ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলখানায় মাদক ঢুকছে অসাধু কারারক্ষীদের সহযোগীতায়

১২ জুন, ২০২১ : ১১:৫৬ পূর্বাহ্ণ ১৫৫৫

সীমান্তবর্তী জেলা ও দাঙ্গা-হাঙ্গামার অঞ্চল হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে মামলা-মোকদ্দমার সংখ্যা অন্য অনেক জেলার চেয়ে বেশি। এই সমস্ত মামলায় পুরো জেলা থেকে গ্রেফতারকৃত সকল আসামিদেরকে রাখা হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগারে। আইন অনুসারে শাস্তি প্রদানের পাশাপাশি তাদেরকে সংশোধন করে গড়ে তোলার দায়িত্ব বাংলাদেশ কারা বিভাগের। “রাখিব নিরাপদ দেখাব আলোর পথ” এই মূলমন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে দেশের কারাগারসমূহে আগত বিপথগামী লোকদের সঠিক প্রেষণা প্রদানের মাধ্যমে তাদের কৃত ভুল বুঝতে সহায়তা করা ও সংশোধন করা এবং বর্তমান যুগের সাথে তাল মিলিয়ে সঠিক প্রশিক্ষণ প্রদান করে দক্ষ মানব সম্পদ হিসেবে সমাজে ফিরিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে বাংলাদেশ কারা কর্তৃপক্ষ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু তেপান্তরের কাছে অভিযোগ আছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারা কর্তৃপক্ষ যথাযথভাবে বন্দীদেরকে প্রয়োজনীয় প্রেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রদান করছে না। যার ফলে কারাগারে প্রবেশকারী ছোট খাটো অপরাধীরাও জামিনে বেরিয়ে অপরাধ ছেড়ে দেয়ার পরিবর্তে আরও ভয়ংকর অপরাধী হয়ে উঠছে ।এছাড়া বন্দীদের সাথে অমানবিক আচরণ, নিম্নমানের খাবার প্রদান,কারা ক্যানটিনে সকল জিনিসপত্র অস্বাভাবিক বেশি মূল্যে বিক্রি করা,বন্দীদের সাথে সাক্ষাৎ বাণিজ্য,কারাগারের ভেতরে মাদকের সহজলভ্যতাসহ অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। হেফাজতের তান্ডবের পর ধারনক্ষমতার তিনগুণ বন্দীদের চাপ সামলানোসহ করোনাকালীন এই সময়ে কারাগারের বর্তমান পরিস্থিতি জানতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগারের জেল সুপার ইকবাল হোসেন’র মুখোমুখি হয়েছিল তেপান্তর । সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কাজী আশরাফুল ইসলাম

 

কাজী আশরাফুল ইসলাম : কেমন আছেন?

ইকবাল হোসেন : ভাল আছি।

 

আশরাফুল : ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগারে মোট বন্দী ধারণক্ষমতা কতজন এবং এই মুহুর্তে বন্দী সংখ্যা কত?

ইকবাল : ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগারের বন্দী ধারন ক্ষমতা অফিসিয়ালি ৬০৪ জন, কিন্তু সম্প্রতি একটি নতুন ভবন নির্মাণ হওয়ায় তা ৮০০ জনে উন্নীত হয়েছে। আর ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে হেফাজতের তান্ডবের ঘটনাতে অসংখ্য আসামি গ্রেফতার হওয়ায় বর্তমানে বন্দীদের সংখ্যা নারী পুরুষ মিলিয়ে সর্বমোট ১৭৭১ জনে দাড়িয়েছে।

 

আশরাফুল: এত বন্দীদের মধ্যে করোনাভাইরাসের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি কীভাবে নিশ্চিত করছেন?

