Tepantor

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর বিচার হয়না, আপোষ মীমাংসা হয় -নৈরাজ্য পর্ব ৫

26 September, 2023 : 6:41 pm
সর্বশেষ শহরের জাহাঙ্গীর সানলাইফ হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় রোগী মৃত্যুর পর সেটিরও আপোষ মিমাংসার চেষ্টা চলছে। ফাইল ছবি।

মোস্তাফিজ চৌধুরী: ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় ভুল চিকিৎসায় গত দুই বছরে অন্তত ১৫ জনের মৃত্যুর অভিযোগ রয়েছে।বলা হচ্ছে চিকিৎসাকালীন সময়ে ভুল চিকিৎসা ও চিকিৎসায় অবহেলার কারনে এই মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। যা জাতীয় এবং স্থানীয় গণমাধ্যমে ফলাও ভাবে প্রকাশও হয়। কিন্তু বেশিরভাগ মৃত্যুর ঘটনা স্থানীয় প্রভাবশালীদের মাধ্যমে আপোষ মীমাংসা করা  হয়েছে। আবার কিছু ঘটনায় স্থানীয় থানায় এবং আদালতে মামলা হয় বটে, কিন্তু পরবর্তীতে সেগুলোও মিমাংসা হয়। শহরে দীর্ঘদিন যাবৎ এই অবস্থা চলতে থাকলেও একটিরও সঠিক কোন বিচার হয়নি।বিচার হয়েছে এমন কোন তথ্য অন্তত সাধারণ মানুষের জানা নেই।ফলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীর পরিবার পাচ্ছে না সঠিক বিচার কিংবা প্রতিকার। এসব মৃত্যু ভুল চিকিৎসার কারনে যদি না ঘটে থাকে তাহলে ডাক্তার বা হাসপাতাল মালিকপক্ষ ও মৃতের স্বজনদের মধ্যে আপোষ-মিমাংসার প্রয়োজন কেন হয় এই প্রশ্নটি রয়েই যায়।

পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, “ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় চিকিৎসায় অবহেলা, রোগীর মৃত্যু’ এমন সংবাদ গণমাধ্যমে প্রায়ই শিরোনাম হয়। চিকিৎসা সেবায় ডাক্তার ও হাসপাতাল কর্তৃক অবহেলার ঘটনা প্রকাশিত হয় এসব সংবাদে। আক্রান্ত অঙ্গের পরিবর্তে সুস্থ অঙ্গে অপারেশন, অপারেশনের পরে রোগীর দেহের ভিতর অপারেশনের যন্ত্রপাতি রেখে সেলাই করার মত বড় ধরনের অবহেলার ঘটনাও ঘটে। অপরদিকে রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে স্বজন বা নিকটাত্নীয়রা হাসপাতাল, ক্লিনিক বা চিকিৎসা কেন্দ্রে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরী করে হাসপাতাল ভাংচুর, চিকিৎসকের উপর হামলা চালায়।

এ ধরণের ঘটনা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ডাক্তার ও রোগীর মধ্যকার সম্পর্কে অবিশ্বাস, আস্থাহীনতা ও ভীতির সঞ্চার করছে। একদিকে যেমন রোগী বা রোগীর স্বজনরা চিকিৎসকদের উপর বিশ্বাস হারাচ্ছেন অপরদিকে এই অবস্থার ফলে চিকিৎসকগণ নিজের কর্মস্থলে নিজেকে নিরাপদ ভাবতে পারছেন না। ফলশ্রুতিতে স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক কার্যক্রম অনেকক্ষেত্রেই ব্যাহত হচ্ছে এবং দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। চিকিৎসকদের অবহেলা বা ভুলের কারণে রোগীর ক্ষতির বিষয়টিকে Medical Negligence হিসেবে অভিহিত করা হয়। চিকিৎসায় অবহেলায় ক্ষতিগ্রস্ত রোগীর  প্রতিকারের সুস্পষ্ট কোন বিধান না থাকায় স্থানীয় প্রভাবশালীদের মাধ্যমে আপোষ মীমাংসার প্রস্তাব আসলে সেদিকেই বেশি ঝুকে পড়ে ভুক্তভোগীর স্বজনরা।

