা করে কমিটি করে ফেলি।’ তবে নির্বাচন ছাড়া কমিটির বৈধতার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এর কোনো উত্তর দিতে পারেননি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া শ্রমিক ইউনিয়নের যুগ্ম আহবায়ক নিয়ামত খানের কাছেও কিভাবে নতুন কমিটির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ২০১৬ আমাদেরকে আহবায়ক করা হলো। পরে কুমিল্লার মিটিংয়ে শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সেক্রেটারি আনিস চৌধুরী এমপি র আ ম ওবায়দুল মুকদাদির সাবকে নিয়ে সমালোচনা করেন। এই কথা এমপি সাব শুনে ফেলে। জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আল মামুন সরকারও শুনে ফেলে। তারা দুজনই বলে আওয়ামী লীগ  দলীয় প্রায়োরিটি দিয়ে কমিটি করতে। এছাড়া আল মামুন সরকার বলেন সভাপতি-সেক্রেটারি মতো ভাইটাল পদে যেন অবশ্যই  আওয়ামী লীগ থাকে। পরে আমরা সাধারণ সভা করে কমিটি করে ফেলি।

কিন্তু শ্রম দপ্তরের চিঠিতে আপনাদের করা কমিটিকে বিধিসম্মত নয় বলে জানালে জবাবে নিয়ামত খান বলেন, এডি ( উপ-পরিচালক) নাহিদ একটা চোর, সে একটা বাটবার। তারে যাদি এখন ৫০ হাজার টাকা দেই  সে এখনই এই কমিটিকে বৈধ কইবো (বলবেন)। হের বাফের শক্তি আছে কমিটি দেওয়ার। হে পাারবোনি  নির্বাচন দিতো? ফারলে হেরে কইন নির্বাচন দিতো। হে কিমুন বাফের ফুত দেহুমনে। এই কিমিটি আমরা দিছি, এই কমিটিই থাকবো। সাহস থাকলে হেরে কইন নির্বাচন দিতে!

আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের প্রাধান্য দিয়ে কমিটি করার বিষয়ের সত্যতা জানতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল মামুন সরকার বলেন, এর আগেও জেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন নির্বাচন হয়েছে কখনো দলীয় হস্তক্ষেপ বা প্রভাব ছিল না। তবে আমরা জামাতের বিষয়ে আপোস করি না। জামাত ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধীরা যেন কমিটিতে না থাকে। তবে সরকার দলীয় প্রায়োরিটি থাকতে হবে এমন কথা আমরা বলিনি। একটি স্বাধীন রেজিষ্ট্রেশন প্রাপ্ত ইউনিয়ন নির্বাচনের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। আপনার কাছে নিয়ামত খান যদি বলে থাকে আমরা কমিটির বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেছি সেটা তিনি মিথ্যা বলেছেন। এটা পুরোপুরি আমার আর এমপি সাহেবের উপর মিথ্যাচার।

শ্রম অধিদপ্তরের শ্রীমঙ্গল বিভাগীয় শ্রম দপ্তরের উপ পরিচালক রেজিষ্ট্রার অব ট্রেড ইউনিয়ন শ্রীমঙ্গল এর  উপ-পরিচালক নাহিদুল ইসলামের কাছে বিষয়টি জানতে ফোন করলে তিনি বলেন, আমার দপ্তর থেকে এই কমিটিটিকে যেহেতু অনুমোদন করি নাই। আমার দপ্তরের কাছে এটা সব সময়ই অবৈধ কমিটি। আমি এই কমিটিকে অলরেডি দুইটি চিঠি দিয়েছি। তারা যেন নির্বাচনের মাধ্যমে কমিটি করে।

