সড়কের কাজে অনিয়ম: এলজিইডি সন্তুষ্ট থাকলে বাইরের লোকের লাফালাফিতে কিছু হয়না

২০ এপ্রিল, ২০২১ : ১২:১৫ পূর্বাহ্ণ ৭৫৭

কাজী আশরাফুল ইসলাম: ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলায় এলজিইডি’র একটি সড়কের মেরামত কাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর ও আশুগঞ্জ উপজেলার মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী এই সড়কটি ভৈরবের মেসার্স মোমিনুল হক এন্টারপ্রাইজ নামক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মেরামত করার কথা থাকলেও সড়ক মেরামত প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে জেলা সদরের মেসার্স হাসান এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

মেসার্স হাসান এন্টারপ্রাইজ কমিশনের বিনিময়ে জেলা এলজিইডি-কে ম্যানেজ করে ভৈরবের প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকল্পটি কিনে নিয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে, প্রায় দুই কোটি টাকার সড়ক মেরামত প্রকল্পটিতে দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী পুরুত্ব কম,পুরাতন ও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার,অনেক জায়গায় প্রাইমকোট ছাড়া নামমাত্র বিটুমিন দিয়ে কার্পেটিং করাসহ একাধিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে উক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।

ইতিমধ্যে এই প্রকল্পের অনিয়মের ব্যাপারে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার একাধিক সিনিয়র সাংবাদিকসহ সুশীল ব্যাক্তিবর্গ। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সরেজমিনে প্রকল্পের আওতাধীন সদর উপজেলার তালশহর পূর্ব ইউনিয়নের অষ্টগ্রাম এলাকায় গিয়ে প্রথম দিন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কিংবা এলজিইডি’র পক্ষে বক্তব্য দেয়ার মতো দায়িত্বশীল কাউকে পাওয়া যায়নি।

পরদিন পুনরায় প্রকল্প এলাকায় গিয়ে কথা হয় সাব-কন্ট্রাক্টরের পক্ষে প্রকল্প তদারকির দায়িত্বে থাকা রেনু মিয়া নামক এক ব্যাক্তির সাথে। তার কাছে প্রকল্পের শিডিউল অনুযায়ী কাজ হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ” আসলে কাজটিতো ভৈরবের এক প্রতিষ্ঠান থেকে কেনা কাজ তাই কিছুটা ঊনিশ বিশতো হবেই। মূল শিডিউলের ব্যাপারে আমি তেমন কিছু জানি না তবে আমাকে বলা হয়েছে ২৫ মিলি.(এক ইঞ্চি) ঢালাই দেয়ার জন্য।কাজের মানে হেরফের হলে বড়ভাইয়েরা অফিস ম্যানেজ করবে।” বড়ভাই কারা জানতে চাইলে তিনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিকের বন্ধু শামীম মিয়া এবং জেলা ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতাসহ অনেকেই এই কাজের সাথে জড়িত আছেন বলে জানান।

তিনি আরও বলেন, ” এই ব্যাপারে মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলার কোনো প্রয়োজন নেই। এলজিইডি কর্তৃপক্ষ যদি আমাদের কাজে সন্তুষ্ট থাকে, তাহলে বাইরের মানুষ যতই লাফালাফি করুক তাতে কোনো ফল নেই। “আরও কিছু জানার থাকলে তিনি শামীম মিয়ার সাথে পার্সোনালি কথা বলার জন্য অনুরোধ করেন। শামীম মিয়ার ব্যাক্তিগত মুঠোফোনে একাধিক বার কল করলেও তিনি রিসিভ করেন নি।

এ ব্যাপারে রাজঘর গ্রামের এমদাদ মিয়া বলেন,’কিছুদিন পরপর এই সড়কের টেন্ডার হয়।যে ঠিকাদারই আসে,কোনরকমে নামকাওয়াস্তে কাজ করে চলে যায়।ফলে অল্প কিছু দিন পরই সড়কটি পূর্বের বেহাল দশায় ফিরে যায়।’

তালশহর পূর্ব ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এনামুল হক ওসমান তেপান্তরকে বলেন , ‘জেলা প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব প্রাপ্ত উপ-সহকারী প্রকৌশলী কমিশন নিয়ে নিম্নমানের কাজ করাচ্ছেন। প্রকল্পটিতে লালবালি ব্যাবহারের কথা থাকলেও সাদা বালি ব্যাবহার করা হচ্ছে। কিছু কিছু জায়গায় দুই নম্বর এমনকি তিন নম্বর মানের ইট ব্যাবহার করা হচ্ছে যা অত্যন্ত নিম্নমানের।উপজেলা উপ-সহকারী প্রকৌশলীকে এই বিষয়ে বারংবার অভিযোগ দেয়া হলেও তিনি তা আমলেই নিচ্ছেন।”

অভিযোগের ব্যাপারে জানার জন্য সদর উপজেলা উপ-সহকারী প্রকৌশলী জনাব সাজ্জাদ হোসেনের মোবাইলে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

পুথাই গ্রামের আওয়াল মিয়া বলেন, ‘ঠিকাদার যে পুরাতন ইট ব্যবহার করেছেন, তা পা দিয়েই ভাঙা যাচ্ছে। আমরা কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন করার মতো কাউকেই পাইনা। শুধু শুনি এই কাজ নাকি ইতিমধ্যে দুই-তিন হাত বদল হয়ে গেছে। অভিযোগ দিতে গেলে সাব- ঠিকাদার আর দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা কেউই আমাদেরকে পাত্তা দেন না।’

প্রকল্পটি সাব-কন্ট্রাক্টে বাস্তবায়িত হচ্ছে বলে স্বীকার করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা এলজিইডি’র নির্বাহী প্রকৌশলী সিরাজুল ইসলাম। তবে দরপত্র অনুযায়ী কাজ হচ্ছে কিনা এবং সাইট ভিজিটিং এ গিয়েছিলেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন,”আমিতো অসংখ্য প্রকল্প নিয়ে ব্যাস্ত থাকি তাই সকল বিষয়ে খোজ রাখা অনেক কঠিন। তাছাড়া আমি লকডাউনের কারনে মাঠপর্যায়ের যেতে পারিনি।” এই কাজের তদারকির দায়িত্বে সদর উপজেলার এসও সাজ্জাদ হোসেন রয়েছেন বলে তিনি জানান। কিন্তু সাজ্জাদকে কেন টানা দু’দিন ভিন্ন সময়ে গিয়েও প্রকল্প এলাকায় তদারকির কাজে পাওয়া যায়নি জানতে চাইলে তিনি এই প্রশ্নের কোনো সুদোত্তর দিতে পারেন নি।

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।