ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বড়াইলে ভূমিদস্যু ইমামের চাঁদাবাজী, শেষবারের মতো সতর্ক করলো প্রশাসন

৪ জুলাই, ২০২১ : ৩:৫১ অপরাহ্ণ ৪৬৬

তেপান্তর রিপোর্ট: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের বড়াইলে জামায়াতে ইসলাম ও হেফাজত নেতা এক ইমামের নেতৃত্বে চাঁদাবাজি চলছে। কিশোরগঞ্জের ভৈরবের চন্ডিবেরের বায়তুস সুবহান জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা কাজী আলমগীর ও তার বড় ভাই বড়াইল বাজারের কাজী ডিসপেনসারির মালিক কাজী আবু তাহের, কুয়েত ফেরত তাদের অপর ভাই কাজী জালাল উদ্দীন, তাদের বোন জামাই হাজী নাছির উদ্দিন মাস্টার, আবু তাহেরের শ্বশুর সাদেকপুরের হাজী আবদুল মালেক মালু, তাহেরের মেয়ের শ্বশুর হাজী ইসমাইল খাঁ, তাহেরের ছেলে কাজী ইমরুল হোসাইন চাঁদার দাবিতে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির নেতা সাংবাদিক কাজী ইমরুল কবীর সুমনের গ্রামের বাড়ির নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন।

গতকাল (শনিবার) ৪০ লাখ টাকা চাঁদা দাবী করে কাজী আবু তাহের ও তার ছেলে কাজী হোসাইন সকাল ১০টায় বড়াইলের কাজী বাড়িতে সাংবাদিক সুমনের বসতভিটায় কাজ করতে যাওয়া শ্রমিক মো. দুলাল সহ অন্যদের মারধরের হুমকি দিয়ে তাড়িয়ে দেন।

এর আগে গত ২৮ জুন ২০২১ সাংবাদিক সুমনের বসতভিটায় ঘরের কাজ করতে গেলে আবদুল মালেক ও মো. দুলালসহ শ্রমিকদের তাড়িয়ে দেন কাজী জালাল উদ্দিন, কাজী আবু তাহের ও কাজী হোসাইন। এসময় ফোনে হুমকি দেন ইমাম কাজী আলমগীর। চাঁদার টাকা না দিলে তারা কাজ করতে দিবেন না বলেও হুমকি দেন।

গত ১০ই মে ২০২১ খৃ. সাংবাদিক সুমনের আমবাগানের ১৯টি আমগাছ থেকে কাজী আবু তাহের, কাজী জালাল, কাজী হোসাইন, কাজী সাব্বির, মনোয়ারা বেগমের নির্দেশে অন্য দুর্বৃত্তরা প্রায় ১৭ মন আম চুরি করে নিয়ে যায়।

এর আগে গত ২৩ মার্চ ২০২১ খৃ. আশুগঞ্জে সমঝোতা বৈঠকে বসে নবীনগর আওয়ামী লীগের শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক এটিএম মোস্তাফিজুর রহমান নান্নু মাস্টার, বড়াইলের কতা’র এডমিন মো. সুমন সরকার, বড়াইল আওয়ামী লীগ যুব লীগের সভাপতি মনির হোসেন হামিদী,  যুব নেতা শাখাওয়াত হোসেন মুন, শিল্পপতি মো. হোসেন পলাশ, সমাজসেবক এসএম বাহাউদ্দীন জাকি, মো. আনিসুজ্জামান, সাংবাদিক লোকমান হোসেনের সামনে ইমাম মাওলানা কাজী আলমগীর ও কাজী আবু তাহের প্রকাশ্যে সাংবাদিক সুমনের কাছ থেকে ২৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবী করেন। এ টাকা দিলে তারা সুমনকে কাজ করতে  দেবেন বলে জানান। নইলে বাধা দেয়ার হুমকি দেন।

কাজী আবু তাহের সাংবাদিক সুমনের মেহগনি গাছ কাটতে গিয়ে গাছ থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন। গ্রামবাসীর অনুরোধে ঢাকায় এনে তাকে হাসপাতালে অপারেশন করিয়ে সুস্থ্য করে দেন সাংবাদিক সুমন। সেই চিকিৎসার টাকাও শোধ করেননি কাজী আবু তাহের, কাজী আলমগীর, মনোয়ারা বেগম গং।

