Tepantor

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবায় নৈরাজ্য

15 August, 2023 : 8:07 pm

মোস্তাফিজ চৌধুরী: ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরে চিকিৎসা সেবার নামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা ব্যাপক লাভজনক ও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছে। সেসকল প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যসেবার নামে প্রতিনিয়ত চলছে সেবা প্রার্থীকে হয়রানি, ভুল চিকিৎসা, অতিরিক্ত ফি আদায়, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সেবা দেয়া,চটকদার বিজ্ঞাপন এবং দালালের রোষানলে ফেলে সর্বস্ব হাতিয়ে নেয়ার প্রতিযোগিতা। কিন্তু এই নৈরাজ্য রুখতে নেয়া হচ্ছে না সঠিক ব্যবস্থা, প্রতিনিয়ত করা হচ্ছে না তদারকি।

বেসরকারিভাবে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান চালুর আগে স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে অনুমোদন নিতে হয়। যার জন্য একগুচ্ছ নিয়মকানুন মেনে যোগ্য হতে হয়। চিকিৎসা সেবা দেওয়ার জন্য থাকতে হয় প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স, টেকনোলজিস্ট, যন্ত্রপাতি ইত্যাদি। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিয়েই চালু করা হয় হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনোস্টিক সেন্টার। স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, ক্লিনিক কিংবা ডায়াগনোস্টিক সেন্টার চালুর জন্য স্বাস্থ্য বিভাগের লাইসেন্স, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের লাইসেন্স, পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র নিতে হয়। প্রতি অর্থবছর বেসরকারি হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকের নিবন্ধন নবায়ন করা বাধ্যতামূলক। পুরাতন জেলখানার মোড় থেকে কুমারশীল মোড় পর্যন্ত ১০০ মিটারের মধ্যে রয়েছে কয়েক ডজন  হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনোস্টিক সেন্টার। এসব ক্লিনিকের বেশিরভাগের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের লাইসেন্স, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেই, শুধু আবেদন করেই খুলে বসেছে ব্যবসা। আবার কেউ কেউ ট্রেড লাইসেন্সে চালাচ্ছে ক্লিনিক ও ডায়াগনোস্টিক সেন্টার। প্রশ্নে উঠেছে, জেলা শহরে প্রশাসনের নাকের ডগায় কীভাবে চলছে এসব হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনোস্টিক সেন্টার।

এসব হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনোস্টিক সেন্টারে নেই রোগ নির্ণয়ের মানসম্মত যন্ত্রপাতি, অপারেশন থিয়েটার, পরীক্ষাগার, প্রশিক্ষিত সেবিকা ও ল্যাব টেকনোলজিস্ট। নাক, কান ও গলা ও সার্জনসহ বিভিন্ন রোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নাম দিয়ে সাইনবোর্ড টাঙানো থাকলেও তারা কেবল সাপ্তাহিক ছুটির দিন রোগী দেখেন,যার ফলে রোগীর চাপ অনেক বেশি থাকে, দেয়া যায়না যথাযথ চিকিৎসা। ধার করা খণ্ডকালীন চিকিৎসক দিয়ে চলছে জটিল অস্ত্রোপচারসহ নানা চিকিৎসা,আবার ওটি ইনচার্জ বা এসিস্ট্যান্টরা করে ফেলছে জটিল অস্ত্রোপচার, যার ফলে ভুল চিকিৎসায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে রোগীরা এমনকি মারাও যাচ্ছে কেউ কেউ। জরাজীর্ণ ভবনে ছোট খুপরির মতো কয়েকটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে চলছে অনেক হাসপাতালের কার্যক্রম। কিছু ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ডে স্থাপন করা হয়েছে ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। কিছু হাসপাতাল রয়েছে চিপা গলির ভিতর, জরুরি মুহূর্তে এম্বুলেন্স কেন একটি রিক্সাও যাবেনা সেখানে। এমনকি অনেক প্রতিষ্ঠানে রোগী ওঠানামার সিঁড়িগুলোও সরু। শহরের এ এলাকায় গত তিন শুক্রবার ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে। এসব হাসপাতালে চিকিৎসার নামে ব্যবসা, প্রতারণা, রোগী ভোগান্তির অভিযোগ উঠছে প্রতিনিয়ত।