তিনি বলেন,  এরা যেহেতু দুটো চিঠির কোনো উত্তর বা কমিটি গঠন নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। তাই আমি চলতি মাসের তিন তারিখে  তৃতীয় আরো একটি চিঠি তাদেরকে ইস্যূ করেছি। ২০১৬ সালের যে মেয়াদ উত্তীর্ণ কমিটি ছিলো, তাদেরকে বলেছি আপানারা নির্বাচন করনে তা না হলে আমি এই ইউনিউয়নের রেজিষ্ট্রেশন বাতিলের জন্য শ্রম আদালতে মামলা করবো। এখানে কে কি বললো সেটা দেখার বিষয় নাই, নির্বাচন ব্যতীত আমার দপ্তর কোনো কমিটি গ্রহণ করবে না।

জেলা পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের চলমান জটিলতার বিষয়ে জানতে জেলা প্রশাসক হায়াত উদ দৌলা খানকে ফোন করলে তিনি বলেন, ‘জেলা পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচনের বিষয়ে জানি। তবে এই বিষয়ে আমরা প্রশাসনিক সহায়তা করা ছাড়া আমাদের কিছু করার এখতিয়ার নেই। এটা শ্রম দপ্তরের বিষয়।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ আনিসুর রহমানের কাছেও শ্রম দপ্তরের চিঠিটি পাঠানো হয়। এই বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এই চিঠিটি আমাদের কাছে আসার কেনো কারণও নেই। তাছাড়া নির্বাচন হলে জেলা পুলিশ সব ধরণের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবে।’জেলা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক দশ বারের নির্বাচিত সভাপতি মনছুর আলী দানা মিয়াকে এই কিমিটির বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন,  গঠনতন্ত্র অনুসারে কোনো সাধারণ সভায় কোনো কমিটি হওয়ার বিধান নাই। নির্বাচনের মাধ্যমে কমিটি হতে হবে। আমি নিজেও সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়েছি।

আহবায়ক কমিটির যুগ্ম আহবায়ক নিয়ামত খান বলছেন তারা সাধারণ সভা করে কমিটি কতরেছেন। এই বিষয়য়ে মনছুর আলী দানা বলেন, নিয়ামত কি করে যুগ্ম আহ্বায়ক হন! তিনিতো আমার সংগঠণের সদ্যস্যই না। সাধারণ সভায় ৪৫ দিনের জন্য আহ্বায়ক কমিটি হতে পারে। পূর্ণাঙ্গ কমিটি হতে অবশ্যই নির্বাচন করতে হবে। আমার কাছে শ্রম অধিদপ্তরের দুটি চিঠি এসেছে, যেখানে চিঠিতে এই কিমিটিকে অবৈধ বলছে। দপ্তরে এই কমিটির কোনো বৈধতা নেই বলেও জানানো হয়। নির্বাচন না হলে আমাদের সংগঠনের রেজিষ্ট্রেশন বাতিল হবে। আমি নির্বাচন করি বা না করি সংগঠন বাঁচাতে এই নির্বাচন জরুরি।

উল্লেখ্য, গত ২০১৩ সালের জেলা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচনে দানা-জাকির পরিষদ ও সেলিম-আনিস প্রতিদ্ধন্ধীতা করলে সেই নির্বাচনে সভাপদি পদে মনছুর আলী দানা মিয়া ও আনিস চৌধুরী বিজয়ী হলে ওই কমিটির বিরুদ্ধে অনাস্থা জানায় শ্রমিকদের একটি অংশ। পরবর্তীতে ২০১৬ সালে আবারও নির্বাচনের সময় নির্ধারিত হলে সেটি হাই কোর্টের রায়ে স্থগিত হয়ে যায়। নির্বাচিত প্রার্থীদের কাজ করতে না দিয়ে টানা আট বছরই অবৈধভাবে চলছে শ্রমিক ইউনিয়ণের কার্যকলাপ। এরই মধ্যে নির্বাচনের জন্য বেশ কয়েকবার শ্রম অধিদপ্তর থেকে নির্বাচন করার কথা বলা হলেও  নানান টালবাহানায় নির্বাচন হতে দিচ্ছে না একটি পক্ষ।

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

  • 86
    Shares