মাদক ব্যবসায়ীরা বেতন দিয়ে শতাধিক লোক রাখে তথ্য পাওয়ার জন্য, এর মধ্যে শিশুও আছে

২৩ ডিসেম্বর, ২০২০ : ১:১২ অপরাহ্ণ ৯৯৪

সীমান্তবর্তী জেলা হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে মাদক চোরাচালান এবং কেনা-বেচা অন্য অনেক জেলার চেয়ে বেশি। বাংলাদেশ সরকার মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করার পরও থেমে নেই মাদক কারবার। মাঝখানে কিছুদিন মাদক চোরাচালান ও কেনা-বেচা কিছুটা কম হলেও এখন আবার বেড়েছে। এমনকি অভিযোগ আছে যেসকল সরকারি সংস্থা মাদক নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত তারা সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না। অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে মাদক উদ্ধার ও মাদক ব্যাবসায়ীদের আটক করে টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দিচ্ছে কিংবা উদ্ধারকৃত মাদকের পরিমাণ কমিয়ে মামলার এজাহার লেখা হচ্ছে। এমনটাই অভিযোগ। তেপান্তরের কাছে আসা এসব অভিযোগ এর ব্যাপারে এবং জেলার বর্তমান মাদক নিয়ন্ত্রণের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ব্রাহ্মণবাড়িয়া‘র মুখোমুখি হয়েছিলেন তেপান্তরের কাজী আশরাফুল ইসলাম। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাদক পরিস্থিতির বিভিন্ন দিক নিয়ে তেপান্তরের সাথে কথা বলেছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ব্রাহ্মণবাড়িয়া’র ভারপ্রাপ্ত সহকারী পরিচালক মু.মিজানুর রহমান । মিজানুর রহমান ২০২০ সালের জুলাই মাসের ১৯ তারিখ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ভারপ্রাপ্ত সহকারী পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন।

তেপান্তর: শুভ সকাল, কেমন আছেন?

মু.মিজানুর রহমান: শুভ সকাল, ভাল আছি।

 

তেপান্তর: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাদক পরিস্থিতির কি অবস্থা?

মু.মিজানুর রহমান: মাদক নিয়ন্ত্রণের পরিস্থিতি আশানুরূপ ভাল তেমনটি বলবোনা, তবে খারাপও বলবোনা। আমরা ধারাবাহিক ভাবে অভিযান এবং কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের জন্য। যদিও আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা আছে।

 

তেপান্তর: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলো মাদকে সয়লাব, সেখানে আপনাদের অভিযান কেমন?

মিজান: আমাদের পুরো জেলায় প্রায় ৭২ কি.মি.সীমান্তবর্তী এলাকা রয়েছে যা আমাদের সক্ষমতার তুলনায় বিশাল।বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও আমরা জেলার বিভিন্ন স্থানে প্রত্যেকদিন অভিযান পরিচালনা করে যাচ্ছি।

 

তেপান্তর: সীমান্তের মাদকের গডফাদারদের বিষয়ে আপনাদের কাছে কোন তথ্য আছে কি? থাকলে সেগুলো কি? এবং তাদের নাম কি?

মিজান: হ্যা তথ্য আছে, আমরা তালিকা করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দিয়েছি এবং ধারাবাহিক ভাবে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে যাচ্ছি।

 

তেপান্তর: আপনারা মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে অন্য কোন বাহিনীর দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হন কি?

মিজান: না,তারা আমাদের সহযোগিতা করেন।

 

তেপান্তর: মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সীমাবদ্ধতা কি?

মিজান: জনবলের অভাব এবং অস্ত্রহীনতা।১৯৯০ সালে আমাদে দপ্তর প্রতিষ্ঠাকালে সদস্য ছিল সারাদেশে মাত্র ৭০০ জন এবং এখন আছে কেবল ৩০৫৯ জন। আমার জেলায় সরকারিভাবে ৩২ জন থাকার কথা থাকলেও এখন আমরা আছি ১৪ জন,যাদের মধ্যে মাঠপর্যায়ে মাত্র ৭ জন। তবে কিছু নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন আছে। আপনারা জানেন যে মাদক ব্যাবসায়ীরা হচ্ছে টপ টেরর। মাদকের সাথে সকল অপরাধের একটা যোগসূত্র আছে। যার দরুন জীবনের ঝুঁকি থাকে,তার মধ্যে আবার আমরা নিরস্ত্র।

 

তেপান্তর: জনবল বৃদ্ধি এবং অস্ত্রের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চাহিদাপত্র দিয়েছেন কিনা?