এসব হাসপাতালের মালিকরা দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতা খাটিয়ে হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনোস্টিক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে বহাল তবিয়তে। অনেক বৈধ ক্লিনিকেরও একটি অংশ লাইসেন্সের শর্ত পূরণ করছে না। বিভিন্ন সময় স্বাস্থ্য অধিদফতর কিংবা ভ্রাম্যমাণ আদালত এসব হাসপাতাল, ক্লিনিকের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে বন্ধ করে,আর্থিক জরিমানা করে। সাময়িক সময়ের জন্য হাসপাতাল, ক্লিনিক বন্ধের নোটিস পাঠানোর মধ্যেই তাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়। সেই বন্ধের নোটিস কেউ মানল কি না তা তদারক পর্যন্ত করে না তারা।

জনস্বাস্থ্য সচেতনরা বলছেন,লোক দেখানো এসব অভিযান বেশিদিন চলমান থাকে না। অভিযান কয়েকদিন চলার পর আগের মতোই বন্ধ হয়ে যায়। বেসরকারি খাতে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া নিয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাব রয়েছে, অভাব রয়েছে মনিটরিংয়ের। বেসরকারি চিকিৎসা খাত চলে গেছে রাঘব বোয়ালদের হাতে। রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাগত অবস্থান দেখিয়ে তারা সব লুটে খাচ্ছে। এসব নিয়ন্ত্রণ আনতে সব কিছু ঢেলে সাজানোর দরকার, কিন্তু যারা নিয়ন্ত্রণ করবে তারাইতো রাঘব বোয়ালদের লোক। তাদের সুবিধার্থেই মাঝে মধ্যে লোক দেখানো অভিযান পরিচালনা করা হয়।

তবে অনেক মালিকরা বলছেন, সরকারি স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে শুরু করে বিভিন্ন দফতর থেকে চূড়ান্তভাবে ছাড়পত্র পেতে কয়েক বছর লেগে যায়। আর নবায়নের নতুন নিয়মে যে ধরনের শর্ত দেয়া আছে তা মেনে হাসপাতাল ও ক্লিনিক চালানো প্রায় অসম্ভব। আবেদন করে দিনের পর দিন ঘুরতে হয়। ঘুষ না দিলে প্রশাসনের কর্মকর্তারা ফাইল ছাড়ে না। ফলে অনেকটা বাধ্য হয়েই নিয়ম না মেনে ব্যবসা চালাতে হচ্ছে তাদের।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের ও জেলা সিভিল সার্জনের ওয়েব পোর্টালের তথ্য অনুযায়ী, জেলা সদরে নিবন্ধিত স্বাস্থ্যকেন্দ্র আছে প্রায় ৮৭ টি,যার মধ্যে হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার ক্যাটাগরি রয়েছে। তবে বর্তমানে আবেদন করে নিবন্ধনের অপেক্ষায় আছে কতটি, তা জানা যায়নি।

সারাদেশে ২০২০ সালে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক নিয়ে অভিযোগের পাহাড় জমার পর সরকার এ খাতে শৃঙ্খলা আনার উদ্যোগ নেয়। পরে লাইসেন্স নবায়ন বা আবেদন করতে সময় বেঁধে দেয়। কথা ছিল যারা আবেদন করবে না, তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চলবে; কিন্তু তা খুব একটা দৃশ্যমান হয়নি। কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হলেও পরে তা চালু হয়েছে। এ ছাড়া সরকারি নির্দেশনা অমান্যকারীদের নিয়ন্ত্রণে অধিদফতরের কিংবা জেলা সিভিল সার্জন অফিসের কোনো মনিটরিং সেল নেই।

করোনা মহামারীর প্রাক্কালে স্বাস্থ্য অধিদফতর অনিবন্ধিত/অবৈধ/নিয়মবহির্ভূতভাবে পরিচালিত/সেবার মান খারাপ এমন বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে বিধি মোতাবেক যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রয়োজনে সিলগালা করে অধিদফতরে পাঠানোর নির্দেশ দেন। কিন্তু করোনা মহামারি শুরু হলে জোরালোভাবে অভিযান চালানোর মধ্যখানেই তা থেমে যায়।