সম্প্রতি শহরের পাইকপাড়ার জাহাঙ্গীর সানলাইফ ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতালে ডাঃ আইরিন হকের ভুল চিকিৎসা ও অবহেলার কারণে মুক্তাকি নামের এক প্রসূতি মায়ের মৃত্যুর অভিযোগ করে ভুক্তভোগীর স্বজনেরা। স্বজনদের অভিযোগ, সার্জারীর সময় রোগীর মূত্রনালী কেটে ফেলেন ডাঃ আইরিন হক। এবং এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আপোষ মীমাংসার চেষ্টাও চলমান রয়েছে।

গত ১৮ মার্চ শনিবার সকালে শহরের আল খলিল হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নাকের পলিপাসের অপারেশন করতে গিয়ে ভুল চিকিৎসায় ইশতিয়াক আহমেদ ইকরাম (২২) নামের এক কলেজ ছাত্রের মৃত্যুর অভিযোগ উঠলে থানা পুলিশ হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কসহ তিন জনকে আটক করে মামলা দায়ের করা হয়। তাদের আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতেও পাঠানো হয়। অবশেষে এঘটনায় ভুক্তভোগীর স্বজনদের সাথে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আপোষ মীমাংসা হয়ে যায়।

গত ৭ জুন বুধবার বিকেল ৫টার দিকে জেলা শহরের কুমারশীল মোড়ে নবজাতক শিশু ও জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ভুল চিকিৎসায় পারুল বেগম নামে এক গৃহবধূর মৃত্যুর অভিযোগ উঠে। এবং পরবর্তীতে উভয় পক্ষের মধ্যে আপোষ মীমাংসা হয়ে যায়।

জেলার আশুগঞ্জে নূর মেডিকেল সেন্টারে ভুল চিকিৎসায় আকলিমা আক্তার (১৯) নামে এক প্রসূতি মায়ের মৃত্যুর অভিযোগে স্বজনরা হাসপাতাল ঘেরাও করলে স্থানীয় মাতব্বরদের মধ্যস্থতায় ২ লাখ টাকায় বিষয়টি রফাদফা করা হয়।

কিংবা শহরের মুন্সেফপাড়াস্থ খ্রিস্টান মেমোরিয়াল হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় একজন শিক্ষিকার মৃত্যুর ঘটনায় তার পিতা আদালতে মামলা দায়ের করলে সংশ্লিষ্ট ডাক্তার জেল হাজতে যান। এবং ডাক্তারকে জেল হাজতে পাঠানোয় পেশাজীবি ডাক্তারদের বিভিন্ন সংগঠন চিকিৎসা সেবা বন্ধ করে দেয়াসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে চাপ সৃষ্টি করে। যার ফলে প্রতিকারে সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়নি।

কয়েকজন ভুক্তভোগীর স্বজনের সাথে কথা বললে তারা জানায়,থানায় সহজে চিকিৎসায় ভুল কিংবা অবহেলার মামলা দায়ের করা যায়না। প্রশাসনের সবাই অসহযোগিতা করে। তারপর স্থানীয় প্রভাবশালী এবং ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালীরা বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করে আপোষ মীমাংসার জন্য। ভুক্তভোগীদের মধ্যে যারা একটু প্রভাবশালী তারা প্রাথমিকভাবে কিছুটা ব্যবস্থা নিতে পারে, তবে শেষমেশ আপোষই করতে হয়। আর ডাক্তারদের যত সংগঠন আছে তারা সত্য মিথ্যা যাচাই না করে অন্ধভাবে অভিযুক্ত ডাক্তারের পক্ষে সরকার ও প্রশাসনকে চাপ দিতেই থাকে। মৃত্যুর পর মামলা হলে ময়নাতদন্তের রিপোর্টও ঠিকভাবে আসে না। স্বাভাবিকের চেয়ে সময় অনেক বেশি লাগে। সামাজিক ও প্রশাসনিক কোন ভাবেই সহযোগিতা পাওয়া যায় না। অবশেষে ৫০ হাজার টাকা থেকে ১/২ লাখ টাকায় আপোষ করা ছাড়া উপায় থাকে না।

জানা যায়, চিকিৎসায় অবহেলা কিংবা ভুলের প্রতিকার চেয়ে অভিযোগ করা যায় বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল বা বিএমডিসি’তে। বিএমডিসি একটি সরকারি সংস্থা। এখানে যারা কর্মরত রয়েছেন তারা প্রত্যেকেই চিকিৎসক।