মিজান: আমাদের উর্ধতন কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট বিভাগে চাহিদাপত্র দিয়েছেন। বিষয়গুলো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, তবে কিছুটা সময় লাগবে।

 

তেপান্তর: আপনি বলেছেন অন্য সংস্থা বা বাহিনী আপনাদেরকে সহযোগিতা করে থাকে,তাহলে তাদের সাথে সমন্বয় করে অভিযান পরিচালনা করেন না কেন যেহেতু আপনাদের জনবল সংকট এবং আপনারা নিরস্ত্র?

মিজান: আমরা নিয়মিত সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করে যাচ্ছি। কিন্তু আপনারা জানেন মাদক ব্যাবসায়ীরা কিংবা চোরাচালানকারীরা অনেক চতুর এবং সতর্ক। তারা ১০ মিনিটের বেশি কোথাও অবস্থান করেনা। আমাদের কাছে তথ্য আসার সাথে সাথে আমরা পুলিশ,RAB বা বিজিবিকে জানালে তাদের যথাস্থানে যেতে অন্তত ২০ থেকে ৩০ মিনিট সময় লাগে। এর মধ্যে চোরাকারবারিরা অবস্থান পরিবর্তন করে ফেলে এবং সতর্ক হয়ে যায়। এমনকি তাদের নেটওয়ার্কিং অনেক বিশাল।সকল ব্যাবসায়ীরা মিলে এলাকার চারদিকে প্রায় ১০০ জনের মত লোক মাসিক বেতন দিয়ে রাখে যাদের কাজ হচ্ছে কখন কোথায় অভিযান হচ্ছে কিংবা সীমান্ত এলাকায় কখন কারা ঢুকছে তার খবর দেয়া। যাদের মধ্যে ১০ থেকে ১২ বছরের শিশুও আছে যারা ব্যাবসায়ীদের খবর দিয়ে থাকে। আপনি সীমান্ত এলাকায় গিয়ে দেখবেন আপনি পা রাখার সাথে সাথে খবর ছড়িয়ে পড়েছে।

 

তেপান্তর: মাঝে-মধ্যেই আপনাদের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসায়ীদের ছেড়ে দেয়ার বা তাদের সাথে আপোষ করার অভিযোগ উঠে।এমনকি টাকার বিনিময়ে উদ্ধারকৃত মাদকের পরিমাণ মামলার এজাহারে কমিয়ে দেয়ার অভিযোগও কখনো কখনো পাওয়া যায়।

মিজান: এই অভিযোগ সত্য নয়,অন্তত আমি আসার পরে এরকম কোন ঘটনা ঘটেনি। আমার সহকর্মীরা অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। তারপরও যদি আপনাদের কাছে কিংবা অন্যকারো কাছে এরকম কোন অভিযোগের তথ্য উপাত্ত থাকে আমাদেরকে বা আমাকে জানাবেন। আমরা আমাদের বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করব।অভিযোগকারীর পরিচয় অবশ্যই গোপন রাখা হবে এবং প্রয়োজনে পুরস্কৃত করা হবে। তাছাড়া ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দেখবেন ২০০ পিস ইয়াবায় যে সাজা ২০ পিসেও একই সাজা।

 

তেপান্তর: নভেম্বর মাসে আপনারা কি পরিমাণ মাদক উদ্ধার করেছেন এবং কয়টি মামলা দিয়েছেন?

মিজান: গতমাসে আমরা ৩৮৫ পিস ইয়াবা,৮৩ কেজি গাজা,১৩৫ বোতল ভারতীয় ইস্কপ এবং ৯৫ বোতল ফেন্সিডিল উদ্ধার করতে সক্ষম হই। তাছাড়া মাদক পরিবহনে ব্যাবহৃত ১টি ট্রাক,১টি অটোরিকশা এবং ১টি মোটরসাইকেল আটক করি। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ২২টি মামলা হয়।তাছাড়া ১টি মামলায় মোবাইল কোর্টে সাজা হয়।

তেপান্তর: মামলার পর কোন ফলোআপ রাখেন কি?

