মোস্তাফিজ চৌধুরী: গত ১০’ই জুন শনিবার শহরের কুমারশীল মোড়ের আলিফ জেনারেল হাসপাতালে সদর উপজেলার থলিয়ারা গ্রামের প্রবাসী নাছির সওদাগরের ১৬ মাসের সন্তান আরাফ কে পায়ের ফোড়ার চিকিৎসার জন্য নিয়ে গেলে হাসপাতালের স্টাফ কর্তৃক এনেস্থিসিয়া দিয়ে ভুল চিকিৎসায় হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে শিশুটির স্বজনেরা। এঘটনায় ডাক্তার এস এম মামুন মোহরসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছে মামলা। লোকাল এনেস্থিসিয়া কিংবা জেনারেল এনেস্থিসিয়া ব্যবহারের জন্য মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থেকে নিতে হয় লাইসেন্স। অথচ আলিফ জেনারেল হাসপাতালের এনেস্থিসিয়া তথা ডেঞ্জারাস ড্রাগস (ডিডি) ব্যবহারের অনুমতিই ছিল না। এরকম ড্রাগস ব্যবহার করতে চাইলে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কাছ থেকে অনুমতি তথা লাইসেন্স নিতে হয়। কারণ সারাদেশে এসব ডেঞ্জারাস ড্রাগস দিয়ে মানুষকে নিখুঁতভাবে হত্যা করার ঘটনা ঘটছে। আবার অনেকে নেশা করার জন্য অবৈধ ভাবে এসব সংগ্রহ করে মাদকের নেশা নিচ্ছে। আবার অনেকে অতিরিক্ত মুনাফার লোভে মাদকসেবিদের কাছে বেশি দামে বিক্রিও করছে।
আলিফ জেনারেল হাসপাতালের এনেস্থিসিয়া তথা ডেঞ্জারাস ড্রাগস ব্যবহারের অনুমতি বা লাইসেন্স আছে কিনা জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সহকারী পরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, আলিফ হসপিটালের এই লাইসেন্স নেই। লাইসেন্স ছাড়া এগুলোর ব্যবহার বেআইনি।
জানা যায়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অভিযানে আলিফ জেনারেল হাসপাতালকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের লাইসেন্স, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইসেন্স না থাকায় সিলগালা করে দেয়া হয়। দীর্ঘ প্রায় তিন মাস সকল কার্যক্রম বন্ধ থাকার পর হাসপাতালের কার্যক্রম পুনরায় চালু হয়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের লাইসেন্স ছাড়া, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বিশেষ সুবিধা প্রদান করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইসেন্স ইস্যু করে হাসপাতাল পুনরায় চালু করে। বেসরকারি হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, এবং ক্লিনিক প্রতিষ্ঠায় ১৯৮২ সালের অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী যে শর্তসমূহ পূরণ করার কথা তার ৫০ শতাংশও পূরণ করা হয়নি। তারপরও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আলিফ হাসপাতালকে লাইসেন্স ইস্যু করে।
জেলার সিভিল সার্জন ডাঃ মোহাম্মদ একরাম উল্লাহ বলেন, আলিফ হাসপাতালে তদন্ত দেয়া হয়েছে, সবকিছু রিভিউ হবে।
আলিফ জেনারেল হাসপাতালে মৃত্যু বরণ করা ১৬ মাসের শিশু আরাফ এর পিতা প্রবাসী নাছির সওদাগর বলেন, আমি যখন শুনেছি তারা আমার ছেলেকে মেরে ফেলছে, আমি সাথে সাথে বাংলাদেশে আসার বিমানের ইমার্জেন্সি টিকিট কাটি এবং পরেরদিন রবিবার দেশে আসি। আমার ভাই বাদী হয়ে ডাক্তার ও হাসপাতালের মালিকদের নামে মামলা করেছে। আমি তাদের বিচার চাই, কোন মা বাবার সন্তান যেন এরকম ভাবে চিকিৎসার নামে তাদের হাতে মারা না যায়।
তিনি আরও বলেন, আলিফ হাসপাতালের এরা বিভিন্ন ভাবে শেষ করার জন্য খবর দিচ্ছে, টাকা পয়সা দিতে চাচ্ছে। আমি তাদের বলব তাদের আমি আমার সব বিক্রি করে এক কোটি টাকা দিব,তারা আমার ছেলেকে ফেরত দিক।
