ছোট গল্প: হঠাৎ চলে যাওয়া

১৫ জুলাই, ২০২১ : ৪:৪১ অপরাহ্ণ ৩৫৫

জাহাঙ্গীর আলম বিপ্লব: আমি পিতৃহারা সাইফুল| আমি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের একমাত্র সন্তান| আম্মার বয়স হয়েছে। আমাকে নিয়ে খুব চিন্তা করতো| আম্মা ইদানিং বেশ বিষণ্ণ থাকে| যে কেউ তার চোখের দিকে তাকিয়েই বলে দিতে পারবে, ভদ্রমহিলা একজন দুখী মানুষ|

আম্মাকে সাফ জানিয়ে দিয়েছিলাম কখনো বিয়ে করবোনা| তারপর জীবনে ডালিয়া এলো| এতোদিন জানতাম আমার মন নাই| এখন দেখি সত্যি সত্যিই সুন্দরীর প্রেমে পড়ে আবেগে চোখের জল নাকের জল এক করে ফেলছি! ওর শরীরে আমি পেতাম বকুলের ঝরে পড়া ঘ্রাণ| ওকে দেখে, ওর সাথে মিশে মনে হলো এই মেয়েকে বিয়ে না করলে জীবন আমার পুরোটাই বৃথা|

বেকার অবস্থায় ভাঙচুর টাইপ একতরফা ভালোবেসে বিয়ে করেছিলো ডালিয়া |পরিবারের অমতে বিয়ে করে ডালিয়া আমাকে| আদরের মেয়েটার সাথে এরপর আর তার পরিবার কোনো যোগাযোগ রাখেনি| আমাকে ঘিরেই গড়ে উঠতে থাকে উঁচু পাঁচিল ঘেরা ডালিয়ার নতুন পৃথিবী| আমি কিন্তু ঠিকই তাকে পাগলের মতো ভালোবাসতাম | রাতে আমার শরীর ঘেষে বসে গুনগুনিয়ে গান গাওয়া আর চুলে বিলি কাটা ওর অভ্যাস হয়ে গেছে | অমন পটলচেরা চোখে তাকানোর ভঙ্গি, লাস্যময়ী হাসি হেসে হৃদয়ের গহীনে ঢুকে যাবার জাদুমন্ত্র যেন শুধু জানতো| আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতাম|

আমাদের ছাদটা সুন্দর। কিনার দিয়ে অনেক রকম গাছের চারা লাগানো| বেশিরভাগ আমার পছন্দে| ডালিয়া সেগুলোকে নিজের মনে করে প্রতিদিন যত্ন নিয়ে পানি দেয়| আমি কৃতজ্ঞ থাকি| বিয়ের পর ধীরে ধীরে জানতে পারে আমার নানারকম মাদকে’র প্রতি আসক্তি| বিয়ের এক বছর যেতে না যেতেই সারারাত বাহিরে কাটিয়ে ঘোরগ্রস্ত অবস্থায় ভোরে বাড়ি ফিরতাম| আমার আধো লাল চোখ দেখে ডালিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে| আমি খেয়ে বুঁদ হয়ে বাড়ি ফিরলে ডালিয়া খুব রাগ করতো| ওর শরীর আর শাড়ির প্রতিটা ভাঁজে লেগে থাকতো রাগ| আমি ওর সাথে কথা না বলে থাকতে পারিনা| কিছুক্ষণের মাঝেই ছটফট শুরু করতাম| আমি ওর ঠোঁটে তামাকগন্ধে চুমু খেয়ে বলতাম, আমাকে আর ভালো লাগে না, না? ডালিয়া কেমন নির্বিকার গলায় মোল্লার ফতোয়া জারি করে আমাকে ভৎসনা করতো| মাতালের সাথে তার নাকি কোন কথা থাকতে পারেনা|

