ব্যক্তিগত কাজে সরকারি গাড়ি নিয়ে জেলার বাইরে যান আশুগঞ্জের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা

২২ এপ্রিল, ২০২১ : ২:৩৯ অপরাহ্ণ ৫২৩

তেপান্তর রিপোর্ট: আশুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান চিকিৎসক নুপুর সাহা প্রায় অর্ধকোটি টাকা দামের সরকারী গাড়ী দিয়ে ব্যক্তিগত কাজে ব্যাক্তিগত চালক দিয়ে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় যাতায়ত করছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আশুগঞ্জ থেকে কিশোরগঞ্জে গিয়ে বেসরকারী হাসপাতালে প্রাইভেট চেম্বারে রোগী দেখতে যান তিনি। এই কাজে সবসময় তিনি এই সরকারি গাড়িটি ব্যবহার করেন তিনি। এসময় সাংবাদিকের মুখোমুখী হয়ে প্রচণ্ড ক্ষেপে গিয়ে তিনি আঙুল তুলে দেখিয়ে বলেন, আপনি কয়জনের নামে নিউজ করবেন। ইউএনও, এসিল্যান্ডসহ সারা বাংলাদেশের কর্মকর্তারাই তাদের ব্যক্তিগত সব কাজে সরকারী গাড়ী ব্যবহার করেন। কিন্তু আমি ব্যক্তিগত কাজে সরকারী গাড়ী ব্যবহার করি না। এমন কোনো প্রমাণ নেই। আর এ বিষয়ে আপনি যতই নিউজ করেন আমার কিছু হবে না। কারণ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এই নিউজ কানেই নেবে না এবং তার উপরমহলে ব্যাপক খুঁটির জোর রয়েছে। এমনটাই জানান তিনি। সেই ক্ষমতার জোরেই তিনি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিভিন্ন ধারার ভয় দেখান এই প্রতিবেদকে।

সম্প্রতি কয়েকদিন সরেজমিনে আশুগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ঘুরে তথ্যানুসন্ধানে দেখা যায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আশুগঞ্জ উপজেলা ৫০ শয্যা বিশিষ্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান পরিবার ও পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা.নুপুর সাহা যোগদানের পর থেকে তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সংলগ্ন বেসরকারী হাসপাতাল বিসমিল্লাহ্ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়মিত বসছেন তিনি। দিনের বেশিরভাগ সময় চেম্বারে বসে যত্ন করে রোগীদের সেবা দেন এই কর্মকর্তা।

অনুসন্ধান আরো বলছে। প্রতি শুক্রবার সকালে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের গ্যারেজ থেকে তার ব্যক্তিগত চালক দিয়ে প্রায় অর্ধকোটি টাকা দামের সরকারী গাড়ী বের করে চিকিৎসক নুপুর সাহা তরিঘরি করে গাড়িতে উঠে বেসরকারী হাসপাতালের উদ্যেশ্যে রওনা হোন। কিশোরগঞ্জ যাওয়ার সময় সৈয়দ নজরুল ইসলাম সেতুর টোল প্লাজা দিয়ে গাড়িতে করে চিকিৎসক নুপুর সাহা পার হওয়ার ভিডিও ফুটেজ এই প্রতিবেদকের কাছে আছে।

সৈয়দ নজরুল ইসলাম সেতুর টোল প্লাজা পার হয়ে তার নিজ বাড়ি কিশোরগঞ্জ কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে একটি বেসরকারী মালিকানাধীন রেনেসাঁ হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে স্ত্রী রোগ ও প্রসূতী বিদ্যা চিকিৎসক হিসাবে এখানে বিভিন্ন রোগী দেখতে আসেন। এসময় বিভিন্ন এলাকাও ঘুরে বেড়ান এই কর্মকর্তা। যেখানে আশুগঞ্জ উপজেলা থেকে কিশোরগঞ্জ কটিয়াদী উপজেলায় আসা যাওয়ার দূরত্ব প্রায় ৮০ কিলোমিটার। এসব কারণে সরকারী গাড়ী ব্যবহার করায় জ্বালানি তেল বেশি লাগছে। এতে বাড়তি তেলের খরচের টাকাও সরকারকে বহন করতে হচ্ছে।