ইকবাল : করোনা ঝুঁকির কারনে বন্দীদের সাথে আত্মীয় স্বজনদের সাক্ষাৎ করা আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। এখানে নতুন কোন বন্দী এলে তাকে বাধ্যতামূলক ভাবে স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধুয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে হয় এবং কারাকর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে একটি মাস্ক প্রদান করা হয়। এছাড়াও নতুন বন্দীদেরকে প্রথম তিন দিন আলাদা সেলে রাখা হয়।তিন দিন পর পরীক্ষা-নীরিক্ষা করে সুস্থ পাওয়া গেলে তাকে অন্যান্য সাধারণ বন্দীদের সাথে মিশতে দেয়া হয়।

 

আশরাফুল: কারাগারের ভেতরে বন্দীদের জন্য কোন ধরনের বিনোদনের ব্যাবস্থা রয়েছে কী?

ইকবাল: হ্যা,বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলার সরঞ্জামের পাশাপাশি দৈনিক পত্রিকার ব্যাবস্থা রয়েছে। কেউ বই পড়তে চাইলে লাইব্রেরি রয়েছে। সাদাকালো টেলিভিশনের ব্যাবস্থাও রয়েছে।

 

আশরাফুল : বন্দীদের সাথে নিয়মিত কাউন্সেলিং করেন কী?

ইকবাল: আসলে মোটিভেশনাল লেকচার দেয়ার মতো কেউ এখানে নেই। আমি নিজেও এই বিষয়ে তেমন একটা অভিজ্ঞ না।আর এগুলো করার মতো আমার হাতে তেমন সময়ও থাকে না।

 

আশরাফুল: আপনি নিজে বন্দীদের অভিযোগ ও সমস্যাদি নিয়মিত শোনেন?

ইকবাল: হ্যা,সপ্তাহে একদিন সকল বন্দীদের সাথে সরাসরি কথা বলি। তাদের যাবতীয় অসুবিধা শুনি এবং সেগুলো তৎক্ষনাৎ সমাধানের চেষ্টা করি।

 

আশরাফুল : অভিযোগ আছে আপনার কারাগারে বন্দীদের জন্য সরবরাহ করা খাবারের মান অতি নিম্নমানের। এ ব্যাপারে কী বলবেন?

ইকবাল : দেখুন,এখানে তৃতীয় শ্রেণির মানুষের খাবারের উপযোগী খাবার পরিবেশন করা হয়। মধ্যবিত্ত শ্রেণির অনেকের কাছে এই খাবার অখাদ্য মনে হতে পারে। তবে যে কেউ চাইলে নিজের টাকায় ক্যানটিন থেকে পছন্দসই খাবার কিনে খেতে পারে।

 

আশরাফুল : কারা কর্তৃপক্ষের আওতায় থাকা দুটো ক্যান্টিনেই জিনিসপত্রের দাম বাইরের তুলনায় অস্বাভাবিক বেশি এবং  অধিক মূল্য রাখার চালান রশিদও  আমার কাছে আছে। এছাড়াও বাইরে থেকে বন্দীদেরকে কিছু দিতে গেলে বাধ্যতামূলক বখশিশ দিতে হয়।কী বলবেন?

ইকবাল : এখানে ন্যায্যমূল্যেই সবকিছু বিক্রি করা হয় এবং বাইরে থেকে পোশাক-আশাকসহ অন্য কিছু ভেতরে পাঠালে কোন অর্থ দিতে হয় না। তবে আপনি যেহেতু প্রমানসাপেক্ষে অভিযোগ করছেন,আমি এইসব অনিয়মের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা নেব এবং আজই সকল পন্যের বাজারমূল্য অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণ করে দিব।

 

আশরাফুল : কারাগারের মূলগেটের ভেতরে মোবাইল ও ব্যাগ নিয়ে প্রবেশ করা যায় না। জেলগেটসংলগ্ন দোকানীকে প্রতিটি মোবাইল রাখার জন্য ৫ টাকা এবং ব্যাগের জন্য ১০ টাকা দিতে হয়। অথচ পূর্বে মোবাইলসহ মূল্যবান জিনিসপত্র গেটে অবস্থানরত কারারক্ষীদের কাছে বিনামূল্যে রাখা যেতো। এই দোকানটি কী আপনাদের অনুমতিপ্রাপ্ত?

