
সীমান্ত খোকন:
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগারকে ঘিরে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। সময়ের সঙ্গে জেল সুপার পরিবর্তন হলেও, অনিয়ম বা দূর্নীতির কোনো পরিবর্তন হয়না, শুধু কৌশল পাল্টায়।
বর্তমান জেল সুপার মজিবুর রহমানের দায়িত্বকালেও কারাগারটিকে ঘিরে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিবেদকের নিজের পর্যবেক্ষণ এবং বন্দি ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, হাসপাতালের শয্যা বাণিজ্য, ক্যান্টিনে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে পণ্য বিক্রি, কারাগারে মাদক প্রবেশ এবং বন্দিদের ওপর নিয়মবহির্ভূত শারীরিক নির্যাতনের মতো ঘটনা ঘটছে।
এই প্রতিবেদনের জন্য প্রতিবেদক সরেজমিনে কারাগারের ভেতরের বিভিন্ন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং বন্দি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে এসব অভিযোগের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছেন।
কারাগারে নতুন কোনো আসামি বা বন্দি প্রবেশের পর প্রথমে তাদের একটি নির্দিষ্ট স্থানে নেওয়া হয়, যা কারাগারে “কেস টেবিল” বা বিচারালয় নামে পরিচিত। সেখানে বন্দিদের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম সম্পন্ন করার পাশাপাশি বর্তমান জেল সুপার মজিবুর রহমান তাদের উদ্দেশে বিভিন্ন নৈতিক ও ইতিবাচক দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন। তিনি অপরাধ থেকে বিরত থাকা, সংশোধিত জীবনযাপন এবং শৃঙ্খলা মেনে চলার বিষয়ে বন্দিদের উপদেশ দেন। কারাগারের অভ্যন্তরে কোনো বন্দির বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ উঠলেও এই “কেস টেবিলেই” তার বিচার বা শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
তবে কারাগারের ভেতরে বিদ্যমান বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের সঙ্গে জেল সুপারের এসব নীতিবাক্যের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন উঠে। একদিকে বন্দিদের নৈতিকতার পাঠ দেওয়া হলেও অন্যদিকে একই কারাগারে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে চলমান। আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, এসব অনিয়ম নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুললে বা অভিযোগ করার চেষ্টা করলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
প্রতিবেদকের অনুসন্ধানের সময় একাধিক বন্দি অভিযোগ করেছেন, অনিয়ম বা দুর্নীতির বিষয়ে কথা বলার কারণে অতীতে অনেককে “সেল”-এ রাখা হয়েছে। “সেল” হলো এমন একটি আবাসন ব্যবস্থা, যেখানে একজন বন্দিকে এককভাবে একটি কক্ষে রাখা হয় অথবা বিশেষ পরিস্থিতিতে অল্পসংখ্যক বন্দিকে একসঙ্গে সীমিত পরিসরে রাখা হয় এক কক্ষে। সাধারণ ওয়ার্ডে থাকা বন্দিদের তুলনায় সেলে থাকা ব্যক্তিদের চলাফেরা ও দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের সুযোগ অনেক বেশি সীমিত। এ কারণে অধিকাংশ বন্দির কাছেই সেল এক ধরনের ভীতিকর শাস্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
বন্দিদের ভাষ্য, অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বললে সেলে পাঠানো হতে পারে, এমন আশঙ্কায় অনেকেই মুখ খুলতে সাহস পান না। প্রতিবেদনের জন্য কথা বলা একাধিক বন্দি দাবি করেছেন, অতীতেও অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তোলার কারণে কয়েকজন বন্দিকে সেলে পাঠানো হয়েছিল।
কারাগারের অভ্যন্তরে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে অভিযুক্ত বন্দিদের “কেস টেবিল” বা বিচারালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী “টাওয়ার” নামে পরিচিত একটি পৃথক ওয়ার্ডে রাখা হয়। পদ্মা ভবনের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত এই ওয়ার্ডটি মূলত শাস্তিমূলক আবাসন হিসেবে ব্যবহৃত হয় বলে কারাগারের একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
প্রতিবেদক সরেজমিনে টাওয়ার ওয়ার্ডের প্রবেশমুখে অবস্থান করে সেখানে বন্দিদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন। এ সময় একাধিক বন্দিকে প্রকাশ্যে মাদক সেবন করতে দেখা যায়। অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, সাধারণ ওয়ার্ডে কোনো বন্দি মাদকসহ আটক হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে তাকেও টাওয়ার ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়।
তবে প্রশ্ন উঠেছে, যেখানে মাদক-সংক্রান্ত অপরাধে অভিযুক্ত বন্দিদের রাখা হয়, সেই ওয়ার্ডেই যদি প্রকাশ্যে মাদক সেবনের অভিযোগ থাকে, তাহলে কারাগারের মাদক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?