রেনেসাঁ হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে তিনি সরকারী গাড়ী ও ব্যক্তিগত চালকসহ শনিবার আশুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগদান করেও রীতিমতো কর্মস্থলে আসেন না। মাঝেমধ্যে আসলেও বেলা ১১ টায় এসে ১২টায় প্রস্থান করেন। একাধিকবার স্থানীয় সাংবাদিকরা বিভিন্ন তথ্যের জন্য স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়েও উনাকে না পেয়ে ফেরত আসতে হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ অফিস সুত্র জানায়, সরকারের পক্ষ থেকে আশুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের করোনাকালীন সংকট মোকাবিলায় সরকারী কাজে ব্যবহারের জন্য কালো রঙের উন্নতমানের একটি গাড়ী দেওয়া হয়। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের যেখানে নির্দেশনা রয়েছে সরকারি কাজ ছাড়া উপজেলার বাইরে গাড়ি নিয়ে যেতে হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ও সংশ্লিষ্ট কারণ থাকতে হবে। এই গাড়ি নিয়ে উপজেলার বাইরে যাওয়া, সরকারি গাড়ির অপব্যবহার ও ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে মন্ত্রণালয়ের।

আশুগঞ্জের স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রতি শুক্রবার সকালে চিকিৎসক নুপুর সাহার বাসার সামনে একটি কালো রঙের সরকারি গাড়ী দেখা যায়। নিজ বাড়ী থেকে অন্যান্য এলাকায়ও যেতে দেখি। তবে সরকারী গাড়ী ব্যবহারের ক্ষেত্রে এ ব্যাপারে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থা নেয়া উচিত বলে জানান আশুগঞ্জ উপজেলাবাসী মনে করেন।

এ বিষয়ে সরকারী গাড়ী নিয়ে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় রোগী দেখার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা.নুপুর সাহা বলেন, “আমি প্রতি শুক্রবারে কিশোরগঞ্জ কটিয়াদী উপজেলায় বেসরকারী প্রাইভেট চেম্বারে যাই রোগী দেখান জন্য। এবিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি বা সংশ্লিষ্ট কারণ আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি রেগে গিয়ে আঙুল তুলে বলেন, “আপনি কয়জনের নামে নিউজ করবেন? আশুগঞ্জ উপজেলা ইউএনও এসিল্যান্ডসহ সারা বাংলাদেশের প্রত্যেক কর্মকর্তারাই তাদের ব্যক্তিগত সব কাজেই সরকারী গাড়ী ব্যবহার করেন। কিন্তু আমি ব্যক্তিগত কাজে সরকারী গাড়ী ব্যবহার করি না। এমন কোনো প্রমাণ নেই। আর এ বিষয়ে আপনি যতই নিউজ করেন আমার কিছু হবে না। কারণ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এই নিউজ কানেই নেবে না। আমি একজন সহজ-সরল মানুষ হওয়ায় কিছু দুর্বলতাও আছে আমার, তা স্বীকার করি। এ কারণে কোনো স্টাফ যদি অপরাধ করে তাহলে অ্যাকশনে যেতে পারি না। সতর্ক করে দেই। হয়তো এ কারণে অনেকেই অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন। কিন্তু আমি কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি করি না।

এ বিষয় যানতে আশুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার অরবিন্দ বিশ্বাসের সাথে কথা হলে তিনি জানান, “বিষয়টি আমার জানা নেই। যদি ব্যক্তিগত কাজে ওই চিকিৎসক সরকারি গাড়ি ব্যবহার করেন। তাহলে তার বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ ব্যবস্থা নেবে।

তবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিভিল সার্জন ডা: মোহাম্মদ একরাম উল্লাহ’র কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন,“সরকারী কাজ ছাড়া কোন ক্রমেই তার নির্ধারিত এলাকা ছাড়া অন্য এলাকায় গিয়ে সরকারী গাড়ী ব্যবহার করে প্রাইভেট চেম্বার করতে পারেন না। সে যে সরকারী গাড়ী নিয়ে কিশোরগঞ্জ কটিয়াদী উপজেলায় বেসরকারী প্রাইভেট চেম্বারে রোগী দেখতে গিয়েছে তার প্রমানসহ রিপোর্ট করেন এবং আমাদের দেন আমরা তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিব।

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।