ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নৌকাডুবি: প্রশাসন কি দায় এড়াতে পারে?

২৯ আগস্ট, ২০২১ : ৫:৫২ অপরাহ্ণ ৬৫৪

সীমান্ত খোকন: গত ২৭ আগষ্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মর্মান্তিক নৌকা ডুবির ঘটনায় যে ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে, এই ঘটনার জন্য দায়ী কে? জেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ ও নৌ পুলিশ কি এর দায় এড়াতে পারে? নৌ পরিবহন সংশ্লিষ্ট এই দপ্তরগুলো আনন্দবাজার থেকে বিজয়নগরের চম্পকনগর নৌ রোট নিয়ে কখনোই কাজ করতে দেখা যায়নি। ফলে এখান থেকে যে যার মতো করে নৌকা পরিচালনা করে, এবং এর ফলাফল কেমন হতে পারে ব্রাহ্মণবাড়িয়া তথা দেশবাসী দেখেছে।

নদী নিয়ে কাজ করা সামাজিক সংঘঠন “নোঙর” প্রায় এক বছর আগে “বাংলাদেশ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ “ ভৈরব অফিসে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের আনন্দ বাজার ঘাটে একটি পল্টুন নির্মানের দাবী জানিয়ে আসলেও এখনো পর্যন্ত তা নির্মান করা হয়নি। পল্টুনটি নির্মান করা হলে এখান থেকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা নৌ চলাচল পর্যবেক্ষণ করতে পারতেন। কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের এমপির সুপারিশযুক্ত একটি লিখিত আবেদনের পরও এখানে একটি পল্টুন নির্মান হতে সমস্যা কোথায় তা একটি বড় প্রশ্ন।

এদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসনের অধীনে “নদী রক্ষা কমিটি” নামে একটি কমিটি আছে। কিন্তু নামে মাত্র এই কমিটির এখনো পর্যন্ত কোন কার্যক্রম ব্রাহ্মণবাড়িয়াবাসী দেখেনি। কমিটির কাজ কি, কারা এই কমিটির সদস্য এই বিষয়ে সাধারণ মানুষ ওয়াকিবহাল নন। মোট কথা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার এই নৌ রুটটি বরাবরই অবহেলিত রয়ে গেছে। অথচ এই রুটে বর্ষাকালে নৌকা দিয়ে প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ যাতায়াত করে।

বর্ষাকালে হাওরে পানি বেড়ে যাওয়ায় বিজয়নগরের মানুষ নৌকা দিয়েই ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে যাতায়াত করে বেশি, বিশেষ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর বরাবর পূর্বাঞ্চলের মানুষের বর্ষাকালে শহরে আসার জন্য নৌকাই একমাত্র ভরসা। নিত্যপ্রয়াজনীয় জিনিষ কেনা-বেচা, চিকিৎসা, পড়াশোনাসহ নানা কাজে প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষের যাতায়ত এই নৌ পথে। অথচ এর নিরাপত্তার জন্য কখনোই কোন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে কোন প্রকার ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

বরং এই আনন্দ বাজার নৌকা ঘাটকে ব্যবহার করে কিছু লোক নিজেদের ফায়দা হাসিল করছে প্রতিনিয়ত। বিনিময়ে সামান্য সুবিধা টুকু দেওয়া হচ্ছেনা নৌকার মাঝিদের। ২৯ আগষ্ট সরেজমিনে আনন্দ বাজার নৌকা ঘাটে গেলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক নৌকার মাঝি ও একজন সংগঠক তেপান্তরকে জানান, আনন্দ বাজার মসজিদ কমিটি নৌকা ঘাট থেকে ইজারা বাবদ বাৎসরিক মোটা অংকের টাকা নেয়। কি কারনে নেয় তা মাঝিদের জানা নেই।

এবিষয়ে আনন্দ বাজার মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি তেপান্তরকে জানান, নৌকা ঘাট থেকে কোন টাকা নেওয়া হয়না। বরং এই বিষয়টি জানে আনন্দ বাজারের বাজার কমিটি।

এবিষয়ে আনন্দ বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোঃ জালাল উদ্দিন তেপান্তরকে বলেন, নৌকার সাথে আমাদের কোন সম্পর্কই নেই। বরং অনেক আগেই বাজারের মালামাল বহনকারী নৌকাগুলো থেকে টুল আদায় ফ্রি করে দেওয়া হয়েছে।

যদিও আদন্দ বাজার মসজিদের আরেকটি সূত্র বলছে, নৌকা ঘাট থেকে মূলত টাকা নেয় শহরের কান্দিপাড়া এলাকার কয়েকজন।

