সারাজীবন আওয়ামীলীগ করেছি, শেষ বয়সে এলাকার মানুষের সেবা করার সুযোগ চাই

২২ ডিসেম্বর, ২০২০ : ২:০০ অপরাহ্ণ ১১৮২

মো: সিরাজুল ইসলাম। যিনি শৈশব থেকেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একজন ভক্ত। বঙ্গবন্ধু আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্য পেয়েছেন সিরাজুল ইসলাম। তখনই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সুহিলপুর বাজারে বঙ্গবন্ধুর খুব কাছে থেকে “জেলের তালা ভাঙবো, শেখ মুজিবকে আনবো” স্লোগান দিয়ে বঙ্গবন্ধুর আদর পেয়েছিলেন সিরাজুল ইসলাম। এরপর ১৯৮৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার মজলিশপুর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাধরণ সম্পাদক হিসেবে দায়ীত্ব পালন করে আসছেন তিনি। সারা জীবন আওয়ামীলীগে কাটিয়ে শেষ জীবনে তিনি মজলিশপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান হিসেবে দল থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশি সিরাজুল ইসলাম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সীমান্ত খোকন

 

তেপান্তর: কেমন আছেন?

সিরাজুল ইসলাম: আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি।

 

তেপান্তর: আপনার রাজনীতিতে আসার গল্পটা শুনতে চাই।

সিরাজুল ইসলাম: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে যখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় জেলে নেওয়া হয় তখন আমি ছোট, সম্ভবত ক্লাস ফোর-ফাইভে পড়ি। আমার চাচা আব্দুল মোতালেব এসে আমাদের বলতেন, আমার সাথে তোরা স্লোগান দিবি। আমি বলবো “জেলের তালা ভাঙবো” আর তোরা বলছি “শেখ মুজিবকে আনবো”। তখন এবাবেই আমার ছোট ভাই এবং চাচাতো ভাইদের নিয়ে চাচার সাথে মিছিল করতাম। এমনকি আমার স্কুলের সহপাঠিদের নিয়েও এরকম মিছিল করতাম। এবাবেই রাজনীতিতে আমার আসা। তবে মূলধারার সক্রিয় রাজনীতি শুরু করেছি ১৯৮৪ সাল থেকে। মূলত সেই ছোট কাল থেকেই আমি বঙ্গবন্ধুর অন্ধ ভক্ত ছিলাম। ১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধু আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্তি পেয়ে ঢাকায় যাওয়ার পথে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সুহিলপুরে পথসভা করেছিলেন। তখন আমি, আমার চাচাতো ভাই ও কিছু সহপাঠিদের আমার চাচা নিয়ে গেলেন সেই পথসভায়। চাচার পিছনে পিছনে সেই স্লোগান দিতে দিতে গিয়েছি। তখন এত লোক ছিলনা, সম্ভবত ৫০ থেকে ৭০ জন লোক বঙ্গবন্ধুর অপেক্ষায় দাড়িয়ে আছে। হঠাৎ একটি গাড়ি দিয়ে তিনি সুহিলপুর বাজারে এসে নামলেন। তখন আমি বঙ্গবন্ধুর অনেক কাছে দাড়িয়ে ছিলাম। যদিও তখন আমি বঙ্গবন্ধুকে চিনতামনা। কিন্তু জোসের ঠেলায় “জেলের তালা ভাঙবো, শেখ মুজিবকে আনবো” স্লোগান মেরে বসলাম। তখন আমি উনার খুবই কাছে। তখন সবাই অবাক। ঠিক তখনই বঙ্গবন্ধু আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন, “এইতো সাবাস”। সুহিলপুরের তাউস চৌধুরী এখনো এই ঘটনার সাক্ষি আছেন। বঙ্গবন্ধুর স্পর্শের কথা মনে হলে এখনো আমার গায়ে শিহরন জাগে। তখন থেকেই বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামীলীগের প্রতি আমার একটা হৃদয়ের টান তৈরি হয়েছে, যা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কোন ভাবেই যাবেনা। ১৯৮৪ সাল থেকে আমি মজলিশপুর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আমি এই পর্যন্ত দায়ীত্ব পালন করে আসছি। ৮৪ সালের আগে মজলিশপুরে আওয়ামীলীগের যেই কমিটি ছিল তা ছিল একেবারেই নিষ্কিৃয়। এতটাই নিষ্কিৃয় ছিল যে, আমার গ্রাম বাকাইলে চায়ের দোকানে বসে আওয়ামীলীগের পক্ষে কেউ কথা বলতে পারতোনা। আর আমার ইউনিয়নের অন্যদিক দিয়ে আরো ভয়ঙ্কর অবস্থা।
তখন আমি ইউনিয়নে আওয়ামীলীগটা চাঙ্গা করতে পেরেছিলাম কারন, আমার ডিগ্রী পরিক্ষার ফরম ফিলাপ করার পরেই আমার চাকরি হয়ে যায় ফরেস্টে। তখন আমার বাবা এক পীর সাহেবকে ডেকে এসে তার সামনে বললেন, হারাম রোজগারের দরকার নেই। তখন আমি ওই চাকরি ছেড়ে দিয়ে কুমিল্লার প্রশিকা নামক একটি এনজিওতে চাকরি করতাম। তাই মজলিশপুর, সুহিলপুর ও বুধল ইউনিয়নের কিছু গ্রামের সবাই ছিল আমার জানাশোনা। এই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে এসব গ্রামে আওয়ামীলীগের লোক কারা কারা তা খুজে বের করেছি। এভাবেই আমি মজলিশপুর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগকে এই জায়গায় এনেছি।

 

তেপান্তর: আপনি এতদিন যাবৎ আওয়ামীলীগে আছেন, কিন্তু এতদিনেও বড় কোন পদে না যাওয়ার কারন কি?