ডাক্তার মামুন সাহেব আপনাদের কাছে ভালো সাজছে, উনি আর আলিফ হাসপাতালে বসবেন না। আপনারা খোঁজ নিয়ে দেখেন উনি ঠিকই আলিফ হাসপাতালে আবার বসতেছে। আমি খোঁজ নিয়ে দেখছি দালাল এরশাদ সদর হাসপাতালে ডাঃ মামুন সাহেবের এসিস্ট্যান্ট এর চাকরি করে, সে নিজের, ডাক্তারের, এবং হাসপাতালের বেশি লাভের জন্য আমার বাচ্চাটাকে ফুসলিয়ে হাসপাতালে নিয়ে ভুল চিকিৎসায় মেরে ফেলছে। আমি জানতে পারছি,ছোট খাট এরকম কাটা ছেড়া ওটির এরা ডাক্তারকে ছাড়া নিজেরাই করে ফেলে। তাই আলিফ হাসপাতালের মালিকরা তাদের ওটি ইনচার্জ পলাশকে ইন্ডিয়া পাঠাই দিছে যাতে সত্যটা প্রকাশ না পায় বলে জানান আরাফের পিতা।
ওটি ইনচার্জ পলাশের নাম কেন মামলায় দেয়া হয়নি জানতে চাইলে তিনি বলেন, তখনো আমরা পলাশ সম্পর্কে জানতাম না, আপনাদের নিউজের পর জানতে পেরেছি,আমরা তার নাম মামলায় ঢুকানোর জন্য আবেদন করবো।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আলিফ জেনারেল হাসপাতালের একজন বলেন, আজকে (২০’ই জুন) ডাঃ মামুন স্যার হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে একটা সার্জারি করেছেন। আর পলাশ ভারতে গেছে কিনা সে ব্যাপারে কিছু জানিনা,তবে যাদের নামে মামলা হয়েছে সবাই হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে এসেছে।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধিনে লেবার ইন্সপেকশন ম্যানেজমেন্ট অ্যাপ্লিকেশন- লিমা’র লাইসেন্স না থাকায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পলাশকে এঘটনার জন্য দায়ী করে সহজেই তারা মামলা থেকে মুক্তি নিয়ে নিতে পারে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, অবশেষে দেখবেন এটাই হবে। এগুলোতে অন্তর্ভুক্ত থাকলেও সহজে কেউ কর্মচারীদের সুযোগ সুবিধা বা অধিকারগুলো দেখেনা আর আলিফের তো এটা নাই’ই।
আলিফ জেনারেল হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রানা বলেন, পলাশ কোথায় আছে আমরাও জানি না,তাকে খোঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। হাইকোর্ট থেকে জামিনে আছেন বলে জানান তিনি।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের লাইসেন্স এবং পরিবেশ অধিদপ্তর এর ছাড়পত্রের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি ভৈরবে আছি,এসে আপনার সাথে যোগাযোগ করতেছি।
উল্লেখ্য প্রাইভেট ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করতে হলে ১৯৮২ সালের অধ্যাদেশের অধীনে লাইসেন্স ছাড়া কোন ব্যক্তি প্রাইভেট ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না।
অধ্যাদেশের ৯ নং ক্লস অনুযায়ী নিম্নলিখিত শর্তগুলি পূরণ না করা পর্যন্ত একটি প্রাইভেট ক্লিনিক প্রতিষ্ঠার জন্য কোন লাইসেন্স জারি করা হবে না, যথা:-
১.রোগীদের জন্য স্বাস্থ্যকর পরিবেশ সহ উপযুক্ত আবাসন ব্যবস্থা।
২.প্রতিটি রোগীর জন্য কমপক্ষে আশি বর্গফুট মেঝে জায়গা।
৩.একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অপারেশন থিয়েটার।
৪.তফসিল বি-তে উল্লেখ করা প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম।
৫. জীবন রক্ষাকারী এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের পর্যাপ্ত সরবরাহ।
৬.তফসিল সি-তে উল্লেখ করা পূর্ণ-সময়ের নিবন্ধিত মেডিকেল প্র্যাকটিশনার, নার্স এবং অন্যান্য কর্মী।
৭.রোগীদের অপারেশন, চিকিৎসা ও তত্ত্বাবধানের জন্য বিশেষজ্ঞ।
তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
ArrayCopyright © 2026 তেপান্তর | Design & Developed By: ZamZam Graphics