আজকে মন্ত্রীর যদি কিছু হয়ে যায় তাহলে কাজলের অবস্থা শোচনীয় হবে

১৮ জানুয়ারি, ২০২১ : ৬:৪৮ অপরাহ্ণ ১৭০৩

নূরুল হক ভূইয়া এবারের আখাউড়া পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী। দলীয় মনোনয়ন ছাড়া তিনি বিদ্রোহী (সতন্ত্র) হিসেবে নির্বাচন করছেন। ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতি করেছেন। তারপর আওয়ামীলীগ। রাজনৈতিক জীবনে তিনি ইউপি চেয়ারম্যান ছিলেন ১৫ বছর। এরপর ২০০২ সালে আখাউড়া পৌরসভার মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হয়ে একটানা ৯ বছর দায়ীত্বে ছিলেন। বর্তমানেও আওয়ামীলীগের রাজনীতি করছেন। আখাউড়া উপাজেলা আওয়ামীলীগের আহবায়ক কমিটির সদস্য তিনি। সম্প্রতি তার প্রতিদ্বন্ধী প্রার্থী ও আখাউড়া পৌরসভার বর্তমান মেয়র তাকজিল খলিফা কাজল দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পরই মেয়রের এক সমর্থক নূরুল হক ভূইয়াকে প্রকাশ্যে জুতাপেটা করেছেন। বিষয়টি নিয়ে উত্তাপ ছড়িয়েছে আখাউড়ার পৌর নির্বাচনে। নির্বাচনকে ঘিরে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তিনি খোলাখুলি কথা বলেছেন তেপান্তরের সাথে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সীমান্ত খোকন

 

তেপান্তর: আপনি এবার কোন দল থেকে নির্বাচন করছেন?

নূরুল হক ভূইয়া: আমি এবার আওয়ামীলীগ থেকেই মনোনয়ন চাওয়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু দেখলাম যে মন্ত্রী সাহেব (আইন মন্ত্রী আনিসুল হক) বর্তমান মেয়রের খুব ঘনিষ্ট লোক। যেকোন রিস্ক নিতে উনি রাজি। এজন্য দলীয় মনোনয়ন আমি চাইনি। তাই নিজে আমি সরাসরি সতন্ত্রভাবেই নির্বাচন করছি।

 

তেপান্তর: আখাউড়া পৌর নির্বাচনে মেয়র প্রার্থীদের মনোভাব কেমন?

নূরুল হক: প্রার্থীদের দেখলাম যে সবাই যার যার মতো আছে। দুইজন প্রার্থী কি নির্বাচন করবে সেদিকে কোন আগ্রহ নেই। দুজনই কাজলের (বর্তমান মেয়র) বিরুদ্ধে। তাদের উদ্যেশ্য কাজলকে যেকোন ভাবেই ফেইল করাতে হবে। তারা হলো শফিক আর মোহাম্মদ আলী। আরেক প্রার্থী রতন, সেও কাজলকে হাড়ানোর জন্য আমাকে সমর্থন করতে পারে। আমরা মোট প্রার্থী ৫ জন।

 

তেপান্তর: এবারের নির্বাচনী হাওয়া কি অন্য সময়ের চেয়ে ভিন্ন মনে হচ্ছে?

নূরুল হক: এবারের নির্বাচনী হাওয়া অন্য সময়ের চেয়ে ভিন্ন। বর্তমান মেয়রও যত রকমের ষড়যন্ত্র আছে, বিশেষ করে আমার বিরুদ্ধে তা সবই করছেন। যার ফলে একের পর এক আমার পরিস্থিতিটা কঠিনই হচ্ছে। শুরু থেকেই সে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে, এখনো তা চলমান আছে। শুধু আমাকে কিভাবে নির্বাচন থেকে সরানো যায়।

 

তেপান্তর: কয়দিন আগে বর্তমান মেয়রের এক সমর্থক আপনার উপর হামলা করেছে।

নূরুল হক: বর্তমান মেয়রের একটি ভীতির কারন হলাম আমি। আর মেয়রের খাস লোক সে (হামলাকারি)। সে (হামলাকারি সোহাগ মোল্লা) একজন্য ইয়াবা ব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসী। খুব দাগী সন্ত্রাসী। থানায় অনেকগুলো মামলা আছে তার বিরুদ্ধে। ইয়াবার মামলাসহ অনেক মামলা। তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানাও আছে। কিন্তু মেয়রের কারনে তাকে ধরা যাচ্ছেনা। তো আমার ঘটনায় মামলা দিয়েছি। সেটাকে জিডি হিসেবে নিয়েছে।

 

তেপান্তর: এঘটনার পর পুলিশ কেমন আইনি ব্যবস্থা নিয়েছে?

