হেফাজতের তান্ডব: অধমের বিক্ষিপ্ত ভাবনা

১৫ জুন, ২০২১ : ৫:২৬ অপরাহ্ণ ৪৪৬

মোস্তাফিজ চৌধুরী: স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও মুজিব শতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে অতিথি হিসেবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আগমনকে ইস্যু করে মার্চের ২৬,২৭ ও ২৮ তারিখ হেফাজতে ইসলাম চট্টগ্রামের হাটহাজারী, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ সারাদেশে ব্যাপক তান্ডব চালিয়েছে।যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি তান্ডব চালানো হয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে। ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে তারা রেলওয়ে স্টেশনে আক্রমণ করে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করে।যার জন্য সাধারণ যাত্রীগণ প্রায় তিন মাস ট্রেন সেবা থেকে বঞ্চিত রয়েছে। জাতির জনকের ম্যুরাল ভাংচুরসহ তারা শহরের গণগ্রন্থাগার, সুর সম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গন,জেলা মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল,ভূমি অফিস, পৌরসভা কার্যালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড,বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাকর্মীর বাড়িসহ আরও অনেক স্থানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এমনকি পুলিশ সুপারের কার্যালয়, সদর থানা এবং পুলিশ লাইনে আক্রমণ করে। তাদের এ তান্ডবের সময় ১৭ টি তাজা প্রাণ হারিয়ে যায়।সম্প্রতি জেলার সাধারণ জনগণের ব্যানারে রেলওয়ে স্টেশনে মানববন্ধন, গণস্বাক্ষরসহ কিছু কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে পুনরায় জেলা শহরে ট্রেন সেবা চালু করার জন্য এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া হেফাজতের তান্ডবের মূল হোতা মাওলানা মোবারক উল্লাহ এবং সাজিদুর রহমানকে গ্রেফতার করার জন্য।যদিও এরই মধ্যে হেফাজতের নতুন কমিটিতে তাদের নাম এসেছে।

যারা নিজেদেরকে ইসলাম ধর্মের হেফাজতকারী বলে দাবি করে তারা কেন রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিনষ্ট করল,তারা কেন এতটা সহিংস হলো।এর মধ্যে দেশের বিশিষ্ট জনেরা বলছেন হেফাজত মূলত এদেশের গর্বের মহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন এবং এদেশের অবিসংবাদিত নেতা জাতির জনকের শতবর্ষ উদযাপনকে বিনষ্ট ও বিতর্কিত করতে এ তান্ডব চালিয়েছে।বেশ কিছুদিন যাবত হেফাজত এবং তাদের তান্ডব নিয়ে অধমের ভাবনার জগৎ বিক্ষিপ্তভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। কারা এ হেফাজত,কি তাদের উদ্দেশ্য, আদৌ কি তারা ধর্মের হেফাজতকারী?

দেখা যায় ২০১১ সালে মূলত কওমিদের উদ্যোগে হেফাজতে ইসলাম আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে ইসলাম ধর্মকে হেফাজত করার অজুহাত দেখিয়ে। যদিও ধর্মের হেফাজত করার এখতিয়ার স্রষ্টা তাদের দেয়নি।যা স্রষ্টার প্রতি একপ্রকার ধৃষ্টতা দেখানো। তারা মূলত লাইম লাইটে আসে যুদ্ধাপরাধীর বিচার দাবিতে সরব ব্লগারদের নাস্তিক ঘোষণা করে তাদের বিচারের দাবি করে এবং তাদের ১৩ দফার মাধ্যমে। এখানেও কাউকে নাস্তিক ঘোষণা করে তার বিচার চাওয়ার কিংবা তাকে কতল করার এখতিয়ার কোন ধর্মই কাউকে দেয়নি।উল্টো তারা ইসলাম ধর্মের মর্যাদা প্রতিনিয়ত হানি করছে,সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্রবাদ ছড়িয়ে দিচ্ছে। এদেশের সকল জঙ্গিরা তাদের মধ্যে সুপরিকল্পিত ভাবে মিশে গেছে।

