পৌরসভার রিক্সার লাইসেন্স: “যেই লাউ সেই কদু”

৫ জুন, ২০২১ : ৩:৩১ অপরাহ্ণ ২৮৫
ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের যানজটের চিত্র। ফাইল ছবি

কাজী আশরাফুল ইসলাম: ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে যানজট কমাতে পৌরসভা থেকে ব্যাটারি চালিত রিক্সা ও অটোরিক্সাকে যেই লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে তা কোন কাজে আসছেনা। শহরে রিক্সার পরিমান কমাতে সীমিত পরিসরে রিক্সার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে যানজট তৈরি হওয়া রাস্তায় যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই লাইসেন্স করা রিক্সা চোখে পড়ে। এমনকি লকডাউনের মধ্যেও শহরে লাইসেন্সধারী রিক্সায় যানজট লেগে থাকে। তাই স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভা থেকে যে সীমিত পরিসরে লাইসেন্স দেওয়ার কথা ছিল শেষ পর্যন্ত এটা কি সীমিতই ছিল কিনা? কেননা, লাইসেন্স দেওয়ার সময় আগে ও পরে আওয়ামীলীগের কিছু নেতা টাকার বিনিময়ে এসব লাইসেন্স দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ।

শহরে অতিরিক্ত গাড়ির চাপ কমানোর জন্য এবং যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার লক্ষ্যে পৌরসভা কর্তৃক তিন হাজার ব্যাটারি চালিত রিক্সা ও ইজিবাইকের মালিককে নির্দিষ্ট ফি’র বিনিময়ে প্রতিটি গাড়ির জন্য আলাদা করে লাইসেন্স প্রদান করা হয়। যদিও এই পরিকল্পনাটি শুরু থেকেই ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। কারন পৌরসভা থেকে অধিক সংখ্যক লাইসেন্সের চাহিদার বিপরীতে সীমিত সংখ্যক লাইসেন্স প্রদান করা হয়, যার বেশিরভাগই সরকারি দলের বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের প্রভাবশালী নেতারা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নেন। অনেক লাইসেন্স তখন পৌরসভার নির্ধারিত ফি- এর দ্বিগুণ এমনকি তিনগুণ বেশি দামেও হাতবদল হয়। যার ফলে সাধারণ চালক ও মালিকরা বিপাকে পড়ে যান।

পৌর কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তখন তারা বিক্ষোভ মিছিল এবং মানববন্ধনও করেন। কিন্তু পৌর এলাকায় যানবাহন সীমিত করার লক্ষ্যে লাইসেন্স প্রদানের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পৌর কর্তৃপক্ষের অটল অবস্থানের কারনে শেষ পর্যন্ত সাধারণ চালক ও মালিকদের ঐসব আন্দোলন মুখ থুবড়ে পড়ে।

তাছাড়াও প্রকল্পটি যানজট নিরসনের উপায় বিবেচিত হওয়ায় তখন জেলা প্রশাসন, শহরের সামাজিক সংগঠন এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিগনও পৌরসভার এহেন বিতর্কিত সিদ্ধান্তে কোন হস্তক্ষেপ করেনি। যার কারনে অনেকটা জোরজবরদস্তিপূর্বক পৌরসভা কর্তৃক প্রদত্ত লাইসেন্সবিহীন সকল রিক্সা ও ইজিবাইক শহরের বিভিন্ন অংশে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়।

এছাড়াও যাত্রীদের সুবিধার্থে পৌর এলাকার বিভিন্ন রুটের ভাড়া নির্দিষ্ট করে দেয় পৌর কর্তৃপক্ষ। পৌরসভার পক্ষ থেকে শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে ভাড়ার তালিকা সমৃদ্ধ বিশালাকৃতির সাইনবোর্ডও টানানো হয় এবং তালিকায় নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি ভাড়া নেয়ার অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্ট যানবাহনের লাইসেন্স বাতিলের ঘোষণা দেয়া হয়। কিন্তু তালিকায় নির্ধারিত ভাড়ার ব্যাপারে চালক ও যাত্রী কেউই বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখায়নি। নির্ধারিত ভাড়ার ব্যাপারে পৌর কর্তৃপক্ষের সুনির্দিষ্ট কোন তদারকি না থাকায় সকল চালকগন একজোট হয়ে যাত্রীদেরকে জিম্মি করে অধিক ভাড়া আদায় করতে শুরু করে এবং এই অনিয়মই এখন নিয়ম হয়ে দাড়িয়েছে। লাইসেন্স প্রদান করেই যেন পৌর কর্তৃপক্ষ তাদের দায়িত্ব সম্পন্ন করে ফেলেছে। অথচ যেই যানজট নিরসনের লক্ষ্যে এত ঢাকঢোল পিটিয়ে লাইসেন্স প্রকল্প গৃহীত হয়েছিল,প্রকল্পটি সেই যানজট নিরসন করতে পেরেছে কিনা এই প্রশ্ন এখন পুরো শহর জুড়ে।

