অধমের ধর্মানুভূতি

২৯ মার্চ, ২০২১ : ৩:৩৩ অপরাহ্ণ ৮২৩

মোস্তাফিজ চৌধুরী: অধম তার জন্মের পর যখন ধীরে ধীরে সবকিছু বুঝতে শুরু করল তখন থেকে সে দেখল তার মা-বাবা,আত্নীয়স্বজন এবং পাড়া-পড়শীরা সকলে যে ধর্ম পালন করে তাদের দাবি অনুযায়ী কেবল সেটিই সঠিক এবং শ্রেষ্ঠ।বাকি ধর্মগুলো সব বিকৃত এবং শিরকে ভরা।এর কিছু দিনের মধ্যেই অধম দেখতে পেল এই সঠিক এবং শ্রেষ্ঠ ধর্মের অনুসারীরা বিভিন্ন দল এবং উপদলে বিভক্ত,তারা একে-অপরের নিন্দা ও কুৎসা রটানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। ধর্মীয় বিভিন্ন ধরনের আচার-অনুষ্ঠান এলে এসব নিয়ে তারা বিভিন্নজন বিভিন্নরকম ব্যাখ্যা প্রদান করে,যা শোনে এবং দেখে মনে হয় একে অপরের ব্যাখ্যা বা বর্ণনাকে মিথ্যা কিংবা সত্য-মিথ্যার মিশ্রণ অথবা গালগল্প বা বেদাত বলে অভিহিত করছে।তারা কারণে অকারণে একে অন্যকে বেদাতি, কাফের, মুশরিক কিংবা নাস্তিক উপাধিতে ভূষিত করছে।

আজ তারা যেটি হারাম বা নিষেধ বলছে কাল আবার তারাই নির্দ্ধিধায় এটি করে যাচ্ছে।তাদের ধর্মানুভূতি আবার খুবই ঠুনকো এবং স্পর্শকাতর। যেকোন সময় মৃদু আঘাতে বিধ্বস্ত হয়ে যায়।তাদের ব্যাখ্যা কিংবা বর্ণনা অনুযায়ী তাদের নিজের সহী ইমানের ব্যাপারে তারা শতভাগ নিশ্চয়তা দিতে পারে না। পরকালে জান্নাত নাকি জাহান্নাম পাবে সে নিশ্চয়তা দিতে পারে না, কিন্তু তারা তাদের দ্বীন প্রতিষ্ঠায়,ধর্মের হেফাজত করার ব্যাপারে এবং তথাকথিত ধর্মানুভূতি অটুট রাখার ক্ষেত্রে শতভাগ নিশ্চয়তা দেয়।সেজন্য তারা যেকোন সময় রাজপথে নেমে পড়ে। এবং ভাঙ্গচুর,অগ্নিসংযোগ করে রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিনষ্ট করে। যদিও রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে তাদের প্রত্যক্ষ এবং উল্লেখযোগ্য কোন অবদান নেই।

তাদের প্রয়োজনে তারা অতি উগ্র হিসেবে পরিচয় প্রদান করে, এবং অবুঝ শিশু ও কিশোরদের রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে ক্ষতির সম্মুখীন করে।তারা আবার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলেও বিভক্ত, যার ধরুন তারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ঐ অবুঝদের রাস্তায় নামিয়ে দেয় ধর্মের এবং তাদের ঠুনকো ধর্মানুভূতির দোহাই দিয়ে। স্বার্থসিদ্ধির জন্য সাধারণের মাঝে ঈমান রক্ষার দায়ে তথাকথিত তৌহিদী জনতার ব্যানারে তাদেরকে জমায়িত করে। তথাকথিত তৌহিদী জনতার মধ্যে তারা ধর্মান্ধতাকে ছড়িয়ে দেয়। তাদেরকে সুকৌশলে বিশ্বাস করায় ধর্মে যুক্তি চলে না,তাদের বুঝানো হয় সবকিছু অন্ধভাবে বিশ্বাস করাটাই হচ্ছে ঈমান।আর এতেই মিলবে বহুল প্রত্যাশিত জান্নাত,কপালে থাকতে পারে শহিদী মৃত্যু। তাদেরকে জিম্মি করা হয় মৃত্যুর পরে জানাজার নামায না পড়ানো,বিবাহের সময় বিবাহ না পড়ানো এবং কাফের,মুশরিক ও মুরতাদ অপবাদ দেয়ার ভয় দেখিয়ে।এবং তারা মানুষের ধর্মটাকে রাষ্ট্রের ধর্ম বানিয়ে ফেলে, সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম নামে ধর্মের অনুপ্রবেশ ঘটানো হয়।যদিও এই তথাকথিত তৌহিদী জনতার এবং রাষ্ট্রধর্মের ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে কোন বর্ণনা বা ন্যূনতম দিকনির্দেশনা খুঁজে পাওয়া যায় না।অধম দেখতে পায় পবিত্র কুরআন’ই একমাত্র মহাগ্রন্থ যা সকল দল ও উপদল একবাক্যে এবং একসুরে বিশুদ্ধ বলে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং অনুসরণ করে বলে দাবি করছে।