নূরুল হক: পুলিশ দুইদিন গিয়েছিল তাকে ধরতে। ওসির উপরও উপর মহল থেকে বিভিন্ন প্রেশার আসছে। সেই হিসেবে ওসিও চেষ্টা করছে বলে জানায়।

 

তেপান্তর: বর্তমান মেয়র কাজলের প্রতি পৌরবাসী কতটা সন্তুষ্ট বলে আপনি মনে করেন?

নূরুল হক: মেয়র কাজলের প্রতি মানুষের মনোভাব খুব খারাপ। মানুষ পরিবর্তন চাচ্ছে।যেখানেই যায়, তার নিজস্ব লোকগুলো ছাড়া ৮০ ভাগ লোক পরিবর্তন চাচ্ছে। কিন্তু তার খাস লোকগুলো পারলে তার এসব কর্মকান্ডের কথা ঢেকে রাখে। এবং বলে যে, কাজল ভাই বিপুল ভোটে পাশ করে ফেলবে। আর গতকাল জামানত জমা দেওয়ার সময় পৌরসভার বাইরের বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে সে হাজারো লোক জড়ো করেছে। মোগড়া,মনিয়ন্দ,ধরখার, সিঙ্গারবিল ও আখাউড়া দক্ষিণ ইউনিয়নের সব লোক সাথে নিয়ে মনোনয়ন জমা দিয়েছে। সেখানে পৌরসভার লোক ছিলনা। একজন রিক্সাওয়ালার কাছে জানতে চাইলেও এই কথা বলবে।

তেপান্তর: অতীতে বর্তমান মেয়রের নানা কর্মকান্ড সমালোচনার জন্ম দিয়েছে, পত্রিকার শিরোনামও হয়েছে। এই বিষয়টা কিভাবে দেখেন?

নূরুল হক: যা হয়েছে এগুলোতো একদম সত্য।এরপর দূর্নিতী দমন কমিশন (দুদক) তার বিরুদ্ধে একটি মামলাও করতে যাচ্ছিল। মামলা হতো, সব রেডি ছিল। কিন্তু মন্ত্রী সাহেব সরাসরি দুদককে বলেছে এখন এসব বন্ধ করো, তোমরা তোমাদের কাজ করো গিয়ে। ডাইরেক্ট না করে দিয়েছে। একারনেই সে বেচে আছে। দুদকের অফিসার আমার সাথেও কথা বলেছে। জানতে চেয়েছে এই ঘটনাগুলো ঠিক কিনা? আমি বলেছি সব ঠিক।

 

তেপান্তর: কি বিষয়ে দুদক এসেছিল?

নূরুল হক: এইযে বাড়ি করছে, এছাড়াও আরো কিছু কিছু বিষয় আছে সেগুলো জানতে চেয়েছিল।

 

তেপান্তর: বাড়ি কি অনেক টাকা দিয়ে তৈরি করছিল?

নূরুল হক: হ্যা,টাকাতো, ব্যপারটা হয়েছে মন্ত্রী চাকরি দেয়, সে পয়সা লয়। অতী গোপনে মানুষ দিয়ে দেয়। মানুষও দেখে গোপনে পেয়ে যায়। এভাবেই সে কোটি টাকার বেশি কামিয়ে ফেলেছে। বহু লোককে চাকরি দিয়েছে। নিয়োগপত্র পাওয়ার আগেই সে কাজ বানিয়ে ফেলে। তবে এর মধ্যে কিছু বিষয় মন্ত্রী জানেন আর কিছু জানেন না।

 

তেপান্তর: নানা সমালোচনার পরও কিন্তু বর্তমান মেয়র দল থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন। এর কারনটা কি?