প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে মেঘনা-৮ ওয়ার্ডের সাবেক ইনচার্জ ও সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি বাচ্চু দাবি করেন, কারাগারের ভেতরে উচ্চমূল্যে মাদক কেনাবেচা হয় এবং টাওয়ার ওয়ার্ড বা পদ্মা ভবন থেকেই সেই মাদক সংগ্রহ করা সম্ভব। চলতি বছরের মে মাসের শেষ দিকে বা জুনের শুরুতে ইয়াবা সেবনের অভিযোগ ওঠার পর কারা কর্তৃপক্ষ বাচ্চুর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে তাকেও টাওয়ার ওয়ার্ডে স্থানান্তর করে।
বাচ্চুর অভিযোগ তদন্ত চলাকালে বাচ্চু কারা কর্মকর্তাদের কাছে ১৫টি ইয়াবা ট্যাবলেট জমা দেন । সে সময় তিনি দাবি করেন, সিরাজ নামে তার এক পরিচিত বন্দি কারাগারে প্রবেশের সময় ২০টি ইয়াবা নিয়ে আসেন। বাচ্চুর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ইয়াবার পাঁচটি তিনি, সিরাজ ও শাহ আলম নামে আরও কয়েকজন সেবন করেন।
পরবর্তীতে টাওয়ার ওয়ার্ডে থাকা অবস্থায় বাচ্চু এই প্রতিবেদককে জানান, কারারক্ষীদের সহযোগিতায় ওই ইয়াবা কারাগারের ভেতরে প্রবেশ করানো সম্ভব হয়েছিল। এ ঘটনায় তিনি তৎকালীন অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সুবেদার রতনের নাম উল্লেখ করেন। এ ছাড়া একাধিক বন্দি অভিযোগ করেছেন, সুবেদার রতনের মাধ্যমে অর্থের বিনিময়ে কিছু বন্দিকে কারাগারের ভেতরে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হতো।
বর্তমানে জেল সুপার মজিবুর রহমানের দায়িত্বকালে দেখা গেছে কারাগারে আগের মতো মাদকের ছড়াছড়ি নেই, সাধারণ ওয়ার্ডে মাদক সেবনে ধরা পরলে ব্যক্তিকে শাস্তি হিসেবে প্রাথমিক ভাবে টাওয়ারে রাখা হয়। তবু মাদক কান্ডে মাঝে মধ্যেই ধরা পরেন বন্দিরা। জেলখানায় এখন মাদক সংশ্লিষ্ট ব্যাপারে অভিযুক্ত বন্দিগণকে একই জায়গায় কেন্দ্রীভূত করে রাখা হয়। ফলে মাদক এখন শুধু টাওয়ার ভিত্তিক, এখানে নির্ভয়ে মাদক সেবন করা যায়, কয়েদি ইনচার্জ বাচ্চুর কথা অনুযায়ী টাওয়ার বা পদ্মা বিল্ডিংয়ে মাদক কিনতেও পাওয়া যায়। এভাবেই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগারকে মাদকমুক্ত বা মাদক নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।
বন্দিদের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও অতিরিক্ত খাবারের চাহিদা পূরণের জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগারে একটি ক্যান্টিন চালু রয়েছে। তবে এই ক্যান্টিনকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। একাধিক বন্দির অভিযোগ, বাজারদরের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি দামে খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি করা হয়। বিশেষ করে যেসব বন্দি কারাগারের নিয়মিত খাবার খেতে পারেন না, তাদের অনেকটাই বাধ্য হয়ে ক্যান্টিনের ওপর নির্ভর করতে হয়।
প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ক্যান্টিনে বিক্রি হওয়া খাবারের মান নিয়েও বন্দিদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ রয়েছে। বন্দিদের দাবি, মাত্র তিন টুকরো ছোট আকারের গরুর মাংস দিয়ে রান্না করা একটি তরকারির দাম নেওয়া হয় ২০০ টাকা। এছাড়া ক্যান্টিনের প্রবেশপথে টাঙানো মূল্যতালিকার সঙ্গে বাস্তবে আদায় করা মূল্যের মিল পাওয়া যায়নি বলেও অভিযোগ করেছেন একাধিক বন্দি। তাঁদের দাবি, তালিকায় উল্লেখিত মূল্যের চেয়ে বেশি অর্থ আদায় করা হয়।
