সৌদিতে প্রবাসীরা কাদছে

১২ ডিসেম্বর, ২০২০ : ১২:২৪ পূর্বাহ্ণ ১৫৩
মসজিদে নববীর পাশে মানবেতর জীবন কাটাচাছে মাদারীপুরের সুমন আলী। (ফাইল ছবি)

তেপান্তর রিপোর্ট: করোনার প্রকোপ, কর্মসংস্থানের অভাব, অভিবাসন ব্যায় বৃদ্ধিসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে সৌদি প্রবাসীরা এখন দিশেহারা। তারা রীতিমতো কাদছেন।  সৌদি আরবে অর্থনৈতিক মন্দার কারনে দেশটিতে একের পর এক ব্যাবসায়ীক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়াকে এর মূল কারন হিসেবে বিবেচনা করছেন প্রবাসীরা। এই সমস্যা সমাধানের জন্য ও অর্থনৈতিক অবস্থা চাঙ্গা করতে সৌদি সরকার একের পর এক পদক্ষেপ গ্রহন করছে।কিন্তু এই পদক্ষেপে কোন সুফল তো পাওয়া যাচ্ছেইনা উল্টো এর প্রভাব প্রবাসীদের মধ্যে “মরার উপর খাড়ার ঘা” হিসেবে দেখা দিয়েছে, বলছেন প্রবাসীরা।

একই তো করোনা, ও কাজের সঙ্কট, অর্থনীতিক অবস্থা চাঙ্গা করতে করোনার আগেই প্রবাসীদের অভিবাসন ব্যায় বৃদ্ধি করেছে সৌদি সরকার। এছাড়া গত কয়েক বছরে কয়েক দফায় প্রবাসীদের জন্য প্রায় ৪০ টি কাজ নিষিদ্ধ করেছে দেশটির সরকার।এর ফলে কাজের অভাবে অনেক প্রবাসী সৌদি ছেড়ে নিজ দেশে চলে যাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে।অনেকে বলছেন প্রবাসী হঠাতে এসব পদক্ষেপ নিচ্ছে সৌদি সরকার।

গত কয়েক বছর দরে সৌদিতে এই অবস্থা বিরাজ করলেও বর্তমানে তা চরম সঙ্কট হিসেবে দেখা দিয়েছে। সামনের দিন গুলোতে এই সমস্যা সমাধানের কোন লক্ষণ দেখছেন না প্রবাসীরা। তাই চরম হতাশায় দিন কাটছে তাদের।
অপরদিকে কাজ না পেয়ে হতাশায় ভুগতে ভুগতে আত্নহত্যাও করছেন বাংলাদেশী প্রবাসীরা।

অনুসন্ধান করে জানা যায়, দেশে জমি বিক্রি করে ও সুধে টাকা সংগ্রহ করে যারা সৌদিতে এসেছেন তারাই আত্নহত্যা বেশি করছেন। কয়দিন পর পরই আত্নহত্যার ঘটনা ঘটছে, এসব খবর বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়ও আসছে।
সৌদিতে যারা নতুন আসছেন তাদের মধ্যে অনেকেই খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন। কারন, কর্ম না থাকায় খাবারের পয়সাও থাকেনা তাদের কাছে। মাসখানেক আগে এমনই কয়েকজনের সাথে কথা হয়েছিল এই প্রতিবেদকের। তারা বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে সৌদিতে এসেছেন নিজেদের ও পরিবারের দুঃখ্য গোছাতে।

কিন্তু তারা দুঃখ্য গোছাতে এসে যেন উল্টো দুঃখ্যের মরুভুমিতে পতিত হয়েছেন। তারা দালালের মাধ্যমে একেক জন সাড়ে পাচ থেকে সাড়ে ছয় লক্ষ টাকা দিয়ে এসেছেন ঠিকই কিন্তু এসে কোন কাজ পাচ্ছেনা। মাসের পর মাস যায় কিন্তু কোন কর্ম পান না তারা। ভারা বাসায় থাকার টাকা নেই, তাই এক পর্যায়ে দলাল তাদেরকে মরুভূমিতে তাবু টানিয়ে থাকার ব্যাবস্থা করে দেন। এবং সপ্তাহে দুই বা তিন দিন একবেলা করে খাওয়ার ব্যাবস্থা করেন। খাবার দেওয়া হয় সামান্য শুকনো রুটি। ভুক্তভোগীরা জানান, বাকি সময় তারা রাস্তার পাশে ডাস্টবিনের খাবার খেয়ে বাচেন। দিনে যখন সূর্য উঠে তখন তারা প্রচন্ড গরমে জীবন বাচাতে মরুভুমি ছেড়ে রাস্তার পাশে খেজুর গাছের ছায়ায় আশ্রয় নেন। আবার রাতের বেলা প্রচন্ড শীতে মরে যাওয়ার মতো অবস্থা। এই অবস্থায় টিকতে না পেরে তারা দালালকে বলেছিল তাদের দেশে পাঠিয়ে দিতে, কিন্তু সে জন্য দালাল মোটা অঙ্কের টাকা চান। তাই তারা দেশে আসতেও পারছেন না আবার এত কষ্ট সহ্য করে থাকতেও পারছেন না। এসব কথা বলার সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বসির আহমেদ কেদে ফেলেন। সৌদি আরবের মক্কায় বসির ও তার কয়েক বন্ধুর সাথে কথা হয়।তারা বলেন ক্বাবা’র হেরেমের আশে পাশে ঘুরাঘুরি করলে লোকে মাঝে মধ্যে খাবার দেয়।তাই আপাতত জীবন বাচানোর স্বার্থে কিছুদিন মক্কায় হেরেমের আশে পাশে থাকা যায় কিনা সেই চেষ্টা করছেন বলে জানান তারা।
শুধু তাই নয়, প্রবাসীদের মধ্যে যারা পুড়নো লোক তারাও দেশে আসার জন্য টাকা পান না। তাই তারা ইচ্ছা করে পুলিশের হাতে দরা দিয়ে দেশে যাচ্ছেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সমস্যাও আছে, তা হলো যাদের বৈধ ইকামা (রেসিডেন্ট পারমিট) আছে তাদের পুলিশ দরছেনা। ফলে তারা চাইলেও ইকামার মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত পুলিশে দরা দিয়ে দেশে আসতে পারেন না।
মাসখানেক আগের একটা ঘটনা বলা যাক।

কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার ঘোষঘর গ্রামের বাসিন্দা মান্নান ভূইয়ার ছেলে সুমন।তিনি মোটে বছর খানেক হলো সৌদি এসেছেন। কিন্তু বর্তমানে কাজ না থাকায় তিনি দেশে চলে যাবেন।ইকামারও মেয়াদ শেষ।সেই হিসেবে পুলিশে দরা দিলে পুলিশ দরার কথা এবং দেশে পাঠিয়ে দেওয়ার কথা। কিন্তু কয়েকবার তিনি পুলিশে দরা দিলেও দেশে না পাঠিয়ে ছেড়ে দেন।অবশেষে এক পরিচিত’র মাধ্যমে ১৫০০ রিয়াল (৩০,০০০ টাকা) সৌদির পুলিশকে ঘুষ দিয়ে তিনি দেশে আসতে সামর্থ হয়েছেন।

তবে অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ সামান্য ছুতো পেলেই বৈধ লোককে দরে দেশে পাঠিয়ে দেওয়ার নজিরও আছে।
ইকামা বিরম্বনা ছাড়ছেনা নতুনদের। যারা নতুন সৌদি আসছেন তাদের অনেকেই সহজে ইকামা পাচ্ছেন না। দালালরা ইকামা দিতে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হচ্ছেন। মাসের পর মাস এমনকি বছর পেড়িয়ে যায় কিন্তু ইকামা পাওয়া হয়না। আর কাজ? সেতো সোনার হরিন। ইকামা ছাড়া কোন কাজে জয়েন করা যায়না। কারন ইকামা ছাড়া লোক হলো অবৈধ। তাই তাদেরকে কেউ কাজ দেয়না। এই অবস্থায় অর্থসঙ্কট ও হতাশায়তো ভুগতে হয়, আরো বড় বিষয় হলো পুলিশের ভয়ে হয়ত তারা ঘরে বন্দি জীবন যাপন করে অথবা রাস্তায় বের হলেও লুকিয়ে লুকিয়ে চলাফেরা করে। পুলিশী ভীতি নিয়ে ফেরারি আসামীর মতো দিন যাপন করতে হয় ইকামা না পাওয়াদের।

এমনই একজন কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার হাটাস গ্রামের যুবক “আরিয়ান আহমেদ নাজির”। ৮ লক্ষ টাকা দিয়ে তিনি ১০ মাস আগে সৌদি এসেছেন।কিন্তু এখনো ইকামা পাননি।তাই কাজও করতে পারছেন না। এই অবস্থায় যিনি তাকে বিদেশ এনেছিলেন তার সাথে প্রায়ই মনোমালিন্য বা বাকবিতন্ডা হয়। ইকামা না থাকায় নাজিরকে ইতোমধ্যেই একবার পুলিশ আটক করেছিল। একদিন অনাহার অবস্থায় জেল খাটানোর পর ফিঙ্গার প্রিন্ট নিয়ে তাকে মুক্তি দিয়েছে।নাজির বলেন, এরকম আরো ১/২ বার আটক হলে আমাকে দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
তখন আমার ৮ লক্ষ টাকার কি হবে?

বাংলাদেশী প্রবাসীদের এই বাচা-মরার প্রশ্নে বাংলাদেশ সরকারের কোন ভূমিকা লক্ষ করা যাচ্ছেনা। প্রবাসীদের এসব সমস্যা সসমাধানে গত জানুয়ারির মাঝামাঝি সৌদির সাথে বাংলাদেশ একটি চুক্তি সাক্ষর করেছে। কিন্তু সেই চুক্তি বাস্তবায়নের কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছেনা। এই অবস্থায় প্রবাসীরা আরো হতাশাগ্রস্থ হয়ে পরছেন। তারা অচিরেই বাংলাদেশ সরকারের প্রতি প্রবাসীবান্ধব পদক্ষেপ নেওয়ার জোর দাবী জানান।

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

  • 21
    Shares