এর আগে বাড়ি করতে না দিয়ে সাংবাদিক সুমনের কেনা ১০ হাজার ১নং ইট চুরি করে নিজেদের ঘরের ভিটি তৈরী করেন কাজী আবু তাহের, কাজী জালাল উদ্দিন, কাজী আলমগীর, কাজী হোসাইন ও মনোয়ারা বেগম। চিকিৎসার জন্য ধার নেয়া টাকা ফেরত না দেয়া ও প্রাণনাশের হুমকি দেয়ায় ঢাকার  মোহাম্মদপুর থানায় ইমাম মাওলানা কাজী আলমগীর, কাজী জালাল উদ্দিন, কাজী আবু তাহের, হাজী নাছির উদ্দিন মাস্টার, মনোয়ারা বেগম, কাজী হোসাইন, হাজী আবদুল মালেক মালুর বিরুদ্ধে জিডি করা হয়েছে, যা মোহাম্মদপুর থানার জিডি নং ৮০, তারিখ ০১/০৬/২০২১।

এছাড়া চাঁদা দাবী, আমচুরি, বাড়ির কাজে বাঁধা দেয়ায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ ও নবীনগর থানায় ২টি অভিযোগ দায়ের করেন সাংবাদিক সুমন। অভিযোগগুলো মামলা করার প্রক্রিয়াধীন আছে।

১৫ লাখ টাকা চাঁদা চাওয়ার অপরাধে দুই বছর আগে ইমাম মাওলানা কাজী আলমগীর, কাজী ইমরুল হোসাইন, কাজী আবু তাহের, হাজী নাছির উদ্দিন মাস্টার, হাজী আবদুল মালেকের  বিরুদ্ধে চাঁদাবাজীর মামলাও হয়। মামলাটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জজকোর্টে বিচারধীন। এ মামলায় কাজী আবু তাহের ১০ দিন ও নাছির মাস্টার ৩ দিন  জেল খাটেন। পরে গ্রামবাাসী কিয়ামুদ্দীন বাড়ির চাঁন মিয়া, মীর বাড়ির মোহাম্মদ আলী মীর, কাজী বাড়ির কাজী জামাল, খারঘরের মহিউদ্দীন আহমেদ জীবনের বিশেষ অনুরোধে সমঝোতার শর্তে সাংবাদিক সুমন নিজে জিম্মাদার হয়ে এদের জামিন দেন। জামিন পেয়েই কাজী আবু তাহের গং ১২টি মেহগনি ও আম গাছ কাটার মিথ্যা মামলা দেন সাংবাদিক সুমন সহ তার ৩ ভাইয়ের বিরুদ্ধে।

উল্লেখ্য, সাংবাদিকের বড় ভাই বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারের চিকিৎসক ডাঃ কাজী লুতফুল কবীর ফারুক গত ১০ বছর ধরে বড়াইলে গ্রামেই আসেননি। এই গাছকাটার মিথ্যা  মামলায় সাংবাদিক সুমনের বাড়ির কেয়ারটেকার বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজী সিরাজ মিয়া ও গ্রামপুলিশ গোপাল চন্দ্র পালকেও আসামী করা হয়। বড়াইল ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মো. জাকির হোসেন এই মামলার তদন্তের দায়িত্ব  পেলেও ভিলেজ পলিটিক্স করে রহস্যজনকভাবে দেড় বছর তদন্ত কাজ আটকে রেখে বিবাদীদের মামলার জালে ফাসিয়ে হয়রানি করেন। গ্রামপুলিশ গোপাল চন্দ্র পালকে এই মামলার ভয় দেখিয়ে চাকুরী থেকে সরিয়ে দেয়ার হুমকিও দেন জাকির চেয়ারম্যান। দেড় বছর পর আদালত জাকির চেয়ারম্যানকে সাসপেন্ড করে মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেন নবীনগর উপজেলা কৃষি অফিসারকে। তিনি অভিযোগ মিথ্যা বলে রিপোর্ট দিলে আদালত মামলাটি খারিজ বা মিথ্যা বলে রায় দেন।

