এএসআই নাসিরের হুমকি: জলে থেকে কুমিরের সাথে লড়াই করা যায়না (প্রথম পর্ব)

১৪ জুলাই, ২০২১ : ২:২৬ অপরাহ্ণ ১১৮০
এএসআই নাসির

বিশেষ প্রতিবেদক: এএসআই সৈয়দ নাসির উদ্দীন, যিনি দুই বছরের অধিক সময় যাবৎ কর্মরত রয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিজয়নগর থানায়। দীর্ঘ দিন একই থানায় কর্মরত থাকার ফলে এই থানা এলাকায় বিশেষ করে সিঙ্গারবিল ইউনিয়নের অন্তর্গত নোয়াবাদী,নলগড়িয়া এবং কাশীনগর গ্রামের বাসিন্দাদের কাছে তিনি একজন সুপরিচিত পুলিশ সদস্য। তবে এসব গ্রামে তিনি সুপরিচিত তার অশ্লীল শব্দোচ্চারণ এবং বিভিন্ন অপকর্মের জন্যে।

বিজয়নগর থানা এলাকার একেবারে শেষ প্রান্তে অবস্থিত ভারতীয় সীমান্তঘেষা এই গ্রামগুলি মাদকের অভয়ারণ্য বলে বিবেচিত। জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সীমান্তবর্তী এসব গ্রামগুলোর শতকরা ত্রিশ জন বাসিন্দা প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে মাদক চোরাচালানের সাথে জড়িত। মাদকের এই সাম্রাজ্যে অবৈধ অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে এএসআই নাসির তৈরি করেছেন তার এক নিজস্ব বলয়। অভিযোগ রয়েছে, এলাকার সকল মাদক ব্যাবসায়ীদের সাথে রয়েছে তার গভীর সুসম্পর্ক। তাকে সাপ্তাহিক ও মাসিকহারে মাসোহারা দিয়ে এই সমস্ত মাদক ব্যাবসায়ীরা অনেকটা প্রকাশ্যেই করছেন মাদক বেচা-কেনা।

প্রতিদিন জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে শতশত মোটরসাইকেল ও সিএনজি অটোরিকশাযোগে শত শত মাদকসেবি ওই এলাকায় আসা-যাওয়া করে মাদকসেবনের উদ্দেশ্যে। অভিযোগ আছে, মাদক ব্যাবসায়ীদের কাছ থেকে অবৈধ চাদা আদায়ের পাশাপাশি এইসব মাদকসেবিরা এএসআই নাসিরের অর্থ উপার্জনের অন্যতম উৎস। জেলে পাঠানোর ভয় দেখিয়ে আটক করার পর তাদের কাছ থেকে টাকা পেয়ে ছেড়ে দেয়া যেন এএসআই নাসিরের নিত্য দিনের কাজ। অথচ বিভিন্ন সময় তার এই গ্রেফতার বাণিজ্যের দরুন অযথা নিরপরাধ সাধারণ মানুষের হয়রানির শিকার হওয়ার ঘটনাও রয়েছে অসংখ্য। কিন্তু উপরমহলে তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ দিলে তিনি বিভিন্ন মিথ্যে মামলায় ফাসিয়ে দিবেন এমন ভয়ে হয়রানির শিকার সবাই এইসব অন্যায় মুখ বুজে সহ্য করেন।

সর্বশেষ গত ২৪শে জুন বিকেলে কাশীনগর গ্রামের বাসিন্দা মহসিন মিয়া নিজবাড়ি থেকে সিঙ্গারবিল বাজারে যাওয়ার সময় পথিমধ্যে এএসআই নাসির তাকে আটক করে। মহসিন মিয়া তাকে আটকের কারন জানতে চাইলে এএসআই নাসির জানান, তার নামে থানায় ওয়ারেন্ট আছে।মহসিন মিয়া তার নামে কোন মামলা নেই জানিয়ে এএসআই নাসিরের কাছে ওয়ারেন্টের কাগজ দেখতে চাইলে তিনি তাকে ওয়ারেন্টের কাগজ দেখানোর পরিবর্তে চড় থাপ্পড় দিয়ে হাতে হ্যান্ডকাফ পড়িয়ে সিএনজিতে বসিয়ে রাখেন। এমনকি বেশি চিল্লাচিল্লি করলে পকেটে ইয়াবা ঢুকিয়ে দিয়ে তাকে চালান দেয়ার ভয় দেখিয়ে চুপচাপ গাড়িতে বসে থাকারও নির্দেশ দেন এএসআই নাসির। আধা ঘন্টা পর খবর পেয়ে মহসিন মিয়ার মামা জাকির হোসেন ও স্থানীয় ব্যাক্তি জাহাঙ্গীর মিয়া ঘটনাস্থলে পৌঁছে এএসআই নাসিরকে অনুরোধ করেন তাকে ছেড়ে দেয়ার জন্য। তখন এএসআই নাসির তাদের কাছে তাকে ছাড়ার জন্য চা-নাস্তার খরচ ও গাড়ি ভাড়া বাবদ প্রথমে ছয় হাজার টাকা দাবি করেন। মহসিনের মামা এবং জাহাঙ্গীর মিয়া উভয়ই এএসআই নাসিরকে জানান, মহসিন মিয়া এতিম এবং নিতান্তই গরীব ছেলে। তাদের কাকুতি মিনতিতে কিছুটা নরম হয়ে এএসআই নাসির শেষ পর্যন্ত চার হাজার টাকার বিনিময়ে মহসিন মিয়াকে ছেড়ে দিয়ে চলে যান। বাকী সবার মতো মহসিন মিয়া নাসিরের এই অপকর্মের ঘটনা চেপে যাননি। কিন্তু বিপত্তি বাধে যখন মহসিন মিয়া এই ঘটনার পরদিন ২৫শে জুন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার পুলিশ সুপারের নিকট তাকে হয়রানি করার ঘটনাসহ দীর্ঘদিন যাবৎ এলাকায় এএসআই নাসির কর্তৃক কৃত যাবতীয় অপকর্মসমূহ উল্লেখ করে একটি ইমেইল প্রেরণ করেন এবং উক্ত ইমেইলের একটি কপি বাংলাদেশ পুলিশের আইজিপির সরাসরি তত্বাবধানে পরিচালিত পুলিশ অভিযোগ শাখায়ও পাঠিয়ে দেন।