তবে সম্প্রতি কারাগারে বন্দি থাকা একজন সাংবাদিক ক্যান্টিনসহ কারাগারের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলার পর কিছু ক্ষেত্রে পরিস্থিতির পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর কারা কর্তৃপক্ষ তড়িঘড়ি করে কিছু অনিয়ম দূর করার উদ্যোগ নেয়। একই সঙ্গে ওই সাংবাদিককে পরবর্তীতে অন্য একটি অভিযোগে সেলে স্থানান্তর করা হয়। তবে ওই সাংবাদিক মনে করেন, অনিয়ম নিয়ে কথা বলার প্রতিক্রিয়া হিসেবে কারা কর্তৃপক্ষ তাকে সেল এ রেখেছেন।
প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলা কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক বন্দি অভিযোগ করেন, কারাগারে সাংবাদিক পরিচয়ধারী বন্দিদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়। তাঁদের দাবি, সাংবাদিক পরিচয় জানাজানি হওয়ার পর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাঁদের প্রথমেই সেলে রাখা হয়। এছাড়া নতুন বন্দিদের উদ্দেশে “কেস টেবিল”-এ দেওয়া বক্তব্যে জেল সুপার সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদদের সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করেন ।সাংবাদিক পরিচয়ধারী বন্দিদের সঙ্গে আচরণ এবং এ-সংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধানের আরও বিস্তারিত তথ্য ধারাবাহিক এই প্রতিবেদনের পরবর্তী পর্বে তুলে ধরা হবে।
অসুস্থ বন্দিদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগারে একটি হাসপাতাল রয়েছে। তবে এই হাসপাতালকে ঘিরেও অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলা একাধিক বর্তমান ও সাবেক বন্দির দাবি, অর্থের বিনিময়ে সুস্থ বন্দিদের মাসের পর মাস হাসপাতালের শয্যায় থাকার সুযোগ করে দেওয়া হয়। অন্যদিকে প্রকৃতপক্ষে অসুস্থ অনেক বন্দি হাসপাতালের শয্যা না পেয়ে ওয়ার্ড কিংবা সেলেই চিকিৎসাহীন অবস্থায় দিন কাটাতে বাধ্য হন।
সরেজমিনে অনুসন্ধানের সময় হাসপাতালের বারান্দায় অসুস্থ কয়েকজন বন্দিকে শুয়ে ও বসে কষ্ট করতে দেখা যায়। তাঁদের কয়েকজন জানান, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার মতো শারীরিক অবস্থা থাকলেও শয্যা খালি না থাকায় তারা ভর্তি হতে পারেননি।
প্রতি মাসে প্রায় ১৫ হাজার টাকার বিনিময়ে সুস্থ কিছু বন্দিকে হাসপাতালের শয্যায় থাকার সুযোগ দেওয়া হয়। প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলা এমন কয়েকজন বন্দি, যারা অতীতে হাসপাতালের শয্যায় ছিলেন, এ ধরনের লেনদেনের অভিযোগের কথা নিশ্চিত করেছেন। হাসপাতালের শয্যায় থাকলে আরামে থাকা যায়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কারাগারের সুবেদার রতন বলেন, “হাসপাতালে কে থাকবেন আর কে থাকবেন না, সেই সিদ্ধান্ত হাসপাতালের চিকিৎসকই নেন।”
বন্দিদের সঙ্গে স্বজনদের সাক্ষাৎ নিয়েও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগারে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। একাধিক বন্দি ও তাঁদের স্বজনদের দাবি, আগে সাধারণভাবে সপ্তাহে একবার সাক্ষাতের সুযোগ থাকলেও বর্তমান জেল সুপার মজিবুর রহমানের দায়িত্বকালে তা কমিয়ে ১৫ দিনে একবার করা হয়েছে। তবে এ পরিবর্তনের পেছনে কোনো আইন, জেল কোড বা কারা অধিদপ্তরের লিখিত নির্দেশনা রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ উঠে এসেছে, সাক্ষাতের সুযোগ সীমিত হওয়ায় এক ধরনের অনিয়মের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। একাধিক বন্দির স্বজনের ভাষ্য, নির্ধারিত সময়ের বাইরে সাক্ষাৎ করতে গেলে অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের “ডিউ নেই” বা সাক্ষাতের সুযোগ পাওনা নেই এই কারণ দেখিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু অর্থের বিনিময়ে একই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটিয়ে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলা একাধিক বন্দি ও তাঁদের স্বজনরা দাবি করেছেন, নির্ধারিত নিয়মের বাইরে অর্থের বিনিময়ে সাক্ষাতের সুযোগ করে দিতে কারাগারের কিছু কারারক্ষী ভূমিকা রাখেন। সাক্ষাতের নিয়ম পরিবর্তনের আইনগত ভিত্তি এবং অর্থের বিনিময়ে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে জেল সুপারের বক্তব্যও জানতে চাওয়া হয়েছে।
কারাগারের সেলুনেও অনিয়ম চলে। তাঁদের দাবি, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী বন্দিদের বিনামূল্যে চুল কাটা ও দাড়ি-গোঁফ ছাঁটার সুবিধা পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক এ সেবা পেতে অর্থ দিতে হয়। অর্থ না দিলে সেবা পাওয়া যায় না বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন বন্দি।
কারাগারের সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। বন্দিদের ভাষ্য, জেলা প্রশাসক বা ঊর্ধ্বতন কোনো কর্মকর্তা পরিদর্শনে এলে সাময়িকভাবে বিভিন্ন অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা বন্ধ রাখা হয় এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করা হয়। তবে পরিদর্শন শেষ হওয়ার পর আগের অবস্থায় ফিরে যায় সবকিছু। একাধিক বন্দির ভাষায়, “পরিদর্শন শেষ, আবার আগের নিয়মেই সব চলতে থাকে।”
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগারে বন্দিদের ওপর নিয়মবহির্ভূত শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগও উঠে এসেছে প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে। একাধিক বর্তমান ও সাবেক বন্দির দাবি, সামান্য শৃঙ্খলাভঙ্গ কিংবা তুচ্ছ ঘটনাকেও কেন্দ্র করে অনেক সময় বন্দিদের প্রহার করা হয়।
একাধিক বন্দির অভিযোগ, কারাগারের “কেস টেবিল” সংলগ্ন একটি বকুল গাছে স্থাপিত লোহার রিংয়ে বন্দিদের হাত বেঁধে কারারক্ষীরা লাঠি দিয়ে প্রহার করেন। আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অধিক শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে বন্দিদের সেলে নিয়ে বস্তার ভেতরে ঢুকিয়ে মারধর করা হয়, যাতে শরীরে আঘাতের চিহ্ন সহজে দৃশ্যমান না থাকে। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ এই প্রতিবেদকের পক্ষে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ পাওয়া গেছে, তৎকালীন অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সুবেদার রতন বিভিন্ন সময় সামান্য ঘটনাকেও কেন্দ্র করে বন্দিদের লাঠিপেটা করতেন। একাধিক বন্দির ভাষ্য অনুযায়ী, মেঘনা-৮ ওয়ার্ডে এক বন্দিকে কথাকাটাকাটির ঘটনায় তিনি প্রকাশ্যে লাঠি দিয়ে প্রহার করেন। পরে ওই বন্দিকে আবার “কেস টেবিল”-এ হাজির করে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে আনুষ্ঠানিক শাস্তিও দেওয়া হয়। অর্থাৎ, একই ঘটনার জন্য তিনি প্রথমে প্রহারের শিকার হন এবং পরদিন প্রশাসনিক শাস্তিরও মুখোমুখি হন বলে অভিযোগ রয়েছে। সুবেদার রতন প্রায়ই এভাবে বন্দিদের পিটান।