যানজটের দূর্দশার ব্যাপারে বলতে গিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের পশ্চিম মেড্ডার (সিও অফিস) এলাকার বাসিন্দা মোঃ মুতাসিম বিল্লাহ বলেন, ‘মোদকবাড়ির মোড় থেকে কুমারশীল মোড় পর্যন্ত এলাম বিশ মিনিটে! এটাকে যদি যানজট পরিস্থিতির উন্নতি বলা হয় তাহলে এমন উন্নতি আমার দরকার নেই ।’

পৌর সুপার মার্কেটের সামনে জ্যামে আটকে থাকা মোটরসাইকেল আরোহী মিজানুর রহমান বলেন, ‘ লাইসেন্সের মাধ্যমে যদি অটোরিকশার সংখ্যা সীমিতই করা হয়ে থাকে তাহলে এই মুহুর্তে আশিক প্লাজার সামনে থেকে এই পর্যন্ত এতবড় অটোরিকশার সারি তৈরি হলো কীভাবে?এখন পর্যন্ত লাইসেন্সের বোর্ডবিহীন কোন অটোরিকশা দেখিনি, তারপরেও এতবড় লাইন! এক লাইসেন্সে একাধিক গাড়ি চলছে নাতো?’

শহরের কান্দিপাড়ার বাসিন্দা আলামিন মিয়া সীমাহীন যানজটের জন্য পৌরকর্তৃপক্ষের অদূরদর্শীতাকে দায়ী করে বলেন, ‘শুনলাম নতুন করে নাকি আরও চারশো গাড়ির লাইসেন্স দিবে পৌরসভা থেকে। এইসব লাইসেন্স প্রক্রিয়া কিছু মানুষের নতুন করে টাকা কামানোর ধান্ধা বৈ আর কিছু না।’

সরজমিনে যানজটের চিত্র প্রত্যক্ষ করতে শহরের বিভিন্ন স্থানে সকাল দশটা থেকে দুপুর দেড়টা নাগাদ ঘুরে ঘুরে প্রায় একই দৃশ্য দেখা গেছে। বরঞ্চ বেলা বাড়ার সাথে সাথে যানযট যেন আরও বেড়েছে।তীব্র রোদের মধ্যে দীর্ঘক্ষন জ্যামে আটকে থেকে অনেকেই হাপিত্যেশ করছিলেন। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের দূর্দশা ছিল অবর্ননীয়। অনেককেই জ্যামে আটকে থাকতে থাকতে ধৈর্য হারিয়ে গাড়ি থেকে নেমে হেটে গন্তব্যে রওনা দিতে দেখা যায়।অতিরিক্ত গাড়ির চাপ সামলাতে শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশদেরকেও রীতিমতো হিমশিম খেতে দেখা গেছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের যানজটের পরিস্থিতির ব্যাপারে জানতে চাইলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ট্রাফিক বিভাগের টি আই এডমিন দেবব্রত কর তেপান্তরকে জানান, পৌরসভা থেকে মোট ৩ হাজার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল। ছোট শহর তাই অল্প রিক্সাতেও যানজট মনে হয়। এর মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ থেকেও কিছু রিক্সা আসে। যেসব রিক্সার লাইসেন্স নেই সেগুলোকে মামলা দিচ্ছি। অফিস টাইমে একটু যানজট বাড়ে, যেমন সকাল ও সন্ধ্যা। শুনলাম পৌরসভা থেকে আরো কিছু লাইসেন্স দেওয়া হবে।

শহরের ভেতরে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের চলাচল সীমিত করার পরেও যানজট কেন কমানো যাচ্ছে না এমন প্রশ্নের জবাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা (সচিব) সামসুদ্দিন বলেন, “যানজট কমবেনা”। এর বেশি তিনি কিছু জানেন না বলেও জানান তিনি।

শহরের সড়কগুলোতে চলাচলকারী সাধারণ মানুষ আশা করেন,শহরের যানজট নিরসনে পৌর কর্তৃপক্ষ আরও আন্তরিক হবে এবং এই জন্যে খুব দ্রুতই তারা কার্যকরী পদক্ষেপ নিবে।

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।