অতি প্রাকৃতিক গল্প “জাফরিন”

৩ জুন, ২০২১ : ২:৩৬ অপরাহ্ণ ২১৫

আস্থা রাহমান শান্ত্বনা: বাসররাতে যখন একজন স্বামী জানতে পারে তার সদ্য বিয়ে করা বউ মানুষ নয়, একটা ভয়ংকর পরী তখন তার কি করা উচিত ভেবে পায়না আহিন।

রুমের সোফার এক কোণে ধপাস করে বসে পড়ে সে। আড়চোখে একবার মেয়েটার দিকে তাকাল, মেয়েটা দিব্যি সিলিং ফ্যানের উপর বসে পা দোলাতে দোলাতে চোখ বড় বড় করে আহিনের দিকে তাকিয়ে আছে।
আহিন ঢক গিলে শক্তকন্ঠে মেয়েটির দিকে প্রশ্ন করে,

” আপনি কি আমার সাথে মজা করছেন? আপনি সত্যি ই পরী?”
মেয়েটা বিকট শব্দে হেসে উঠল। অনেকক্ষণ ধরে হাসল যেন সে এমন মজার কথা আগে কখনো শুনেনি। আহিন এই হাসিতে কিছুটা বিরক্তবোধ করছে। মেয়েটা হাসি থামিয়ে বলল,
” বুদ্ধু আমি যদি পরী না হতাম তাহলে সিলিং ফ্যানের উপর বসে পা দোলাতে পারতাম!”
বলেই আবার নিজের মত হাসতে লাগল।
আহিন টেনশানে এক হাতে নিজের চুল ছিড়তে শুরু করে ভাবল, ” ঠিক ই তো, মেয়েটা যদি স্বাভাবিক মানুষ হত তবে কি সিলিং ফ্যানের উপর বসে পা দোলাতে পারত।” আহিনের মনে হচ্ছে সে একটা ঘোরের মধ্যে আছে, তাই সামনে যে ব্যাপারটা ঘটছে সেটা বিশ্বাস করতে পারছেনা।
মেয়েটা হাসি বন্ধ করে আহিনের দিকে তাকাল, আহিন তখনো মেঝের দিকে তাকিয়ে চুল ছিড়তে ব্যস্ত।

“কি এত ভাবছিস? বিশ্বাস হচ্ছেনা তাই তো!”
কথা শুনে আহিন মাথা তুলে মেয়েটির দিকে তাকায়। মেয়েটি সাথে সাথে এক লাফে সিলিং ফ্যান থেকে মেঝেতে এসে নামে। আহিন নিজের অবাকতা সামলে নেয়, এই মেয়ে সত্যি ই জ্বীন-পরী। সাধারণ মেয়ের পক্ষে অত উচু থেকে মেঝেতে লাফ দেওয়া অসম্ভব।

মেয়েটি মাথা থেকে শাড়ির ঘোমটা ফেলে আচলটা কোমড়ে গুজে নেয়। তারপর আহিনের দিকে ঝুকে বলল,
” আমি নিজের আসল রুপ তোকে দেখাতে চাচ্ছিনা, আশা করি যা প্রমাণ দিয়েছি তা যথেষ্ট।”
আহিন মেয়েটির চোখ থেকে চোখ সরিয়ে নিল। ভয়ে তার হৃদপিন্ড অস্বাভাবিকভাবে লাফাচ্ছে, মেয়েটির চোখগুলো লাল রক্তবর্ণের রঙ ধারণ করেছিল। তা দেখেই আহিনের ভয় ভয় করতে লাগল।

” আপনি যদি পরী হয়ে থাকেন তবে আমায় বিয়ে করলেন কেন?” মেয়েটি খানিকটা রেগে গিয়ে বলল,
” অত কথা জেনে তোর কি কাজ! আমাকে কি তোর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।”
আহিন চুপ করে রইল। মেয়েটা বেশ রেগে গেছে, এই অবস্থায় তাকে তুলে আছাড় ও দিতে পারে। মেয়েটি আহিনের পাঞ্জাবীর কলার ধরে দাড় করিয়ে বলল,

” আমার আসল পরিচয় যদি কাউকে জানাস তবে তোর পরিবারের একজন ও বাচবেনা। তোকেসহ সবগুলোকে কেটে টুকরো টুকরো করে আমার পুকুরের হিংস্র মাছগুলোকে খাওয়াব। অতএব, আমি যেভাবে চলব-থাকব তাতে বাধা দিতে আসবিনা। আমাকে কোনো ব্যাপারে জবাবদিহি করতে বাধ্য করবিনা।”