মিজান: মামলা হওয়ার পর কোর্টে চালান দেয়ার পর আমাদের হাতে কিছু থাকে না। তবে এটা বলতে পারি আমাদের মামলার প্যাটার্ন ভিন্ন।মামলা দায়েরের জন্য শতাধিক তথ্য কালেকশন করে থাকি। যার কারণে দেখবেন আমাদের দায়েরকৃত মামলার প্রায় ৯৫% সাজা হয়।

তেপান্তর: আপনি আসার পর গত তিন মাসে কতজন সাজাপ্রাপ্ত হয়েছে এবং সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে কয়জন সাজাভোগ করছে আর কয়জন জামিনে আছে?

মিজান: এমূহুর্তে বলতে পারছি না,তবে জেনে জানাতে পারবো।

তেপান্তর: বলা হয় যারা মাদক মামলায় কারাগারে যায় তারা নাকি বের হয়ে আসে বড় ব্যবসায়ী হয়ে। অন্য মাদক ব্যাবসায়ীদের সাথে কারাভোগের ফলে তাদের নেটওয়ার্কিং আরও বেড়ে যায়।

মিজান: দেখুন, এটা আমাদের এখতিয়ার বহির্ভূত। তবে আমরা তাদের নিয়মিত নজরদারিতে রাখি,সে অনুযায়ী ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করি।

 

তেপান্তর: অনেক মাদক ব্যবসায়ী বলে যে,আপনাদেরকে মাসোয়ারা দিয়েই তারা ব্যবসা করে। এ বিষয়ে আপনি কি বলবেন?

মিজান: এটা সত্য নয়। দেখুন, তারা এটা বলে তাদের ভোক্তাদের অভয় দেয়ার জন্য। আপনি তাদের সাথে কথা বললে মনে হবে সকল দোষ আমাদের, আর তারা একেবারে নিরীহ। তবে আমি পরিষ্কার করে বলতে চাই, আমরা সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করেছি। কাউকেই নূন্যতম ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই এবং দেয়া হবে না।

 

তেপান্তর: জেলায় অনুমোদিত মাদক নিরাময় কেন্দ্রের সংখ্যা কয়টি এবং এগুলোতে আপনাদের মনিটরিং কেমন?

মিজান: এই জেলায় প্রত্যাশা,প্রয়াস,প্রত্যয় ও আশীর্বাদ নামে ৪টি সরকার অনুমোদিত মাদক নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে। এগুলো আমাদের মনিটরিং এ থাকে এবং প্রত্যেক মাসে আমরা এগুলো পরিদর্শনে যাই।

 

তেপান্তর: অভিযোগ আছে আপনাদের অনুমোদিত মাদক নিরাময় কেন্দ্রে মাদকাসক্তদের অমানবিক নির্যাতন করা হয়। আবার কেউ কেউ সেখানে মাদক সহজলভ্যও করে রাখে। এ ব্যাপারে কী বলবেন?

মিজান: আমি যোগদানের পর সুনির্দিষ্ট অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে “অশ্রু” নামক একটি নিরাময় কেন্দ্র সীলগালা করে দেই। বাকীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

 

তেপান্তর: মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে আপনারা সামাজিক সচেতনতা মূলক কর্মসূচি পালন করেন কিনা?

মিজান: জ্বি, এটা আমরা নিয়মিত করে থাকি। তবে এখন কোভিড-১৯ এর কারণে স্থগিত আছে।

তেপান্তর: মাদকের সহজলভ্যতার কারণে মাদকাসক্তের সংখ্যা দিন দিন আশঙ্কাজনকহারে বৃদ্ধি পাচ্ছে যার মধ্যে রয়েছে অসংখ্য কিশোর। অবিভাবকরা তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। এক্ষেত্রে করণীয় কি?

মিজান: দেখুন, আমরা সরকারি সংস্থাগুলো যার যার অবস্থান থেকে মাদকের বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছি। কিন্তু আমাদের স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিরা এবং পাড়া,মহল্লা,গ্রাম ও পরিবারের অবিভাবকরা সচেতন না হলে,মাদকের বিরুদ্ধে রুখে না দাড়ালে আমাদের একার পক্ষে কখনোই মাদকদ্রব্য চোরাচালান ও কেনা-বেচা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

তেপান্তর: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ,বিশ্বাস করি এদেশ ও সমাজ একদিন মাদকমুক্ত হবে।

মিজান: আপনাকেও অসংখ্য ধন্যবাদ।

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।