অভিযোগকারী মহসিন বলেন, ২৬ শে জুন আইজিপি সেলের নির্ধারিত ফোন নাম্বার থেকে মহসিন মিয়ার ব্যাক্তিগত মোবাইল নাম্বারে কল দিয়ে ইমেইলে উল্লেখিত ঘটনাটি পুনরায় জানতে চাওয়া হয় এবং প্রাথমিক সত্যতা যাচাইপূর্বক তার অভিযোগটি গৃহীত হয়েছে মর্মে আশ্বস্ত করা হয়। পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে গিয়ে তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত অভিযোগের ব্যাপারে জানতে পেরে এএসআই নাসির ভীষণ ক্ষেপে যান এবং কাশীনগর গ্রামে এসে মহসিন মিয়াকে খুজতে থাকেন।

মহসিন আরো জানান, গত ৩০শে জুন দুপুরে এএসআই নাসির সাদা পোষাকে কাশীনগর গ্রামে আসেন এবং মহসিন মিয়ার মামা জাকির হোসেনকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে গিয়ে মহসিন মিয়া কর্তৃক দায়েরকৃত অভিযোগের কারনে চাকরিক্ষেত্রে তার অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে বলে জানান। তিনি জাকির হোসেনকে দীর্ঘক্ষন আটকে রেখে বিভিন্নভাবে হুমকি প্রদর্শন করেন এবং নিজেকে কুমিরের সাথে তুলনা করে “জলে থেকে কুমিরের সাথে শত্রুতার ফলাফল ভালো হবে না” বলেও কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তাছাড়া, কিছু দিনের মধ্যে তার ব্যাপারে পুলিশের বিভাগীয় তদন্ত এলে তার ভাগিনাকে বুঝেশুনে সাক্ষী দিতে বলেন। এএসআই নাসিরের দম্ভোক্তিতে সহজ সরল মানুষ জাকির হোসেন প্রচন্ড ভয় পেয়ে যান এবং বাড়ি ফিরে তার ভাগিনাকে বলেন নাসিরের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সকল অভিযোগ উঠিয়ে নিতে।

মহসিন মিয়া ঘটনার দিন রাতেই তার মামাকে উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে হুমকি প্রদানের ঘটনার বিস্তারিত উল্লেখ করে আইজিপি সেলে পুনরায় ইমেইল প্রেরণ করেন।

এএসআই নাসির

এই ঘটনার পর থেকে উর্ধতন কর্তৃপক্ষ এএসআই নাসিরের সিঙ্গারবিল ইউনিয়নে প্রবেশের ব্যাপারে কড়াকড়ি আরোপ করে বলে জানা যায়। প্রায় দুই সপ্তাহ যাবৎ এলাকায় এএসআই নাসিরের অনুপুস্থিতি ইতিমধ্যেই জনমনে কৌতুহল সৃষ্টি করেছে। বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে এএসআই নাসিরের একের পর এক কুকীর্তির অভিযোগ। যদিও তার ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে কেউই এখনো সরাসরি তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে চাইছে না, তবে নাম না প্রকাশ করার শর্তে অনেকেই তেপান্তরকে জানিয়েছেন তার নানান অপকর্মের ঘটনা এবং তার অবৈধ ক্ষমতার কাছে তাদের অসহায়ত্বের গল্প। এইসব বক্তব্যে উঠে এসেছে বিভিন্ন সময় মামলার ভয় দেখিয়ে কিভাবে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে তিনি টাকা আদায় করে,দাবিকৃত অর্থ না পেলে বিভিন্ন অজ্ঞাত আসামীর মামলায় ঢুকিয়ে দেয়ার হুমকি,এলাকার চিহ্নিত মাদক চোরাকারবারি পরান মিয়া ও আলমগীর মিয়ার সাথে তার দহরমমহরম সম্পর্ক, এলাকার নিরিহ মানুষদের সাথে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরন,বিভিন্ন মাদক স্পট থেকে কিভাবে নিয়মিত মাসোহারা আদায় করে, নিজেকে আইনমন্ত্রীর আত্মীয় পরিচয় দিয়ে এলাকায় বেপরোয়া চলাফেরা করা, এলাকার বিভিন্ন বাড়ি ঘরের আনাচে-কানাচেতে অনধিকার প্রবেশ, টাকা পেয়ে ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি গ্রেফতার করেও ছেড়ে দেয়া,গ্রামে বেরাতে আসা আত্মীয় স্বজনসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে এলাকায় আগত (মাদকসেবি ব্যাতিত) বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের সাথে অশালীন আচরনসহ অসংখ্য অপকর্মের গল্প। সাধারণ মানুষের এসব বক্তব্যের ভিডিও গোপনে ধারণ করা হয়েছে। ( এবিষয়ে অভিযুক্ত নাসির ও পুলিশের উর্ধতন কর্মকর্তাদের বক্তব্য থাকছে প্রতিবেদনের শেষ পর্বে )

চলবে…..

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।