সিরাজ: আমি যখন থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ে রাজনীতি শুরু করেছি তখন বলার মতো কোন আওয়ামীলীগের লোক ছিলনা এখানে। আমার একটাই লক্ষ ছিল যে, যেভাবেই হোক আমি ইউনিয়ন আওয়ামীলীগকে চাঙ্গা করবো। শহরে গিয়ে রাজনীতি করে আমি কি করবো যদি গ্রামেই আমার লোক না থাকে? তাছাড়া আমার মাথায় সবসময় একটা জিসিষ কাজ করতো, আর তা হলো আমি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন করবো। আর তার জন্য এটাই সুযোগ।

 

তেপান্তর: এখন কি আপনি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন করার কথা ভাবছেন?

সিরাজ: হ্যা, ভাবছি।

 

তেপান্তর: আপনি কি মনে করেন যে, আপনি নির্বাচন করলে নির্বাচিত হবেন?

সিরাজ: ইনশাআল্লাহ, আশা করি। প্রত্যেকটা লোকের সাথে আমার সু-সর্ম্পক আছে। এছাড়া বিএনপির লোকেরাও আমাকে খুব পছন্দ করে। বিএনপি-আওয়ামীলীগ সবাই আমাকে পছন্দ করে।

 

তেপান্তর: আপনি নির্বাচিত হলে এলাকার কোন পরিবর্তন বা উন্নয়ন মানুষ আশা করতে পারে কিনা?

সিরাজ: আসলে আমার এলাকার লোকজন আমাকে ভালো করেই জানে, আমি কখনোই লোভী ছিলামনা। লোভের বশবর্তী হয়ে আমি জিবনে কোন কাজ আমি করিনি। চেষ্টা করেছি যতটুকু সম্ভব মানুষের উপকার করতে, বিনিময়ে কিছু আশাও করিনি। যেমন, শালিস-বৈঠকে আমাকে এক কাপ চা কেউ খাওয়াতে পারেনা। আপনি চাইলে কথাটা যাচাই করতে পারেন। আজ পর্যন্ত কোন গ্রাম্য শালিসে কেউ আমাকে এক কাপ চা খাওয়াতে পারেনা।

 

তেপান্তর: আপনি বলতে চাচ্ছেন আপনি চেয়ারম্যান হলে এলাকায় ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা পাবে?

সিরাজ: ইনশাআল্লাহ। যদি আমার কপালে থাকে আর আমার নেত্রী আমাকে দেন আর যদি আমি পাশ করতে পারি তাহলে বাকি জীবনটা আমি মানুষের কল্যানে বিলিয়ে দিতে চাই। বিনিময়ে কোন কিছু আমি চাইনা,চাওয়ার ইচ্ছাও নেই।

 

তেপান্তর: রাজনীতিতে আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনা কি?

সিরাজ: আমার ইউনিয়নকে ঘুছাতে গিয়ে আমি রাজনীতিতে উপর দিকে যাইনি। এখন আমি ইউনিয়ন আওয়ামীলীগ ঘুছিয়েছি। এখন যদি আমার নেতারা আমাকে কোন সুযোগ দেন, থানা কমিটি বা জেলা কমিটিতে নিলে যদি আমার নেতারা ভালো মনে করেন তাহলে ইনশাআল্লাহ আমি যবো। আমার কোন জোর নেই। দীর্ঘদিন আওয়ামীলীগের মজলিশপুর ইউনিয়নের সম্পাদক জীবনে ৩/৪ বার আমি ইলেকশনে গিয়েছি, বাকিটা সিলেকশনে। এখন আমার শেষ ইচ্ছা এটাই, নিজের এলাকার মানুষদের সেবা করা।

 

তেপান্তর: আপনি রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার পর কোন চ্যালেঞ্জিং সময় পার করেছেন?