সংস্থাটির সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে জানা যায় কিভাবে বিএমডিসিতে চিকিৎসকের বা স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ক প্রতিষ্ঠানের অবহেলার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করা যায়।

ভুক্তভোগী বা তার স্বজনের যে হাসপাতাল বা চিকিৎসক সম্পর্কে অভিযোগ, সেখানে যে সেবা নিয়েছেন তার সকল কাগজপত্র, চিকিৎসক, প্রতিষ্ঠানের নাম, চিকিৎসার তারিখ, সময় সহ সে কেন মনে করছে অবহেলা হয়েছে তার একটি ব্যাখ্যা সহ বিএমডিসির রেজিস্ট্রার বরাবর অভিযোগকারীর সই ও ঠিকানা সহ লিখিত অভিযোগ করতে হবে।

তারপর অভিযুক্ত ব্যক্তি বা চিকিৎসকের কাছে সেই অভিযোগের কপি পাঠানো হবে। তাকে কাউন্সিলের কাছে জবাব দিতে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেয়া হবে। অভিযুক্তের বক্তব্য পাওয়ার পর বিএমডিসি অভিযোগকারীকে সেটি জানাবে।অভিযোগকারী সেই বক্তব্যে আপত্তি থাকলে তিনি সেটি গ্রহণ না করার অধিকার রাখেন। অভিযোগকারী গ্রহণ না করলে অভিযোগ তখন একটি শৃঙ্খলা কমিটির কাছে যাবে । শৃঙ্খলা কমিটি যদি মনে করে এই ঘটনার তদন্ত করা প্রয়োজন তাহলে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তদন্ত কমিটি প্রয়োজনে হাসপাতালে যাবে এবং প্রতিবেদন জমা দেবে। তাদের প্রতিবেদন সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

তবে ভুক্তভোগীর স্বজন এবং সাধারণ জনগণের অনেকেই বিএমডিসি সম্পর্কে জানেন না।

বাস্তবতা হল এই সংস্থা সম্পর্কে জানেন না প্রায় কেউই। এমনকি হাসপাতালগুলো থেকে সেই বিষয়ে জানানোও হয় না।

তাই সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি প্রায়শই তার ক্ষোভ হাসপাতাল বা ক্লিনিকেই প্রকাশ করে ফেলেন। যার ফল হল প্রায়শই ভাঙচুর বা চিকিৎসককে মারধোর।

আর সবচেয়ে বড় সমস্যা হল বিএমডিসিতে কেউ অভিযোগ নিয়ে গেলে তাতে অনেক সময় লেগে যায় কিংবা পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে সাধারণের মধ্যে বিরক্তি, অসন্তুষ্ট ও অভিযোগ তৈরি হয়। অবশেষে বাধ্য হয়ে আপোষ মীমাংসার দিকে ঝুকতে হয় ভুক্তভোগী ও অভিযোগকারীদের।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অভিমত, বাংলাদেশে চিকিৎসায় অবহেলা ও প্রতিকারের ধারণা সাধারণ মানুষ, রোগী ও রোগীর নিকট-আত্মীয়দের নিকট স্পষ্ট নয়। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে পেশাদার চিকিৎসকদের এ ব্যাপারে যথেষ্ট ধারণা বা জ্ঞান না থাকায় বিভিন্ন ধরণের জটিলতা সৃষ্টি হয়। ফলে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগে প্রায়ই হাসপাতাল ভাংচুর ও ডাক্তারের উপর আক্রমণের ঘটনা ঘটে। এমনকি ডাক্তারের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়েরের মত ঘটনাও লক্ষ্য করা যায়। একদিকে যেমন চিকিৎসা অবহেলার ধারণা ও প্রতিকার সম্পর্কিত কোন সুস্পষ্ট আইনী বা প্রশাসনিক কাঠামো আমাদের দেশে গড়ে উঠেনি, অপরদিকে ডাক্তারদের সুরক্ষা সম্পর্কিত কোন আইনী বা প্রশাসনিক সুস্পষ্ট বিধান বা নীতিমালাও তৈরী হয়নি। রাষ্ট্রের উচিত প্রস্তাবিত চিকিৎসা সুরক্ষা আইনটি দ্রুত প্রণয়ন করা। অন্যথায় আপোষ মীমাংসার নামে কিছু স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি ফায়দা লুটতেই থাকবে।

Tepantor

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Array