দেখা যায় তারা ধর্মের হেফাজত এর কথা বলে যাকে তাকে কাফের,মুরতাদ,নাস্তিক ইত্যাদি উপাধি দিয়ে দিচ্ছে। যারাই তাদের ভুল ধরতে গিয়েছে তাদের সবাইকে হেফাজতের রোষানলে পড়তে হয়েছে। হেফাজত ধর্মের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন তথাকথিত ইসলামি জলসায় তাদের বিরুদ্ধে সাধারণ, সরল,অসহায় ও নিরীহ মানুষদের উসকে দিয়েছে, যার ফলে অনেকের উপর হামলাও হয়েছে। বিশেষ করে যারা বঙ্গবন্ধু, স্বাধীনতা ও মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি শক্ত অবস্থান নিয়েছেন ও পক্ষে কাজ করে যাচ্ছেন তাদের প্রতি সুপরিকল্পিত ভাবে আক্রমণ করেছে ও কাফের, নাস্তিকসহ বিভিন্ন উপাধি দিয়েছে।মার্চ মাসের তান্ডবের সময় হেফাজতের নেতাকর্মীরা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাননীয় সাংসদ র আ ম উবায়দুল মোক্তাদির চৌধুরীকে কাফের ঘোষণা করে,এবং জেলা আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগ এর অঙ্গসংগঠনগুলোকে কাফের ও নাস্তিক ঘোষণা করে।হেফাজত ফতোয়া দেয় তাদের জানাজা তথাকথিত কোন আলেম পড়াবে না,তারা ধর্ম থেকে খারিজ হয়ে গেছে, তাদের বিবি তালাক হয়ে গেছে ইত্যাদি।এমনকি ২০১৩ সালের ১ এপ্রিল চট্টগ্রামের লালদিঘীতে হেফাজতের অনুষ্ঠিত মহাসমাবেশে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নাস্তিক বলে সম্ভোধন করে।তাছাড়াও দেশবরেণ্য বুদ্ধিজীবি, কবি,সাহিত্যিক, এনজিও ব্যক্তিত্বদেরও নাস্তিক বলে চিহ্নিত করে,যা দেশের সকল খবরের কাগজে বিভিন্ন সময় উঠে আসে।

যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি দৃঢ়,বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি দৃঢ়,তাদের প্রতি হেফাজতের এমন আচরণ কেন?দেখা যায় বিশ শতকের গোড়ার দিকে আশরাফ বা খানদানি মুসলমান হিসেবে যারা দাবি করত তারা ফতোয়া জারি করে যে বাংলা ভাষায় যেসব মুসলমান লেখালেখি করবে এবং বাংলা ভাষাকে মাতৃভাষা হিসেবে গ্রহণ করবে তারা ইসলাম ধর্ম থেকে খারিজ হয়ে যাবে।এদের বিবি তালাক হয়ে যাবে। এদের সন্তানরা হবে জারজ।১৯৫২ সালে আমাদের ভাষা আন্দোলন এর সময়ও একদল লোক একথাগুলো বলেছিল।আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধেও পাকিস্তানের দোসর জামায়েতে ইসলামীসহ বিভিন্ন ধর্মপন্থী দল একই কথা বলেছিল।২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তারা একই কথা বলেছিল। তাহলে সহজেই অনুমেয় যে এই নির্দিষ্ট কথাগুলো ফতোয়া হিসেবে বিশেষ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে যাচ্ছে। যা এবার হেফাজতের তান্ডবের সময় আবারও প্রতীয়মান হয়।

আরও দেখা যায়,বহুল প্রচলিত সাপ্তাহিক ২০০০ এর ১৫ তম বর্ষে মাদ্রাসা জগৎ নিয়ে একটি আর্টিকেল ছাপানো হয়।যেখানে উল্লেখ আছে,একসময় এদেশের মানুষের দান- খয়রাতে হেফাজতপন্থী কওমি মাদ্রাসা পরিচালিত হলেও এখন তা চলে বিদেশি এনজিও গুলোর সহায়তায়।২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার গঠনের পর তৎকালিন জামায়েতের সেক্রেটারি জেনারেল কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ। তিনি এসব মাদ্রাসাকে জামায়েত ইসলামির পক্ষে আনার জন্য তাদেরকে দেশি-বিদেশি এনজিওর সহায়তা পুষ্ট করে তোলেন।তারপর থেকে মাদ্রাসাগুলো চালনা করতে স্থানীয় সাহায্য সহযোগিতার তেমন প্রয়োজন হয় না।জানা যায় তথাকথিত ইসলামি রাষ্ট্র বানাতে কওমি মাদ্রাসাকে কাজে লাগাতে জামায়াত নেতা মুজাহিদ সেসময় ৩৪ টি ইসলামি নামধারী এনজিওকে কাজে লাগান।এবং তাদের এই শাসনামলে ওইসব এনজিও কওমি মাদ্রাসাগুলোয় ১ হাজার কোটি টাকা সহায়তা করে। অর্থাৎ বছরে ২০০ কোটি টাকা। এধরণের বিনিয়োগ যারা করে তাদের মধ্যে অন্যতম কুখ্যাত জঙ্গি ওসামা বিন লাদেনের এনজিও বেনোভেলেন ট্রাস্ট, কুয়েতি এনজিও রিভাইবাল অব ইসলামিক হেরিটেজ, ইসলামিক রিলিফ এজেন্সি, কাতারের কাতার চ্যারিটেবল সোসাইটি, যুক্তরাজ্যের মুসলিম এইড,সৌদি সহায়তায় আল তাওহীদ ট্রাস্ট, আল মারকাজুল আল ইসলামি প্রভৃতি। এ মাদ্রাসাগুলোর ধ্যান ধারণা হচ্ছে দেশকে তালেবানি রাষ্ট্র গঠনের, কারণ তালেবানদের যেসব দাতা সংস্থা সাহায্য করে কওমি মাদ্রাসাগুলো একই ধরনের সংস্থা থেকে সহায়তা পায়।এছাড়া হেফাজতে ইসলাম যেই হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে পরিচালিত হয় সে মাদ্রাসাটি মূলত কুয়েত,সৌদি আরব ও পাকিস্তানের অর্থ সহায়তায় পরিচালিত হয়।এথেকে স্পষ্ট বুঝা যায় হেফাজতে ইসলাম নামধারীরা মূলত কিসের হেফাজত করছে।