ইকবাল : অবশ্যই না। জেলগেটের বাইরের কোন কিছু দেখার দায়িত্ব আমাদের না। আর এটা সত্য যে পূর্বে সাক্ষাৎ প্রত্যাশীদের জিনিসপত্র জেলগেটের ভেতরে লকার পদ্ধতিতে বিনামূল্যে রাখা হতো। কিন্তু মোবাইল অদলবদলসহ বিভিন্ন ঝামেলার কারনে এই সুবিধাটি বাদ দেয়া হয়। সাধারণ মানুষের মোবাইলের নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব আমার না।

 

আশরাফুল : কারাগারের ভেতরে হাসপাতালের সিট বাণিজ্য সম্পর্কে কতটুকু জানেন? চার পাচ হাজার টাকার বিনিময়ে অসুস্থ না হয়েও কারাগারের হাসপাতালে আরাম করে থাকা যায়,জানেন কী?

ইকবাল : কারাগারের হাসপাতালটি মাত্র আট শয্যা বিশিষ্ট। এটা নিয়ে বাণিজ্যের কী আছে। আর হাসপাতালের চিকিৎসক যদি কোন সুস্থ ব্যাক্তিকে অসুস্থতার সার্টিফিকেট প্রদান করে অতিরিক্ত সুবিধা প্রদান করেন তাতে আমি কী করতে পারি!

 

আশরাফুল : এত নিরাপত্তা স্বত্বেও কারাগারের ভেতরে হাত বাড়ালেই সকল ধরনের মাদক পাওয়া যায়। কীভাবে সম্ভব?

ইকবাল : মাদকের কিছু অভিযোগ মাঝেমধ্যে আমার কাছেও আসে এবং ভেতরে যে মাদক একদমই পাওয়া যায় না তা আমি বলব না। আসলে মাদকসেবীরা প্রতিনিয়তই অভিনব কৌশল অবলম্বন করে মাদকের সংস্থান করে এবং এদেরকে সহায়তা করে কিছু অসাধু কারারক্ষী। তবে এ ব্যাপারটি ইতিমধ্যে আমার কঠোর নজরদারিতে রয়েছে।

 

আশরাফুল : হেফাজতের তান্ডবের ঘটনায় বন্দী সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গিয়েছে। ফলশ্রুতিতে কিছু বন্দীকে আপনারা ইতিমধ্যেই আশেপাশের বিভিন্ন জেলা কারাগারে স্থানান্তর করেছেন। এই স্থানান্তর প্রক্রিয়াতে কাদেরকে প্রাধান্য দিয়েছেন?

ইকবাল : এটি একটি স্পর্শকাতর বিষয়। এই প্রক্রিয়ার ব্যাপারে এই মুহুর্তে আমি কিছু বলতে পারবো না।

 

আশরাফুল : জেলখানার ভেতরে অবস্থিত মসজিদের নামে সাক্ষাৎ টোকেন,মোবাইল জমার টোকেন এবং দানবাক্সসহ বিভিন্ন পদ্ধতিতে টাকা তোলা হয়। অভিযোগ আছে মসজিদের নামে সংগ্রহীত এই অর্থ অনেকের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা হয়ে যায়। এই মসজিদের সভাপতি কে এবং মসজিদের উন্নয়নের জন্য উত্তোলনকৃত এই টাকাগুলো আসলে কোথায় যায়?

ইকবাল : এই মসজিদের সভাপতি আমি নিজে। কিছু টাকা তোলা হয় মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণ,সংস্কার ও ইমাম সাহেবের বেতনের জন্য। আর টাকা কারও কাছ থেকে জোরপূর্বক নেয়া হয়। সবাই নেকীর আশায় স্বেচ্ছায় মসজিদের নামে অর্থ দান করেন, কোন টোকেনের জন্য নয়।

 

আশরাফুল : আমরা প্রত্যাশা করি, সকল অভিযোগকে পাশ কাটিয়ে আপনার মাধ্যমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগার একটি মডেল কারাগারে রুপান্তরিত হবে। সময় দিয়ে সহযোগিতা করার জন্য ধন্যবাদ।

ইকবাল : আপনাকেও ধন্যবাদ।

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।