বড়াইলের কতা’র এডমিন মো. সুমন সরকার জানান কাজী আবু তাহের, মনোয়ারা বেগম, কাজী জালাল উদ্দিন, কাজী আলমগীর, কাজী হোসাইন, হাজী নাছির উদ্দীন মাস্টার, হাজী আবদুল মালেক মালু, হাজী ইসমাইল খাঁ গং পায়ে পা বাধিয়ে সাংবাদিকদের সাথে ঝগড়া করতে চাচ্ছেন। গ্রামের কিছু দুষ্ট লোক তাতে তাল দেয়ায় সাংবাদিককে বাধ্য হয়ে আইনের আশ্রয় নিতে হচ্ছে। সাংবাদিক ইমরুল সুমন জানান চাকুরী সুবাদে তার পরিবারের সবাই রাজধানী ঢাকায় থাকায় ইমাম মাওলানা কাজী আলমগীর, তার ভাই কাজী জালাল উদ্দিন, কাজী আবু তাহের, তাহেরের ছেলে কাজী হোসাইন, তাহেরের স্ত্রী মনোয়ারা বেগম বাড়িঘর ও ফসলী জমি দখল করার পায়তারা করছেন। তাদের বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণবাড়িয়া আদালত থেকে পি- ২৭২/১৯ ইং মামলায় ফৌজদারী কার্যবিধির ১৪৪ ধারার রায় পেয়েছি। গ্রামের এই জমির দলিল, নামজারী, খাজনা খারিজ, দখল সব আমাদের নামে। এগুলো   পৈত্রিক ও ক্রয় করা সম্পত্তি। আমার বাবার ওয়ারিশ হিসেবে পেয়েছি। আমার বাবা এখনো জীবিত। এই জমি দখলের জন্য ভূমিদস্যু ইমাম মাওলানা কাজী আলমগীর আদালতে আর্জি জানিয়েছেন দ্বাদশ বর্ষ(১২ বছর) ধরে জায়গা জমি দেখাশোনা করছেন বলে তিনি নাকি জমির মালিক হয়ে গেছেন! এরা বড়াইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান  মো. জাকির হোসেন চেয়ারম্যানকে হাত করে আমাদের বিরুদ্ধে একের পর হয়রানীমূলক মিথ্যা মামলা করছেন। তারা এলাকায় আমাদের বাড়িঘরে কাজ করতে বারবার বাধা দিচ্ছেন। চাঁদা দাবী করে হয়রানী করছেন। ইমাম মাওলানা আলমগীর, হাজী আবদুল মালেক মালু, মনোয়ারা বেগম ৩ দফা আমাকে প্রাণে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছেন। নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের বিরুদ্ধে জিডি ও মামলা করেছি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। নিরাপত্তার অভাবে এলাকায় যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে আমাদের।

চাঁদাবাজি, গাছ চুরি, সাংবাদিকদের মোবাইল ক্যামেরা ভাঙ্গচুর ও লাঞ্ছিত করার ৩টি মামলায় জামিনে থাকা ভৈরব চন্ডিবের বায়তুস সুবহান জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা কাজী আলমগীরের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমার কোন বক্তব্য নেই।

নবীনগর থানার অফিসার ইনচার্জ আমিনুর রশিদ জানান, সাংবাদিক ইমরুল সুমনের বসতভিটা ও জমিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া আদালতের নির্দেশে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা জারি করা আছে ইমাম মাওলানা কাজী আলমগীর, কাজী আবু তাহের সহ ১২ জনের বিরুদ্ধে। আইনশংখলা বজায় রাখতে থানা থেকেও তাদের কাছে নোটিশ করা হয়েছে।

বড়াইল ইউনিয়ন বিটের দায়িত্বে থাকা দারোগা এস.আই রনি সুরে রানা জানান, সাংবাদিক ইমরুল সুমনের বসতভিটা ও জমিতে ১৪৪ ধারা জারি করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া আদালত। সেখানে কাজী আবু তাহের, কাজী জালাল উদ্দীন, কাজী আলমগীর, কাজী ইমরুল হোসাইন, মনোয়ার বেগম, কাজী মাফুজা, হাজী নাছির উদ্দিন মাস্টার, হাজী আবদুল মালেক মালু, কাজী আবদুর রাজ্জাক রেজেক, কাজী নূর আলম, হাজী ইসমাইল খাঁ, হাজী তাজুল ইসলাম গংদের যেতে নিষেধ করা আছে আদালতের। আমি এ বিষয়ে কয়েক দিন আগে কাজী আবু তাহের গংদের সতর্ক করে বড়াইল বাজারে তাহেরের দোকানে একটি নোটিশও দিয়ে এসেছি। সেই  নোটিশের কপি আদালতেও পাঠিয়েছি। তাদের দুই বার এ নিয়ে নোটিশ দেয়া হলো। পরে বড়াইল কাজী বাড়িতে সাংবাদিক ইমরুল সুমনের বসতভিটা পরিদর্শন শেষে এস আই রনি সুরে রানা গ্রামবাসীর সামনে কাজী আবু তাহের, কাজী হোসাইন, কাজী জালাল, কাজী আলমগীর, হাজী মালু, নাছির মাস্টার গংদের বলেন, ‘সাংবাদিক সুমন তার নিজের জমিতে বাড়ি করুক না খাল কাটুক সেটা গ্রামের অন্য কারো বলার কিছু নেই। শেষবারের মতো সবাইকে সতর্ক করা হলো। কেউ এ নিয়ে বাড়াবাড়ি করবেন না।’ তিনি সাংবাদিক সুমনের জমিতে কাজ করতে বলেন শ্রমিকদের। আর কেউ কাজে বাধা দিয়ে চাঁদাবাজী করতে আসলে সেটার আইনগতভাবে ব্যবস্থা নেয়ার কথাও জানান।

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।