ডালিয়া হয়তো গভীরভাবে এখন আমাকে ভালোবাসে না, কিন্তু এক বিছানায় তো ঘুমায়| বেখেয়ালে আমার বুকে চুমু খেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে| আমি নিরুপায় চোখে কিছুক্ষণ রাগী মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকি| খাবার টেবিলে গিয়ে দেখতাম,ভাত আর তরকারি যত্ন করে রাখা আছে| আমি জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢালতে গিয়ে নিজের শরীরের অনেকটা অংশ ভিজিয়ে ফেলতাম| রাতে ঘুমে আমার গা থেকে ঘামের গন্ধ বেরুত আর আমি কেমন অদ্ভুত শব্দ করে যেন নাক ডাকি| আকণ্ঠ মদ গিলা ও মাতলামির কারনে আমাদের সম্পর্কের পরিস্থিতির অবনতি হলো| ও অন্য ঘরে শুতে লাগলো নিজের মতো করে| এক ঘরে থেকেও আমাদের কথা বন্ধ থাকতো দিনের পর দিন|

ডালিয়া একদিন আমাকে ডিভোর্স দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়| কোট থেকে ডাকটিকিট লাগানো ”অতি গুরুত্বপূর্ণ” লেখা খাম আসে আমার নামে| ডিভোর্স এর কারণগুলোতে লিখলো আমি হিংস্রটাইপ একজন মানুষ| তাকে শারীরিকভাবে ভীষণ নির্যাতন করি, পরনারীতে আসক্ত| মদ খেয়ে মা বাবা তুলে গালিগালাজ করি| আরো অনেক চরিত্র খারাপ উপাধি দিয়ে সে আমার নামে সরকারি চিঠি পাঠায়| তবে ডালিয়া কখনোই আমাকে ছেড়ে যায়নি|

অ্যালকোহলের প্রভাব ধীরে ধীরে আমাকে আরো বুনো করতে থাকে| নানা হুমকি-যুক্তিতে না পেরে ঝগড়ায় জলাঞ্জলি দিয়ে শেষমেশ মিনমিনে গলায় বলত, শরীরের জন্য জিনিসটা ক্ষতিকারক| মেজাজ খারাপ হওয়ায় ওর গায়ে হাত তুলি| ওর গায়ে হাত তোলার ব্যাপারটা আমার নিজের ভেতরে বিচ্ছিরিভাবে প্রভাব বিস্তার করে। অনুশোচনায় অপরাধবোধে কয়েক রাত পরপর ঘুমাতে পারেনি|

আমি জানিনা সেদিন বিকেলে হঠাৎ কেন ডালিয়া আত্মহত্যা করলো| পুলিশ,ওর বাবা মা সবাই আমাকে দোষ দিলো| বললো খুনী| কবরটার উপর গজানো নরম সবুজ ঘাস শিশির পড়ে ভিজে আছে| ওর কবরের মাথার দিকটায় নরম ঘাসে হাত বুলিয়ে দেয় দীর্ঘসময়| ওর পেটে থাকা মেয়েটার নামও রেখেছিলাম| আমাদের তিনজনের কি আলাপ হতো,সেটা কেউ কান পেতেও শুনতে পেতোনা| সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত বাড়ছে| সেই সাথে নীরবতা| বড় অভিমান নিয়ে চলে গেছে মানুষটা| আকাশ ভরা চাঁদের আলো| আমি হঠাৎ করে উপলব্ধি করলাম, আমার সমস্ত পৃথিবীটা শুন্য হয়ে গেছে| আমি ডুবে গেছি অতল অপরাধবোধের সাগরে| কুৎসিত এই আমি অপরাধী চোখে তাকিয়ে থাকি| এই জীবনে যার গভীরতা থেকে আমার জেগে ওঠা হবেনা| আমি একজন দুখী মানুষ, নিঃস্ব হয়ে মাটি এবং নাড়ির খুব কাছাকাছি বসে আছি|

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।