ধর্মের জন্য,দ্বীনের জন্য এবং ধর্মানুভুতি অটুট রাখার জন্য অধমেরও মন চায় রাজপথে যেতে যেখানে তার অনেক পরিচিতজন ও কাছের মানুষেরা অংশ নিয়েছে এবং নিচ্ছে।কিন্তু সে দ্বিধাগ্রস্ত,কারণ দল-উপদলের বিভিন্ন ধরণের মতামত, ব্যাখ্যা কিংবা বর্ণনা তাকে বিব্রত করছে।তাই সে সিদ্ধান্ত নিল সবাই যেটাকে বিশুদ্ধ বলে এবং শতশত বছর ধরে যা অবিকৃত,অপরিবর্তিত এবং অপরিমার্জিত সেই মহাগ্রন্থ পবিত্র কুরআন অর্থসহ পাঠ করবে এবং নিজে কুরআনের দর্শন অনুধাবন করতে চেষ্টা করবে।একাধিকবার অর্থসহ পবিত্র কুরআন পাঠ করে অধম দেখল পবিত্র কুরআন হচ্ছে দ্বীনের একমাত্র দলিল।কুরআন যে রাষ্ট্রধর্ম এবং তথাকথিত তৌহিদী জনতার ব্যাপারে কিছু বলেনি সেটি সে উপলব্ধি করল এবং কুরআন যে ধর্মনিরেপক্ষতা প্রমোট করে সেটিও বুঝতে পারল।এমনকি সে আবিষ্কার করল সংখ্যায় অধিক হলেও কেউ যদি নিজের এবং অন্যের কিতাবের দোহাই দিয়ে কোন কিছু বলে এবং হাসিল করতে চায় তারা অবশ্যই পরিত্যাজ্য।

কুরআন পাঠে অধমের অনুধাবন –

দ্বীনের ক্ষেত্রে কুরআনই স্পষ্ট দলিল(সূরা জাছিয়া-২০,সূরা রা’দ-৩৭)।কুরআনে আল্লাহ বলছেন, “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম,তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামতকে পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে কবুল করলাম” (সূরা আল’মায়েদা-৩০)।পবিত্র কুরআনই সত্য মিথ্যার পার্থক্যকারী(সূরা আল’বাকারা-১৮৫)।আর আল্লাহর বিধানের কোন পরিবর্তন নেই(সূরা বনি ইসরাইল-৭৭)।এবং আল্লাহর কোন আয়াত রহিত করা হয় নাই(সূরা আল’বাকারা-১০৬)।

কুরআন প্রত্যাখ্যানকারীর জন্য কঠিন শাস্তি(সূরা সাফফাত-১৭০),কুরআন প্রত্যাখ্যানকারী ফাসিক(সুরা আল’বাকারা-৯৯)।যারা এই কুরআনের আয়াতের বুঝ অপছন্দ করে তাদের কর্মফল বিনষ্ট হয়(সূরা মোহাম্মদ -৯)।

তোমরা মানুষকে প্রভুর পথে আহবান কর হিকমতের সদউপদেশ দ্বারা এবং তাদের সহিত তর্ক কর উত্তম পন্থায় (সূরা নহল-১২৫)।আমার আল্লাহর অনুমতি ব্যতিত কেউ ঈমান অর্জন করতে পারবে না(সূরা ইউনুস-১০০)।আমার ইচ্ছা ছাড়া কেউই ঈমান অর্জন করতে পারবে না (সূরা আনাম-১১১)।আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে হেদায়েত করেন,আর যাকে ইচ্ছা তাকে পথভ্রষ্ট করেন(সূরা রা’দ-২৭),এবং যাকে ইচ্ছা তাকে পবিত্র করে থাকেন(সূরা নূর-২১),এবং যাকে ইচ্ছা তাকে ক্ষমা করেন,এবং যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেন(সূরা আনকাবুত-২১)।আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কেউ শেরেক থেকে বাঁচতে পারবে না(সূরা আনাম-১০৭)।

রাষ্ট্রের জন্য ধর্মনিরপেক্ষবাদই হচ্ছে পবিত্র কুরআন এর মতবাদ। এই মর্মে আল্লাহ বলেন,”লাকুম দ্বীনুকুম ওয়ালইয়াদ্বীন- অর্থাৎ,তোমাদের ধর্ম তোমাদের কাছে,আমার ধর্ম আমার কাছে”(সূরা কাফিরুন-৬)।তাছাড়া সূরা নেসার ৫৯ নং আয়াত দ্বারা দুনিয়াবি ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের আনুগত্য করা আবশ্যক বলে অধম অনুধাবন করেছে।

