Tepantor

ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে একাধিক কিশোর গ্যাং (পর্ব -১)

30 January, 2023 : 2:32 pm
ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের হালদার পাড়া এলাকার কাদির ডাক্তারের হাসপাতালের সামনে কিশোর গ্যায়ের মহড়া। (ফাইল ছবি)

তেপান্তর রিপোর্ট: ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরে হঠাৎ করে বেড়েছে কিশোর গ্যাং-এর উৎপাত। বর্তমানে শহর জুড়ে প্রায় এক ডজন কিশোর গ্যাং সক্রিয় আছে।প্রভাবশালী কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক ছাত্রনেতা মূলত এই গ্যাং-গুলো নিয়ন্ত্রণ করে। প্রত্যেক গ্যাং-এর সদস্যরা নিজেদেরকে কোন না কোন কথিত বড়ভাইয়ের (সাবেক কিংবা বর্তমান ছাত্রনেতা) অনুসারী বলে পরিচয় দেয়।এই বড় ভাইয়েরা মূলত গ্যাং-এর সদস্যদের বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের শেল্টারদাতার ভূমিকা পালন করে। গ্যাং-এর কোন সদস্য পুলিশের হাতে আটক হলে তাকে থানা থেকে ছাড়িয়ে আনা,আভ্যন্তরীণ বিরোধ মীমাংসা, সিনিয়র -জুনিয়র দ্বন্দ্ব নিরসনসহ গ্যাং-এর সকল বিষয়ে এইসব কথিত বড় ভাই মুখ্য ভূমিকা পালন করে।

প্রভাবশালী এইসব ছাত্রনেতাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আশ্রয় প্রশ্রয়ে উৎসাহিত হয়ে কিশোর অপরাধীরা প্রতিদিন পৌর এলাকার কোথাও না কোথাও ছোট বড় বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে নিজেদেরকে যুক্ত করছে।যার দরুন পৌর এলাকায় চাঁদাবাজি, চুরি-ছিনতাই,মাদকদ্রব্য ক্রয়-বিক্রয় আশংকাজনক হারে বেড়েছে। তাছাড়াও এলাকায় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব কিংবা প্রেমে বিরোধের জেরে খুনোখুনি,দেশি-বিদেশি অস্ত্রের মজুদকরণ শহরে এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। গ্যাং এর কোন একজন সদস্যের সাথে রাস্তাঘাটে কারও কোন ঝামেলা হলে আধা ঘণ্টার মধ্যেই বাকী সদস্যরা তার পক্ষে ঝগড়া করতে ছুটে আসে। তারা সাধারণত “হিট এন্ড রান” পদ্ধতিতে কারও উপর হামলা করে এরপর মুহূর্তের মধ্যেই ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। ঝামেলা যদি  বড় হবার সম্ভাবনা দেখা দেয় কিংবা আইনি প্রক্রিয়ার দিকে চলে যায় তখন তারা তাদের কথিত বড়ভাইয়ের শরণাপন্ন হয়। বড়ো ভাই দ্রুত সময়ে ঝামেলা (তাদের ভাষায় ‘দরবার’) মিটমাটের মাধ্যমে গ্যাং-এর অপরাধ ধামাচাপা দেয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করে।গ্যাং-এর অধিকাংশ কিশোর মাদকাসক্ত হওয়ায় ছোট খাটো ব্যাপারেও কাউকে গ্রিভিয়াস জখম করতে দ্বিধাবোধ করে না।আগে সাধারণত নিম্নবিত্ত পরিবারের অশিক্ষিত কিশোররা এইসব গ্যাং-এর সদস্য হতো। কিন্তু বর্তমানে অনেক অভিজাত পরিবারের কিশোর এবং স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা এইসব গ্যাং-এর সদস্য হচ্ছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের হালদার পাড়া এলাকার কাদির ডাক্তারের হাসপাতালের সামনে কিশোর গ্যায়ের মহড়া। (ফাইল ছবি)

এভাবে দলবেঁধে ক্ষমতার বড়াই করতে পারাকে তারা প্যাশন ও নায়কোচিত ব্যাপার মনে করে। এইসব কিশোর গ্যাং সদস্যরা সাধারণত হালদারপাড়ার সূর্যমুখী কিন্ডার গার্টেনের সামনের রাস্তা, কাজীপাড়ার সাবেরা সোবহান বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের সামনের রাস্তা, হালদারপাড়া গভ. মডেল গালর্স উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনের রাস্তা, মৌড়াইল অবকাশ এলাকার ফারুকী পার্কের সামনে, সরকারি মহিলা কলেজের হোস্টেলের সামনে, পাইকপাড়া আনন্দময়ী বালিকা বিদ্যালয়ের সামনের রাস্তা, লোকনাথ উদ্যান (টেংকেরপাড়), মেড্ডা শ্মশানঘাট,  পাওয়ার হাউজ রোড,  ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর আধুনিক সুপার মার্কেটের সামনে বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করে স্কুলের ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করার পাশাপাশি বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করে বেরায়।