নদী নিয়ে কাজ করা সংঘঠন “নোঙর“র ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সভাপতি শামীম আহমেদ তেপান্তরকে বলেন, আনন্দবাজার নৌকা ঘাটে যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য কোন ব্যবস্থা নেই। যেমন, লাইফ জেকেট, ভয়া ও অতিরিক্ত যাত্রী ও পন্য বহন না করা। এসবের কিছুই এখানে নেই। এখানকার ঘাটটি সরকারি ভাবে এখনো কোন ইজারা দেওয়া হয়নি। আমরা জানতে পেরেছি এখানকার মসজিদ কমিটি ঘাট থেকে মোটা অংকের বাৎসরিক টাকা নেয়। ইজারা যেভাবেই হোক, যিনি টাকা নিবেন তার তো একটা দায়ীত্ব রয়েছে ঘাটের ব্যপারে। যেমন, কোন নৌকায় কতটুকু পন্য বা যাত্রী উঠবে ইত্যাদি। কিন্তু এখানে কোন শৃঙ্খলা নাই। আমরা বাংলাদেশ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছিলাম। আবেদনটি ছিলো, যাত্রীর নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করা, নদীর দূষণ-দখল মুক্ত করার জন্য অভিযান পরিচালনা করা। আমরা পানি উন্নয়ন বোর্ডেও লিখিত আবেদন করেছি দূষণ দখলের বিষয়টি দেখার জন্য। দুঃখ্যের বিষয় তারা গত ৩ বছর যাবৎ নদী দূষণ-দখল মুক্ত করার জন্য অভিযান পরিচালনা করবে করবে বলেও করছেনা।
তারপর এক বছর আগেই আমরা দ্বারস্ত হয়েছি বাংলাদেশ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের কাছে আনন্দ বাজার ঘাটের শৃঙ্খলা ফিরানোর জন্য। চেয়েছিলাম একটা পল্টুনের ব্যবস্থা করার জন্য। আশা করি দ্রুতই সেটা হবে। আরেকটা বিষয় হলো, তিতাসে কোন নৌ পুলিশের ব্যবস্থা নেই। আমরা বাংলাদেশ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের উপ-পরিচালকের কাছে সেটা চেয়েছি এবং তিনি আশ্বস্ত করেছেন একটি নৌ পুলিশের ইউনিট আনন্দ বাজারে দিবেন।
শামীম আহমেদ আরো বলেন, বাংলাদেশের নদীর আইনত অভিবাবক করা হয়েছে নদী রক্ষা কমিশনকে। নদী রক্ষা কমিশেনের জেলা প্রতিনিধি হিসেবে দায়ীত্বে আছেন জেলা প্রশাসক। জেলায় জেলা প্রশাসক নদী রক্ষা কমিটির আহবায়ক। তো সেই হিসেবে টোটাল দায়ীত্বটাই কিন্তু জেলা প্রশাসকের। কয়েকদিন আগে নবীনগরে যেই নৌ দূর্ঘটনাটি ঘটলো তখনই আমরা স্বারকলিপি দিয়েছি ও মানববন্ধন করেছি নৌ রুটে নিরাপত্তার ব্যপারে। কিন্তু দুঃখ্যজনক হলো যেই দিন স্বারকলিপি দিয়েছি তার পরদিনই এই লইস্কা বিলের দূর্ঘটনাটি ঘটলো। আমরা দেখি, যখনই একটি দূর্ঘটনা ঘটে তারপর ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কিন্তু কখনো সেই কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন দিতে দেখলামনা। আমরা চাই সেই তদন্ত কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন দ্রুত সজনসম্মুখে প্রকাশ করা হোক।

বাংলাদেশ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষের পরিবহন পরিদর্শক (ভৈরব) মোঃ জসিম উদ্দিন তেপান্তরকে বলেন, আনন্দ বাজার ঘাটে পল্টুন তো আমরা দিতেই চাই। আমাদের কাজ হলো মানুষকে সেবা দেওয়া। কিন্তু এখানে পল্টুন দেওয়ার মতো পরিস্থিতি পায়নি। কিন্তু পল্টুন দিতে গেলে কি পরিস্থিতি দরকার পরে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পরিস্থিতিটা হলো আমাদের চেয়ারম্যান বরাবর আবেদন করতে হবে। পরে চেয়ারম্যান স্যার আমাদের তদন্ত দিবে পল্টুনের প্রয়োজন আছে কিনা। প্রয়োজন থাকলে অবশ্যয় দেওয়া হবে। কিন্তু একটা পল্টুন দেওয়ার জন্য আবেদন করার পর ১ বছর সময় কি যথেষ্ট নয় এই কাজটি করার জন্য? উত্তরে জসিম বলেন, আবেদন করার পর কেউ যদি না যায় তাহলেতো হবেনা।
এখন এত বড় একটি দূর্ঘটনা ঘটার পর বাংলাদেশ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ কি সিদ্ধান্ত নিয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখন থেকে এই রুটে নৌ চলাচল পর্যবেক্ষণ করা হবে। আনন্দ বাজারেও পল্টুন দিতে হবে। যোগ করেন জসিম উদ্দিন।

এবিষয়ে জানতে রোববার বিকেলে তেপান্তরের পক্ষ থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক হায়াত উদ দৌলা খানের সাথে ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ না করে লাইন কেটে দেন।

পরবর্তীতে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ রুহুল আমিনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ রুহুল আমিনের হাতে দুই মিনিট সময় আছে কিনা প্রতিবেদক জানতে চাইলে সময় আছে বলে জানান তিনি। পরবর্তীতে নৌ চলাচলের নিরাপত্তার বিষয়ে জেলা প্রশাসনের কোন দায়ীত্ব আছে কিনা এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি ব্যস্ততার অজুহাতে আন্তরিকতার সাথে ফোন রেখে দেন।

আনন্দ বাজারের ব্যবসায়ী নাটাই গ্রামের বাসিন্দা হাজী শরীফ উদ্দিন বলেন, নৌ রুটের নিরাপত্তার বিষয়টি এখন সময়ের দাবী। অতীতে কখনোই আমরা এই নৌ রুটের নিরাপত্তা নিয়ে কাউকে কাজ করতে দেখিনি। দুই দিন আগের হৃদয় বিধারক ঘটনার পর এই বিষয়ে আর বসে থাকার কোন সুযোগ নেই। আমি জেলা প্রশাসন সহ সবার কাছে দাবী জানাই, নৌ রুট নিরাপদ রাখার জন্য যা করা দরকার তার সবই যেন করা হয়।

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।