এদিকে ২০১৮ সালের নভেম্বর থেকে অনলাইন পদ্ধতিতে বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক ও ডায়াগনোস্টিক সেন্টারের নিবন্ধন প্রক্রিয়া চালু হয়। তাতে কোনো একটি শর্ত পূরণ না হলে রেজিস্ট্রেশন হয় না, পাচ বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলে এখনও পর্যন্ত এর আওতায় আসেনি সব বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক ও ডায়াগনোস্টিক সেন্টার। এর আগে একই বছরের সেপ্টেম্বরে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের নিবন্ধন ফি এবং নবায়ন ফি ৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে সর্বনিম্ন ৫০ হাজার ও সর্বোচ্চ আড়াই লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এ ছাড়া বিভাগীয় ও সিটি করপোরেশন এলাকায় ১০ থেকে ৫০ শয্যার বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের নবায়ন ফি ৫০ হাজার ও ৫১ থেকে ১০০ শয্যার জন্য ১ লাখ টাকা। শয্যা বেশি হলে আনুপাতিক হারে জনবলও থাকতে হবে। এসব হাসপাতালে কমপক্ষে তিনজন এমবিবিএস চিকিৎসক, ছয়জন নার্স ও দুজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী থাকার শর্তও আছে। প্রতিটি শয্যার জন্য থাকতে হবে ৮০ বর্গফুট জায়গা। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অস্ত্রোপচার কক্ষ, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং নারকোটিকসের লাইসেন্সও থাকতে হবে। এ ছাড়াও সঙ্গে পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্রসহ ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন (কর শনাক্তকরণ নম্বর) ও বিআইএনের (বিজনেস আইডেনটিফিকেশন নম্বর) শর্ত দেওয়া হয়। পরে আবেদনের ভিত্তিতে অধিদফতরের টিম সরেজমিন পরিদর্শন করে লাইসেন্স দেয়।

অভিযোগ রয়েছে, লাইসেন্স দেওয়ার জন্য সরকার থেকে যখন ক্লিনিক ও ডায়াগনোস্টিক সেন্টার পরিদর্শন করা হয় তখন স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের মালিকরা মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে চিকিৎসক, নার্স, চেয়ার-টেবিলসহ বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতি ভাড়া করে আনে। এমনকি এক্ষেত্রে পরিদর্শন কর্মকর্তার সঙ্গে অর্থের বিনিময়ে সমঝোতাও হয়। ফলে অনেক ডায়াগনস্টিক সেন্টার, হাসপাতাল ও ক্লিনিক মালিকই কোনো ধরনের নিয়মনীতির শর্ত পূরণের তাগাদা বোধ করে না। আরও অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায়, স্বাস্থ্য বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা,কিছু অসাধু ডাক্তার, অসাধু সাংবাদিক ও প্রশাসনের সহায়তায় এসব অবৈধ ক্লিনিক চলছে দীর্ঘদিন ধরে। জেলার সর্বত্রই ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা দালালনির্ভর এসব ক্লিনিক, ডায়াগনোস্টিক সেন্টারে গিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে নিরীহ মানুষ। ফলে উন্নত চিকিৎসাসেবার নামে মানুষ ঠকানোর ব্যবসায় পরিণত হয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো।

সরেজমিন দেখা যায়, কুমারশীলমোড় এলাকায় একই ভবনে রয়েছে আল খলিল ও গ্লোবাল অর্থোপেডিক্স হাসপাতাল। এর মধ্যে আল খলিল এর অংশ রয়েছে গাড়ি পার্কিং এর জন্য রাখা আন্ডারগ্রাউন্ডেও। এই দুটি হাসপাতালে গত এক বছরে বিভিন্নভাবে রোগী অসন্তোষের কারণ হয়েছে।

ওই এলাকার একটি প্যাথলজি সেন্টার নামে আরেকটি ক্লিনিকে গিয়ে দেখা গেছে, কোনো চিকিৎসক নেই, নার্স নেই, এমনকি কোনো রোগীও নেই। দুজন কর্মচারী বসে গল্প করছে,ভেতর দিয়ে তালা মারা। ক্লিনিকের নিচে ময়লার ভাগাড়।

নির্মানাধীণ নতুন ভবনে বিভিন্ন ধরনের হাসপাতাল ও ক্লিনিক গড়ে উঠেছে । পুরুষ ও মহিলাদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড-কেবিন ও টয়লেট থাকার কথা থাকলেও সেখানে তা নেই। এ ধরনের একাধিক ক্লিনিক ঘুরে দেখা গেছে, ক্লিনিক বা ডায়াগনোস্টিক সেন্টারের যেসব নিয়মকানুন মেনে চলা দরকার, তা শুধু কাগজ-কলমেই। যে কয়েকজন নিজস্ব চিকিৎসক ও ডিপ্লোমা নার্সসহ জনবল থাকার কথা তা নেই বেশিরভাগ হাসপাতাল ও ক্লিনিকে। অথচ বাইরে সাইনবোর্ডে ঝুলছে এমবিবিএস, বিডিএস, বিডিএ, গাইনি, ডেন্টাল সার্জন, দন্তরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নামসহ নানা চটকদার বিজ্ঞাপন।

চলবে…

Tepantor

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Array