আল্লাহ বলেন,”তোমরা কিতাবিদের দল বিশেষের আনুগত্য করো না,তারা তোমাকে কাফির বানিয়ে ছাড়বে(সুরা ইমরান-১০০),কিতাবিদের সঙ্গ ধারণ থেকে নিজেকে বিরত রাখার জন্য প্রয়োজন হলে নিজের বাসগৃহে সালাতের স্থান নির্ধারণ করে সেখানে সালাত কায়েম কর(সূরা ইউনূস-৮৭),আর যারা কুরআন বাদেও অন্যকিছুকে দ্বীনের দলিল হিসাবে মনে করে তারা আল্লাহর সাক্ষাৎ এর আশা পোষণকারী নহে(সূরা ইউনূস-১৫),আবার যারা নিজ হাতে কিতাব রচনা করে আল্লাহর নামে চালিয়ে দেয় এবং অল্প মূল্যে বাজারে বিক্রয় করে তাদের জন্য কঠিন দুর্ভোগ(সূরা আল’বাকারা-৭৯),আবার আল্লাহর আয়াত বিকৃতকারীর জন্য জাহান্নাম (সুরা ফুসসিলাত-৪০ সূরা আল’বাকারা-৭৫)।একটি বিষয়ে বিভিন্নভাবে এই কুরআনে বর্ণনা করা হয়েছে,যাতে করে মানুষ এই কুরআন সহজেই বুঝতে পারে(সূরা আন’আম-৫)।দ্বীনের সকল বিষয় মিমাংসাকারী এই কুরআন(সূরা তারিক-১৩),আর যারা কুরআন মোতাবেক না চলে অধিকাংশ লোকের কথা মত চলে তারা আল্লাহর পথ হইতে বিচ্যুত হবে(সূরা আন’আম-১১)।আর তাই নবী (সাঃ) কুরআনের বাইরে কোন কিছু অনুসরণ করে নাই(সূরা আন’আম-৫)।তিনি এই কুরআন ব্যতিত কাউকে দ্বীনের বিষয়ে সতর্ক করেন নাই(সূরা আম্বিয়া-৪৫)তিনি ওহী ব্যতিত কোন কথা বলেন নাই(সূরা তূর-৩)।

তোমারা দ্বীন কায়েম কর দ্বীনের মধ্যে মতভেদ করিওনা (সূরা শূরা-১৩),দ্বীনের ক্ষেত্রে সকল কিছুই আল্লাহ পাবে(সূরা জুমুর-৩)।আল্লাহ বলেন,ঈমান অর্জন করা, সৎ কর্ম করা,সত্যের উপদেশ দেয়া ও ধৈর্য ধারণ ব্যতীত সকল মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে(সূরা আসর-৩),পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর কাছে আত্নসমর্পণের মাধ্যমে মুসলমানের দলে দাখিল হও(সূরা বাকারা-২০৮),এবং আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত কাহারও মোমিন হওয়ার সাধ্য নেই(সূরা ইউনূস-১০০)।
আর যারা কুরআন মোতাবেক দ্বীনের বিষয়ে বিধান দেয় না,এরা যালিম,ফাসিক,কাফির(সূরা মায়েদা-৪৪,৪৫,৪৭)এবং কুরআন প্রত্যাখ্যান কারির জন্য কঠিন শাস্তি(সূরা সাফফাত -১৭০)।
অধম আরও অনুধাবন করে যে,একটি বিষয়ে বিভিন্নভাবে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বর্ণনা করেন যাতে তারা বুঝতে পারে(সূরা আন’আম-৬৫)।

সকল কিছু বিশ্লেষণ করে অধম অনুধাবন করতে থাকল যে প্রকৃতপক্ষে এই দল উপদলগুলোই ধর্মের দোহাই দিয়ে তার প্রকৃত ধর্মের মৌলিকতায় এবং ধর্মানুভূতিতে বারংবার খুবই জঘন্যভাবে আঘাত করে যাচ্ছে।যেহেতু কুরআন পাঠ করে অধম অনুধাবন করেছে প্রভুর ইচ্ছা ব্যতিত কেউ সত্য ও সরলপথ অনুসরণ করতে পারে না,সেহেতু সে তার প্রভুর কাছে প্রার্থনা করছে তিনি যেন তাকে এবং সেসকল দল উপদলের প্রত্যেককে সত্য ও সরল পথে নিয়ে আসে।এবং অধম তার প্রভুর কাছে খুবই আকুলতার সহিত মিনতি করে বলেছে ন্যায্যতায় সংখ্যালঘুর অন্তর্ভুক্ত হতে হলেও যেন তিনি তাকে সবসময় ন্যায্যতার এবং সত্য ও সরলতার পথে রাখেন।কেননা অধমের কাছে স্পষ্ট যে কারবালার প্রান্তর থেকেই ন্যায্যতা এবং সত্য ও সরলতায় বিশ্বাসীরা সংখ্যালঘু হয়ে রয়েছে। সকলের শুভবুদ্ধির উদয় হোক,আমিন।

লেখক:মোস্তাফিজ চৌধুরী
আজন্ম শিক্ষার্থী।
২৯ মার্চ ২০২১

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।