বলা হয় কওমিরা মূলত ওহাবীবাদকে অনুসরণ করে। দেখা যায় মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুড,জঙ্গি সংগঠন আল-কায়দা এবং আইএসসহ সকল জঙ্গি সংগঠন এ ওহাবীবাদের অনুসারী। এমনকি জামায়েতে ইসলামীর মওদূদীবাদও ওহাবীবাদের বাই প্রোডাক্ট।যার ন্যায় স্পষ্টতই বলা যায় কেন হেফাজতে ইসলাম কারণে অকারণে একজনকে নাস্তিক, কাফের,মুরতাদ বলে সম্ভোধন করে,কিসের জন্য আমাদের গর্বের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উৎসব এবং মুজিব শতবর্ষ উদযাপনকে বিতর্কিত,বাধাগ্রস্ত এবং নস্যাৎ করার জন্য সুপরিকল্পিত ভাবে এ তান্ডব চালিয়েছে।এখানে ইসলাম ধর্মকে রক্ষা বা এর মর্যাদা সমুন্নত রাখার কোন উদ্দেশ্যই ছিল না।

বিক্ষিপ্তভাবে এসব ভাবতে ভাবতে অধম স্বীদ্ধান্তে উপনীত হয় যে,তারা মূলত ইসলামের হেফাজতকারী নয় এবং তা হেফাজত করার স্পষ্ট যোগ্যতাও তাদের নেই।তারা মূলত এদেশে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে, প্রগতিশীলতা ও মুক্তচিন্তার বিরুদ্ধে, বাঙালি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এবং তথাকথিত ইসলামি রাষ্ট্রের দাবিকে প্রতিষ্ঠার পক্ষে পাকাপোক্ত করছে তথাকথিত ইসলামি জলসার মাধ্যমে সাধারণ অসহায় মানুষকে বিভ্রান্ত করে। তারা হেফাজতে ইসলামকে একপ্রকার একটি নতুন ধর্মে প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে।দেশপ্রেম, মানবিকতা এবং স্বকীয়তা তাদের মধ্যে নেই বললেই চলে। জঙ্গিরা তাদের মধ্যে মিলে মিশে একাকার। তারা তাদের স্বার্থে ইসলাম ধর্ম এবং প্রিয় নবী (সাঃ) কে খুবই জগন্যভাবে ব্যবহার করতেও দ্বিধাবোধ করে না।এদেশের অর্থনীতি, শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে তাদের কোন জোরালো ভূমিকা নেই,ছিলও না।তাই অধম এই সীদ্ধান্তে উপনীত হল যে, সে আমরণ এ হেফাজতকে ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করবে এবং তাদের এই অসৎ উদ্দেশ্য নস্যাৎ করতে নিজের মতো আমরণ লড়াই করে যাবে।
সকলের শুভবুদ্ধির উদয় হোক,
সকলের জীবন স্বার্থক হোক,
জয় বাংলা,
জয় গুরু।

 

তথ্যসূত্রঃ
দৈনিক প্রথম আলো,
সাপ্তাহিক ২০০০,বর্ষ ১৫,
ঐতিহাসিকের নোটবুক, সিরাজুল ইসলাম।

মোঃ মোস্তাফিজ চৌধুরী
আজন্ম শিক্ষার্থী
১৫ জুন ২০২১ ইং

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।