সিরাজ: আমি ১৯৮৪ সালে যোগ দেওয়ার পর এমন সভা,মিছিল-মিটিং ছিলনা যেখানে আমি যোগ দেইনি। উপজেলা আওয়ামীলীগের এমন কোন সভা ছিলনা যেখানে আমি বক্তব্য ছিলনা। আমি এই সুযোগটা পেতাম। তখন বিএনপি সরকার ক্ষমতায়। আমাদের যতেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে। আন্দোলন-সংগ্রামে গিয়েছি। আর আমাদের দূর্ভাগ্য ছিল, আমাদের উপজেলা যদিও সদর কিন্তু রাজনীতি করতে হতো সরাইলের সাথে। এর কারন হলো, সদরের তিনটি ইউনিয়ন যেমন, মজলিশপুর, বুদল ও তালশহর র্পূব সরাইলের সাথে ছিল। ফরিদুল হুদা যখন নির্বাচন করেছিলেন তখন তিনিই নিয়ে গিয়েছিলেন সরাই। পরে এতদিন হয়ে গেলো কোন আওয়ামীলীগ নেতা এটাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাথে যুক্ত করেনি। করন, এই তিনটি ইউনিয়নে বিএনপির সমর্থক বেশি। বিএনপির ঘাটি বললেও ভুল হবেন। তো রবিউল ভাই (র আ ম উবায়দুল মুক্তাদির চৌধুরী) অনেক সাহস নিয়ে এই তিন ইউনিয়নকে আমার সদর উপজেলার সাথে যুক্ত করেছেন। সেজন্য আমরা তাকে দাম দিয়েছি ও দিচ্ছি। আর চ্যালেঞ্জিং বিষয় বলতে গেলে, সব আন্দোলন সংগ্রামে গিয়েছি। তখন বিএনপি ক্ষমতায়, কথা বলার সাহস পাইনা। আমি আমার দলের যারা আছে, আওয়ামীলীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নিয়ে বসেছি। তখন অবশ্য আমাদের বর্তমান চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলনা। তবে ২০০১ এ আমার বিরুদ্ধে ৬টি মামলা হয়েছিল। এগুলো করেছিল বিএনপির লোকেরা। তখন আমার গ্রামে বিএনপির লোকেরা বড় গলায় কথা বলতে পারতোনা। তখন আমাকে হিসাব করতো। ২০০১ এ বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার পর তারা প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে তারা চেয়েছিল প্রতিশোধ নিতে। তখন ৬টি মামলা দিয়েও আল্লাহর রহমতে তারা আমার কিছু করতে পারেনি। তখন তারা ভয়ানক দাপটে। তখন তারা হিন্দু লোক ও আওয়ামীলীগের লোকদের প্রচুর নির্যাতন করতো। সেই প্রভাব আমাদের এলাকায়ও ছিল। তখন সাত্তার সাহেব ও আমিনী হুজুর থানায় গিয়ে সুপারিশ করেছিল আমাকে গ্রেফতার করার জন্য।

 

তেপান্তর: আপনার কর্মজীবন ও পড়াশোনার বিষয়ে যদি কিছু বলতেন?

সিরাজ: পড়াশোনার হাতেখড়ি বাকাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তারপর আমি বাকাইল উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছি। ১৯৭৪ সালে আমি এসএসসি পাশ করি। আর ৭৬-এ এইচএসসি পাশ করেছি। তারপর ৭৮ এ ডিগ্রী ফাইনাল পরিক্ষা দেওয়ার জন্য ফরম পূরণ করেছিলাম। কিন্তু তখনই একটি ইন্টারভিউ দিলাম, আর ফরেস্টে আমার চাকরি হয়ে যায়। তখন ডিগ্রী পরিক্ষা দেওয়া হয়নি। পরে অবশ্য এই চাকরিটা করা হয়নি। কারন বাবা বলেছেন এই চাকরি করলে ঘুষ খেতে হবে। তাই এটা ছেড়ে দিতে হলো। তারপর চলে গেলাম সিঙ্গাপুর। সেখানেও কাজের সুবিধা করতে পারিনি। দেশে ফিরে এসে কুমিল্লার প্রশিকা এনজিওতে চাকরি শুরু করলাম। এই চাকরিতেও বিরক্ত হয়ে গেলাম। তারপর সেটা ছেড়ে দিয়ে ব্যবসা করেছি।

 

তেপান্তর: আপনার শেষ কথা।

সিরাজ: গত ইউনিয়ন পরিষধ নির্বাচনে কিছু বিশ্রী বিষয় ঘটেছে,যদিও সেসব এখন আর বলতে চাইনা। টাকা দিয়েও অনেকে নমিনেশন কিনেছেন। তবে এবার নেত্রী যেরকমের দলীয় কর্মী চাচ্ছে নমিনেশন দিতে, যদি সেই হিসেবে আমি পড়ি তাহলে আমাকে যেন নমিনেশন দেন সেটার জন্য জোর দাবী রইলো। কারন সারাটা জীবন আওয়ামীলীগে আছি, কখনো কিছু চাইনি। কারন আমি শতভাগ আত্নবিশ্বাসী, আমি সেই ভাবেই রাজনীতি করেছি যেমন কর্মী নেত্রী চাচ্ছেন। এটাই আমার শেষ চাওয়া, শেষ বয়সে যদি অন্তত নির্বাচন করার সুযোগ দেয় তাহলে আমি পাশ করতে পারি। বাকি জীনটা যেন আমি আমার এলাকার জন্য কাজ করে যেতে পারি এটাই আমার শেষ কথা।

 

তেপান্তর: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

সিরাজ: আপনাকেও ধন্যবাদ।

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

  • 614
    Shares