বিশেষ করে ফারুকী পার্ক (অবকাশ), ও লোকনাথ উদ্যানে (টেংকেরপাড়) কিশোর গ্যাংয়ের পদচারণা থাকে বেশি।বিশেষ কোন ঘটনা ঘটলে কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিশোর গ্যাং এর ব্যাপারে ব্যাপক আলোচনা হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন সময় শহরের বিভিন্ন এলাকায় লোকদেখানো অভিযান পরিচালনা করে।সুশীল সমাজের অব্যাহত চাপে গত ৮ই জুন ২০২২ -সদর থানার পুলিশের অভিযানে শুধুমাত্র ট্যাংকের পাড় এলাকা থেকে  ১৯ জন কিশোর অপরাধীকে আটক করা হয়।তারপর থেকে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে শহরে উল্লেখযোগ্য আর কোন অভিযান পরিচালনা হয়নি।বিগত কয়েক মাসে শহরের কিশোর গ্যাংগুলোকে অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি সক্রিয় দেখা গেছে। এতে করে সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যপক অবনতি হয়েছে।

অপরদিকে কিশোর অপরাধীদের জুলুম অত্যাচারের শিকার হয়ে কেউ তাদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা নিতে গড়িমসি করে বলেও অভিযোগ রয়েছে।নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ভুক্তভোগী  জানান, কিছু দিন আগে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে শহরের ট্যাংকের পাড় মাঠে একদল যুবক তাকে মারধোর করে। প্রাথমিকভাবে প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে পাচ জনের নাম পরিচয় নিশ্চিত হয়ে থানায় অভিযোগ দিতে গেলে অভিযুক্ত কিশোররা শহর ছাত্রলীগের স্থগিত কমিটির এক নেতার অনুসারী হওয়ায় পুলিশ মামলা নথিবদ্ধ করার পরিবর্তে তাকে আপোষ মীমাংসার জন্য চাপ দিতে থাকে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের হালদার পাড়া এলাকার কাদির ডাক্তারের হাসপাতালের সামনে কিশোর গ্যায়ের মহড়া। (ফাইল ছবি)

বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক পরিচয়ধারী কিশোর অপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা না নিয়ে ভুক্তভোগীকে উল্টো মীমাংসার জন্য চাপাচাপি করাকে অনেকেই সদর থানা পুলিশের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল বলে মনে করেন। যার ফলে অনেকের মনে কিশোর অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনিপদক্ষেপ নিতে অনীহা কাজ করে। এই সুযোগে রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে কিশোর অপরাধীরা এখন প্রায় লাগামহীন হয়ে যাচ্ছে। কিশোর গ্যাং -এর প্রত্যেক সদস্যের কাছে একটি করে স্লুইস ছুরি(তাদের ভাষায় ‘ব্যানার’) থাকা খুবই সাধারণ ব্যাপার। এসব ছুরি এতই ধারালো যে মানুষের শরীরে জায়গামতো এক পোছ লাগলে আক্রান্ত ব্যক্তির তাৎক্ষণিক মৃত্যু হতে পারে।

গত ০৯ জানুয়ারি বিকেলে জেলা শহরের দক্ষিণ মৌড়াইল পাবলিক লাইব্রেরির সামনে সামান্য তর্ক বিতর্কের জেরে রায়হান (২২) নামে এক কিশোরের ছুরিকাঘাতে আশিকুল ইসলাম আশিক (২৭) নামে এক সাংবাদিক ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন। ঘাতক রায়হান জেলা ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির একজন সহ-সভাপতির অনুসারী হিসেবে সুপরিচিত।

 

গত ১২ জানুয়ারি সকালে শহরের মেড্ডা এলাকায় সামিয়া (১৫) নামে এক কিশোরীর ঘরে ঢুকে তার গলা, দুই হাত ও দুই পায়ের রগ কেটে দেয় অজ্ঞাত কয়েকজন কিশোর। কিছু দিন আগে জেল রোডস্থ বি-বাড়িয়া মার্কেটের এক ব্যবসায়ী তার নিজস্ব ফেসবুক আইডিতে জেলা ছাত্রলীগকে নিয়ে বিতর্কিত একটি স্ট্যাটাস পোস্ট করায় জেলা ছাত্রলীগের শীর্ষ পদের এক নেতার অনুসারী কিছু যুবক তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এসে তাকে লাঞ্চিত করে এবং উঠিয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা করে।এসময় মার্কেটের অন্যান্য ব্যবসায়ীরা এগিয়ে এসে তাকে রক্ষা করে। পরবর্তীতে তার দোকানের সিসিটিভি ফুটেজ দেখে হামলাকারীদের সনাক্ত করতে পারলেও পুলিশ তাকে জেলা ছাত্রলীগের ঐ নেতার সঙ্গে আপোষ মীমাংসা করতে এক প্রকার বাধ্য করে বলে তিনি জানান। বর্তমানে বিভিন্ন কিশোর গ্যাং-এর ভয়ে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে শহরের সাধারণ মানুষ।

বিভিন্ন কিশোর গ্যাং -এর নিয়ন্ত্রকদের (কথিত বড়ভাই) পরিচয়, তাদের নিয়ন্ত্রাধীন এলাকা,সাম্প্রতিক সময়ে চাঞ্চল্যকর কিছু কিশোর অপরাধের বিস্তারিত তথ্য, কিশোর গ্যাং এর ব্যাপারে সুশীল সমাজ ও সাধারণ মানুষের ভাবনা এবং কিশোর গ্যাংগুলোর লাগাম টেনে ধরতে পুলিশ প্রশাসনের পরিকল্পনা নিয়ে জেলা পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তার বক্তব্যসহ বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হবে আগামী পর্বে।

 

Tepantor

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Array