সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ডাক্তারের সামনেই রোগীকে ব্যাবস্থাপত্র লিখে দিলো ঔষধ কোম্পানির এমআর

১৩ জুন, ২০২১ : ১২:৪৭ পূর্বাহ্ণ ১৮৭৩

তেপান্তর রিপোর্ট: ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালের জরুরী বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসকের সামনে বসেই রোগীদেরকে প্রেসক্রিপশনে ঔষধ লিখে দিয়েছে একটি ঔষধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি। ওই বিক্রয় প্রতিনিধি কর্তৃক লিখিত একটি প্রেসক্রিপশন তেপান্তরের হাতে এসেছে। প্রেসক্রিপশন লেখার সময় জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত ছিলেন অর্থোপিডিক্স বিশেষজ্ঞ ডাঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন রনি। তার নির্দেশেই ওই এমআর প্রেসক্রিপশন লিখেছেন। আর প্রেসক্রিপশন লিখে দেওয়া ওই ঔষধ বিক্রয় প্রতিনিধির নাম রিয়াজ।

প্রেসক্রিপশনে উল্লেখিত রোগীর নাম হোসনা বেগম। তিনি পৌর এলাকার পূর্ব মেড্ডায় ভাড়া থাকেন। তার গ্রামের বাড়ি সদর উপজেলার মজলিশপুর ইউনিয়নের মৈন্দ গ্রামে। পেশায় তিনি একজন নির্মাণ শ্রমিক। তিনি রোববার (১২ জুন) প্রচন্ড শারীরিক দুর্বলতা নিয়ে তার চাচীর সাথে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালের জরুরী বিভাগে চিকিৎসা নিতে গিয়েছিলেন।

হোসনা বেগমের চাচী তেপান্তরের কাছে অভিযোগ করেন, দুপুর তিনটার দিকে জরুরী বিভাগের টিকিট কেটে তারা যখন কর্তব্যরত চিকিৎসকের কক্ষে প্রবেশ করেন তখন চিকিৎসকের সামনের চেয়ারে দুজন যুবক বসে ছিলেন। তাদের একজন তার কাছ থেকে রোগীর টিকিট নিয়ে রোগীর সমস্যার কথা জানতে চান। তারপর ঐ যুবক হোসনা বেগমের জরুরি বিভাগের ব্যাবস্থাপত্রে চারটি ঔষধ লিখে দেন। চাচি ঐ যুবকের কাছে বলেন যেহেতু রোগীর শারীরিক অবস্থা খুবই দুর্বল তাকে ভর্তি রাখা যায় কিনা। তখন ঐ যুবক তাকে এই ঔষধগুলো কিনে নিয়ে বাসায় চলে যেতে বলেন এবং এই ঔষধগুলো খেলেই রোগী ভালো হয়ে যাবেন মর্মে আশ্বস্ত করেন। অথচ ঐ যুবক যখন রোগীর ব্যাবস্থাপত্রে ঔষধ লিখে দিচ্ছিলেন তখন কর্তব্যরত চিকিৎসক অপর যুবকের সাথে খোশগল্পে মগ্ন ছিলেন বলে তিনি জানান।

অনুসন্ধানে জানা যায়,জরুরি বিভাগের প্রেসক্রিপশনে ঔষধের নাম লিখে দেয়া যুবকের নাম রিয়াজ। তার লিখিত প্রেসক্রিপশনটি নিয়ে হাসপাতালের সামনের একটি ফার্মেসীতে গিয়ে যাচাই করে জানা যায়, তার লিখে দেয়া চারটি ঔষধের প্রথমটি তার নিজের কোম্পানি লিওন ফার্মাসিউটিক্যালসের পলিসেফ-২০০ ক্যাপসুল, যা একটি উচ্চমূল্যের এন্টিবায়োটিক। এছাড়াও প্রেসক্রিপশনে হেইসোক্যাল নামক একটি ক্যালসিয়াম ট্যাবলেটের নাম লেখা রয়েছে যেটি ইবনে হাইসা নামের ‘ ডি ‘ ক্যাটাগরির একটি কোম্পানি কর্তৃক বাজারজাতকৃত। উল্লেখ্য এই ক্যালসিয়াম ঔষধগুলোকে ফার্মেসী গুলো নিম্নমানের ডিব্বা কোম্পানি বলে অবিহিত করে থাকে। অথচ এই নিম্নমানের প্রতিটি হারবাল ক্যালসিয়াম ট্যাবলেটের দামই ১৮ টাকা।

প্রেসক্রিপশনটিতে প্রায় ১৩০০ টাকার ঔষধ লেখা থাকলেও এগুলোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খোদ ফার্মেসী মালিক নিজে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ফার্মেসী মালিক বলেন, ” সদরের ডাক্তাররা মাঝেমধ্যে এত নিম্নমানের ঔষধ লিখে দেন যেগুলো রোগীর কাছে বিক্রি করতে গেলে আমাদের নিজেদেরই বিবেকে বাধে। অথচ ডাক্তাররা ভালো করেই জানেন এইসব নিম্নমানের ঔষধ রোগীদের কোন উপকারে আসবে না। কিন্তু গ্রামের সাধারণ মানুষ ডাক্তারদের প্রতি অন্ধবিশ্বাস রাখার কারনে অনেকটা বাধ্য হয়েই এইসব অপ্রয়োজনীয় ও মানহীন ঔষধ কিনে নিয়ে যান।”

ডাক্তার মামুন

জরুরী বিভাগে কোন কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি কোন রোগীকে চিকিৎসা সেবা দিতে পারে কিনা,একজন দিনমজুর নারীকে এত উচ্চ মূল্যের ঔষধ লিখে দেয়া ঠিক হলো কিনা এবং তার বিরুদ্ধে আনীত কর্তব্যে অবহেলার অভিযোগ সত্য কিনা এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ডাঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন রনি প্রথমে এমন কিছু মনে নেই বলে এড়িয়ে গেলেও পরবর্তীতে ভুল স্বীকার করে তেপান্তরকে বলেন, ” দেখুন জরুরি বিভাগে মাঝেমধ্যে প্রচন্ড চাপ থাকে। তাছাড়া বিভিন্ন জরুরি প্রয়োজনে আমাদেরকে ওয়ার্ডে কিংবা অপারেশন থিয়েটারে যেতে হয়। তখন হয়তোবা অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী আমাদেরকে কিছুটা সহায়তা করেন। তবে আমরা যা বলি তারা তাই লিখেন।এক্ষেত্রে সে যদি তার নিজের কোম্পানির ঔষধ লিখে থাকে তাহলে সে কাজটা ঠিক করেনি। আর পরবর্তীতে চেষ্টা করবো এ ধরনের কোন ভুল যাতে না হয়। প্রয়োজনে ওই রোগীকে পুনরায় হাসপাতালে আসতে বলুন, আমি নিজ দায়িত্বে সব ট্রিটমেন্ট করে দেব।” ঔষধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিরা চিকিৎসকদের উপর ঔষধ লিখতে কোন চাপ প্রয়োগ করে কিনা আর ঔষধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধিরা সবসময় জরুরী বিভাগের চিকিৎসকের কক্ষে কেন অবস্থান করেন জানতে চাইলে তিনি এইসব প্রশ্নের কোন সদুত্তর দিতে পারেননি।

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।