নূরুল হক: এটা পাওয়ার একমাত্র কারন হলো মন্ত্রী। মন্ত্রীর বাসায় গিয়ে নাকি পরিষ্কার বলেছে যে, “আপনি আমাকে না দিলে আমি বিষ খেয়ে মরে যাবো”। আমি আখাউড়া থাকতেই পারবোনা। এরকমও শুনেছি। আজকে মন্ত্রীর যদি কিছু হয়ে যায় তাহলে তার (বর্তমান মেয়র) অবস্থা শোচনীয় হয়ে যাবে। কিন্তু মন্ত্রীর কারনে একের পর এক সে সবকিছু করে যাচ্ছে। পৌরসভা থেকে কিন্তু সে লুটপাট করে টাকা নেয়না, সে মন্ত্রীর কারনে বিভিন্ন মেকানিজমে বিভিন্ন জায়গা থেকে কোটি কোটি টাকা কামিয়ে ফেলেছে। তবে এসবের অনেক কিছু মন্ত্রী মহোদয় জানেনও না। পয়সা প্রচুর খরচ করছে সে। একটা সভা-সেমিনার করলে পয়সা দিয়ে লোক আনে সে। সামান্য একটা মিটিংয়ে সে মানুষকে বিরিয়ানী খাওয়ায়।

 

তেপান্তর: এমনকি হয় যে, মেয়র পৌরবাসীর উপর কোন দয়া মায়া দেখাননা?

নূরুল হক: পৌরসভার মানুষ তাকে অন্তর দিয়ে কিছুটাও ভালোবাসেনা। তো সে প্রকাশ্যে একজন জনদরদী নেতার মতোই সেজে থাকে।

 

তেপান্তর: আবারও যদি তিনি মেয়র নির্বাচিত হোন তাহলে পৌরবাসীর জন্য ভালো কিছু হতে পারে বলে মনে করেন?

নূরুল হক: বেশি খারাপ হবে। একটা জন্ম নিবন্ধন সনদ আমি দিতাম বিনা পয়সায়। কিন্ত অনেক লোক আমাকে গতকালও বলেছে, একটি জন্ম নিবন্ধন সনদ আনতে গেলে তিন দিন চার দিন এক সপ্তাহ ঘুরায়। তারপর বলে খাজনা সব দিয়ে এসো। ২০/২২ হাজার টাকা খাজনা দিয়ে সারলে এরপরও ১০ দিন ৭ দিন ঘুরে পাওয়াটা ভাগ্যের ব্যপার হয়ে দাড়ায়।

 

তেপান্তর: আখাউড়া পৌর নির্বাচনে ভোটারদের মনোভাব কেমন দেখছেন?

নূরুল হক: গতকালও ৫/১০ জন লোক বলেছে, যদি ভোট দিতে পারি তাহলে কাজলকে দিবোনা। গত দুই নির্বাচনেতো ভোট দিতে পারিনি। তাই ভোট যদি দিতে পারি তাহলে কাজলকে হটাবো। সাবেক মেয়রকে আমরা চাই। সে যাদেরকে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ বানিয়েছে তারা তার নিজস্ব লোক। আওয়ামীলীগের কোন লোক তার সাথে নেই।

 

তেপান্তর: আপনি যদি মেয়র নির্বাচিত হোন তাহলে এলাকার ভালো কি হতে পারে?

নূরুল হক: এলাকার জন্য সবচেয়ে বড় যে জিনিষটা সেটাই করবো। জন্মদিবন্ধন সনদের ক্ষেত্রে টেক্স আদায় করে তারপর সনদ দেওয়ার বিষয়টা আমি বন্ধ করে দিবো। আমি এমনিতেই এসব সার্টিফিকেট দিবো। আর বাস্তবমুখী উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড যা আছে সবই আমি করবো।

 

তেপান্তর: মাদকের বিরুদ্ধে কিন্তু আমরা তেমন তৎপরতা দেখিনা।

নূরুল হক: আখাউড়াতে মাদকের তেমন একটা তৎপারতা নেই। আর যা আছে কাজলের কিছু নিজস্ব লোকই করে। এক্কেবারে সরাসরি তার সেল্টারে। এইযে আমার উপর যেই ঘটনাটা ঘটেছে (হামলা) সেও ইয়াবা ব্যবসা করে। এটা রিক্সাওয়ালাও বলবে।

 

তেপান্তর: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

নূরুল হক: আপানাদেরও ধন্যবাদ।

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।