আইনজ্ঞদের মতে, বর্তমান বাংলাদেশের আইনি কাঠামোতে কারা কর্তৃপক্ষের ইচ্ছামতো কোনো বন্দিকে শারীরিকভাবে প্রহার করার সুযোগ নেই। যদিও Prisons Act, ১৮৯৪-এর ৪৬ ধারায় কারাগারের শৃঙ্খলাভঙ্গের জন্য তৎকালীন আইনি কাঠামোয় “whipping” (বেত্রাঘাত)-এর বিধান ছিল এবং ৫৩ ধারায় সেই শাস্তি কার্যকরের পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এ ধরনের শাস্তিও আইনে নির্ধারিত প্রক্রিয়ার বাইরে কার্যকর করার সুযোগ ছিল না।
এ ছাড়া বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদে নিষ্ঠুর, অমানবিক ও অবমাননাকর দণ্ড বা আচরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন, ২০১৩-এর আলোকে হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগও আইনগতভাবে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে বন্দিদের ওপর নিয়মবহির্ভূত শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু কারা বিধির প্রশ্ন নয়, বরং মানবাধিকার ও প্রচলিত আইনের বিষয়ও হয়ে দাঁড়ায়।
সেল-১৫-এর ৩ নম্বর ওয়ার্ডে সংক্রামক রোগে আক্রান্ত বন্দিদের রাখা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলা একাধিক বন্দির দাবি, ওই ওয়ার্ডে হাম ও যক্ষ্মা (টিবি) আক্রান্ত কয়েকজন বন্দিকে রাখা হয়েছিল, যেখানে সাংবাদিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ের বন্দিরাও অবস্থান করছিলেন। সংক্রামক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের একই ওয়ার্ডে রাখার কারণে অন্য বন্দিদের মধ্যে সংক্রমণের আশঙ্কা ও আতঙ্ক সৃষ্টি হয় বলে তারা জানান।
বন্দিদের ভাষ্য, এ বিষয়ে তাঁরা একাধিকবার দায়িত্বরত কারারক্ষী পলাশ’সহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবহিত করলেও আক্রান্ত বন্দিদের অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়নি। তাঁদের অভিযোগ, সংক্রামক রোগে আক্রান্ত এসব বন্দিকে কারা হাসপাতালের পরিবর্তে সাধারণ সেলে রাখায় অন্য বন্দিদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যায়।
ওই ওয়ার্ডে অবস্থানকারী কয়েকজন বন্দির অভিযোগ, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ের বন্দিদের সঙ্গে একই ওয়ার্ডে সংক্রামক রোগী রাখার সিদ্ধান্ত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল।
কারা হাসপাতালের পরিবর্তে সংক্রামক রোগে আক্রান্ত বন্দিদের সাধারণ সেলে রাখার কারণ এবং এ-সংক্রান্ত চিকিৎসা প্রটোকল কী ?
এখানে গত ১৫ মে থেকে ১৭ জুন পর্যন্ত ঘটে যাওয়া কারাগারের অভ্যন্তরীন নানা অসঙ্গতির কথা তুলে ধরা হয়েছে। তখন কারাগারের জেলার ছিলেন মঞ্জুরুল ইসলাম। তবে কারাগারের এই পরিস্থিতি নতুন নয়, এবং এর কোনো পরিবর্তন হয়না।
উল্ল্যেখিত বিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগারের জেল সুপার মোহাম্মদ মজিবুর রহমান ও সুবেদার রতন এর বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়েছে। কিন্তু জানতে চাওয়ার ১৩ দিন পরও তারা কোনো বক্তব্য জানান নি।
চলবে…
তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
ArrayCopyright © 2026 তেপান্তর | Design & Developed By: ZamZam Graphics