এরপর মেয়েটা তার শাহাদাত আঙ্গুলির বড় নখ দিয়ে আহিনের চেহারায় আস্তে আস্তে আচড় কাটতে কাটতে বলে,
” কোনোরকম চালাকি করার চেষ্টা ভুলেও করবিনা। আমি কিন্তু খুব শক্তিশালী পরী, সব বুঝতে পারি। এখন এখান থেকে যা।”

আহিন চুপচাপ রুম থেকে বেরিয়ে ছাদে চলে গেল। পুরো ব্যাপারটা এখনো কেবল তার ভয়ংকর স্বপ্ন মনে হচ্ছে। আহিন সবে মাস্টার্স শেষ করে ব্যাংকে জব নিয়েছে। এরমধ্যে ই পরিবারের সবার বিশেষ করে দাদার পীড়াপিড়িতে উনার পছন্দ করা মেয়ের সাথে বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ের আগে মেয়েকে দেখার সুযোগ হয়নি আহিনের। বিয়ের সময় জাফরিনকে একনজর দেখেছিল আহিন। বেশ গোলগাল চেহারা, দুধে আলতা গায়ের রঙ-সুস্বাস্থ্যবতী, টানা টানা চোখ। এমন মায়াবী চেহারা দেখে জোর করে বিয়ে করার কষ্টটা ভুলে গিয়েছিল সে।

অনেক আশা নিয়ে যেই বাসরঘরে ঢুকল মনে হল তার মাথায় মস্ত আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। জাফরিন সিলিং ফ্যানের উপর বসে পা দোলাতে দোলাতে গুণগুণ করছে। তারপর তার দিকে তাকিয়ে মস্ত একটা হাসি দিয়ে বলল,
” এভাবে কি দেখছিস, আমি তোর পরী বউ রে।”
ঘটনাটা ভেবে আহিনের শরীর শিউরে উঠে। ছাদের রেলিং এ হেলান দিয়ে বসে পড়ে, এখন তার কি করা উচিত বুঝে উঠতে পারছেনা। সবাইকে কি এসব জানাবে!
কিন্তু মূহুর্তেই মনে পড়ে যায় জাফরিনের দেওয়া হুমকির কথা। আহিনের একান্নবর্তী পরিবার। দাদা, মা-বাবা, ছোটবোন আর কাকা-কাকি এবং তাদের দুটো ছেলে মিলে সবাই একসাথে থাকে। তার জন্য এদের কোনো ক্ষতি হলে সেটা কি করে মেনে নিবে সে!

এখন আপাতত চুপ থাকার অপশনটা বেছে নেয় আহিন। পরে ভেবে-চিন্তে কিছু একটা করা যাবে, এখন শুধু দেখতে হবে তার পরীবউ জাফরিন কি করতে চায় আর কি কি করে।

রাত বাড়ায় আহিন ছাদ থেকে নেমে রুমে ঢুকে। রুমে কোথাও জাফরিনকে দেখতে পাচ্ছেনা, একবার সিলিং ফ্যানের দিকে তাকায় আহিন। সেখানেও নেই। একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ভাবে, “এই পরী নিজে থেকেই ভেগেছে।”
লাইট নিভিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে আহিন।
চোখ বন্ধ করতেই শুনতে পায় জাফরিনের কন্ঠ,
” কি ভেবেছিস আমি ভেগে গেছি! বুদ্ধু পালানোর জন্য কি তোর মত একটা হাবাগোবাকে বিয়ে করেছি।”

আহিন চোখ মেলে তাকিয়ে দেখে জাফরিন তার শরীর বরাবর কিছুটা দূরত্বে শূন্যে ভাসছে।
আহিন কি উত্তর দিবে ভেবে পায়না। তবে কথাটা তার বেশ গায়ে লেগেছে। সে মোটেও হাবাগোবা নয়, কেবল মেয়েটার ভয়ে চুপ করে আছে।
” নে ঘুমা, আমারো বেশ ঘুম পেয়েছে।” বলে ভাসতে ভাসতে আহিনের পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ল। আহিনের আর ঘুম এলনা, পাশে একটা ভয়ংকর পরী ঘুমাচ্ছে ভেবেই তার শরীর বারবার শিউরে উঠছে।

এই মেয়ে কার রুপ ধরে এখানে এসেছে কে জানে! তবে আহিন খুব ভাল করেই বুঝতে পারছে জাফরিন খুব ভয়ংকর দেখতে, খারাপ পরী।

(চলবে)

পর্ব-০১

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।